স্নিগ্ধা রায়:
শব্দবাণ
শব্দবাণটা ভালোই চালাতে পারে ও। ভাবছেন এ যুগে আবার শব্দবাণ কে চালাল? দশরথ আবার এল কোথা থেকে? আরে না, মশাই না। দশরথ নয়, বলছি আমার অর্দ্ধাঙ্গিনীর কথা। কী কুক্ষণেই যে চোখে পড়েছিল। সেই থেকে চোখ কটকট করছে। জলের ঝাপটা দিলেও যাচ্ছে না। কী বললেন– বালি? ধুর মশাই। বালি না। বালি না। ওনার কথাই বলছি, মানে বৌয়ের। তিনবছর আগে প্রথম ফেবুতে চোখে পড়ল। চোখে পড়া মাত্রই বন্ধুত্বের অনুরোধটা পাঠিয়েই দিলাম। দেখতে কিন্তু সত্যি সুন্দরী। চোখে পড়ার মতনই। তাই চোখের দোষ না দিয়ে সেই ক্ষণের দোষটাই দিলাম। সুন্দরী তো। ভাও তো খাবেই একটু। জানা কথা। পাক্কা এক মাস বুঝলেন, পাক্কা এক মাস পরে অনুরোধ গ্রহণ। তারপর কী দেমাক। কথা বলতেই চায় না। দশটা কথা বললে একটা কথার উত্তর দেয়। জেদ চেপে গেল। বিয়ে যখন করিনি, করলে একেই করব। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। টানা তিন মাস, দিন রাত এক করে শেষ পর্যন্ত মাছ বড়শিতে উঠল। নিজেকে তখন যে কি মনে করছিলাম – ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না বর্ণনা করার জন্য। যাই হোক – তারপর আরো পনেরো মাস অনেক নেট ব্যয় করে, দামী দামী রেস্তোরাঁতে খাইয়ে, শপিং মলে গিয়ে ব্যাংক ব্যালেন্স কমিয়ে, শেষ-মেস ছাদনা তলায় হ্যাপি এনডিং।
ঐ সময় এটাই ভেবেছিলাম জানেন তো– হ্যাপি এনডিং। তখন কি জানতাম ভবিষ্যৎ আমার বসন্তের পাতা ঝরার খেলায় মত্ত হবে! বেশ কাটছিল দিনগুলো। সুন্দরী বৌ নিয়ে যেখানেই যাই কদরটা একটু বেশিই পাই। কিন্তু সুন্দর মুখের আড়ালে আমার স্ত্রীর মনস্তত্বটা সত্যিই বুঝতে পারিনি। বুঝলাম টুকরো টুকরো ঘটনায়।
একদিন ফেবুতে স্ট্যাটাস দিলাম ফিলিংস রোমান্টিক। কী কুক্ষণেই যে স্ট্যাটাসটা দিয়েছিলাম অফিসে বসে! বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই দেখি স্বয়ং দেবী চণ্ডী সামনে দাঁড়িয়ে। আমায় বলে– “অফিসে বসে ফিলিংস রোমান্টিক? কার সাথে রোমান্স করছিলে?” একাই বাউন্সের পর বাউন্স বল থ্রো করে চলল। আমাকে বলার সুযোগটাও দিল না যে, অফিস থেকে ভালো কাজের জন্য হলিডে ট্যুর প্যাকেজ গিফ্ট পেয়েছি– তাও আবার সিমলা, কুলু, মানালি। আমারও মাথাটা গরম হয়ে গেল। বৌকে বললামই না ঘুরতে যাওয়ার কথাটা। অফার ছিল প্যাকেজ, নয়ত মানি। পরের দিন সোজা অফিসে গিয়ে প্রথমেই এক্সচেঞ্জ করে নিলাম অফারটা।
আর একদিনের ঘটনা বলি শুনুন। এক বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ফেবুতে ডেয়ার গেম অ্যাটেন্ড করলাম। স্ট্যাটাস দিলাম– “আই অ্যাম ইন লাভ।” ঐ স্ট্যাটাস দেখে একমাস বাপের বাড়ি হলিডে ট্যুরে চলে গেল। যাওয়ার আগে ভাবছেন বাড়িতে সাদা পায়রা উড়ছিল? মোটেও না। যাওয়ার সময় আমার সাধের মিউজিক সিস্টেমটা ভেঙে দিয়ে চলে গিয়েছিল। বলার সুযোগই দিল না যে – ওটা একটা গেম ছিল। শব্দবাণ নিক্ষেপ করা যখন শুরু করেন উনি, অপোজিট ব্যাটসম্যান শুধু নিজেদের হেলমেটটাই বাঁচানোর সুযোগ পায়।
আরো একটা ঘটনা বলি। এই ক’দিন আগেই। অফিস থেকে ফিরছি। বাড়িতে জাস্ট ঢুকতে যাব, এমন সময়, আমাদের বাড়ির কাজের মেয়েটি আমাদের বাড়ি থেকে বেরোবার সময় হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল– একদম আমার বাইকের সামনে। হাতপা ছোড়ে রক্তারক্তি কাণ্ড। বাইক থেকে নেমে তাড়াতাড়ি তুললাম ওকে। তারপর প্রায় জোর করেই বাইকে বসিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিলাম। বৌটি আমার দোতলার বারান্দা থেকে সব দেখছিলেন আর বাড়িতে ঢোকা মাত্রই কী কী শব্দবাণ আমার দিকে নিক্ষেপ করবেন সেটাই সযত্নে মনে মনে সাজাচ্ছিলেন। ঘরে সবে ঢুকেছি। ওরে বাপরে, কী ভাষা প্রয়োগ শুরু করলো। মনে হচ্ছিল, বস্তির ভাষা এর থেকে ঢের ভালো। কাজের মেয়েটির সাথে আমাকে জড়িয়ে কোনো সম্পর্কই আর বাদ রাখল না। সিলেবাস পুরো কমপ্লিট করে ফেলল।
