Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / রিটেক, বিশ্বদীপ দে-এর অণুগল্প

রিটেক, বিশ্বদীপ দে-এর অণুগল্প

 বিশ্বদীপ দে

 

রিটেক

মেট্রোর অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সিটে বসে মেয়েটা কাঁদছে। নিঃশব্দে কুঁকড়ে যাচ্ছে ফরসা মিষ্টি মুখটা।

স্টেশনে পায়চারি করছিলাম। চোখ টেনে নিয়েছিল দৃশ্যটা। দুপুর আড়াইটের ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম। ওড়নাটাকে সামান্য টেনে কান্নাটাকে গোপন করতে চাইছে মেয়েটা। কোলের ওপরে রাখা স্মার্টফোনে টপটপ করে চোখের জল পড়ছে। আমি দুটো সিট ছেড়ে বসলাম। মেয়েটাকে হয়তো আর কেউ খেয়াল করেনি। ইতিউতি লোকজন নিজেদের ফোন আর ইনকোডা টিভিতে ব্যস্ত।

মেয়েটারও কোনওদিকে খেয়াল নেই। একটা বিয়াল্লিশ বছরের আধদামড়া লোক যে আড়চোখে তাকে দেখছে, মাঝে মাঝে সোজাসুজি তার শরীরে চোখ বোলাচ্ছে, সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপও নেই।

বারেবারে নিজেকে ধমকেও মেয়েটার থেকে আলাদা করতে পারছি না। ট্রেন আসতে আর তিন মিনিট। তারপরই ট্রেনের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাবে মেয়েটা। ওর কান্নার কারণ আমার কোনওদিনই জানা হবে না। যত সেকথা মনে হচ্ছে তত কৌতূহলটা চরমে উঠছে। মেয়েটার পরনের দামি সালোয়ার, ফোন আর মেনিকিওর চর্চিত নরম আঙুলগুলো চোখে পড়ে যাচ্ছে। সুডৌল শরীরটা কান্নার দমকে ওঠানামা করছে। অবাক হলাম। আমি কি একধরনের স্যাডিস্টিক প্লেজার পাচ্ছি?

অভাবের কান্না এ নয়। হয় খুব কাছের কেউ অসুস্থ। কিংবা প্রেম। আজকালকার ছেলেমেয়েরা কি প্রেম-ট্রেমে ব্যথা পেয়ে কাঁদে? তারা তো শুনি ব্রেকআপ পার্টি দেয়। মেয়ের কাছেই শোনা। মুন্নির থেকে বড়জোর তিন-চার বছরের বড় হবে মেয়েটা। মনে হতেই লজ্জা লাগল।

ট্রেন আসতে আর দু মিনিট। মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। কিন্তু মনটাকে সরাতে পারলাম না। একেই কি মিডল এজ ক্রাইসিস বলে? নাকি অন্য কোনও কারণ আছে?

একটা মেয়ে কাঁদছে আর আমি হাঁ করে দেখছি। কেন যে দৃশ্যটা এত চেনা চেনা লাগছে! আস্তে আস্তে অতীতের গভীর থেকে ভেসে উঠল একটা ছবি। মনে পড়ল, পাশের পাড়ার পলিকে এভাবেই কাঁদতে দেখেছিলাম। অন্তত কুড়ি বছর আগে। মাধ্যমিকের পলিকে সপ্তাহে তিনদিন ভুগোল আর বাংলা পড়াতে যেতাম, ওদের প্রাসাদোপম বাড়িতে। পাশের ঘরে ওর রাশভারী সফল ব্যবসায়ী বাবা বসে টিভি দেখতেন। একদিন পলির ঘরে ঢুকতেই নজরে পড়ল পলি কাঁদছে। খুব অস্বস্তিতে পড়ছিলাম। দাঁড়িয়ে থাকতে বিচ্ছিরি লাগছিল। কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে এলে ওর বাবা জানতে চাইবে কারণ। তাই ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়েই ছিলাম। খুব জোর এক মিনিট। মনে হচ্ছিল অনন্ত সময়। হঠাৎই পলির নজর পড়ল আমার দিকে। চূড়ান্ত অপ্রস্তুত হয়ে ও ঢুকে গেছিল বাথরুমে। খানিক পরে চোখ-মুখ ধুয়ে এসে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খুলে বসেছিল বইখাতা। এতদিন পরেও দৃশ্যটা পরিষ্কার মনে আছে দেখে অবাক হলাম।

উঠে দাঁড়ালাম। ট্রেন আসার হলদে আলো দেখা যাচ্ছে। পলির কান্নাটা ঠিক কেমন ছিল, সেটা আজ আর মনে নেই। তবে এটা মনে আছে, ওর বাবা তার আগের দিনই জানিয়ে দিয়েছিলেন ভবানীপুরের একটা নামি কোচিং-এ ভরতি হয়েছে পলি। তাই আমার ছুটি। সেদিনই ছিল আমার পলিকে পড়ানোর শেষ দিন। পলির কান্না আর আমার টিউশনি চলে যাওয়ার মধ্যে আদৌ কোনও সম্পর্ক আছে কিনা তা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামানোর সুযোগ হয়নি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রশ্নটা থেকে গেছিল। পলিকে কিছু জিজ্ঞেস করার মতো সাহস ছিল না।

রাস্তায় যতবার দেখা হয়েছে, অচেনার ভান করে হেঁটে চলে গেছে পলি। যেতে যেতে সত্যিই একদিন অচেনা হয়ে গেল।

কুড়ি বছর আগের প্রশ্নটা মনের মধ্যে বুজকুড়ি কেটে ভেসে উঠল। এক আঁচড়ের একটা ভালো লাগা, সেটাও যে একটা দাগ হয়ে থেকে যায় আচমকাই বুঝতে পারলাম। এদিকে ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটা এই ট্রেনে যাবে না। হয়তো একা থাকতেই বেছে নিয়েছে প্ল্যাটফর্মের কোণ।

ট্রেনের দরজা খুলে যেতেই পা বাড়ালাম। শেষবারের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে, কাঁদছিস কেন পলি?’

Spread the love

Check Also

ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’

 সৌমিককান্তি ঘোষ   কাশীনাথ বামুন কাশীনাথ দরজা খুলতেই পশ্চিমের পড়ন্ত আলোয় মায়ের মুখটা চিক্ চিক্ …

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্য গল্প, দ্বারকানাথের মেজদাদু

 দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:   দ্বারকানাথের মেজদাদু দ্বারকানাথ ভূতে বিশ্বাস করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস …

তামাকপাতার দেঁজাভু সম্মাননা

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়: হরেন দে ওরফে এবং হৃদয় এখন একজন মস্ত বড় কবি। তো দীর্ঘদিন কবিগিরি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!