Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / কুয়াশা, সুব্রত সেন-এর গল্প

কুয়াশা, সুব্রত সেন-এর গল্প

 সুব্রত সেন

 

কুয়াশা

কুয়াশাটা যে বেশ জমিয়ে নামছে সেটা খেয়াল করেনি জিৎ। খোলা আকাশের তলায় পার্টি, বছর শেষ হওয়ার আনন্দে সকলে নাচে-গানে মশগুল, সকলের হাতে হাতে মদের গ্লাস। হই হই করে বাজি ফাটিয়ে বর্ষবরণ, সেই সঙ্গে আরেকপ্রস্ত উল্লাসের জোয়ার। জিৎ জানে নতুন বছরে পদার্পণ করার কিছুক্ষণ পর থেকেই পার্টিতে সমাগত সুসজ্জিত সুবেশিত লোকগুলো ক্রমে বেসামাল হতে শুরু করে। শেষ রাতের দিকে অনেককেই জোর করে ঠেলে ঠেলে গাড়িতে তুলে দিতে হয়। জিৎ ওই সব ঘটনা ঘটার আগেই বেরিয়ে যেতে চায় অকুস্থল থেকে। ওই সব ঘটনা সামলানোর জন্য অনেক লোক আছে, তার সে সব নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে।

পার্টি থেকে বাইরে বেরোতে তাও নয় নয় করে দেড়টা বেজে গেল জিতের। তার বাড়িতে ফ্রিজে সাধারণ বাঙালি খাবার রাখা আছে, ইচ্ছে ছিল বাড়ি গিয়ে মাইক্রোওয়েভ ওভেনে গরম করে বাড়ির খাবার খাওয়া। শেষ পর্যন্ত জুনিয়ারদের পীড়াপিড়িতে পার্টির খাবারই খেতে হয়েছে। বৎসরান্তের মেনু অবশ্য ভালোই লাগল। বিশেষ করে কষা মাংস আর গলদা চিংড়িটা অতীব উপাদেয়, জিতের রসনা তৃপ্ত হয়েছে। বাড়িতে একার সংসারে এই সব জোটে না তার। কাজের মহিলার রান্না সাদামাটা, বাঙালির রোজকার রান্না যে রকম হয়। তাও সপ্তাহে মাত্র তিন দিনের রান্নাতেই পুরো সপ্তাহ চলে যায় জিতের।

বাইরে বেরিয়ে পার্কিং লটে যাওয়ার সময়ে কুয়াশাটা টের পেল জিৎ। সাদা একটা আস্তরণ পড়ে রয়েছে চারদিকে। ভিতরে অনেক আলোর ঝলকানির মধ্যে এই কুয়াশার আস্তরণটা বোঝা যাচ্ছিল না একেবারে। এখন পার্কিং লটে নিজের গাড়ি পর্যন্ত হেঁটে আসতে আসতে দু’বার হোঁচট খেয়ে কুয়াশাটা মালুম পড়ল। জিৎ আজ তার ড্রাইভার ছেড়ে দিয়েছে বিকেলের দিকে, গাড়ি চালিয়েই তাকে বাড়ি ফিরতে হবে এই মধ্যরাতে। ঘন কুয়াশার মধ্যে গাড়ি চালাতে অসুবিধে হবে না তো?

নিজের চিন্তাতেই আপনমনে একটু হেসে উঠল জিৎ। তার এখন বাহান্ন বছর বয়স, বিভিন্ন শহরে নিজে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা তার নয় নয় করে তিরিশ বছর। গাড়ি চালানো নিয়ে জীবনে তার কোনও দুর্ভাবনা হয়নি। বয়স বেড়েছে বলে কি হঠাৎ করে তার এই গাড়ি চালানো নিয়ে দুর্ভাবনাটা মাথায় এল? মাত্র পনেরো বছর আগেও তো স্বাতীকে নিয়ে এই নববর্ষের রাতেই ঘন কুয়াশার মধ্যে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরেছিল। সেটা দিল্লি শহর, সেখানে কুয়াশা নামলে দু’হাত দূরেও কিছু দেখা যায় না। ওই কুয়াশা দেখে স্বাতী ভয় পেয়েছিল খুব, আর জিৎ হাসছিল। হেডলাইট আর ব্লিঙ্কার জ্বালিয়ে রাস্তা খুঁজে ঠিক পৌঁছে গেছিল বাড়ি। কলকাতায় দিল্লির মতো ঘন কুয়াশা পড়ে না কখনও। এখানে কুয়াশাকে ভয় পাওয়ার কোনও কারণই নেই। কুয়াশা নিয়ে দুর্ভাবনাটা আসল নয়, সেটা জিৎ জানে। কুয়াশা দেখে আসলে হঠাৎ করে তার স্বাতীর কথা মনে পড়ে গেছে। দশ বছর অতিক্রান্ত স্বাতী মারা গেছে, এখন জিতের জীবনে সেই অর্থে স্বাতীর কোনও ভূমিকা নেই। স্বাতীবিহীন নিজের জীবন নিজের মতো করে কাটাতে কোনও অসুবিধেও হয় না তার। তাও হঠাৎ হঠাৎ স্বাতীর কথা মনে পড়ে যায়।

গাড়িতে ওঠার আগে একবার ঘড়িটা দেখে নিল সে। স্বাতীর কথা মনে পড়াতে দুম করে পায়েলের কথাও মনে পড়েছে তার। পায়েল তাদের মেয়ে। এই মুহূর্তে কাজ করছে শিকাগোতে, নামকরা সফটওয়্যার মাল্টিন্যাশনালে। সেখানে এখনও বর্ষ পাল্টায়নি, গত বছর চলছে। এ দেশে থাকলে ঠিক রাত বারোটায় ফোন করত পায়েল। গত বছর অবধি যেমন করেছিল। এ বছরও করবে, জানে জিৎ। শুধু টাইম জোন পাল্টে গেছে বলে ফোনটা আসেনি।

পার্কিং লটে কয়েকটা ফ্লাডলাইট জ্বলছে, তাই কুয়াশার মধ্যেও গাড়ি বার করতে অসুবিধে হয়নি জিতের। এখন গাড়ির ঘনত্ব অনেক ফাঁকা হয়ে গেছে, যখন এসেছিল তখন গাড়ি পার্ক করতে তাকে বেশ কসরত করতে হয়েছিল। পার্কিং লট থেকে বেরোনোর পর বেশ খানিকটা কাঁচা রাস্তা, সে জায়গাটা বেশ উঁচু-নিচু, ওই অংশটুকু সাবধানে চালাতে হবে। একবার বড় রাস্তায় পৌঁছে গেলে আর খুব একটা অসুবিধে নেই, কলকাতার রাস্তায় নতুন বছর শুরু হওয়ার প্রথম লগ্নে অনেক রাত অবধি গাড়ি চলে। একটু সাবধানে গাড়ি চালাতে হয় যদিও, অনেক চালকই এই সময়ে অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে একটু বেসামাল হয়ে থাকে। মদ্যপান জিৎও করেছে, একটা হাল্কা নেশা তার মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষে আলসেমির মতো ছড়িয়েও রয়েছে। কিন্তু সেটা এমন কিছু বেশি হয়, গাড়ি চালাতে অসুবিধে হবে না কোনও। তা ছাড়া গাড়ি চালানোর দীর্ঘদিনের অভ্যাস থেকে জিৎ জানে, স্টিয়ারিংয়ে একবার বসলে যাবতীয় নেশা কী রকম যেন উবে যায়, তখন নার্ভগুলো একেবারে অ্যাটেনশনে চলে আসে, গাড়ি চালাতে কোনও অসুবিধে হয় না আর। আজও হবে না। এমনিতেও তার নেশা করা একটা লিমিটের মধ্যে থাকে, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

পার্কিং লট থেকে বেরোনোর পরই ঘন অন্ধকার, সেখানে জাঁকিয়ে বসেছে কুয়াশাটা। হেডলাইটের আলো এবং ফগ ল্যাম্প জ্বেলেও সামনে দেখতে অসুবিধে হচ্ছে জিতের। একটা পুরু সাদা চাদরের মতো ছড়িয়ে আছে কুয়াশাটা, এই ধরনের কুয়াশার মধ্যে গাড়ি চালানো সত্যি অস্বস্তিকর, বিশেষ করে অপরিচিত রাস্তায়। কাঁচা রাস্তায় বেশ খানাখন্দ, গাড়ি গাড্ডায় পড়ে ওপর নীচ করছে, তাতে হেডলাইটের আলো সোজা থাকছে না বলে অসুবিধেটা আরও বাড়ছে। এই রকম পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়, তার খুব ভালো করে জানা আছে সে কথা। একটা জটিল বাঁক আছে মাঝখানে কোথাও, আসার সময়েই দেখে নিয়েছিল। ওই বাঁকের ঠিক পরে একটা কালভার্ট — দু’পাশে কোনও পাঁচিল নেই। ওই কালভার্টের অংশটুকু ঠিক করে পেরোতে হবে। কোনও কারণে কাঁচা রাস্তা থেকে দিকভ্রষ্ট হলে বিপদের আশঙ্কা রয়েছে যথেষ্ট। ধীর গতিতে কুয়াশা ঠেলে গাড়ি চালানোর সময়ে ওই কালভার্ট অংশটুকুর জন্য মনে মনে সতর্ক হয়ে রইল জিৎ। ওই কালভার্টটা পেরিয়ে গেলেই আর বিপদ নেই কোনও। বড় রাস্তা অবধি রাস্তার বাকিটা কাঁচা হলেও সহজ পথ, সেখানে কোনও অঘটন ঘটবে না।

কালভার্টের অংশটা এসে গেছে। কালভার্টের জন্য একটা আবছা সতর্কীকরণ আসার পথে  রাস্তায় ছিল, মনে পড়ল জিতের। এ দিক থেকে যাওয়ার সময়েও একটা সাইনবোর্ড আছে। কুয়াশায় প্রায় কিছু পড়া যাচ্ছে না, কিন্তু একটা সতর্কীকরণ যে আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ওইটা চোখে পড়তেই আরও সাবধান হল সে।  সামনের বাঁকটুকু পেরিয়ে গেলেই আর কোনও সমস্যা নেই।

এই কালভার্টটা নিয়ে যতটা টেনশন করছিল জিৎ, আদপে ততটা করার দরকার ছিল না। আসার সময়ে কালভার্টের ওপর অনেক গাড়ি ছিল বলে জিতের কেন জানি জায়গাটা বিপদসঙ্কুল মনে হয়েছিল, এখন রাস্তায় শুধু তারই গাড়ি, তাই জায়গা পেতে কোনও অসুবিধে নেই। কালভার্টের ধারে যাওয়ার দরকারই হল না তার, মাঝবরাবর গাড়ি চালিয়ে কালভার্ট পেরিয়ে আবার কাঁচা রাস্তায় পড়ল সে। আর কোনও সমস্যা নেই, এখান থেকে কিলোমিটার খানেক চালালেই মেট্রোপলিটান বাইপাস, সেখান থেকে শহুরে সভ্যতায় পৌঁছতে আর কতটুকু! কিন্তু এই রাস্তায় এসেই সমস্যা শুরু বেড়ে উঠল হঠাৎ করে, কুয়াশা এতটাই ঘন হয়ে উঠল যে গাড়ি চালানো প্রায় অসম্ভব বোধ হল জিতের। সাদা পুরু পর্দা ঠেলে ব্লিংকার জ্বেলে যে গতিতে সে গাড়ি চালাতে লাগল তাকে শম্বুকগতি বললেও বাড়িয়ে বলা হবে।

ঠিক সেই সময়ে সাদা কুয়াশা ফুঁড়ে আবির্ভূত হল ছায়ামূর্তিটি। গাড়ির ঠিক সামনে সামনে চলছে, হেডলাইটের আলোয় ছায়ামূর্তিটির অবয়ব ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সাদা কুয়াশার মধ্যে অদ্ভুত দেখতে লাগছে। জিৎ কখনও ভূতে বিশ্বাস করেনি, তার মধ্যে যাবতীয় কুসংস্কারের রেশমাত্র নেই। তাইও তার ওই মূর্তিটিকে দেখে মানুষের মথাই মনে হল। এই জনমানবহীন রাস্তায় একা একা হেঁটে যাচ্ছে এই মানুষটি কে? গাড়ির থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে যখন ছায়ামূর্তিটা, তখন হর্ন দিল জিৎ, মানুষটা থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকাল। তারপর এগিয়ে এল গাড়ির দিকে।

জানলার কাচ নামাল জিৎ, এবং দেখল একটি মেয়ের মুখ– তার মুখে একটা সময়ে মেক-আপ করা ছিল যদিও এখন তা ধেবড়ে গেছে অনেকখানি, চোখের কাজলের জৌলুসের মধ্যে থেকে দেখা যাচ্ছে ক্লান্তির চিহ্ন। মেয়েটি তন্বী, দেখতে বেশ ভালো, মুখের পাশাপাশি শরীরটাও নজরেও পড়ার মতো।

ক্লান্ত স্বরে মেয়েটি বলল, “আমাকে বড় রাস্তা অবধি পৌঁছে দেবেন? আমার বাসটা আমায় ফেলে চলে গেছে, কী করে বাড়ি ফিরব বুঝতে পারছি না।” জিৎ মাথা নাড়ল, তার পাশের সিটে উঠে আসতে বলল মেয়েটিকে।

গাড়িতে ওঠার পর মেয়েটি কে তা বুঝতে পারল জিৎ। পার্টি চলাকালীন এই রকম কয়েকটি মেয়েকে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছিল সে। মেয়েগুলি এই শীতের মধ্যেও পরেছিল স্বল্প দৈর্ঘ্যের স্কার্ট, ওপরে লাল রঙের টপ এবং বেশ উঁচু হাই হিল জুতো। ডিসেম্বরের শেষ রাতে এই পোশাকে শীত করার কথা, কিন্তু এই মেয়েগুলির উপায় নেই, তাদের এই রকম কম পোশাক পরাটাই দস্তুর, এটাই তাদের পেশার অঙ্গ। একেকটা করে হাই ডেসিবেল গান শেষ হওয়ার পর এই মেয়েগুলো হাতে রঙিন ঝালর নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করে সংঘবদ্ধভাবে নাচে। এদেরকে বলা হয় চিয়ার গার্ল, এদের আজকাল ক্রিকেট ম্যাচেও দেখা যায়।

মেয়েটির পোশাকই চিনিয়ে দিয়েছে মেয়েটিকে। পাশের সিটে এখন জড়সড় হয়ে বসে আছে সে, মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। মেয়েটার হাতে একটা খাবারের প্যাকেট এমনভাবে আঁকড়ে ধরা রয়েছে, যেন সেটাই তার জীবনের শেষ সম্বল। মেয়েটার কতই বা বয়স হবে, পায়েলের সমবয়সীই মনে হচ্ছে। শিকাগোর ঠান্ডাতেও পায়েলের মতো মেয়েদের কোনও কষ্ট করতে হয় না, অথচ তারই দেশের একটি মেয়ে…

জিতের গাড়ি এখনও চলছে ঘন কুয়াশা ঠেলে। একবার আড়চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমার ঠান্ডা লাগছে না?”

মেয়েটা আনমনে বলল, “পা ব্যথা করছে। আসলে এই জুতোটা…”

“তুমি একা কেন? অনেকে ছিলে তো এক সঙ্গে।”

“আমি খাবারের প্যাকেট আনতে গেছিলাম। আমাদের তো আলাদা খাবারের ব্যবস্থা, সবাই যেখান থেকে খাবার নেয়, সেখান থেকে নেওয়ার নিয়ম নেই। আমার ব্যাগটা একটা মেয়ের কাছে দিয়ে খাবারের লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। ওই ব্যাগে আমার মোবাইল আর পার্সটা ছিল। সোয়েটার ছিল গাড়ির মধ্যে…” কথা বলতে বলতে বলতে মেয়েটার গলা ধরে এল একটু।

“তারপর?”

“খাবারের লাইনে একটা গোলমাল লেগে গেছিল, কে একজন দু’টো প্যাকেট নিয়ে নিয়েছিল, তাই নিয়ে গোলমাল। আমার দেরি হয়ে গেছিল। ফিরে এসে দেখি গাড়ি আমাকে না নিয়ে চলে গেছে।”

একটু থেমে মেয়েটি আবার বলল, “আমার পার্স আর মোবাইলটাও সঙ্গে নেই যে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করব। আমি এখানে চিনিও না কাউকে, কী করব বুঝতে পারছিলাম না। গাড়িটা যদি এগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এই ভেবে হাঁটতে শুরু করেছিলাম রাস্তা ধরে। বোধহয় বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, থাকতেও পারে।”

একটু চুপ করে থেকে মেয়েটি বলল, “যদি না খুঁজে পাই, বড় রাস্তায় পুলিশকে বললে আমাকে হাওড়া স্টেশন পৌঁছে দেবে? ওখান থেকে সকালে ট্রেন পেয়ে যাব। সকালের ট্রেনে টিকিট না কাটলেও চলে, আমাদের স্টেশনে কেউ আটকাবে না।”

“কোথায় থাকো তুমি?”

“মেচেদার কাছে। মেচেদাতে নামতে হয়। কাকু, পুলিশকে বললে পুলিশ হেল্প করবে না?”

“চলো গিয়ে পুলিশকে বলে দেখা যাক। আমার মনে হয় পুলিশ বেশি ব্যস্ত রাস্তায় ট্র্যাফিক সামলাতে। তা ছাড়া তোমার কথা শুনে তোমায় থানায় যেতে বলতে পারে।”

“থানায় কেন?”

“নাও বলতে পারে। আমি ঠিক জানি না পুলিশ কী বলতে পারে। পুলিশের কাছে কখনও বিশেষ যাইনি তো!”

মেয়েটার মুখ শুকিয়ে গেল একটু। শীতের রাত্তিরে সিটে আরও একটু জড়সড় হয়ে বসল যেন। একবার তাকিয়ে দেখল জিতের দিকে। তারপর বলল, “আমি খারাপ মেয়ে নই। পুলিশ কি আমায় খারাপ ভাববে?”

সামান্য একটু হাসল জিৎ। বলল, “পুলিশ কী ভাববে সত্যি জানি না। তবে ভাবতেই পারে। এই শীতে এই রকম পোশাক পরে…। আসলে পোশাকটাই তো লোকে সবার আগে দেখে।”

“তা হলে কী হবে? আমি বলব আমি কী কাজে এসেছিলাম।”

“আমি তো অন্য কথা ভাবছি। সারা রাত স্টেশনে বসে থাকলে শীতেই না তুমি মারা যাও। গরম জামাও তো পরে নেই।”

“গরম জামা তো গাড়ির সিটে রাখা ছিল।”

মেয়েটি ক্লান্ত চোখে তাকাল কুয়াশার দিকে। তারপর আপন মনে বলল, “আমি কলকাতায় এর আগে আসিনি কখনও। পাড়ার দিদিটা বলল কলকাতার প্রোগ্রামে এলে বেশি টাকা পাওয়া যায়। ওই দিদিটার আসার কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত ও-ই এল না। এজেন্সির গাড়ি আমাকে তুলে এনেছে। কাল সকালে বাড়ি পৌঁছে দিত। এখন গাড়িটাই কোথায় একটা হারিয়ে গেল কুয়াশার মধ্যে। আমায় ছেড়ে চলে গেছে বলল পার্কিংয়ের লোকটা…”

“নাম কী তোমার?”

“সরস্বতী।”

“কী করো এমনিতে?”

“উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েছিলাম গত বছর। পাশ হয়নি। তারপর থেকেই প্রোগ্রামে ঢুকে গেলাম। ওই দিদিটাই ঢুকিয়ে দিল, বলল বসে না থেকে কিছু একটা কর, কিছু রোজগার হবে। নাচতে পারি বলে ডাক পাই। এজেন্টরা ডাকে। বিচিত্রানুষ্ঠানে, ক্লাবে, বিয়ের পার্টিতে। গ্রুপে নাচ করি। আমাদের ওদিকে একজন কোরিওগ্রাফার আছে, তার প্রোগ্রাম হলেও ডেকে নিয়ে যায়। ওই দাদাটা ভালো, বলেছে আমাকে ডান্স বাংলা ডান্স-এ চান্স করিয়ে দেবে। একবার ফাইনালে উঠতে পারলে আমি ফেমাস হয়ে যাব, তখন আর টাকাপয়সার চিন্তা করতে হবে না, বলুন?”

জিৎ কিছু বলল না। সে টেলিভিশন বিশেষ দেখে না, তবে ডান্স বাংলা ডান্স বলে একটা জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের কথা তারও অজানা নয়।

সরস্বতী বলল, “আমার বাবা একটা সময়ে যাত্রা করত জানেন? তারপর একবার গাড়ি করে ফেরার পথে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে পঙ্গু হয়ে বাড়ি বসে আছে। আমি স্টেজে প্রোগ্রাম করলে বাবা খুশি হয় খুব।”

“আর কে আছে বাড়িতে?”

“একটা ভাই। স্কুলে যায়। মা আছে। একটা সেলাই কলে যায়। আমার রোজগারটা দরকার লাগে বাড়িতে।”

সাদা কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে জিতের গাড়ি তখনও এগিয়ে চলেছে সন্তর্পণে। তারই মধ্যে আরও একবার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখে নিল জিৎ। রোগা চেহারা, কিন্তু শরীরের গঠন চমৎকার। মুখে একটা আলগা শ্রীও আছে। গায়ের রং ফরসার দিকে। এই ধরনের মেয়েদের এর আগেও চিয়ার গার্ল হিসেবে বিভিন্ন পার্টিতে দেখেছে জিৎ, কিন্তু কখনও খেয়াল করে দেখার প্রয়োজন পড়েনি সেভাবে। এই সব মেয়েদের ঠিক মানুষ হিসেবে দেখে না কেউই, ওদের শরীরের লাস্যটাই গুরুত্বপূর্ণ। তার বাইরে এদের কথা ভাবার কোনও কারণ নেই।

তা ছাড়া জিতের জগৎটা আলাদা। নামকরা একটি বহুজাতিক কম্পিউটার সংস্থার সে ডিরেক্টর, ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি বা অবনতির সঙ্গে তার কর্মজীবনের ওঠাপড়া। জিৎ অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা করেছে, অ্যাকাডেমিক জগৎ ছেড়ে এসেছিল কর্পোরেট দুনিয়ায় ভারতের অর্থনীতির এক সন্ধিক্ষণে। তথাকথিত সমাজতন্ত্র থেকে খোলা অর্থনীতির পথে তখন ভারত পা বাড়াতে শুরু করেছে। সে সকালে গোলাপি রঙের খবরের কাগজ পড়ে মন দিয়ে, বাড়িতে দামি দার্জিলিং চা ছাড়া আর কিছু খায় না। তাদের সংস্থার হেড অফিস ব্যাঙ্গালোরে, সেখানেও জিৎকে মাসের অর্ধেকটা সময় গিয়ে পড়ে থাকতে হয়, সে কারণে সেই শহরেও জিতের একটা ফ্ল্যাট আছে। ওই ফ্ল্যাটটা সে কিনেছিল পায়েলের কথা ভেবে, তার মনে হয়েছিল পায়েল যদি কলকাতায় না থেকে অন্য কোথাও সেটল করতে চায় তা হলে ব্যাঙ্গালোরের ফ্ল্যাটটা তার কাজে লাগবে। জিতের কলকাতার ফ্ল্যাটটা বাইপাসের ওপর একটা নামজাদা বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের এগারো তলায়। তার ফ্ল্যাটে চারটে বেডরুম, একটা গেস্ট রুম এবং ফ্ল্যাটের সংলগ্ন একটি টেরাস যেখান থেকে কলকাতা দেখা যায় অনেক উঁচু থেকে। অত উঁচু থেকে সব কিছুকেই সুন্দর এবং ঝকঝকে দেখায়।

মাত্র কয়েকদিন আগে ওই গোলাপি খবরের কাগজে একটা বিরাট প্রবন্ধ বেরিয়েছে। আর খুব বেশি হলে সাত আট বছরের মধ্যে ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত পৃথিবীর উন্নত দেশগুলির মধ্যে একটি বলে পরিগণিত হবে। এই দেশটা সত্যি কথা বলতে কী এগিয়েছে কম তো নয়। যখন ছাত্র ছিল জিৎ তখন কেউ কি ভাবতে পেরেছিল দেশটা এই পর্যায়ে এসে পৌঁছবে? তখন তো অনেকেই মনে করেছিল এই দেশটায় সাম্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য সমাজতন্ত্রই একমাত্র রাস্তা। জিতের কিছুটা তাই বক্তব্য ছিল। সে বামপন্থী অর্থনীতি খুব মন দিয়ে অধ্যয়ন করেছিলও বটে। আবার ওর অনেক বন্ধু তখন এই দেশটার কিছু হবে না এই রকম ভেবে বিদেশে থিতু হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছিল। অনেকে এখন আমেরিকার নাগরিক, তারা এখন এ দেশে জিৎদের স্টেটাসের দিকে হিংসার চোখে তাকায়। ভারত নামক দেশটা এখন আর অকিঞ্চিৎকর নয়, বিশ্বের চোখে তো নয় একেবারেই।

