Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / কবিতা / কবিতাগুচ্ছ, শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কবিতাগুচ্ছ, শিমুল সালাহ্উদ্দিন

 শিমুল সালাহ্উদ্দিন

 

একা মানুষের চিঠি

ক.
এক বাক্যের দীর্ঘ চিঠি পাখি, হাহাকারের পৃষ্ঠা খোলা রাখি।

 

খ.
এখনো রাত্রিতে, এখনো একলা, কান্না গলে নামে, আ-গলানাভীমূল
আমারি ভুল ছিল তোমার চুল ছিল দিগন্ত ছাড়িয়ে স্বাপ্নিক উড্ডীন…
তবুও দিনদিন ভুলেই যাওয়া গেছে, যা ছিলো ভুলবার, তোমার ও আমার
তবুও কেনো যে এখনো একলা কান্না গলে নামে আ-গলানাভীমূল

এখনো রাত্রিতে…!
কত যে কান্নার, কত যে কথা থাকে, না বলা না বলা

 

গ.
সারাদিন মনে মনে তোর সাথে কথা বলি। একটা কথার পাহাড় জমেছে ফলে ভেতরে আমার৷ নাম তুইপর্বতমালা। এতো ওজন তার, ঘাড় নুতে নুতে এখন নতজানু আমার মনে হয়, মাথা নোয়াতে জানে না যারা তাদের মাথাই আদতে নেই। তোর সামনে তাই আবার দাঁড়াতে চাই। দুই হাত প্রসারিত।

অস্ফুটে ভালোবাসি বল, উঠে আসব।

 

তোমার সমস্ত শুক্রবার

ঘুম ভেঙে দেখবে একটা আস্ত শুক্রবার তোমার সামনে,
আর তোমার কোন কাজ নাই, বরের সাথে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া নাই,
দেবর ননদদের খুনসুটি নাই, দুম করে হাওয়া হয়ে যাওয়া যায়
এমন কোন কাশফুলের মাঠ নাই, যেখানে দৌড়ে দৌড়ে তুমি
প্রজাপতি হয়ে যেতে চাইবে হলুদ জামার প্রপেলারে ভর করে
আর গাইবে খোলা গলায় ‘আমরা মলয় বাতাসে ভেসে যাব শুধু
কুসুমের মধু করিবো পান…’

একটা আস্ত শুক্রবার তোমার সামনে, অথচ কুসুমে কুঙ্কুমে তোমার
ইগোময় অপেক্ষা সেইদিনের জন্য, যেদিন বিরহকঙ্কাল ফুঁড়ে
তোমার পেশি থেকে গজাবে ফুলডালপালা আর মুদ্রাময় ভরতনট্যম

একটা আস্ত শুক্রবার তোমার সামনে অথচ তোমার
এমন ফাঁকা লাগছে ব্যস্ত ব্যস্ততায়ও, দ্যাখো, তোমার
জগত ভরে থাকা আমি নামের শূন্যতা, টলমল করে
পা রাখছে বৃষ্টিভেজা ওভার ব্রিজের রেলিং-এ…

জড়িয়ে ধরে গায়ে পা তুলে ঘুমহীন শুক্রবারগুলো
তুমি কখনো চাওনি, তাও কি মনে পড়বে তোমার
আজ সকালে, একটা আস্ত শুক্রবার নিজের সামনে
দুমম করে আবিষ্কার করে, সোনা…

 

তোমাকে দুঃস্বপ্নে পেয়ে

অবচেতনে মানুষের কোন হাত নাই
যতই সক্ষম হোক সে, যতই বীর, ভাই-
লোক হোক না মানুষ, স্বপ্নের নিয়ন্ত্রণ
তার হাতে নাই, অবচেতন এইখানে
চেতনার পর্দা আলাদা করে, মানে
ভাগ করে ফেলে মনের অন্ধকার
চিন্তা ও কাঠামোকে আটকে দেয় আর
বলে, এ জগৎ তোমার নয়, যা কিছু
ভাববে তুমি চেতনে তার পিছু পিছু
ধাওয়া করে যাবে অবচেতন তা-ই
তাতে মানুষের কোন হাত নাই।

স্বপ্নে আমি দেখতে চাই যাকে, তাকে ছাড়া
স্বপ্ন আমার ভাঙলে দেখি অন্যরা সব আঁকে।

 

খ.

বহুদিন পর তাকে দেখলাম, স্বপ্নে।

ভয় পেয়ে পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরছে।
স্বপ্নের এক বাস্তব তাকে খুব তাড়া করছে।
ভয় পেয়ে পেয়ে বড় হয়েছিল সে, চারিপাশের
ভয় জয় করে প্রেমে তো পড়েছিল, প্রেমের

বহুদিন পর তাকে দেখলাম, স্বপ্নে।
একা একা খুব, বড় মানুষের মতো বাচ্চা মানুষ করছে,
জামাইয়ের শার্ট জাঙ্গিয়া মোজা ছাদে মেলে ধরছে
দিনে একুশবার তার পুতুলটারে তুলুপুলুতুলু ধরছে

নড়ছে অথচ নড়ছে,
বুকের লকেটে আদিম আমার সেই ছবিটাই নড়ছে
যেনো ইচ্ছে হচ্ছে বলি, আয় নিয়ে যা সব, আয় সব নে
বহুদিন পর তাকে স্বপ্নে দেখলাম, স্বপ্নে।।

সেই একই রকমের আছে, উদার, বলছে সব তোর, নে নে
বহুদিন পর খালি তাকে দেখলাম আমি, যত্নে।

 

দৃশ্যের ভেতরে ২
রেললাইনে শুয়ে পড়লো লোকটা,
আর হুইসেল বাজিয়ে চলে গেলো ট্রেন
মৃত্যু এমনি সহজ।

ট্রেনের কবজভাঙা দরোজায় তখন
দুজন বিনিময় করছিল জীবনের মন্ত্র
ঠোঁটে রেখে ঠোঁট।

জীবন! কী সহজ কী সহজ!

দৃশ্যের ভেতরে
দৃশ্য এটুকুই
সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুছে নেয়া
চুপচাপ পিছিয়ে গিয়ে টের পাওয়া
সেই তুমি ঠিক আছো, এই ‘আমি’ নই।

 

স্বনির্বাসন

সে কেবল পেনিনসুলা
সে কেবল ঘুমভাঙা হ্রদ
পৃথিবীর ওপাড় থেকে
আনে সব উল্টোশপথ

শপথে কয়েক যোজন
রাত্রি-হরদমাদম
দিন ভেঙে, দেই পারি দেই
আত্মার স্বনির্বাসন

ওটি-তো ভুল শব্দ
ও কেবল পেনিনসুলা
অনন্ত জলের মধ্যে
স্থলেরি একটি গোলা

নিজেকে নিজেই যদি
পাঠালে নির্বাসনে
মুক্তির কোন বাসনার
বুদ্বুদ তোমার মনে?

সুতরাং শোনরে ধলা,
সে কেবল পেনিনসুলা
সে কেবল ঘুমভাঙা হ্রদ
পৃথিবীর ওপাড় থেকে
এনেছে উল্টোশপথ।

শপথের মায়রে বাপ আজ
শপথের বাপরে মা-ও
আমাদের অভিধানে
বক্র গভীর মানের
সব ভুল শব্দও দাও
সব ভুল শব্দও দাও।।

পার্সেল

আমার খুব ইচ্ছে হয় একদিন নিজের কর্তিত মাথা হয়ে অতি জরুরী পার্সেলের ভেতর করে তোমার বাড়ি যাবো। প্রবল আগ্রহে পার্সেল খুলে সম্বিৎ হারিয়ে ফেলা তুমি আমার হাসিমুখ লেগে থাকা কাটা মাথার দিকে বিস্ফোরিতনেত্র হামুখে তাকিয়ে থেকে বুঝবে, তুমিহীন একটা আতঙ্কের পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে কেমন লাগে!

চূড়ান্ত লাল থামা
একলা তো লাগেই একা একা,
কোলাহলেও একলা লাগে আমার
বৃষ্টি বাতাস এক করে দেই
চান্স পাই না থামার
মনের ভেতর শীত কিন্তু
স্রোত থামে না ঘামার

চতুর্দিকে আমার আমার আমার
আয়োজন এক চূড়ান্ত লাল, থামার।

 

***

শিমুল সালাহ্উদ্দিন শূন্য দশকের কবি। জন্ম ১৭ অক্টোবর, ১৯৮৭। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বইঃ ৪টি কাব্যগ্রন্থ। শিরস্ত্রাণগুলি (ঐতিহ্য,২০১০), সতীনের মোচড় (শুদ্ধস্বর,২০১২), কথাচুপকথা…(অ্যাডর্ন বুকস্ ,২০১৪), সংশয়সুর (চৈতন্য, ২০১৬)। প্রকাশিত সাক্ষাৎকারগ্রন্থ: “আলাপে, বিস্তারে”, প্রকাশিতব্য উপন্যাস: ‘যৌননগরী মৌননগরী কার্নিভোরাস’। এই কবি একজন সক্রিয় সংস্কৃতিকর্মীও বটে। নেতৃত্ব দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট ও আবৃত্তি সংগঠন ধ্বনি’র। দীর্ঘদিন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ও ‘শিল্প-সংস্কৃতি ও বিনোদন’ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন কাজ করছেন চলচ্চিত্রভিত্তিক স্যাটেলাইট টেলিভিশন, বিজয় টিভির কন্টেন্ট ক্রিয়েটরস স্টুডিওর এডিটর হিসেবে। দুই বাংলার বরেণ্য কবি, শিল্পী. সাহিত্যিক, অভিনেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ব্যতিক্রমী সব সাক্ষাৎকার নিয়ে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন।

কবির ছবি: টুটুল নেছার

Spread the love

Check Also

পাহাড় মন আর উন্নয়ন

      কৃষাণু নস্কর :   পাহাড় মন আর উন্নয়ন এখন এখানে পাহাড় কেটে …

চালচিত্র …

কোজাগরী: চালচিত্র …   নিরঞ্জনের আলো থেকে ফুল ফোটার আওয়াজ … পড়ন্ত বিকেলে অফিস যাত্রীর …

আমার মৃত্যুর জন্যে …

  রঙ্গীত মিত্র :   আমার মৃত্যুর জন্যে … বাফামেট জেগে আছে। কে যেন প্রাগৈতিহাসিক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *