সুকৃতি সিকদার :
বর্ণ কাহিনী
একে তো উল্টোদিকের সিট তারপর কোণার সিটটা পাইনি। ফলে ট্রেনের চকচকে ধাতুর পাটাতনে পড়া রোদ লাফিয়ে আমার চোখের ডান দিকে লাগছে। রোদ বরাবরই আমার মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। খানিকটা ‘শ’-র মতো। বাবার চাকরির সুবাদে ক্লাস থ্রির বয়সে ওঠার পর আমাকে ইংলিশ মিডিয়াম থেকে বাংলা মিডিয়ামের স্কুলে পড়ানোর চিন্তা-ভাবনার কারণবশত যখন বাংলা বর্ণপরিচয় শেখানোর তোড় শুরু হল তখন থেকেই ‘শ’-কে আমার না-পছন্দ। ঠিক পছন্দ হয় না এই ‘বর্ণমাল’-টাকে। অথচ এর সঠিক কারণ আজ আমার মনে নেই। হতে পারে ‘শ’-এর শরীরিক গঠন। হতে পারে ওই যে নিচে ঝুলে থাকার জন্য গায়েগায়ে দুটো গোল গোল মতো করে দিতে হয় বলে। কেমন অসভ্য উলঙ্গ মনে হত এই ‘শ’-কে। অথবা ‘শ’-কে ‘শব’, ‘শ্মশান’ ―এইরকম কিছু শব্দের প্রতিনিধি মনে হওয়ার কারণেও হতে পারে। কিংবা হতে পারে নির্দিষ্ট কোনও কারণই ছিল না। জাস্ট পছন্দ হয় না। ফলে সেই ছোটোবেলা থেকে বহুদিন কোনো কোনো শব্দ লেখার সময় যদি ‘শ’ লিখতে হত, তখন আমি আগে পিছে বেপরোয়া … ইচ্ছাকৃত ভাবে বানান ভুলের পরোয়া না করে ‘স’ লিখে দিতাম। এ-কারণে বাংলা দিদিমণির কাছে বকাও শুনেছি আর পরীক্ষায় নম্বরও কাটা যেত মনে হয়। তবু আমি এই অভ্যাস থেকে বহুদিন বেরোতে পারিনি।
এর থেকে ‘ষ’ ভালো। পেটকাটা মূর্ধন্য ‘ষ’! বাংলা বর্ণমালার এই শব্দটার প্রতি আমার একটা মায়া কাজ করে। আহা রে পেটকাটা অবস্থায়ও উপাধির ব্যাধি ঘাড়ে নিয়ে টিকে আছে। ছোটোবেলায় একটা ষাঁড়কে রাস্তায় ঘুরতে দেখতাম, তার বাঁ দিকের পাজর থেকে পেটাবধি আড়াআড়ি তেরছা ভাবে লম্বা একটা কাটা দাগ ছিল। ক্ষতটা শুকিয়ে গেছিল ঠিকই কিন্তু দাগটা ছিল। আর ষাঁড় বানানেও যেহেতু ‘ষ’ লাগে তাই ‘ষ’-র কথা মনে পড়তেই যোধপুরের অলিগলি দিয়ে হেঁটে বেড়ানো ওই ষাঁড়টার কথা মনে পড়ে যেত।
আরও একটা কথা মনে পড়ে যেত। কথাটা শুনেছিলাম একদিন মাঝরাতে ভাগলপুরের পর সুলতানগঞ্জ স্টেশন ছাড়িয়ে বেলহার স্টেশনের বেশ কিছুটা আগে। ১৯৮৫ সাল। তখন সেসব লুটতরাজের এলাকা। লাইনের পাত ঘটিত কোনো সমস্যার কারণে হয়তো, মাঝরাত্তিরে আমাদের ট্রেনের কয়েকটা বগি উল্টে অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেল। যতটা না চিৎকার-চেঁচামেচি তার থেকে বেশি ছিল হৈ-হট্টগোল। যে সামান্য ঘড়ঘড় ঝাঁকুনি খেতে খেতে ট্রেন অকেজো হয়ে গেল, তাতে সাবারই ঘুম ভেঙ্গে গেছিল। বাবা ছয় বছরের আমি আর আড়াই বছরের মেজ ভাইকে কাছে টেনে নিল। মা’র কোলে তিন মাস বয়সের ছোট ভাই। ভাইদের দুধের বোতল সব ছিটকে পড়ে গেছিল এদিক-ওদিক। উৎকন্ঠার বোধ হয়তো তখনো হয়নি আমার। তবে কেমন একটা বাঁকা বাঁকা মনে হচ্ছিল সব কিছু। ট্রেনের মেঝের সঙ্গে তাল রেখে সোজা ভাবে দাঁড়াতে পারছিলাম না। আমাদের বগিটাও লাইন থেকে নেমে সামান্য একটু হেলে ছিল। একটা লোয়ার বার্থের সিটে জানলার কোণায় মা’র কাছে ভাইকে ও আমাকে রেখে বাবা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
চারিদিকে হঠাৎ একটা শোরগোল শুরু হয়ে গেল। তখন ট্রেনের ভিতরের আলোয় তেমন জোর ছিল না। একটু পরে সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। আর সেই সঙ্গে শোরগোল বেড়ে গেল। টর্চ, লাইটার ও দেশলাই কাঠি জ্বলে উঠতে লাগল এদিকে-ওদিকে। এরকম জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটলে লুটেরার আবির্ভাব ঘটে। দল বেঁধে অথবা আলাদা আলাদা ভাবে আসে তারা। মৃতের পকেট হাতিয়ে ও শরীরের গয়নাগাটি খুলে নেওয়াই এদের প্রথম টার্গেট। তারপর দুর্বলের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার পালা। খুব বেশি বাধার সম্মুখীন হলে এরা আরো আক্রমণাত্মক, এমনকি ঘাতকও হয়ে ওঠে।
যদিও স্টেশন থেকে জায়গাটা খুব বেশি দূরে নয়। তবু কত সময় পরে উদ্ধারকারীর দল এসে পৌঁছায় তার ঠিক নেই। ইতিমধ্যে দুই সদস্যের আরও এক বাঙালী পরিবারের সাথে যোগাযোগ হয়ে গেল। চব্বিশ-পঁচিশ বছরের লোকটি তার মাস ছয়ের বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে ফিরছিল। লোকটি বাবার পূর্ব পরিচিত। নদীয়ার মানুষ। ডিফেন্সে জয়েন করার পর বাবার আন্ডারে ট্রেনিং করেছিল। দিল্লি থেকে ট্রেনে ওঠার সময় একবার দেখাও হয়েছিল। তখন বাবাকে দাদা দাদা বলছিল কাকুটি। যদিও তখন খুব বেশি কথা হয়নি। তবু ট্রেন ছাড়ার পর একবার দেখা করে গেছিল। মা’র সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বাবা। আমাদের বগির একটা বগি পরেই ওরা ছিল। এখন এক জায়গায় হয়ে গেছি। লাগেজ-পত্র সহ আমাদের বাচ্চাকাচ্চা সবাইকে ধরাধরি করে নামানো হল। তখন ট্রেনে এত যাত্রী সমাগমও হত না হয়তো। তবু কিছু দূরে দূরে কয়েক জনের দু-একটা দল দেখা গেল। ওরাও ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনে পৌঁছানোর অন্য উপায় খুঁজছে। কম-সে-কম এই ফাঁকা প্রান্তর জুড়ে ঝোপঝাপময় লুটপাটের এলাকা থেকে বেরিয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে চাইছে সবাই।
কিন্তু আমাদের মতো বাচ্চাকাচ্চা আর লাগেজ-পত্র নিয়ে এই রুক্ষ এলাকার মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়াটাও চাপের। ইতিমধ্যে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ষাট-পঞ্চাশের এক দম্পতি আমাদের দলের সাথে জুড়ে গেল এবং তারা ভীষণ ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল আমাদের উপর। কিন্তু এই আধাপাথুরে পথে বয়স্ক মানুষ, বাচ্চাকাচ্চা ও লাগেজ-পত্র নিয়ে হেঁটে যাওয়াটা সত্যিই চাপের। ছোটদেরকে তবু কোলে নেওয়া যাবে। আমিও হাঁটতে পারব।
জোৎস্নালোক আরও প্রবল হয়ে উঠছে। চাঁদালোকে ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। লাইনের দু’পাশে ফাঁকা ফাঁকা জায়গায় মাটির রুক্ষতা অনুযায়ী এবড়ো-খেবড়ো ঢাল গুলোকে মনে হচ্ছে চাঁদের নীরব সমুদ্র। যেন চলমান অবস্থাতেই গীতাজ্ঞানে হঠাৎ স্থির হয়ে গেছে। কিন্তু এই রুক্ষ ভূমির মায়াবী ক্ষমতা গেছে বেড়ে। থেকে থেকে গুল্মরূপী ছোটো-খাটো বাবলা ও বাবলা জাতীয় গাছের ঝাড়। যত দূরে তাকাই ততই ঘন হয়ে উঠছে। দূর থেকে ঘন লাগে ঝাড়। ঝাড়ের পেছনে কত যে রহস্য ওৎ পেতে আছে। হয়তো ঝাড়ও জানে না। এতই নীরব!
কিন্তু এই নীরবতা ভেঙে দিচ্ছে একটি অন্ধকার ট্রেন। মানুষের ফুসফাস ও উৎকন্ঠার ভিতর দিয়ে কয়েকটা টর্চের লম্বা আলো এদিক-ওদিক দৃকপাত করতে করতে রেললাইন বরাবর ট্রেনের সামনের দিক দিয়ে পেছন দিকে এগিয়ে আসছে। মাঝেমাঝে ওদের ভেতরে একজন বাঁশিও বাজাচ্ছিল। ফুটবল খেলায় রেফারি যে বাঁশি বাজায় সেই বাঁশি। কিন্তু এই বাঁশি বাজানোর ধরণ আলাদা। সুদীর্ঘ চিলের ডাকের মতো।
বাঙালী কাকুটিকে আমাদের কাছে দাঁড়াতে বলে বাবা সামনের দিকে এগিয়ে গেল। রেলওয়ে পুলিশের তিন সদস্য। ওরা কোথা থেকে কীভাবে এল কিছুই জানি না। ওদের থেকেই জানা গেল রেললাইন বরাবর কিছুটা হেঁটে গেলেই একটা গেট পড়বে। রেললাইন বরাবর আরেকটু এগিয়ে গেলেই স্টেশন। আসলে বড় রাস্তাটিকে আড়াআড়ি কেটে রেললাইন বেলহার স্টেশনের দিকে এগিয়ে গেছে।
রেলের পক্ষ থেকে সেই মুহূর্তে এক্সট্রা কোনো ট্রেন দেবে কিনা তার ঠিক নেই। কখন কে কীভাবে সাহায্য করবে তারও ঠিক নেই। বাবা ওদের সাথে কিছু কথা বলল হিন্দিতে। ফিরে এসে মাকে বলল, “আমি একটু রেল গেটটার দিকে যাই। দেখি কিছু পাই কিনা।” বাঙালী কাকুটিও সঙ্গে যাবে বলছিল। কিন্তু যাওয়ার সময় বাবা বাঙালী কাকুটিকে আমাদের দেখিয়ে বলল, “দেখিস। আমি জলদি ফেরার চেষ্টা করছি।” বলে বাবা বেরিয়ে গেলেন।
যা হচ্ছে সেটা দেখছি। কিন্তু কী হতে পারে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু আন্দাজ করতে পারছি না। আকাশের থেকে চাঁদ যেন মুক্তির আলো ছড়িয়ে চলেছে। আশেপাশে গাছের পাতায় সেই আলোর নাচন। পাথুরে এলাকা বলে রাত বাড়ার সাথে সাথে বাতাসও বেশ ঠান্ডা হয়ে উঠেছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল বাবা এখনো ফিরল না। মা মনে হয় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু চাঁদের আলায় আমি সেটা বুঝতে পারছিলাম না। মাঝেমাঝে মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “বাবা কখন আসবে?”
এর মধ্যে বাতাসে একটা শব্দ ভাসাভাসি করছিল― লাশ! ট্রেনের আরও সামনের দিকে লাইন বরাবর নাকি একটা লাশ পাওয়া গেছে। লাশ কথার মানে আমি তখনো জানি না। কিন্তু বড়োরা সবাই বেশ সতর্ক ও অস্থির হয়ে উঠলেন। আমার তখন মাকেও বেশ উদ্বিগ্ন মনে হল।
বাঙালী কাকুটি মাকে বলল, “বৌদি চিন্তা করবেন না। দাদা এখুনি চলে আসবে হয়তো। আমি এগিয়ে দেখছি।” কাকুটি রেলওয়ে পুলিশগুলোকে খুঁজতে, নাকি বাবাকে খুঁজতে, সামনের দিকে এগিয়ে গেছিল জানি না। আমি মাকে জিজ্ঞাসা করছি, “কী হয়েছে মা? বাবা কখন আসবে?” মা কী বলেছিল মনে পড়ছে না। তখন আমি দূর থেকে ভেসে আসা একটা ‘প্যাপু’ আওয়াজ শুনতে পেলাম।
বাবা এসে গেছে। আমি “বাবা” বলে ডেকে উঠলাম। মা ঠাকুরের উদ্দেশে কিছু বিড়বিড় করছিল কিনা তাও জানি না। তবে বাবাকে উদ্দেশ করে বলল, “কী মানুষ তুমি! এত চিন্তার মধ্যে ফেলে দাও! যা হবে হবে। এক সাথে থাকো তো।” বাবা তেমন কোনো গাড়ি পায়নি। তুলনায় বেশি ভাড়ার বিনিময়ে সাধ্যমতো দুটো রিক্সা ভ্যান পাওয়া গেছে। তাও তাদেরকে অ্যাক্সিডেন্টের কথা প্রথমে জানানো হয়নি। ভাড়া নির্দিষ্ট করে এদিকে আসার পথেই জানান হয়েছে। নতুবা আরও বেশি ভাড়া চাইত মনে হয়।
আমাদের তিন পরিবারের লাগেজ-পত্র তুলতে তুলতেই দুটো রিক্সা গেল ভরে। ছোটো ভাই মায়ের কোলে। বাবার কোলে মেজো ভাই। আমার হাত ধরে ওই কাকুটা হাঁটছে। মোটামুটি সবাই একসাথে হাঁটছি। বাবার থেকেই আসল খবরটা জানা গেল। রেলওয়ে পুলিশগুলো এই ট্রেন দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আসেনি। ওরা অন্য একটা খুনের ব্যাপারে এসেছিল। সম্ভ্রান্ত পরিবারের কোন মহিলাকে খুন করে কেউ রেললাইনের উপর রেখে গেছিল। যেহেতু রেলের এরিয়ায় তাই এই পেটকাটা লাশ পড়ে থাকার খবর পেয়ে পুলিশ লাইন বরাবর রওনা দিয়েছিল।
কিন্তু ওরা এসে পৌঁছানোর আগেই ট্রেন এসে গেছিল। ট্রেনের ইঞ্জিনের চাকাও ওই লাশটির পেটের উপর দিয়ে চলে গেল। তার পরের বগির চাকা গুলোও মনে হয় ওই মহিলার পেটের উপর দিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু তারপরেই ইঞ্জিন সহ ট্রেনের কয়েকটা বগি গেল উল্টে।
রেললাইনের পাশের রাস্তা দিয়ে রিক্সার পেছন পেছন আমরা হাঁটছিলাম। ইঞ্জিনের কাছাকাছি আসতেই একটা জায়গায় একজন পুলিশ টর্চের আলো ফেলে ফেলে দুজন ডোমকে কিছু নির্দেশ করছিল। ওই আলোর ফাঁকে রেললাইনের দিকে চোখ পড়তেই আমি লাল-হলুদ মতো একটা কাটা পেট দেখলাম! রেললাইনের একপাশে কোমর থেকে নিচের দিকের অংশটা। সেটা ভালো ভাবে দেখা যাচ্ছিল না। তবে ফ্যাটফেটে চাঁদের আলোয় দেখা গেছিল শরীরের দুই অংশের মাঝবরাবর পেট কেটে একটা রেললাইন এগিয়ে গেছে।
এখনও মাঝেমাঝে পেট কাটা মূর্ধন্য ‘ষ’-কে দেখলে আমার ওই দৃশ্যটার কথা মনে পড়ে। তাছাড়া অনেক সময় পেটে অপারেশনের দাগ ওয়ালা মানুষ জনকে দেখলেও আমার ‘ষ’-র কথা মনে পড়ে। ফলে মূর্ধন্য ‘ষ’-কে নিয়েও আমার খুব বেশি টানা-হ্যাঁচড়া করতে ভালো লাগে না। বরং তিনজনের ভিতর দন্ত্য ‘স’-কে ব্যবহার করতেই আমার ভালো লাগে। হয়তো নিজের নামের শুরুটা ওই ‘স’ দিয়ে হওয়ার কারণই দায়ী, দন্ত্য ‘স’-এর প্রতি আমার একটা প্রচ্ছন্ন দুর্বলতা আছে। হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও ‘র’-এর প্রতি একটা দুর্বলতা ছিল। হতে পারে, বিনয় মজুমদারেরও ‘ব’-এর প্রতি একটা দুর্বলতা ছিল। তোমারও কি তাই মনে হয়?
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news