তবে এ সবই তো অর্থিনীতিবিদদের কথা। জিৎদের মতো সমাজের ওপরের তলায় যারা ঘোরাঘুরি করে তাদের বক্তব্য। এই সব লোকেরা প্লেনে করে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়, বছরের শেষ দিনটিতে কোথাও না কোথাও পার্টি করে। আর এই সব পার্টিতে যারা মেচেদার অভ্যন্তরের কোনও জায়গা থেকে এসে চিয়ারগার্লের ভূমিকা পালন করে তাদের মনোরঞ্জন করে, তারা কি জানে ভারতবর্ষ নামক দেশটা আর কয়েক বছরের মধ্যে ‘উন্নত’ দেশ হবে? জানে না, কারণ ভারতের মধ্যেই আরেকটা পৃথিবী আছে, যারা অন্য পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে উঠতে পারেনি।

কাঁচা রাস্তা ফুরিয়ে আসছে। আর একটু পরেই বড় রাস্তা এসে যাবে। কুয়াশাও ফিকে হয়ে আসছে এখন।

বড় রাস্তায় উঠে গাড়িটা দাঁড় করাল জিৎ। মেয়েটা গাড়ির জানলা দিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে তার গাড়িটা খুঁজল। যদি তার জন্য এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকে এ রকম একটা আশা সে হয়তো মনে মনে করেছিল। খুঁজে না পেয়ে ম্লান মুখে বলল, “গাড়িটা এখানেও নেই। আমাকে ফেলেই চলে গেছে।”

“তুমি কী করবে তা হলে? পুলিশের কাছে যাবে?”

“জানি না। পুলিশ যদি আমাকে থানায় নিয়ে যায়? আমায় যদি খারাপ মেয়ে ভাবে?”

জিৎ ঘাড় নাড়ল। তারপর বলল, “তুমি আমার বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারো আজকের রাতটা। আমার বাড়িতে কেউ থাকে না, তুমি একটা ঘরে আরাম করে ঘুমোতে পারবে, শীত করবে না। সকালে উঠে হাওড়া চলে যেও। আমার ড্রাইভারকে ডেকে পাঠাব ‘খন, তোমাকে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসবে।”

মেয়েটা চুপ করে আছে। জিৎ হেসে বলল, “তোমার চিন্তার কোনও কারণ নেই। তুমি যেমন খারাপ মেয়ে নও আমিও তেমনি খারাপ লোক নই। তা ছাড়া তুমি আমার মেয়ের থেকেও ছোট। আমার মেয়ে কাল সকালে আমাকে ফোন করবে, সে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকে। তুমি তার সঙ্গে ফোনে কথাও বলতে পারো। তার জগৎটা একেবারে আলাদা যদিও, তবুও তোমরা তো একই দেশের নাগরিক, মাঝে মাঝে তোমাদের মধ্যেও কথা হওয়া দরকার।”

Spread the love

Check Also

ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’

 সৌমিককান্তি ঘোষ   কাশীনাথ বামুন কাশীনাথ দরজা খুলতেই পশ্চিমের পড়ন্ত আলোয় মায়ের মুখটা চিক্ চিক্ …

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্য গল্প, দ্বারকানাথের মেজদাদু

 দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:   দ্বারকানাথের মেজদাদু দ্বারকানাথ ভূতে বিশ্বাস করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস …

তামাকপাতার দেঁজাভু সম্মাননা

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়: হরেন দে ওরফে এবং হৃদয় এখন একজন মস্ত বড় কবি। তো দীর্ঘদিন কবিগিরি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!