Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / রবিবারের গল্প: ত্রি

রবিবারের গল্প: ত্রি

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়:

ত্রি

দু’ঘন্টা ধরে তিনটি মেয়ে গাড়ির মধ্যে বন্দি। বাইরে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তীব্র বেগে হাওয়া বইছে। সেই সঙ্গে বৃষ্টি, ঘনঘন বজ্রপাত।

পেখম, মেখলা আর মাটিল্ডা— প্রবাসী বাঙালি, কানপুরে থাকে। ওরা নিজেদের মধ্যে বাংলাতেই কথা বলে। যখন কোনও অবাঙালির সঙ্গে কথা বলার দরকার পড়ে তখন লোক বুঝে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ওরা বেছে নেয় ইংরেজি বা হিন্দি। তিন বান্ধবী ফিরছিল বিল্হৌর থেকে। আজ দশেরা। দশেরার দিন বিল্হৌরের রামলীলা ময়দানে তিরিশ ফুটের রাবণদহন হয়। সঙ্গে ফাউ হিসেবে পাওয়া যায় মনোহারী এক গ্রামীণ মেলা। ওদের মধ্যে মাটিল্ডার আবার ফোটোগ্রাফির শখ। রাবণদহন ছাড়াও একটা অন্যরকম পরিবেশ, অন্যরকম সব মানুষজন ওদের বেশ টানে। এই প্রথমবার নয়। আগেও ওরা এখানে এসেছে। কানপুর থেকে বিল্হৌর মাত্র ৫৫ কিলোমিটার। তার মধ্যে বেশ কিছুটা পথ অরণ্য-ঘেরা। তবুও ওরা কোনও ড্রাইভার নেয়নি। কেনই বা নেবে? পেখম এবং মাটিল্ডা দুজনেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। গাড়িটা মাটিল্ডার বাবার। ওই অরণ্য-সংকুল রাস্তাটা দারুণ রোমাঞ্চকর। ড্রাইভার আনলে সেই থ্রিলিং-টা আর থাকে না।

রাবণদহন শেষ হতে হতে রাত আটটা বেজে গেল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে পোঁছতেই আকাশের মুখ ভার। মেখলা বলেছিল— “হ্যাঁ রে, এত রাত হয়ে গেল, ফেরাটা কি ঠিক হবে? আকাশের অবস্থাও ভালো নয়। তার চেয়ে এখানে কোনও গেস্টহাউস দেখে আজ রাতটা থেকে গেলে কেমন হয়?” পেখম মেখলার কথা উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল— “তোর কি মনে হয় আমাদের থাকার মতো কোনো হোটেল এখানে পাওয়া যাবে?” মেখলাই তখন উল্টে বলেছিল— “এসব জায়গায় থাকাটাও রিস্ক, তার থেকে কানপুর ফিরে যাওয়াই ভালো।” মাটিল্ডা আশ্বাস দিয়ে বলেছিল— “আরে কতক্ষণই বা লাগবে, দশটার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যাবি।” কিন্তু বিধি বাম। বনের মধ্যে এসে ওদের গাড়ি খারাপ হয়ে গেল। সেই সঙ্গে শুরু হল তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। তিনজনে মিলে ঠেলে-ঠুলে গাড়িটাকে কোনোরকমে রাস্তার একপাশে সরাতে পেরেছে। ব্যাস এইটুকুই। একজনের মোবাইলেও টাওয়ার নেই। পথ চলতি দু’একটা গাড়িকে ওরা থামানোর চেষ্টা করেছিল। কেউ থামেনি। যাওবা একটা ট্রাক থামল, ট্রাক-ড্রাইভার ভিজে সপসপে তিনটে মেয়ের দিকে এমন লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল যে ওরা দৌড়ে গাড়ির মধ্যে পালিয়ে আসতে বাধ্য হল। গাড়ির কাঁচ সব তোলা ছিল। মাটিল্ডা তাড়াতাড়ি দরজাগুলো লক করে দিল। তাতেও নিস্তার নেই। ট্রাক-ড্রাইভার তার খালাসিকে নিয়ে ট্রাক থেকে নেমে এল। অনেকক্ষণ ধরে ওরা গাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করল। বারবার কাঁচে টোকা মারছিল। বেশ অনেকক্ষণ ধরে এসব চলল। এইবার মাটিল্ডা সবাইকে অবাক করে দিয়ে নিজের ট্রাইপডের ব্যাগটা নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল, ট্রাকওয়ালা আর খালাসিটার দিকে তেড়ে গিয়ে চিৎকার করে হিন্দিতে বলতে লাগল— “কী ভেবেছিস কী? আমরা সাধারণ মেয়ে? এমনি এমনি বনের মধ্যে ঘুরছি? আমরা টেররিস্ট। দেখ, কী আছে আমাদের কাছে। তোকে তোর ট্রাকশুদ্ধু উড়িয়ে দিতে আমার দু’মিনিটও সময় লাগবে না।” ততক্ষণে পেখমও গাড়ি থেকে নেমে এসেছে। একটা আধলা ইঁট কুড়িয়ে ছুঁড়ে দিয়েছে ট্রাক-ড্রাইভারের দিকে। এ-পথে তো অনেক ইঁট বোঝাই লরি-টরি যায়, কোনোটা থেকে কোনোদিন হয়তো ইঁটটা পড়ে গিয়েছিল। যদিও সেটা করোর গায়ে লাগেনি। তবে কাজ হল। ট্রাক-ড্রাইভার ও খালাসি ট্রাক নিয়ে একদম ভোঁ ভাঁ। এত বিপদের মধ্যেও পেখম আর মাটিল্ডা নিজেদের কান্ডকারখানা দেখে নিজেরাই হেসে কুটোপাটি। ওরা দুজনে গাড়িতে ফিরে এল। মেখলার মুখে তবে হাসি নেই, শুধু বলল— “তোরা পারিস বটে!” মাটিল্ডা তখন বলল— “অ্যাই দেখলি, সামনে একটা সরু পথ বনের মধ্যে ঢুকেছে?” পেখম বলল— “দেখলাম বটে। পায়ে হাঁটা পথ।” মাটিল্ডা বলল— “রাস্তা যখন আছে, ভেতরে নির্ঘাত কোনও জনবসতি আছে।” এসব শুনে মেখলা আরও আতঙ্কিত হয়ে বলল— “খবরদার কেউ গাড়ি থেকে নামবি না।” পেখম বলল— “তাহলে উপায়? গাড়িতে রাত কাটানোটা নিরাপদ নয়। দেখলি তো একটু আগে কী হল।” তারপর থেকে তিনজনেই চুপ। সময় চলে যাচ্ছে। দুর্যোগ বাড়ছে।

