Breaking News
Home / পার্বণী / পুজোয় বেড়াতে যাওয়া নিয়ে কিছু কথা

পুজোয় বেড়াতে যাওয়া নিয়ে কিছু কথা

 দেবব্রত কর বিশ্বাস:

 

পুজোয় বেড়াতে যাওয়া নিয়ে কিছু কথা

 

“পুজোর সময় বাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে যাওয়ার কোনো মানেই হয় না।” ছোটো থেকেই এমনটা মনে হত আমার। কী সুন্দর ফুরফুর করে হাওয়া, শরতের ওই বিশেষ প্রাণবন্ত রঙে। পুজো-পুজো গন্ধে ভেসে থাকে মনের সমস্ত উঠোন। তাই একটা বয়স অবধি আর পাঁচজনের মতো গভীর রাত অবধি ভিড় ঠেলে লাইনে দাঁড়িয়ে ঠাকুর দেখতে যাওয়ায় বিশ্বাস করতাম আমি। কী মজাই যে লাগত! তখন যে খুব ঈশ্বরভক্ত ছিলাম এমনটা নয়। আমার ভালো লাগত মানুষ দেখতে। কত রকম চলমান গল্প দেখতে পাওয়া যায় পুজোর সময়। এ এক মহা মিলনের কার্নিভাল। বিশেষ করে কোলকাতা শহরের আবহ চোখ চেয়ে দেখার মতো হয়।

কর্মসূত্রে রাজ্যের বাইরে যারা থাকেন, তাঁরা এই সময় ঘরে ফেরেন। দেশের বাইরে থাকা মানুষজনও ফেরেন। তাই এটা যেন ঘরে ফেরার উৎসবও। কৈলাস থেকে মা মর্ত্যে আসেন, ছেলেমেয়েরাও বাড়ি ফেরে। সবাই যখন ফিরতে চায়, তখন বাড়ি থেকে দূরে বেড়াতে চলে যাওয়ার কোনও মানে হয়? দীর্ঘদিন অবধি আমি ভাবতাম, এটা চরম বোকামি। পুজোয় বাংলার জমজমাট পরিবেশ ছেড়ে যারা চলে যায় তাঁদের দেখে আমি অবাক হতাম। এই অবাক হওয়াটা দীর্ঘদিন চলেছিল। ধীরে ধীরে বয়স বাড়তে থাকল। তিরিশের কোটা পেরিয়ে গেলাম। সারা বছর প্রচণ্ড হাঁসফাঁস খাটুনির মধ্য দিয়ে দিন কাটতে শুরু করল। নিঃশ্বাস ফেলার মতো ছুটিটুকুও থাকে না। শিবরাত্রির সলতের মতো টিমটিম করে জ্বলতে থাকে রবিবার। ওতে কী হয়? অপেক্ষা শুরু হল। পুজোর ক’টা দিন বেশ ছুটি পাওয়া যাবে। যতই ঠাকুর দেখতে বেরোই না কেন, আসলে তো নিজের মতো সময় কাটানো। অফিসের কাজ তো নয়। যেমন ভাবা, তেমন কাজ শুরু হল। কিন্তু মন চাইলেও শরীর আর সঙ্গ দিতে চাইল না। এত ভিড়! এত ক্যাকোফোনি! এত জ্যাম! ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকা।

 

চন্দ্রশিলা সামিট। ছবি:- লেখক

 

দরদর করে ঘেমে যাওয়া। পুজোকেন্দ্রিক যেগুলো প্রিয় ছিল, সেগুলোই অসহ্য লাগতে শুরু করল। মনে হতে শুরু করল, এই উল্লাসমঞ্চ আমার থেকে দূরে সরে গেছে, অথবা আমিই আর পা মেলাতে পারছি না নির্দিষ্ট ছন্দে। মনে হল, ছুটি চাই। মনে হল, পালাই পালাই। কিন্তু ওই ছোটোবেলার ইট মাথায় চেপে বসে ছিল। পুজোতে বাইরে চলে যাব বেড়াতে? হতেই পারে না। কাজের চাপ যত বাড়ল জীবনে, বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছেটাও বেড়ে গেল পাল্লা দিয়ে। ওদিকে সমস্যা হল ছুটি পাওয়া নিয়ে। বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে টানা দশ-বারো দিন ছুটি দিতে চায় না সহজে। পুজোর চারদিন তো ছুটিই থাকে, সঙ্গে পাঁচ কি ছ’দিন ছুটি নিলেই টুক করে বেড়িয়ে আসা যায়। এই থেকে শুরু। একবার বেরিয়ে পড়া হল। হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরা হল পুজোর সময়। গন্তব্য হরিদ্বার। সপ্তমীর দিন দুপুরে যখন কোলকাতা ধীরে ধীরে ভিড় বাড়াচ্ছে নিজের শরীরে, আমাদের ট্রেন ছেড়ে গেল হাওড়া স্টেশন। আমার সাধের কোলকাতার পুজো ছেড়ে প্রথমবারের মতো বেড়াতে যাচ্ছি। হু হু করে এগোতে লাগল ট্রেনটা। কথায় বলে, ভেতরে থাকলে অনেক কিছু বোঝা যায় না। দূরে গেলে অনেক কিছু আলাদা ভাবে চোখে পড়ে। হঠাৎ যেন ক্লান্তি দূরে সরে যেতে শুরু করল আমার। সারা বছরের কাজের ক্লান্তি শুধু নয়, এই শারদোৎসবের ক্লান্তিও যেন দূরে সরে যেতে শুরু করল। এখানে থমকে গেছিলাম সেদিন।

এসব কী ভাবছি আমি? শারদোৎসবের ক্লান্তি? বাঙালি সারা বছর যার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকে সেই দুর্গাপূজায় ক্লান্তি? আবার যেন চোখের সামনে থেকে সরে গেল পর্দা। মনে হল, কোনদিন ভেবে দেখেছি পূজা আসলে কী? পূজা হল শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের আচার অনুষ্ঠান। কিন্তু আম-বাঙালি কি সেটা নিয়ে মাথা ঘামায়? তাঁরা জানে পুজো এসেছে, জমিয়ে আনন্দ করতে হবে। কিন্তু কী উপলক্ষে এই উৎসবের আয়োজন? সেই উপলক্ষ পুজো। মা দুর্গার পুজো। সেটাই গৌণ হয়ে গেছে। আমরা বলি ঠিকই যে ‘ঠাকুর দেখতে যাচ্ছি’ আসলে তেমনটা নয়। আমরা মণ্ডপ সজ্জা দেখতে ঘুরে বেড়াই সারারাত ধরে। সর্বজনীন হয়ে গিয়ে কালক্রমে পুজো এখন শিল্পের প্রদর্শনী আর উৎসবের প্ল্যাটফর্ম। শুধুই উৎসব করি আমরা চুটিয়ে। দুর্গাপূজা নামটা এবার বাদ দিলেই হয়। সে ঠিক আছে। সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে যাওয়া এই উৎসবে কেউ যদি বছরের পর বছর মেতে থাকতে চান, তাতে আমার আপত্তি করার কিছু নেই। কিন্তু আমি যেন ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে উঠছিলাম। যে ছেলেটা বা মেয়েটা ডিস্কো থেকে উদ্যাম নাচতে ভালোবাসে, তারও একটা সময় পরে ক্লান্তি আসে।

সেও তখন চেয়ারে বসে পড়ে। এসব ভাবছিলাম যখন, দুরন্ত গতিতে এগোচ্ছিল ট্রেন। দূরে আকাশে তখন ফুটে উঠেছে শরতের পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। তার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে সেই বিশেষ রোদ। গোটা শহর যখন উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে আনন্দে মেতে থাকে, আমি তখন সুদূর হিমালয়ের কোনও চটিতে বসে শীতে কাঁপি। আকাশের গায়ে ফুটে ওঠা বরফ-সাদা শৃঙ্গগুলোর দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে বসে থাকি। ভারী ভালো লাগে ও-ভাবে বসে থাকতে। এটাও আমার কাছে উৎসব। আমি বাইরের উৎসব থেকে ধীরে ধীরে ডুবে যেতে শিখেছি নিজের ভেতরে থাকা উৎসবে।

 

দেবব্রত কর বিশ্বাস: জন্ম ৩১ জুলাই, ১৯৮২, কোলকাতা৷ দীর্ঘ দেড় দশক ধরে নিয়মিতভাবে কবিতা, গল্প, মুক্তগদ্য লিখে চলেছেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পাঁচ৷ সবকটিই কাব্যগ্রন্থ। সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থের নাম ‘বিচ্ছেদ ব্রহ্ম’। প্রকাশক― আজকাল।

Spread the love

Check Also

একাকী বেহালাবাদক

  দেবাশীষ চক্রবর্তী :   একাকী বেহালাবাদক    কিছু কান্নার কোনো শব্দ হয় না। কোনো …

শব্দবাণ

স্নিগ্ধা রায়: শব্দবাণ শব্দবাণটা ভালোই চালাতে পারে ও। ভাবছেন এ যুগে আবার শব্দবাণ কে চালাল? …

বর্ণ কাহিনী 

  সুকৃতি সিকদার : বর্ণ কাহিনী    একে তো উল্টোদিকের সিট তারপর কোণার সিটটা পাইনি। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *