সুমন ভট্টাচার্য:
পুজোয় আপনার ইচ্ছে কি?
এই প্রশ্নটা যদি আমায় কেউ করে, তাহলে এই প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় দাঁড়িয়ে ঠিক কি উত্তর দেব?
চারদিন ধরে আড্ডা, ভুড়িভোজ… কোথাও ঘুরতে যাওয়া? না, আমি বরং কিরণ দত্ত ওরফে ‘বং গায়’-এর মতো সাহসী হতে চাই, কুন্ঠাবিহীনভাবে কিছু কথা বলতে চাই। এই ইউটিউব আর কেন এত জনপ্রিয়, কেন তার চ্যানেলের এত গুণমুগ্ধ দর্শক, কেন তরুণ প্রজন্ম তার কথা এত হা করে শোনে, সেটাই এই কয়েকদিন ধরে অন্তর দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছি।
আজ থেকে ২৫ বছর আগে আমরা যখন সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম, তখন বরিষ্ঠ সাংবাদিকরা বলতেন, ‘irreverence’ একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। সিকি শতাব্দী বাদে দেখতে পাচ্ছি, ‘irreverence’ নয়, ‘সেটিং’টাই এখন মূল বিষয়। সেই জন্য বাংলা চলচিত্রের রিভিউ করার আগে হয়তো অনেক সমালোচককেই ভেবে রাখতে হয় যদি পরিচালক বা নায়ক রাগ করেন, তাহলে তাঁর অনুরোধে পুজো উদ্বোধনে যেতে রাজি হবেন না। এবং তাহলে ‘কাট মানি’ও মিলবে না। ‘দিদিকে বলো’র শরণাপন্ন হয়েও এই ‘কাট মানি’র রোগ থেকে বাংলা সিনেমা মুক্তি পাবে না।
সেই জন্যেই আজ খবরের কাগজ বা টেলিভিশন চ্যানেলের চাইতে লোকে অনেক বেশি নির্ভর করে পোর্টাল বা ইউটিউব-এর রিভিউ এর উপর। মার্ক জুকেরবার্গরা আজকের পৃথিবীটাকে যে জায়গায় নিয়ে চলে গেছেন, সেখানে খবরের কাগজ বা টেলিভিশন চ্যানেল হয়তো শুধুই পাবলিক রিলেশন কোম্পানিগুলির খেলার মাঠ। এবং তার প্রতিস্পর্ধী হিসাবেই কিরণ দত্ত ওরফে ‘বং গায়’-এর মতো ইউটিউবারদের উঠে আসা।
এবার পুজোর ঠিক প্রাককালে বাংলা সিনেমা নিয়ে যাবতীয় আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক দেখতে দেখতে সেই সারসত্যটাই আর একবার বুঝতে পারলাম। মাননীয় সাংসদ দেব, যিনি কখনো বিবেকানন্দ, আবার কখনও বা ঘাটালের সাংসদ রূপে অবতীর্ণ হন, তিনি ভারি রাগ করেছেন কেন বাঙালি এত গোয়েন্দা গল্পে মজে আছে সেই নিয়ে। মাননীয় সাংসদ তথা সুপারস্টার এর হতাশার কারণটা বুঝতে পারি। কারণ গোয়েন্দা, যেখানে ‘মগজাস্ত্র’ই মূল অস্ত্র, সেখানে দেবকে অভিনেতা হিসেবে নেওয়ার কথা অন্তত কেউ ভাববে না। যিনি মাছ রান্না করতে পারেন না, তিনি যে অষ্টমীর মধ্যহ্নভোজে পনিরপসিন্দার গুণগান করবেন, সে তো বলাই বাহুল্য। কিন্তু বাঙালি সরষে-ইলিশ ছেড়ে পনিরে মজবেন কিনা সেটা তো অন্তত তাঁকে ভাবতে দিন!
বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে আপনি যত আলোচনা করবেন, তত বিরক্ত এবং হতাশ হবেন। পাভেল নামে এক বিখ্যাত পরিচালক, যাঁর নাকি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের থেকেও ডেট পাওয়া মুশকিল, তিনি ‘অসুর’ বলে একটি ছবির টিজার বাজারে ছেড়েছেন। এই ‘অসুর’এ সুপারস্টার জিত একজন ভাস্কর-এর রোল করেছেন। এই ভাস্কর চরিত্রটি নাকি আবার কিংবদন্তী শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ-এর ছায়াই তৈরি। যদি আপনি ভুল করেও টিজারটি দেখে ফেলেন, তাহলে বুঝতে পারবেন রামকিঙ্করকে এতবড় অপমান বোধহয় গত পঞ্চাশ বছরেও কেউ করেনি।
এই ধরনের বাংলা সিনেমা, তার নায়ক কিংবা তার পরিচালকদের যদি ‘বং গায়’দের মতো ইউটিউবাররা একেবারে ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে দেন এবং তরুণ প্রজন্ম যদি সেই রিভিউ দেখে বাংলা সিনেমা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেন, তাহলে কিই বা বলার থাকতে পারে। জিত যদি রামকিঙ্করের জুতোয় পা গলানোর সাহস দেখাতে পারেন, তাহলে তো অঙ্কুশ হাজরা দাবি করবেনই ‘ফরেস্ট গাম্প’-এর হিন্দি রিমেকে অভিনয় করার জন্য আমির খান নাকি তাঁকে ঝুলোঝুলি করেছেন। এই সব আজগুবি দাবি বা অতিসয়ক্তিকে আজকের তরুণ প্রজন্ম বা ইউটিউবাররা যেভাবে ধরে ধরে উড়িয়ে দেন, সেটা প্রায় রাষ্ট্রপুঞ্জে পাকিস্তানকে দেওয়া বিদিশা মৈত্রের উত্তরের মতোই সপাট থাপ্পর।
আজকের এই দুনিয়ায় যেখানে ইন্টারনেট বা ওয়েব সিরিজ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে চলেছে, সেখানে বাঙালি পরিচালক এবং অভিনেতারা যদি ভাবেন নেতাজি অথবা রামকিঙ্করের মতো ‘আইকন’দের ধরে দর্শককে বোকা বানাবেন, তাহলে সেটা বাঙালির মেধা এবং মননশীলতার উপর অবিচার করা হবে। আমরা যাঁরা চল্লিশ পেরিয়ে চালসে, তাঁরা হয়তো স্মৃতি মেদুরতায় আক্রান্ত হলেও হতে পারি, কিন্তু তরুন প্রজন্ম বোকা বানবে কেন? ‘সুজয়দা’ কিংবা ‘বাবাইদা’র যুগ যে চলে গেছে, সেটা বোধহয় নিজেদের সত্যজিত রায় বা হৃত্বিক ঘটকের সমতুল্য মনে করা পরিচালকদের বোঝার সময় এসেছে। একই কথা প্রযোজ্য তথাকথিত সুপারস্টারদের ক্ষেত্রেও। এই গুগল, হোয়াটসঅ্যাপের দুনিয়ায় আপনি ‘কাটমানি’ নির্ভর একশ্রেণীর সাংবাদিককে স্তাবকে পরিণত করতে পারেন, কিন্তু বুদ্ধিমান দর্শক তেলেভাজা আর শিল্পের তফাতের মতো ‘জুলফিকর’ থেকে ‘গুমনামি’ কেন বানাতে হয়, তা বোঝেন।
ভুবনেশ্বরে থাকলে পারে হয়তো অনেক প্রযোজককেই ‘নিখিল’ বিশ্বের প্রতি হতাশ হয়ে কঠিন সমঝোতার রাস্তা খুঁজতে হয়, কিন্তু তাতে খারাপ সিনেমার ‘বিসর্জন’ ঠেকানো যায় না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news