তখন রাত এগারোটা। ওরা হঠাৎ দেখতে পেল, বনের মধ্যে যাওয়ার সেই সরু গলি দিয়ে সাদা চাদর মাথায় কে যেন বেরিয়ে এল। দেখা মাত্রই মেখলা ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে উঠল— “ভূত! এটাই একমাত্র বাকি ছিল।” পেখম ধমক দিয়ে বলল— “পাগল হয়ে গেছিস? ভূত বলে কিছু হয়? চুপ থাক।” ব্যক্তিটি ওইখানেই দাঁড়িয়ে রইল। দেখে বোঝা যাচ্ছিল, লোকটি বেশ লম্বা। মাটিল্ডা বলল— “বলছিলাম না, ভেতরে লোকবসতি আছে। দেখ। ওই লোকটিকে জিজ্ঞেস করলে একটা আশ্রয় মিললেও মিলতে পারে।” মেখলা বাধা দিয়ে বলল— “এও তো খারাপ লোক হতে পারে।” পেখম বলল— “আমরা তিনজন। ও একা কী করবে? মাটিল্ডা তোর ট্রাইপডের ব্যাগটা নিয়ে আমার সঙ্গে চল তো।” মেখলা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। পেখম এমন একটা দৃষ্টি নিক্ষেপ করল যে সে আর কিছু বলতে পারল না। সাদা-চাদর তখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। মাটিল্ডা ট্রাইপডের ব্যাগ নিয়ে গাড়ি থেকে নামল, সঙ্গে পেখমও। ওরা দৌড়ে গেল ওই দীর্ঘাঙ্গ মানুষটির দিকে। পেখম হিন্দিতে বলতে লাগল, ওদের গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে, ভীষণ বিপদে পড়েছে, ওরা এই রাত্রের মতো একটা আশ্রয় খুঁজছে। ভদ্রলোক কোনো কথা বললেন না। শুধু ওই পায়ে-চলা পথটার দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করলেন। ঠিক সেই সময় বিদ্যুৎ চমকাল। ভদ্রলোকের মুখটা দেখে পেখম এবং মাটিল্ডা দুজনেই ভয়ে তিন পা পিছিয়ে গেল। তাঁর সারামুখ ক্ষত-বিক্ষত, পুঁজ-রক্তে ভর্তি, যেন পচে গলে গলে পড়ছে। কপালের ঠিক মাঝখানে বিশাল বড় একটা গর্ত, কোনো কালে যেন তাঁর তৃতীয় চক্ষু ছিল, আজ আর নেই। মুখ দেখে বয়স বোঝার তো কোনও উপায় নেই। তবে সটান দেহ। উচ্চতা প্রায় সাড়ে ছ’ফুটের মতো। এককালে যে বেশ মজবুত শরীরের অধিকারী ছিলেন তা ভালোই বোঝা যায়। এখন চেহারা ভেঙে গেছে।
ভদ্রলোক আর দাঁড়ালেন না। বড় রাস্তার যেদিকে কানপুর সেই দিকে হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন। তিনি তখন বেশ খানিকটা দূরে চলে গেছেন, পেখম একটা ঢোক গিলে বলল— “ভয় পাওয়ার কিছু নেই। লেপরসি কেস।” শুনে মাটিল্ডা শুধু বলল— “হুঁ।” মেখলা ততক্ষণে অধৈর্য হয়ে পড়ছিল, গাড়ি থেকে মুখ বের করে বলল— “কী হল কী তোদের?” মাটিল্ডা নীচু গলায় পেখমকে বলল— “ওঁকে দেখতে যেমনই হোক, ভদ্রলোক বলেই তো মনে হল। আশা করা যায় এই পথে গেলে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পাব।” পেখম বলল— “চল, ভেতরে গিয়েই দেখা যাক না।” ওরা দুজনে গাড়িতে ফিরে এল। সঙ্গে যা জিনিস-পত্র এনেছিল গাড়ি থেকে বের করল। মেখলা জিজ্ঞাসা করল— “আমরা যাচ্ছি কোথায়?” পেখম উত্তর দিল— “জানি না। আমাদের সঙ্গে যেতে হলে চল। নয়ত এখানে পড়ে থাক।” বাধ্য হয়ে মেখলা ওদের সঙ্গ নিল। বনের মধ্যে দিয়ে কিছুটা এগোতেই কোনও এক মন্দিরের ঘন্টা বাজার শব্দ শোনা গেল। মাটিল্ডা বলল— “আমরা ঠিক পথেই যাচ্ছি। মন্দির যখন আছে, লোকালয় নিশ্চই পাব।” আরও খানিকটা হাঁটার পর ওরা একটা মন্দির দেখতে পেল, যার গর্ভগৃহে তখনও আলো জ্বলছে। ঠাকুর দালানে বেশ কয়েকটা ঘন্টা, হাওয়ার তোড়ে ঢংঢং ঢংঢং করে বাজছে। কিন্তু, আসে-পাশে গাছপালা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। পেখম বলল— “আজকের রাতটা আমাদের এই মন্দিরের মধ্যেই কাটাতে হবে, মনে হচ্ছে।” মাটিল্ডা বলল— “আমার কি মন্দিরে ঢোকা উচিত হবে?” পেখম আবার রেগে গেল, চিৎকার করে বলল— “কেন? তুই খৃষ্টান বলে? একদম ন্যাকামি না, বলে দিচ্ছি।” ওরা তিনজনে মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করল। ওটি একটি শিব মন্দির। এত ঝড়ের মধ্যেও গর্ভগৃহের প্রদীপগুলো নিভে যায়নি। এতক্ষণ ধরে ভিজে পোশাকে থাকায় ওদের খুব শীত করছিল। মন্দিরের ভেতরটা আশ্চর্য রকম গরম। ঢুকে ওরা দরজা ভেজিয়ে দিল। কিন্তু, ভেতর থেকে দরজা আটকাবার কোনও খিল বা ছিটকিনি কিছুই দেখতে পেল না। মাটিল্ডা দরজায় ঠেস দিয়ে বসে গেল। মেখলা শিবলিঙ্গে প্রণাম করে বলল— “ঠাকুরের কী মহিমা, দেখ।” পেখম সে কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল— “শিবের ওই ত্রিশূলটা তুলে আন। দরজায় ছিটকিনি নেই।” মেখলা বলল— “কোনও দরকার নেই। ভগবান যখন আশ্রয় দিয়েছেন, তখন ভগবানই রক্ষা করবেন।” পেখম আবার চেঁচাতে লাগল— “এখন যদি ১০-১২ টা লম্পট এসে মন্দিরে ঢোকে, কোন শিব আসবে রে তোকে বাঁচাতে?” তখন মাটিল্ডাও বলল— “ছাড় না পেখম, সব তাতে মাথা গরম করিস কেন? এখানে কে আসবে? তাও এই দুর্যোগের মধ্যে?” পেখম আরও রেগে গেল, বলল— “কী ভাবছিস, ওই ট্রাইপড দিয়ে সব সময় বাজীমাত করবি? চারিদিকে গভীর জঙ্গল, কোনও বন্য জন্তুও তো আসতে পারে। তখন সেটাকে বলিস— “এই যে দেখছ, এটা রকেটলঞ্চার, তোমাকে না, এক্ষুণি উড়িয়ে দেব। আর সেও সুরসুর করে কেটে পড়বে!” এ-সব বলে পেখম নিজেই টানা-হেঁচড়া করে শিবের ত্রিশূলটা তুলে ফেলল। তারপর হাত দিয়ে ধার পরীক্ষা করে মাথা নাড়ল এবং মাটিল্ডার পাশে এসে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল। মাটিল্ডা মস্করা করে বলল— “কী বুঝলি? এতে বাঘ মরবে?” পেখম কোনও উত্তর দিল না। মেখলা বলল— “জানি তুই মেজাজ দেখাবি, তাও বলছি, কাজটা ঠিক করলি না।” এবারও পেখম কোনও কথা বলল না। প্রসঙ্গ পাল্টে মাটিল্ডা বলল— “কী খিদে পাচ্ছে!” মেখলাও বলল— “আমারও পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে, কতক্ষণ খাইনি বল তো! আজ রাতে না খেয়েই থাকতে হবে।” এমন সময় পেখম মুখ খুলল— “ওই দেখ, ওগুলো কী?” পেখম যেদিকে আঙুল দেখাচ্ছিল, বাকি দুজন সেই দিকে তাকিয়ে দেখে দুটো বড় বড় পেতলের থালা ভর্তি একগাদা ফলমূল। মেখলা বলল— “মনে হয় ঠাকুরের নৈবেদ্য।” পেখম বলল— “চল, ওগুলো খেয়ে ফেলি।” আবারও বাধ সাধল মেখলা, বলল— “ওগুলো খাওয়া কি ঠিক হবে?” ব্যাস আর যায় কোথায়! পেখম চেল্লাতে লাগল— “ঠাকুরের প্রসাদ খাস না? ভগবান ওপর থেকে নেমে এসে সব গবগবিয়ে খেয়ে যায় বুঝি? মাটিল্ডা, তুই এবার কী বলবি? “আমি খৃষ্টান, আমার নৈবেদ্যর ফল খাওয়া উচিত না!” মাটিল্ডা কিছু বলার আর সাহস পেল না। পেখম একটা থালা নিজের কাছে টেনে নিয়ে এল এবং “আমি খেতে শুরু করলাম। যে খাবি খা। না খেলে উপোস করে মর।”— বলে ফল খেতে শুরু করল। তখন বাকি দুজনও সোনামুখ করে খেতে লাগল। খাওয়া-দাওয়ার পর তিনজনেরই খুব ঘুম পেতে লাগল। সারাদিন ধকল গেছে। ততক্ষণে ঝড়ের দাপটও কমেছে, ঘন্টার আওয়াজ আর শোনা যাচ্ছে না। শুধু বৃষ্টির শব্দ আসছে। তিনজনেই একে একে ঘুমে ঢলে পড়ল। মাটিল্ডা বা পেখম কেউই দরজা আগলে বসে থাকতে পারল না, ঘুমের ঘোরে মন্দিরের মেঝেতে গড়াগড়ি খেতে লাগল।

মন্দিরের দরজাটা হঠাৎ করে সশব্দে খুলে গেল। তিনজনে ধড়মড় করে উঠে বসল। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে তখন সকালের আলো ফুটে গেছে। মন্দিরের দরজায় এক ব্যক্তির আগমন ঘটেছে। গর্ভগৃহের প্রদীপগুলিও ততক্ষণে নিভে গেছে। ফলত, যিনি এসেছেন তাঁকে ছায়ামূর্তির মতো দেখতে লাগছে। ঘটনার আকস্মিকতায় সদ্য-ঘুম-ভাঙা তিনটি মেয়ের ট্রাইপড বা ত্রিশূলের কথা মাথাতেই এল না। একে ওপরকে জড়িয়ে ধরে ওরা তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল। এদিকে যিনি এসেছেন, তিনিও মেয়েদের দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। সেই মানুষটিও আর্তনাদ করে উঠলেন। অবশেষে মাটিল্ডা সম্বিত ফিরে পেয়ে আগন্তুকের উদ্দেশে হিন্দিতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল— “কে আপনি? কী চান এখানে?” ভদ্রলোক আমতা আমতা করে হিন্দিতে উত্তর দিলেন— “আমি এই মন্দিরের পুরোহিত। কিন্তু, তোমরা কে?” মেয়েরা একটু আশ্বস্ত হল। মেখলা বলল— “আমরা কানপুরে থাকি। বিল্হৌরে গিয়েছিলাম রাবণদহন দেখতে। রাস্তায় গাড়ি খারাপ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে মন্দিরে আশ্রয় নিই।” পুরোহিত তখন বললেন— “তোমরা এখানে এলে কী করে?” পেখম বলল— “রাতে একজনের সঙ্গে দেখা হয়, তিনিই মন্দিরের পথ বাতলে দিয়েছিলেন।” পুরোহিত বললেন— “রাতে মানে, কখন? কোথায় দেখা হল?” এবার মাটিল্ডা মুখ খুলল— “এই ধরুন, রাত্তির এগারটা নাগাদ। বড় রাস্তা থেকে যে পথটা বনের মধ্যে ঢুকছে সেই পথ দিয়ে একজন হেঁটে বেরিয়ে এলেন।” পুরোহিত ঘাড় নেড়ে বললেন— “এখানে সূর্যাস্তের পর তো কেউ আসে না। কাছাকাছি কোনও জনবসতিও নেই। এত ঝড়-জলের মধ্যে কে আসবে?” পেখম ভ্রু কুঁচকে বলল— “আপনার কি মনে হচ্ছে, আমরা মিথ্যে কথা বলছি?” মাটিল্ডা চোখের ইশারায় পেখমকে চুপ করতে বলল। ভদ্রলোক আবার জিজ্ঞাসা করলেন— “গতরাত্রে তোমরা যাঁকে দেখেছিলে, তাঁকে কেমন দেখতে বলতে পারবে? তাঁর মুখ দেখেছিলে?” মেখলা তাড়াতাড়ি বলতে শুরু করল— “সাদা চাদর মুড়ি দেওয়া। খুব লম্বা।” এর চেয়ে বেশি মেখলা জানতও না। মাটিল্ডা বাকিটা বলে দিল— “মনে হয় কুষ্ঠরোগী, মুখ দেখে যে কেউ আঁতকে উঠবে।” পুরোহিত বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন— “আর?” পেখম বলল— “কপালে বিশাল বড় একটা গর্ত।” শোনা মাত্র মেখলা বাংলাতে বলে উঠল— “তোরা আমায় আগে বলিসনি তো!” মাটিল্ডা হিন্দিতেই বলল— “তুই ভয় পাবি বলে বলিনি।” এসব শুনে পুরোহিত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আবার জেরা শুরু করলেন— “তোমরা মন্দিরের মধ্যে ঢুকলে কী করে? মন্দিরে তো তালা দেওয়া ছিল।” পেখম বলল— “না, খোলা ছিল। নয়ত ঢুকব কী করে?” পুরোহিত বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন— “তালা যদি খোলাই থাকে, তাহলে আমি কী করে এসে তালা খুললাম?” পেখম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, মাটিল্ডা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল— “বিশ্বাস করুন, আমরা একবিন্দুও মিথ্যে বলছি না।” পুরোহিত বললেন— “আমি বিশ্বাস করলাম।” মেখলার এবার নজর গেল শিবের খুলে রাখা ত্রিশূলটার দিকে, সে বলে উঠল— “আমরা একটা অন্যায় করে ফেলেছি। আত্মরক্ষার যদি প্রয়োজন পড়ে সেই ভেবে ত্রিশূলটা খুলে ফেলেছি।” পুরোহিত বললেন— “সে ঠিক আছে, আমি আবার লাগিয়ে নেব। কিন্তু, অন্ধকারের মধ্যে খুললে কী করে?” মেখলা বলল— “অন্ধকার তো ছিল না, মন্দিরের ভেতরে অনেক প্রদীপ জ্বলছিল।” পুরোহিত আবার হতবাক। কিছুক্ষণ পরে ভদ্রলোক বললেন— “অতক্ষণ তো প্রদীপ জ্বলার কথা নয়!” মালিল্ডা আবার বলল— “আমরা একটাও মিথ্যে কথা বলছি না।” মেখলাও বলল— “মন্দিরে বসে মিথ্যে বলব?” পুরোহিত ঘাড় নেড়ে বললেন— “আমি তোমাদের সব কথা বিশ্বাস করছি … তোমরা এখন বাইরে গিয়ে বসো, আমি পুজোটা সেরে নিই। এখান থেকে এক মাইল দূরে আমাদের গ্রাম। সেখানে একজন ভালো মোটর মেকানিক আছে। শহরের বড় গ্যারেজে কাজ করে। তোমাদের কপাল ভালো, ছেলেটি এখন ছুটিতে এসেছে। আশা করি সে তোমাদের গাড়ি মেরামত করে দিতে পারবে। তোমরা যদি রাজি থাক, পুজো হয়ে গেলে আমি তোমাদের আমার গ্রামে নিয়ে যাব।” এ-ছাড়া মেয়েদের হাতে অন্য কোনও উপায়ই বা কী আছে? ওরা সম্মতি জানাল। তারপর পেখম বলল— “আমরা যদি ততক্ষণ বড় রাস্তায় গিয়ে আমাদের গাড়িটা একবার দেখে আসি?” পুরোহিত বললেন— “গাড়িটা সাইড করা আছে তো?” মাটিল্ডা বলল— “তা আছে। তাও একবার দেখে আসতে চাই।” পুরোহিত বললেন— “ঠিক আছে, যাও। আমি তোমাদের অপেক্ষায় থাকব।”

নিজেদের জিনিস-পত্রগুলো নিয়ে মেয়েরা মন্দিরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল। বনপথ চিনে গাড়ির কাছে পৌঁছতে ওদের কোনও অসুবিধা হল না। গিয়ে দেখল, গাড়ি যেমন ছিল তেমনি আছে। তিনজনের মোবাইলই ততক্ষণে চার্জ শেষ হয়ে সুইচড অফ। পেখম বলল— “আমরা কী মাইরি! রাতে ফোনগুলো বন্ধ করে দিলাম না কেন?” মাটিল্ডা বলল— “তাতেই বা কী হত? এখানে টাওয়ার পেতিস?” মেখলা বলল— “রাতে পাওয়া যায়নি বলে দিনেও পাওয়া যাবে না, তার কী মানে আছে? তাছাড়া কাল তো আবহাওয়া খারাপ ছিল।” মাটিল্ডা মজা করে বলল— “ঝড়ে টাওয়ার পড়ে গিয়েছিল, বলছিস? আর সকাল হতে না হতেই সবক’টা টাওয়ার উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে?” পেখম প্রসঙ্গ পাল্টে মাটিল্ডাকে বলল— “তোর কাছে সিগারেট থাকলে দে তো।” মাটিল্ডা একটা সিগারেটের প্যাকেট আর একটা লাইটার ব্যাগ থেকে বের করে পেখমের হাতে ধরিয়ে দিল। মেখলা আতঙ্কিত হয়ে বলে উঠল— “তোরা এখন সিগারেট খাবি নাকি! পুরোহিত মশাই এসে পড়লে?” পেখম বলল— “সে এখন পুজোয় ব্যস্ত।” মাটিল্ডা বলল— “উঁহু, এখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফোঁকা উচিত হবে না। রাস্তা দিয়ে কোনও গাড়ি-টারি গেলে তারা আমাদের দেখে ভাবতেই পারে আমরা বাজে মেয়ে এবং আমাদের সঙ্গে যা ইচ্ছা তাই করা যায়।” পেখম তখন বলল— “চল, তাহলে বনের মধ্যে ঢুকে সুখটান দিই।” বড় রাস্তা থেকে সরে এসে জঙ্গলের মধ্যে ওরা সিগারেট ধরাল। মেখলাও ওদের সঙ্গে দু-টান দিল এবং প্রচণ্ড রকম কাশতে শুরু করল। তাই দেখে পেখম বিরক্তির স্বরে বলে উঠল— “এ মেয়ে আর কোনোদিন মানুষ হবে না!” ধূমপান পর্ব মিটলে মেখলা নিজের ব্যাগ থেকে একটি নামী ব্র‍্যান্ডের পারফিউম বের করে সবার গায়ে স্প্রে করে দিল। মাটিল্ডা মেখলার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল— “মেয়ের বুদ্ধি আছে।” তারপর ওরা মন্দিরের পথে হাঁটতে শুরু করল।

মন্দিরের সামনে এসে দেখে ওরা একদম ঠিক সময়ে এসে পৌঁছেছে। পুরোহিত মশাই সবেমাত্র পুজো শেষ করে মন্দিরে তালা দিচ্ছেন। বাইরে থেকেই মেখলা দেবতার উদ্দেশে একটি প্রণাম জানাল। ভদ্রলোক ওদের দেখতে পেয়ে বললেন— “ওহ, তোমরা এসে গেছ। চলো আমার সঙ্গে।” পুরোহিত আগে আগে চললেন, পিছন পিছন মেয়েরা। সেই সময় মেখলা মাটিল্ডার কানে কানে বলল— “তোর নাম কিন্তু মায়া, ঠিক আছে?” যতই নিচু গলায় বলুক, পেখম কথাটা ঠিক শুনে ফেলল এবং মেখলার দিকে বিস্ফারিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। বিষয়টা মাটিল্ডার নজর এড়াল না, পেখমকে বুঝিয়ে ফিসফিস করে বলল— “ও কিছু ভুল বলেনি। আমি যত দূর জানি, এসব গ্রামাঞ্চলে জাতপাতের বাছ-বিচার প্রচণ্ড।” কথা বলতে বলতে মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছিল। বিষয়টা অনুধাবন করে পুরোহিত মশাই বললেন— “তোমাদের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না? কাল রাত থেকে নিশ্চই পেটে কিছু পড়েনি? গ্রামে চলো, আমার বাড়িতে দু’টি খেয়ে নেবে।” শুনে মেখলা মাথা নীচু করে বলল— “মাফ করবেন। কাল রাতে খিদের জ্বালায় মন্দিরে রাখা নৈবেদ্যর সব ফল আমরা খেয়ে ফেলেছি।” পুরোহিত আবার বাকরুদ্ধ। হাঁটা থামিয়ে মেয়েদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। অবশেষে বললেন— “মন্দিরে ফল পেলে কী করে? নৈবেদ্যে ফল তো দেওয়া হয় হয় না। এখানে চাল দেওয়া হয়। চালই প্রসাদ।” মাটিল্ডা তখন বলল— “না, ফল ছিল তো! বড় বড় দুটো পিতলের থালা-ভর্তি ফল!” ভদ্রলোক গম্ভীর স্বরে আবার বললেন— “আমি তোমাদের সব কথা বিশ্বাস করছি।” বলে আবার হাঁটতে শুরু করলেন, মেয়েরাও চলল পিছু পিছু। কোনও এক অজানা কারণে ওদের তিনজনেরই কেমন যেন গা ছমছম করতে লাগল। ওরা আবার নিজেদের মধ্যে নীচু স্বরে কথা বলতে লাগল। মেখলা বলল— “সব কিছু কেমন যেন আশ্চর্য!” পেখম বলল— “এই লোকটার কথার সঙ্গে তো আমাদের অভিজ্ঞতা কিছুই মিলছে না! কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বলত আমাদের? এর সঙ্গে যাওয়া আদৌ কি উচিত হচ্ছে?” মাটিল্ডা বলল— “এঁকে দেখে খারাপ লোক বলে মনে হচ্ছে তোর?” পেখম তখন ঘাড় নেড়ে “না” বলল, সঙ্গে যোগ করল— “তবে কিছু একটা রহস্য তো আছেই।”

দেখতে দেখতে পুরোহিতের গ্রাম এসে পড়ল। ভদ্রলোক তাঁর বাড়িতে নিয়ে এসে মেয়েদের বসালেন। মাটির বাড়ি, টিনের ছাদ। চারদিকে অভাবের ছাপ সুস্পষ্ট। কিছুক্ষণ বাদে, পুরোহিত ঘুরে এসে জানালেন, মোটর মেকানিককে খবর দেওয়া হয়েছে, সে একটু বাদে আসছে। তিনি কোত্থেকে একটা মোবাইলও জোগাড় করে এনে দিলেন, বললেন, এই অঞ্চলে একটি বিশেষ নেটওয়ার্ক ছাড়া আর কোনও নেটওয়ার্ক কাজ করে না, মেয়েদের যদি বাড়িতে খবর দেওয়ার থাকে তাহলে তারা এই মোবাইলটি ব্যবহার করতে পারে। ফোনটি নিয়ে তারা একে একে যে যার বাড়িতে খবর দিল। এরপর দেখা গেল, একটি-দুটি করে গ্রামের মানুষ মেয়েদের কাছে আসছে এবং তাদের কাছে গতরাত্রের ঘটনা শুনতে চাইছে। পাড়া-গাঁ অঞ্চলে খবর ছড়িয়ে পড়তে আসলে বেশি সময় লাগে না। আরেকটা ব্যাপারও লক্ষ্য করা গেল, গ্রামের মানুষের ওই দীর্ঘকায় কুষ্ঠরোগীটিকে নিয়েই বেশি আগ্রহ। ওরা বারবার ওই লোকটির কথাই জানতে চাইছিল। এক কথা বারবার বলতে বলতে পেখমের চোখে-মুখে ফুটে উঠছিল একরাশ বিরক্তি। মাটিল্ডা পেখমের উদ্দেশে ফিসফিস করে বলল— “মাথা ঠাণ্ডা রাখ। গ্রামের লোকেদের কৌতুহলটা একটু বেশি হয়। তেমন হলে তুই উত্তর দিস না, আমরা দিচ্ছি তো।” এমন সময় ভেতরের ঘর থেকে একজন মহিলা মেয়েদের জন্য জলখাবার এনে দিলেন। পুরোহিত মশাই এসে গ্রামের লোকেদের বললেন— “তোমরা এখন এসো। মেয়েরা খেয়ে নিক।”

ওরা খেতে শুরু করল। খেতে খেতেই মেখলা পুরোহিত মশাইকে বলল— “একটা কথা বলব? কাল রাতে আমরা যাঁকে দেখেছিলাম তিনি কে? গ্রামের লোকেরা আমাদের কাছে তাঁর কথা জানতে চাইছে কেন?” পুরোহিত মশাই মুচকি হাসলেন, বললেন— “তোমরা কেউ মহাভারত পড়েছ?” তিনজনেই বলল যে তারা কেউ মহাভারত পড়েনি, তবে টিভি সিরিয়াল দেখেছিল, গল্পটা মোটামুটি জানে। পুরোহিত বললেন— “টিভি সিরিয়াল দেখে মহাভারতকে জানা সম্ভব নয়।” ভদ্রলোক বলতে থাকলেন— “কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের তখন অন্তিম পর্যায়। কৌরব পক্ষের রথি-মহারথিরা প্রায় সকলেই দেহ রেখেছেন। গুরু দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা তখন কৌরবদের সেনাপতি। একরাতে যুদ্ধকালীন বিরতির সময়ে অশ্বত্থামা পাণ্ডবদের শিবিরে ঢুকে পড়লেন এবং দ্রৌপদীর পাঁচ ছেলেকে পঞ্চপাণ্ডব ভেবে ভুল করে তাদের হত্যা করলেন। সেই রাত্রে পাণ্ডবরা কেউ শিবিরে ছিল না। সকালে ফিরে তাঁরা অশ্বত্থামার এই ঘৃণ্য কর্মের কথা যখন শুনলেন তখন তাঁরা ক্রোধিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণকে সঙ্গে করে অশ্বত্থামার অনুসন্ধান করতে লাগলেন। অবশেষে অশ্বত্থামাকে তাঁরা ব্যাসদেবের আশ্রমে দেখতে পেলেন। পাণ্ডবদের দেখা মাত্র অশ্বত্থামা পাণ্ডবদের হত্যা করার জন‍্য ব্রহ্মাস্ত্র ছুঁড়ে দিলেন। নিজেদের রক্ষা করতে অর্জুন তখন উল্টে আরেকটি ব্রহ্মাস্ত্র ছুঁড়লেন। দুটি ব্রহ্মাস্ত্রের মধ্যে টক্কর লাগলে এই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত। বিপদ বুঝে ব্যাসদেব অর্জুন এবং অশ্বত্থামা দু-জনকেই ব্রহ্মাস্ত্র ফিরিয়ে নিতে অনুরোধ করলেন। ব্রহ্মাস্ত্র ফিরিয়ে নেওয়ার বিদ্যা অর্জুনের জানা ছিল। কিন্তু, অশ্বত্থামা জানতেন না কীভাবে ব্রহ্মাস্ত্র ফিরিয়ে নিতে হয়। ব্যাসদেবের কথায় অর্জুন ব্রহ্মাস্ত্র ফিরিয়ে নিলেন। অশ্বত্থামা পারলেন না। অশ্বত্থামা ব্রহ্মাস্ত্রের দিক পরিবর্তন করে তা পাঠিয়ে দিলেন উত্তরার গর্ভে। উত্তরা ছিলেন অভিমুন্যর স্ত্রী, অর্জুনের পুত্রবধূ। উত্তরার গর্ভে তখন পরীক্ষিত। ব্রহ্মাস্ত্রের আঘাতে পরীক্ষিতের তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হল। পাণ্ডবদের না মারতে পেরে তাদের নির্বংশ করার অভিপ্রায়ে অশ্বত্থামা এই কুকর্মটি করেছিলেন। পরে অবশ্য উত্তরার গর্ভস্থ পরীক্ষিতকে শ্রীকৃষ্ণ বাঁচিয়ে দেন। পরীক্ষিত বড় হয়ে রাজা হন এবং পাণ্ডবদের বংশ রক্ষা করেন। কিন্তু, এই রকম একটা জঘন্য কাজ করার জন্য শ্রীকৃষ্ণ অশ্বত্থামাকে শাস্তি প্রদান করেন।
শিবের কৃপায় অশ্বত্থামা গুরু দ্রোণের ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। জন্ম থেকেই অশ্বত্থামার কপালে ছিল একটা মণি যে মণির দ্বারা এই পৃথিবীতে মনুষ্যেতর যা কিছু আছে সবকিছুর ওপর অশ্বত্থামা কর্তৃত্ব ফলাতে পারতেন। শাস্তিস্বরূপ সেদিন শ্রীকৃষ্ণ অশ্বত্থামার কপালের ওই মণিটি তুলে নেন আর তাঁকে অমর হবার অভিশাপ দেন।” মেয়েরা এতক্ষণ খেতে খেতে গল্প শুনছিল। তিনজনেই সমস্বরে বলে উঠল— “অমর হওয়ার অভিশাপ!” পুরোহিত বললেন— “হ্যাঁ, শ্রীকৃষ্ণ অশ্বত্থামাকে বলেছিলেন— “যতদিন এই পৃথিবী থাকবে ততদিন তুমিও থাকবে, বনে বনে ঘুরে বেড়াবে, তোমার শরীর পচে গলে যাবে, তুমি মৃত্যুর জন্য কাকুতি-মিনতি করবে, তবুও মৃত্যু তোমার কাছে আসবে না!”
মেয়েদের মুখে খাবার আর উঠছে না। ওরা খাওয়া থামিয়ে চুপচাপ বসে রইল। পুরোহিত আবার বললেন— “ওঁকে এই বনের মধ্যে অনেকেই দেখেছে। শুধু আমরা নয়, আমাদের পূর্বপুরুষেরাও তাঁকে দেখেছেন। অনেকেই বলে গুরু দ্রোণের আশ্রম নাকি এই বনের মধ্যেই কোথাও একটা ছিল, সেখানেই অশ্বত্থামার জন্ম হয়েছিল। হয়তো সেইজন্যেই এই বন ছেড়ে তিনি যেতে পারেননি। আমিও মাঝে মধ্যেই দেখি, আমি পুজো করতে যাওয়ার আগে কে যেন এসে শিব মন্দিরে পুজো করে গেছে, দুধ-গঙ্গাজল ঢেলেছে, পুরোনো ফুল সরিয়ে নতুন মালা দিয়ে সাজিয়েছে, দেরাদুন চাল দিয়ে অর্ঘ্য দিয়েছে। অথচ মন্দিরের চাবি একমাত্র আমার কাছেই থাকে।”


পেখম পুরোহিত মশাইকে জিজ্ঞাসা করল— “উনি কত বছর জীবিত আছেন?” পুরোহিত বললেন— “সেই দ্বাপর যুগ থেকে … কিন্তু, তোমরা খাচ্ছ না কেন?” ওরা আর খেতে পারল না। অনতিবিলম্বকাল পরেই মোটর মেকানিক এসে পড়ল। পুরোহিত মোটর মেকানিককে বললেন— “মন্দিরের কাছে বড় রাস্তায় ওদের গাড়ি খারাপ হয়ে পড়ে আছে। ওদের সঙ্গে যাও।” তারপর মেয়েদের বললেন— “ও ছেলে ভালো, ওকে নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নেই।” মেখলা ঢক করে পুরোহিতকে একটি প্রণাম ঠুকল। তারপর ওরা বনের মধ্যে দিয়ে মোটর মেকানিকের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। এবারে ভয়টা যেন একটু বেশিই করছে। শিরদাঁড়া দিয়ে সব সময় একটা চোরা স্রোত খেলে যাচ্ছে। পেখম মাটিল্ডাকে বলল— “তুই গল্পটা বিশ্বাস করলি নাকি?” মাটিল্ডা বলল— “জানি না। কাল রাতে যাঁকে দেখলাম, তাঁর কপালের ওই গর্তটা আমাকে ভাবাচ্ছে।” পেখম বলল— “মানুষ কখনও অমর হতে পারে? একজন কুষ্ঠরোগী যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছে— এটা বিশ্বাসযোগ্য? এরা তো মেডিক্যল সায়েন্সের মা-মাসি এক করে দিল দেখছি।” মেখলা তখন বলল— “বেশ, তবে খেতে পারলি না কেন?” পেখম চুপ করে রইল। মাটিল্ডা বলল— “দু’পাতা বিজ্ঞান পড়ে আমরা ভাবি, সব জেনে ফেলেছি, সব বুঝে ফেলেছি। আমাদের জানার বাইরে, বোঝার বাইরে কিছু কি থাকতে পারে না? বিজ্ঞান মহাবিশ্বের সব রহস্যের সমাধান করতে পেরেছে? মানুষ এতই মহান?”

বনের রাস্তা পেরিয়ে তারা বড় রাস্তায় এসে উঠল। কিছুক্ষণ হাঁটতেই ওদের গাড়িটি দেখতে পাওয়া গেল। মোটর মেকানিক অল্প সময়ের মধ্যেই ওদের গাড়ি সেরে দিল। পারিশ্রমিক হিসেবে কিছুতেই একটা টাকাও নিল না, বলল— “আপনারা গ্রামের অতিথি, আপনাদের কাছ থেকে টাকা নিলে অধর্ম হবে।” শত পীড়াপীড়িতেও কোনও কাজ হল না। ছেলেটির সেই এক গোঁ। অবশেষে মেয়েরা হাল ছাড়ল। ওরা কানপুরের উদ্দেশে রওনা দিল। মোটর মেকানিক ছেলেটিও বনের মধ্যে ঢুকে গেল। স্টিয়ারিং হাতে মাটিল্ডা। মাটিল্ডার পাশে মেখলা। পেছনের সিটে পেখম একা। হঠাৎ কী মনে হতে পেখম ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। দেখল, বেশ খানিকটা দূরে বনের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই সাদা চাদরে ঢাকা লোকটা, উচ্চতা প্রায় সাড়ে ছয় ফুট। দেখা মাত্রই পেখম কেঁপে উঠল। বিড়বিড় করে বলল— “অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ”!

Spread the love

Check Also

রবিবারের কবিতা, কমলেশ পাল

কমলেশ পাল করবীকে দেখো করবী সকল পাতা হলুদ বানিয়ে বসে আছে। আমি যে কালকে ওকে …

‘অফুরান গোলাপ নিয়ে চুলের ফিতে বুনছি’, ৩টি কবিতা, মৌমিতা পাল

 মৌমিতা পাল: মওকা বুঝে এসেণ্সবুড়ি ফুটপাথে ঘুমোক ভালোবাসা নিপাত যাক দৃশ্যত কামাতুর রাতে দূরত্বে প্রেম …

কাঁদবেন বলে ছুটি চাইলেন কবি! ধর্ষিত বিষাদ-অক্ষর কিশোর ঘোষের কলমে

 কিশোর ঘোষ কান্নাবান্না কী সব ঘটে যায়, অফিসের দিকে তাকিয়ে ভাবি, অফিস আমার দিকে কড়কড়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *