Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / অণুগল্প, উত্তম বিশ্বাস

অণুগল্প, উত্তম বিশ্বাস

 উত্তম বিশ্বাস

 

কুণ্ডহাঁড়ি এবং একজন কাপুরুষের গল্প

বাড়ি থেকে দু’কদম এগোলেই দুর্গাদালান। আজ অষ্টমী। সারা সন্ধ্যা ধরে সাজগোজ করল পূর্বা। কিন্তু শৌনক প্যাণ্ডেলে যাবে না। রেশমের পাজামাটা দু’ দুবার জানু অবধি উঠিয়েও খসিয়ে ফেলল সে। গায়েত্রী দেবী প্রদীপ হাতে শৌনকদের শোবার ঘরে ঢুকে পড়লেন। উনি শৌনকের মা। কাঁচে ঢাকা প্রতিমাটির সামনে প্রদীপটা খানিকক্ষণ ঘুরালেন। তখনও শৌনক কোলবালিশ নিয়ে কাত হয়ে পড়ে আছে খাটের একপাশে। এবার গায়েত্রী দেবী ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “কীরে শানু, সন্ধ্যা আরতি এক্ষুনি শুরু হয়ে যাবে! সবাই যাচ্ছে…. যাবি না?”
-“না মা, বৃষ্টিতে একদম বাইরে বের হতে ইচ্ছে করছে না!”
-“এই বয়সে এত অলস ক্যানো রে! দেবীর মুখখানা একবার দর্শন করবিনে?”
-“এই যে আরতি করলে!… ঘরেই তো দেবী আছে।… আবার ক্যানো?”
পূর্বা রাগ দেখিয়ে খোঁপা থেকে জুঁইফুলের মালাগাছা ছুড়ে ফেলল। পূর্বা শৌনকের জীবন সঙ্গিনী। শৌনক শান্তচিত্তে সেটিকে কুড়িয়ে একটা নৈবেদ্যর বাটায় তুলে রাখল। পরক্ষণেই পূর্বা ঘরে ঢুকে শৌনকের শোকেসে রাখা দেবী প্রতিমার ফুলমালা ঘেঁটে, ওর ভেতর থেকে একগাছা চুড়ি, একটা হীরের নাকছাবি, আর তিনসেট হার বার করে নিল। প্রতিমা বলতে একটি বহুমূল্যবান পুতুল।
গায়েত্রী দেবী পূর্বার নেকলেসের হুক লাগাতে লাগাতে সান্ত্বনা দিলেন, “এই বয়েসে তোদের এত মাথাগরম ক্যানো রে মা? গয়নাগুলো নিবি, নে। তাই বলে অমন সুন্দর গাঁথা মালাটা এভাবে ঘেঁটে রাখলি! বাগানের সব ফুলগুলো দিয়ে একটা একটা করে আসনটা আমি সাজালাম। আর তুই…..! আজকালকার বাজারে অমন একখান ছেলে মাথাকুটে মরলেও আর পাবি? একবার ভালো করে তলিয়ে দ্যাখ…. তোকে তো দেবী করে রেখেছে রে! একজনমে আর কত চাস মা?”
পূর্বা প্রায় কেঁদেই ফেলল, “আপনার ছেলে কী মা! ওর ভাবখানা দেখলে সত্যিই আমার কষ্ট হয়! পুজোপ্যাণ্ডেলে সবাই সবার বউকে নিয়ে ঘুরছে, মজা করছে। অথচ উনি! সত্যি বলছি মা, আমার অমন দেবীত্বে দরকার নেই!”
শৌনক এসব কথার উত্তর দেয় না। বরং সে মনেমনে অস্থির হয় আর ভাবে, “জাস্ট দুটো মিনিটের জন্যে ওকে একটু চোখের আড়ালে নাও মা!”
শহরের একজন বড় স্বর্ণ ব্যবসায়ী শৌনক। যেমন বলিষ্ঠ চেহারা তেমনি স্মার্ট। দোষের মধ্যে দোষ… একটু আধটু পুতুল ম্যানিয়া আর অনেকখানি ইনট্রোভার্ট। কিন্তু তাই বললে কী হবে! ভেতরে ভেতরে সে লালন করে চলে এক অতি উচ্চমার্গের শিল্প সত্ত্বা। এত গুণ অথচ একমাত্র মা বউ ছাড়া কেউই জানে না। শোবার ঘরখানি তার রীতিমতো একখান আর্ট গ্যালারি। দেওয়ালজুড়ে বিশাল বিশাল কাঁচের শোকেস। ওর মধ্যে নানান দেশের মূল্যবান শোপিস। ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে এসব ফাইন আর্টসের আইটেমগুলো কালেকশান করাই শৌনকের নেশা। এর মধ্যে যেটা ইউনিক সেটা হল,…শোবার জন্যে যেখানে ময়ূরপঙ্খী খাটখানি পাতা আছে, তার ঠিক শিথান ঘেঁষে কাঁচের মধ্যে পাতলা একটা রুপোর আসনে বসানো রয়েছে ওই অনিন্দ্যসুন্দর দেবীমূর্তিটি। শৌনক অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে এর নাম দিয়েছে পয়মন্ত পুতুল। এর জন্যেই নাকি শৌনকের ব্যবসায় এতো জাঁক! সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল মূর্তিটির উচ্চতা, দেহের গড়ন, গায়ের রং, মুখের আদল…. হুবহু ঠিক পূর্বার মতো। একেক অকেশানে এক একেকরকম ভাবে সাজিয়ে তোলে শৌনক। দেখে কখনও মনে হবে দুর্গা, কখনো বা দেবী সরস্বতী, কখনো মনে হবে ধনদায়িনী লক্ষ্মী। তবে প্রতিমাটি পাথর কিংবা অন্য কোনও ভারী মেটিরিয়াল দিয়ে নির্মিত নয়, তাই এটিকে সহজেই কাঁচের মধ্যে রেখে তোলা, বা ইচ্ছে মতো স্থানে নামানো ওঠানো করতে পারে শৌনক। ছেলের এমন স্ত্রীভক্তি দেখে গায়েত্রী দেবীও যারপরনাই চমকিত! আর যার এমন স্বামীভাগ্য সেই পূর্বা? একথা বলার অপেক্ষাই রাখে না! অর্থাৎ স্বামীর এমন ঐশ্বরীক প্রেমে পূর্বাও ফুলে ঢোল! তবে পূর্বা পুতুলটির কপালে চন্দন লাগানোর সময় বেশ কয়েকবার অবাক হয়ে এলোমেলো প্রশ্নও করেছে, “এ তো পুরো মানুষের মতো শৌনক! গায়ে একবার হাত বুলিয়ে দ্যাখো, ঠিক আমার স্কিনের মতো সফ্‌ট!”
-“হুম্‌ জানি। একদম মাখন! তোমার ডিটো!”
-“ওমা সে-কী! এমন কখনও হয় না কি? কোত্থেকে আনলে বলো না?”
-“বিদেশ থেকে। বেশি হেজিও না। জানাজানি হয়ে গেলে এর আর ইজ্জত থাকবে না!”
সত্যিই তো স্বামী তার জন্যে এত করতে পারে, আর স্ত্রী হয়ে এটুকু গোপন রাখতে পারবে না পূর্বা! নিশ্চয়ই পারবে। সংসারে সুখ সম্পত্তি অধিকাংশ মেয়েরাই পায়। এটা তো আটপৌরে জিনিস। কিন্তু তার মতো দেবী হবার সৌভাগ্য কজন লাভ করতে পারে! এ নিয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছে অহংকারের অন্ত নেই পূর্বার। শৌনক ওর শোরুম থেকে দামি দামি গহনা এনে সোহাগ করে ওই আসনের তলায় লুকিয়ে রাখে। আর সকাল সন্ধ্যা তাজা ফুলে বেদী সাজিয়ে ওগুলো তুলে নিয়ে নিজের আলমারিতে গুছিয়ে রাখে পূর্বা।
বেশি বাক্যব্যয় করার অবসর নেই। শাশুড়িকে নিয়ে পূর্বা সন্ধ্যারতি দেখবার জন্যে মন্দিরের পথে পা বাড়াল। জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখল বিরাট একটা প্রদীপ হাতে পুরোহিত নধরনলিনী মত্ত হাতির মতো মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আরতি করছে। ভীড়ের মধ্যে মা বউয়ের ভক্তিবিগলিত সুরতখানি আর দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে ধারেকাছে কোথাও ছাতিমফুল ফুটেছে। এবার জোর বৃষ্টি শুরু হল। ধূপধুনো আর নৈবেদ্যর সাথে সদ্যফোটা ছাতিমফুলের ভিজে একটা মাতাল মাতাল গন্ধ অনুভব করছিল শৌনক। মুহূর্তে ওর বুকের মধ্যেও কুড়ুৎ কুড়ুৎ করে বেজে উঠল একশ আটটা ঢাক! নরমপায়ে নেমে, ভেতর থেকে গেটে তালা লাগিয়ে দিল। এরপর বাটা থেকে জুঁইফুলের মালাটা তুলে…. লোমশ বাহুতে পেঁচিয়ে …. বুকভরে গন্ধ নিল।
এখন খোলা শোকেসের সামনে এসে দাঁড়াল এক আদিম পুরুষ, শৌনকের সাথেই থাকে। অথচ শৌনক নিজেও যাকে চেনে না!
গয়না খুঁজতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় পুতুলটাকে এক্কেবারে বিবস্ত্র করে রেখে গেছে পূর্বা! অব্যক্ত ব্যথায় বুকের ভেতরটা টসটস করে উঠল শৌনকের!
জানলার পর্দা ফাঁক করে আরও একবার বাইরে উঁকি মেরে দেখে নিল সে। না কেউ নেই। শার্টের বোতাম খোলা। শরীরে বৃষ্টির জোর ঝাপট এসে লাগছে। এবার পুতুলটাকে কাঁচের আড়াল থেকে নামিয়ে বিছানায় তুলে বেডসুইচ অফ করে দিতেই কে যেন খিলখিল করে হেসে উঠল।
আর ঠিক তখন মন্দির থেকে বিক্ষিপ্ত অথচ ধীরমন্দ্রিত স্বরে ভেসে আসছিল আদি ভোগপর্বের চণ্ডীপাঠ, “এষ সচন্দন পুষ্প পত্রাঞ্জলি!…. বলপ্রদায়িনী কামার্থ মোক্ষদে!….. মহারাত্রি…. মহাবীর্যে….ত্রম্বকে গৌরী নারায়ণী নমস্তুতে!”

***************
উত্তম বিশ্বাসের জন্ম ১৯৮০ সালে। বনগাঁর এক অখ্যাত সীমান্তগ্রাম সুটিয়ায়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে এমএ। পেশায় শিক্ষক। প্রকাশিত গ্রন্থ ‘নদীতৃষ্ণা ও অলৌকিক মাছেরা’ ২০১৮ (গল্পগ্রন্থ)। উপন্যাস ‘বন্ধ্যানদীর বালিহাঁস’ ২০১৯,। কাব্যগ্রন্থ ‘জলটুঙি’ ২০১৯,। প্রকাশের পথে ‘মাটির সিন্দুক’ (গল্পগ্রন্থ) বইমেলা ২০২০। ২০১৮ সালে পেয়েছেন ‘রামমোহন রণজিৎ পাল সাহিত্য পুরস্কার’। ভালোবাসেন লেখালিখি ও গান।

Spread the love

Check Also

ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’

 সৌমিককান্তি ঘোষ   কাশীনাথ বামুন কাশীনাথ দরজা খুলতেই পশ্চিমের পড়ন্ত আলোয় মায়ের মুখটা চিক্ চিক্ …

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্য গল্প, দ্বারকানাথের মেজদাদু

 দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:   দ্বারকানাথের মেজদাদু দ্বারকানাথ ভূতে বিশ্বাস করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস …

তামাকপাতার দেঁজাভু সম্মাননা

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়: হরেন দে ওরফে এবং হৃদয় এখন একজন মস্ত বড় কবি। তো দীর্ঘদিন কবিগিরি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!