Breaking News
Home / পার্বণী / পার্বণী গদ্য / চৈতন্য দেহি মে, শ্বাশত করের গদ্য

চৈতন্য দেহি মে, শ্বাশত করের গদ্য

 শাশ্বত কর

চৈতন্য দেহি মে

ভোর জাগছে। ভোর বড় হলে সকাল হয়। সকালের যুবাবস্থা দিন আর দিনসোনাটির বার্ধক্যের শেষে অবধারিত রাত্রি। শেষ নয়। শেষ বলে কিছু নেই। আলোর সায়াহ্নে অন্ধকার বাড়ে আর অন্ধকারের অন্তর থেকে আলোর প্রসব হয়। রাত্রির অবসানে ফের জাগেন ঊষা। সরল চক্র, অথচ জটিল ব্যাপ্তি, অনন্ত গভিরতা! একটি মাত্র সুমহান চক্র। আর সেই চক্রের একক অগুণতি ছোট ছোট চাকা। সুখ, দুঃখ, জীবন, মরণ, হাসি, কান্না, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা সব কিছুই সেই পরম চক্রের নিয়মে ঘুরে বেড়ায়। বাইরে যাবার জো নেই।
তাই তো বচ্ছরকার নিয়ম মেনে আজ ভোর জাগছেন। এমনিতেই ভোরে মিশে থাকে ভোরাইয়ের মায়া। গোটা চরাচরের প্রাণ জেগে ওঠে যে, জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততায় ভোর তাই সবসময়ই সুন্দর, মায়াময়! অবশ্য অন্য অন্য ভোর থেকে আজকেরটি আলাদা! হর বছরই এমন আলাদা সাজ হয় তার। আসলে মন যে মহাজন। চিন্তা চেতনার সবটুকুতেই যে মন মহাশয়। তাকে বোধই বলা যাক, অথবা চৈতন্য— তাঁর হাত ধরেই মুহূর্তরা নানান পোষাকে সাজেন। আজ যেমন সেজে উঠেছেন খুশিতে, শান্তিতে, মায়ের অথবা মেয়ের আগমন বার্তায়!
আজ মহালয়া। আজ ঊষার কন্ঠহারের লকেটের নাম রেডিও। আজ মন মহাজনের নির্মল ভোরের কারিগর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, পঙ্কজ কুমার মল্লিক। আজ বাড়িতে বাড়িতে, পাড়ায় পাড়ায়, মাইকে বক্সে মোবাইল ফোনে– “আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জির’—মহিষাসুরমর্দিনী।
গুণী শিল্পীর শিল্প এমন এক অমোঘ তুলি, মনের ক্যানভাসে তার রেশ ছড়াবেই। আজকের সকাল তাই চাও বা না চাও, মা আসার খুশিতে আনন্দে মাতাবেই। এমন মনে বাইরে চাইলেই পাখির কিচকিচ মনে হবে ঐশ্বরীক নাদব্রহ্ম। কমলা বোঁটায় শিশির নতুবা দু’ এক ফোঁটা বৃষ্টিমাখা শিউলিকে আজ মনেই হবে স্বর্গবাগানের পারিজাত। ঘুমকাতুরেও হঠাৎ ইচ্ছে করে বসবে কয়েক কদম হাঁটাহাঁটি করে গায়ে এই অলৌকিক ভোর মেখে নেওয়ার। যে নাগকেশরের ফুল এত দিন হেলায় ঝরেছিল, যে চাঁপা তার গন্ধ ছড়িয়ে কতবার ডেকেছে এ ক’দিন, যে জবার লাল চোখেও পড়েনি সুস্বাস্থ্যকামী ধাই ধপড় হাঁটায় অভ্যস্ত আদুরে নোয়াপাতির, আজ তার রেহাই নেই। আজ তার পকেটের মোবাইল থেকে অমোঘ সুর হেঁটে এসে বোঝাবেই পৃথিবী কত সুন্দর, বেঁচে থাকা কত মূল্যবান। আজ তিনি তেলাকুচোর ফুল দেখেও দু’ দন্ড দাঁড়াবেন।
এমনই হয়। এমনটাই হয় প্রতি বছর। পরিবার নিয়ে মা আসেন। সমগ্র চরাচরের মা। সমগ্র চরাচরের চৈতন্য মায়ের মাঝে সমাহিত। শরতে মায়ের অকালবোধন। শরত দক্ষিণায়নের কাল, দক্ষিণায়ণ নাকি দেবদেবীর নিদ্রাকাল, আর উত্তরায়ণ জাগরণের। ঘুম থেকে জেগে ওঠা। অন্ধকার থেকে আলো। ভোর। অন্ধকার থেকে আমায় আলোয় নিয়ে চলো, অজ্ঞান থেকে জ্ঞানে নিয়ে চলো। কে নিয়ে যাবেন? যাবেন চৈতন্য। সে তো আর সহজলভ্য নয় হে! হাতে গোণা মানুষ তাঁর ক্ষণিকের দেখা পান। আপনার কাছেই তাঁর অনুযোগ ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না!’ কিন্তু তেমন জ্ঞানী আর ক’জন? ‘কোটিকে গুটিক’। আর বাকিদের জন্য? তারাও তো এই অনন্ত প্রকৃতি, তবে? তাদের জন্যই মা আসেন। মায়ের সর্বব্যাপী রূপ গোচর হওয়া তো বড় কঠিন, তাই মায়ের মৃন্ময়ী রূপ! জীব থেকে শিব— এই উত্তরণই, চিরন্তন আধ্যাত্মিক এই সুরের ছোঁয়াই মায়ের পুজোর মূল তাৎপর্য।
মা চৈতন্যময়ী। চেতনাকে চৈতন্য করে দিতে পারেন তিনি। মা সব জীবের। মায়ের চালচিত্র থেকে আশেপাশে তাই কেবল দেব দেবী নন, পশু পাখি, গাছপালা এবং অবশ্যই মানুষ। সমাহিত নেচার-প্রকৃতি। কলাবউ! রম্ভা কচ্চি হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্বদাড়িম্বী।/ অশোকমানকশ্চৈব ধান্যশ্চ নবপত্রিকা।। লতা–শস্য–ওষধি-বৃক্ষ—সবে মিলে নবপত্রিকা। সর্বত্র বিরাজমান ব্রহ্ম। ব্রহ্ম মিশে চরাচরের তৃণ গুল্ম থেকে প্রতি কণায় কণায়। এই চৈতন্যই মা। মায়ের পূজা মানে সেই মহাচৈতন্য রূপের পূজা।
মা তো আসেন শরতে। শরত তুলোর মাস। আকাশে ভাসছে তুলোমেঘ। নদীর পাড়ে, হাইওয়ের ধারে ধারে নয়ানজুলি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে প্রাজ্ঞ বৃদ্ধের মতো মাথা নাড়ছে তুলোকাশ। মনের আর দোষ কোথায়? মনও তুলোর মত হালকা। নইলে অমন কড়া হেড আপিসের বড়বাবু কাশের বনে ত্রিভঙ্গ মুরারি হয়ে ছবি তুলে টাইমলাইনে পোস্টান? অবিশ্যি একে ছোঁয়াচে রোগের তালিকায় ফেলা আছে কি না সে অবশ্য সমাজ চিকিৎসকরা বলতে পারেন। হতেও পারে। এ তো এক অদ্ভুত সময়! এ সময় লতা-শস্য-ওষধি-বৃক্ষ মানে উন্নয়নের ঠেলায় তাদের ছেদন উৎপাটন, পরিবেশ মানে দূষণের ঠেলায় দড়কচড়া হয়ে যাওয়া শ্বাসভূমি, ভয় বলতে ভাইরাস, আর ইচ্ছে বলতে ভাইরাল! অবিশ্যি ডাক বলতে ‘ভাই’ও বলা যেতে পারে। যে যাকে পারে ভাই বলে ডেকে দেন। প্রত্যুত্তরে মুখে দাঁত, দাঁতে হাসি আর মনে ‘ভাই বলে ডাকো যদি দেব গলা টিপে’। দাবানল, চোরাচালান, উচ্চারণ করতেও ঘৃণা হয় এমন সব নিত্য ঘটা অপরাধ নির্যাতন আর তা নিয়ে নীচ হতে অতি নীচ নীতিহীনতার খেলাধুলো আর ওই যে বললাম সব ভুলে ভাইরাল হতে চাওয়া ব্যস্ত সমস্ত ঠুলিভূষিত এই যুগে বিশ্বজনীন মা দুগগারও বড় যন্ত্রণা!
মৃন্ময়ী মায়ের কাঠামো বাঁধা থেকে কুমোরটুলিতে শুরু হয়ে যায় ভিড়! আগে দাদুর অথবা জেঠার আঙুল ধরে খোকা খুকুর ভিড় হতো। দুগগা মা, তাঁর সন্তান সন্ততি, অসুরের রঙ নিয়ে হাজারো কৌতূহল। হাতে তুলি নয়তো মাটির দলা নিয়ে কাজ করতে করতেই শিল্পী কৌতূহল মেটাতেন। এখন খোকা খুকুর হাতে ক্যামেরা, কাঁধে লেন্স। কারও আবার মোবাইলই অস্ত্র। শীত গ্রীষ্ম বরষা, স্মার্টফোনেই ভরসা! ও সে মানে না মানা! বাঁশের তলা দিয়ে পিলপিলিয়ে গলে যাচ্ছে! মাখা মাটিতে গদাম গদ আছাড় খাচ্ছে! ফ্রেম ঠিক করার ঠেলায় বেঁকে চুরে শেষ অবধি মৃৎশিল্পীর সরঞ্জাম ধমাদ্ধম ফেলে দিচ্ছে! এমন কী শিল্পের চেতনায় স্থানকাল ভুলে গালস্থ পানাবশিষ্ট ইতিউতি পিকিয়ে রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও গাইছে! তিতিবিরক্ত শিল্পীর তেতো ঝাড়বকা শুনছে! কিচ্ছুতে পরোয়া নেই। খিচিক খিচিক ক্লিকাও, এডিটাও, অমুক’স ফোটোগ্রাফি, তমুক’স ক্রিয়েশান ট্যাগাও আর পোস্টাও! লাইকস লাইকস লাইকস! হা চৈতন্য!
কেবল ব্যক্তিগত ভাইরাল প্রবণতা নয়, ব্যষ্টিগত ভাইরাল প্রবণতাও চোখে পড়ে যায়। এখন তো মিডিয়ার ছড়াছড়ি। তার উপরে গুচ্ছ গুচ্ছ সোশ্যাল মিডিয়া। মহালয়ার বহু বহু আগেই ইদানিং বারোয়ারি পুজোর থিম সঙ মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ায়। পুজোও চার দিন থেকে বেড়েটেড়ে এখন তো অনেক দিনের কান্ডি! ঝা চকচকে ব্যাপার। মধ্যিখান থেকে শিউলি-পদ্ম- সন্ধিপুজো-ধুনোর গন্ধ-শাড়ির কটাক্ষ-নবমীর ভোগ-বিজয়ার গজার সরস মায়ালু আমেজটাই যেন কোথাও হারিয়ে যায়। কেবল পূজোর কথাই বা বলি কেন, পূজোর গান পুজোর সাহিত্য সবই বদল হতে হতে পুজো নামটিই কেবল টিকিয়ে রেখেছে, আসল তানটুকু যেন কোথায় মৃয়মাণ! শরৎ আসার বহু আগেই বিভিন্ন শারদ সংখ্যা বেরিয়ে যায়! কম্পিটিশান বলে কথা বস! এগোতেই হবে। এগোতে হয়, নইলে পিছিয়ে যেতে হয়। কেবল সংখ্যা বেরোনো বলে তো আর কথা নয়, কলেবর না বাড়িয়ে কন্টেন্ট বাড়ানোর ঠেলায় সাহিত্য কোথায় যেন মুখ ভার করে পিছনের সারিতে গিয়ে বসেন। তাছাড়া ভাবনা তো নদীর স্রোত, শব্দ সংখ্যার বেষ্টনীতে কত আর বলো ভাবনাকে বাঁধা যায়!
মায়ের সাবেকি রূপও সেই কবে থেকে বদলের কোপে! চালাই চলে গেছে মায়ের, তো চালচিত্রের দর্শন! সে অবশ্য যেতেই পারে। জগতে তো কোনও প্রবাহ থেমে থাকবার নয়। রুচি, সংস্কৃতিকেও বাঁধ দেওয়ার জো নেই। দিলেও ভাঙবে। এক সংস্কৃতি অন্য থেকে সমৃদ্ধ হবে নতুবা পরিবর্তিত হবে— এ তো বওয়ার স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু শ্রদ্ধা, ভক্তি ভালোবাসার মূল্যবোধ তো বদলাবার নয়। মা ছেলেকে ভালোবাসবেন, সন্তান বাবা মা কাকা জেঠা পাড়া প্রতিবেশী বড়দের শ্রদ্ধা করবে— এই বোধ বদল হওয়ার তো কথা নয়। তবু হয়েছে, হচ্ছেও— বেশ দ্রুতগতিতেই। কার দোষ, কার গুণ— কাকা জেঠার অধঃপতন, না কি সন্তানের মনোজগতে শ্রদ্ধার বীজ প্রথিত না হওয়া— সে তর্কের অধিকার কেবল জ্ঞানীগুণী সমাজবিদদের। আমরা ছানাপোষা ছোট মানুষ কেবল বদলটিই তো দেখব, তাই না? ঠিক এই ভাবনাতেই বোধ হয় বদলের বিষ লুকিয়ে। দায় চাপালেই যেন মুক্তি! যার যতটুকু পরিসর আর যতটুকু দায় তা তাকেই করতে হয়। ছেলেবেলার পড়াগুলো কেবল পড়া হয়েই থেকে গেছে আমাদের। শিক্ষা হয়ে আর ভিতরে পোঁতা হয়নি!
তবে কি না, কেবল নেই নেই করলে না-এর মেঘ ঘিরে ধরে প্রবল নিম্নচাপ ঘটাতে পারে। সেও বড় সাংঘাতিক অবস্থা। বরং সবকিছুর মাঝে মধুমাছির মত কেবল ফুল খোঁজাই ভালো। এই তো সেদিন দমদম মেট্রোর বাইরে দেখলাম এক বৃদ্ধা ভবঘুরে দুই হাতে আদর করে দিচ্ছেন আরেক সুবেশা যুবতীকে! কৌতুহল বড় বেয়াড়া! দাঁড়িয়ে পড়লুম। দেখলুম সেই যুবতী তার কাঁধের ঝোলা থেকে এক এক করে শাড়ি বের করে তুলে দিচ্ছেন পরপর বসে থাকা বৃদ্ধা মায়েদের হাতে। জিজ্ঞেস করছেন, ‘কি? পূজোয় পরবে তো?’ এ দৃশ্য তো কম বড় নয় হে! এরকম বহু কিছুই নীরবে ঘটে যায় এই পুরোনো শহরটার অলিতে গলিতে! তবে তেমন দেখি না কেন? কাগজে বলে না কেন? ওরে বাবা! কগজ তো চাহিদা মেপে কালি দেয়। নেই-এর খদ্দের যে বেশি, কাজেই কাগজে নেই নেই বেশি ছাপা হবেই। কুয়োর ব্যাঙের মত ভাবনা আর চিন্তন নিয়ে দেখাটাকেও বোধ হয় খানিক বেঁধে ফেলেছি আমরা, তাই তেমন করে চোখে পড়ে না! কিন্তু হয় নিশ্চই। নইলে যে চক্রের আর সাম্য থাকবে না! এখনও যখন চাকা ঘুরছে, কাজেই হয়। ভালো কাজ মন্দের তুলনায় বেশিই হয়।
তাও যতটুকু ঘুম পায়ে জড়িয়ে থাকে সেই অসুর নিধনে তো মা আসেন প্রতি বছর। মহালয়ার ভোরে মঠে মন্দিরে মিশনে মিশনে চন্ডীপাঠের ধ্বনিতে ঘোষিত হয় তাঁর আগমন সংবাদ। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সাবেকিয়ানায় সূচনা হয় দেবীপক্ষের। যেমন এ বছরেও হোল। বিশ্বজননী, চিন্ময়ী, সর্বজীবের মায়ের চরণ বন্দনা করে কেবল অতি দুর্লভ চৈতন্য ছাড়া প্রার্থনার আর কিছুই নেই। যত চৈতন্য হয় ততই মঙ্গল।

Spread the love

Check Also

দেখে নিন, বাংলার মহিয়সী মহিলার বিরল কৃতিত্ব ডক্টর সঙ্ঘমিত্রা বন্দোপাধ্যায়

চ্যানেল হিন্দুস্থান নিউজ ডেস্ক: বাঙালির এক মহিলা বিরল কৃতিত্বের অধিকারী, যিনি কিন্তু প্রচারের আড়ালে থাকাই …

২১ মিনিটে ১৩ টা মন্ত্রপাঠ,রেকর্ড ছোট্ট আরুহি’র।

চ্যানেলে হিন্দুস্থান নিউজ ডেস্ক: বয়স মাত্র ৫। এককথায় খেলার বয়স। কিন্তু এই বয়সেই একটা আস্ত …

রাজ্যে এবার পুরুষদের স্ব- নির্ভর গোষ্ঠী

চ্যানেলে হিন্দুস্থান নিউজ ডেস্ক: আজ আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস। আর সেই পুরুষ দিবসে ই বাংলার পুরুষদের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *