মধুমঙ্গল বিশ্বাস
আলো
সারাক্ষণ শুয়েই থাকে। অথবা বলা যেতে পারে বিশ্রামে থাকে। মাঝেমধ্যে একটু নড়াচড়া। টুকটাক, খুচরো জাগরণ ঘটে বোধহয়। বেশ হিলহিলে। লকলকে। যখন জাগে, খ্যাপা দামোদর।
মানবসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের কর্মী হারাধন। অফিসে সবাই তাকে বাবু বলে সম্বোধন করে, আড়ালে পাগল বলে তারিফ করে। কাজপাগল। সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। সুন্দর, সুদর্শন হারাধন সহকর্মী সুন্দরীদের দিকে সারা চাকরিজীবনে একবারও বোধহয় তাকিয়ে দেখার ফুরসত পায়নি।
কাজের বাইরে সত্যিই বোধহয় তার কোনও অবকাশ মেলেনি। প্রতিবছর সংসার বৃদ্ধি পেয়েছে। আটটি ছেলেমেয়ে। কখনও মনে হয়নি, এবার থাক। সাপটা যখনই জেগে উঠেছে, অবধারিত ক্রিয়ায় কলশ ভরাট হয়েছে।
একতলা থেকে দোতলা, তারপর তিনতলা হয়েছে বাড়ি। বড় হয়েছে ছেলেমেয়েরা। এসবই দক্ষ হাতে সামলেছে তার স্ত্রী। অনটন নেই, তাই পরিবারের যে-কোনও কাজই স্ত্রীর কাঁধে চাপিয়ে হারাধন তার কাজের মধ্যে হারিয়ে যেতে পেরেছে।
একরাতে স্বপ্ন দেখে হারাধন। মাতলা নদীতে জ্যোৎস্না নেমেছে। তার পার বরাবর হেঁটে চলেছে সে। কখনও দেখেনি, এমন এক লীলায় তার চোখ আটকে যায়। দুটি হিলহিলে প্রেমিকপ্রেমিকা শঙ্খ লেগেছে। জ্যোৎস্নায় দুলে উঠছে ফাগুনের রতি। খুঁজতে থাকে হারাধন। এতদিন তার শরীর কথা বলত, রাতের প্রয়োজনে শরীরে শরীর খুঁজে পেতে হয়রান হত না। আজ তার মন চঞ্চল। সে চাইছে শরীরের মধ্যে মুক্তি। সাপ সম্পর্কে তার অনেক গল্পই শোনা। নাগপাশ। সে শুনেছে, অভিশপ্ত প্রণয়ের কথা। মুক্তির কথাও। সে তার সাপটিকে খুঁজতে থাকে প্রাণপণে। একসময় ধরেও ফেলে। কিন্তু কই, তার স্পর্শে তো কোনও জাগরণের ইতিহাস লেখা নেই! পাশে শুয়ে-থাকা মালতীও জেগে গেছে? কিন্তু সাপটি যে জাগছে না! এতদিনের চেনাবন্ধু হঠাৎই এমন অচেনা হয়ে উঠতে পারে? মারাত্মক অস্বস্তিতে ছটফট করতে থাকে হারাধনবাবু।
ভোর হয়ে আসে। বাইরে বুঝি কোকিল ডাকছে। তার মৃদু সুর ছড়িয়ে পড়ছে বুঝি চরাচরে। মালতী বলে, জানো আজ পয়লা ফাল্গুন! এইদিনে আমাদের ফুলশয্যা হয়েছিল। আমরা পেয়েছিলাম মুক্তির প্রথম আলোড়ন!
হারাধন ভাবে, তার মানে আজ বসন্ত। মালতীকে বলে, বুঝতে পারিনি। আনাড়ির মতো ব্যবহার করে গেছি শুধু। আমার সঙ্গে ছিল এতকাল। আগুন দেখেছি কেবল। আলো-কে বুঝিনি। আমার বসন্ত আজ বিদায় নিল। এও বুঝি মুক্তির দিন!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news