এই সেদিনের কথা বলি। ওনাকে নিয়ে গেলাম কলেজের এক বন্ধুর বিয়েতে। সেখানে গিয়ে পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেখা। কলেজের বন্ধুরা যখন, ছেলে-মেয়ে সবাই তো থাকবে। অনেকের সাথে সেই কলেজ ছাড়ার পর দেখাও হয়নি কত বছর। সেদিন হল। তেমনি এক বন্ধু পিয়ালীর সাথে দেখা। ও দূর থেকে আমায় দেখতে পেল, আমিও। বৌকে নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। পিয়ালীর কাছে পৌঁছানোর পরই পিয়ালী আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলল– “পার্থ তো তুই? কত্তো বছর বাদে দেখা। কেমন আছিস?” আমি সবে মাত্র হেসে ওর কথার উত্তর দিতে যাব– বৌ সঙ্গে সঙ্গে আমার এক হাতে ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে অন্য দিকে নিয়ে চলে গেল। পিয়ালীর হাসি মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আর আমার মাথা লজ্জায় নিচু। সেদিন সত্যি কষ্ট পেয়েছিলাম, লজ্জিত হয়েছিলাম আমার স্ত্রীর মানসিকতা নিয়ে। বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাও এই মেয়েটা বোঝে না? বন্ধুর যে কোনো লিঙ্গ হয় না– তাও জানে না মেয়েটা? ভেবে লজ্জিত হলাম।
ফেবুতে সুন্দরী, মডার্ণ দেখে প্রেমে পড়লাম। কিন্তু, সব পাথর চকচক করলেই যেমন হীরে হয় না, ঠিক তেমনি বুঝলাম – সাজ পোশাক, চেহারাতে অতি আধুনিকতার ছাপ থাকলেই সবাই মানসিক দিক দিয়ে আধুনিক হয় না।
মানুষের চেহারা দেখে, বাহ্যিক আভরণ দেখে মানুষকে বিচার করা উচিৎ নয়। মানুষের বিচার করা উচিৎ তার উন্নত মানসিকতা দিয়ে, রুচি বোধ দিয়ে, সংস্কৃতি দিয়ে, তার বোধবুদ্ধি দিয়ে।
ঝাঁ চকচকে প্যাকেট দেখে ভাবলাম ভেতরে হয়তো দামী কোনো বস্তু আছে। প্যাকেট খুলে দেখি প্লাস্টিকের একটা সস্তা খেলনা।
আমার অবস্থাটাও ঠিক তেমনি। অরূপ রতন পাবার আশায় পেলাম এক টুকরো কাচ। যে যাঁতাকলে পড়েছি গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে করছে– ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে– ও বন্ধু আমার।।
স্নিগ্ধা রায়:
জন্ম বার্ণপুরে। বেড়ে ওঠা হুগলী জেলার শিল্পাঞ্চল রিষড়াতে। ২০০৪-এ আকাশবাণীর যুববাণীতে অডিশন দিয়ে প্রোগ্রাম প্রেজেন্টার হিসেবে কাজে যোগ দেন। ২০০৭ সালে আভ্যন্তরীণ পরীক্ষার মাধ্যমে কলকাতা-ক, খ, SBS, DTH-এ বাংলা ঘোষিকা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০১১ সালে কাজের এক ঘেয়েমি কাটানোর জন্য আকাশবাণীর নিউজ সেকশনে পরীক্ষা দিয়ে নিউজ ডেক্সে কাজ শুরু করেন। ২০১৩-তে শারীরিক কারণে আকাশবাণীকে বিদায়। কোনোদিন সাহিত্য লিখবেন ভাবেননি। ২০১৬-তে প্রথম কবিতা লেখা। তারপর থেকে বেশ কিছু পত্রিকাতে কবিতা বের হতে শুরু করল। ২০১৭-র ৩রা এপ্রিল প্রথম হাতেখড়ি গল্প লেখায়। বেশ কিছু গল্প পত্রিকাতে বেরোল। ফেসুবকেই মূলতঃ গল্প আর কবিতা লেখেন এখন। ফেসবুক পেজ কলমে স্নিগ্ধা নিয়েই সময় কাটান।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news