কিশোর ঘোষ
সেদিন ফেসবুকে দেখি কমলেশদার কবিতা, কিন্তু কমলেশ পাল নাম উল্লেখ নেই। আমাদের তরুণ কবিবন্ধু অভিনন্দন মুখোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থ ‘এ জীবন ক্রিকেট লিখিত’ নিয়ে পিয়াল রায় এক পোস্ট দিয়েছিলেন। সেখানেই ছিল কমলেশদার অন্যতম পরিচিত কবিতা পংক্তির উল্লেখ—ঘাতক বাইরে থাকে, গুপ্তচর রক্তের ভিতর। কিন্তু কবির নাম বলা হয়নি! কেন? পিয়ালের যুক্তি তাঁর ওই লেখায় লেখাটাই প্রধান, লেখক নয়। আমার মনে হয় উল্টোটা। যদি কবিতা পংক্তি হয় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকারের মতো কবিদের, তবে কবির নাম উল্লেখ না করলেও চলে। কিন্তু কবিটি যদি হন কমলেশ পালের মতো কেউ, এমন কেউ যাঁর গায়ে প্রচারের আলো পড়েনি, যাকে চেনে না বৃহত্তর বাংলা কবিতার পাঠক, সারা জীবন সাধনায় অবিচল থেকেও বঙ্গ সাহিত্য বাজার যাঁকে ঠাঁই দেয়নি, তবে তাঁর নাম সবার আগে উল্লেখ করা উচিত। সেই কবির নাম মনে করে বলা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু কী আশ্চর্য জানেন, এই কমলেশ পালের বাড়িতেই দু’তিন জেলা পেরিয়ে পাঠক আসে দেখা করতে। কবিকে একবার চাক্ষুস করনে বলে!

কমলেশ পালের এমন আরও আশ্চর্য-জীবন অভিজ্ঞতার সাক্ষী আমি। সে কথাই বলব। তার আগে একটা প্রশ্ন, ইতিকথা পাবলিকশনের তরুণ প্রকাশক শূদ্রক উপধ্যায় কি কবি-চরিত্রকেই মান্যতা দিলেন গ্রন্থ প্রকাশনায়? এই যে এবার কলকাতা বইমেলায় কমলেশ পালের কবিতা সংগ্রহটি প্রকাশিত হল, তা হল এত নিরবে…! জানি না, কবি কমলেশ পালের ক’জন পাঠক জানতে পারলেন মূল্যবান গ্রন্থটির কথা। তবে সোশ্যাল মিডিয়া পরাক্রমশালী। যেখানে প্রকাশক ও কমলেশের শুভানুধ্যায়ী পাঠক বার কয়েক পোস্ট দিয়েছেন।
উলেখ্য, কমলেশ পালের কোনও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই। এই কবি বাণিজ্যিক কাগজের দিকে নিজে যেমন এগোননি, তেমনি তাঁর দিকেও এগোয়নি কোনও প্রতিষ্ঠান। এর পেছনে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানটি জরুরি। কিন্তু সে প্রসঙ্গে এ লেখায় তোলবার নয়। আসল কথা হল, স্তুতিবাজ ভক্ত অনুরাগী তাঁর ছিল না ও নেই। যেহেতু কমলেশের পার্থিব ক্ষমতা শূন্য। কবিতার বাজারে কারও দাম বাড়ানো বা কমানোর ক্ষমতা রাখেন না তিনি। কিন্তু যা বলছিলাম শুরুতে, এতদসত্ত্বেও হঠাৎ একদিন টিভি সিরিয়ালের এক চরিত্র দেখি পাঠ করছে—তোমার নাবিক এসে মোহনায় জাল পেতে রাখে।/ আমি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি তাকে:/ এ জল আমার/ আমার দুঃখের জলে আমারই পূর্ণ অধিকার।…’ (জলসীমা)।
নয়ের দশেকের শেষের দিক, একবার মধুদার (মধুমঙ্গল বিশ্বাস) আড্ডা (দৌড়ের আড্ডা) ভাঙতেই সবাই মেতে উঠল কমলেশদার কবিতায়। উপস্থিত কবিরা কোরাসে শুরু করল—
লোকে পাখি পোষে।
আমি পুষি ভালোবাসা বুকের খাঁচায়।
উনত্রিশ বছর ধরে সে কেবলই ডেকে যাচ্ছে
সর্বক্ষণ নিরর্থ ভাষায়।
আমি বলি: ভালোবাসা, যাকে ডাকছো
সে কি শুনতে পায়?
সোমা ঘোষ! ঠিকানা বদল করে
তুমি আজ সোমা বসু রায়।
তবু ছিন্ন ফোটোখানা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে
গোপন তোরঙ্গে আজও রাখি।
ভালোবাসা পুষি আমি, লোকে পোষে পাখি।
সেবার নিউ ব্যারাকপুরে না মধ্যমগ্রাম… ভুলে গেছি। মনে আছে আমি সাইকেলে, একা সন্ধের রাস্তায়। হঠাৎই কানে এল তরুণী বাচিক শিল্পীর পরিশীলিত কণ্ঠ—নমস্কার। কবি কমলেশের পালের জন্মদাগ—
কখনও হারিয়ে গেলে জন্মদাগ দেখে চিনে নিও।
খাড়ি নদী হাতিয়া সন্দীপ গেঁওখালি
তরাই চড়াই খাদ সবুজ বর্ণালী
ভুলে যদি অকস্মাৎ ঘরমুখো না-হই জননী—
বিজ্ঞাপনে নাম দিও
উচ্চতা পোশাক দিও, গাত্রবর্ণ দিও
লিখে দিও:
লালটে মায়ের চুমু অক্ষয় জড়ুল আঁকা আছে—
লোকটি বাংলা বলে, বাংলাভাষা জন্মদাগ তার।
সবচেয়ে বড় কথা আমার বাড়িতেই ছিল কমলেশ পালের কবিতার অন্যতম আবৃত্তি শিল্পী। খুড়তুতো বোন। একদিন দেখি এক স্বনামখ্যাত বাচিক শিল্পীর ক্যাসেট বাজিয়ে সে অনুশীলন করছে —
যে ঘাটে ডোবে না ঘটি, সে ডোবায় ডুবে আছে চাঁদ।
বড় সাধ
হাতের নাগালে পেলে চাঁদ
ছুঁড়ে দেব জামকালো রাত্রির কপালে!…. (মাধ্বীচন্দ্রিমা)
এক বার এমন হয়েছে— মধ্যমগ্রাম পেয়ারাবাগানের কমলেশদার বাড়িতে আড্ডা মারতে গিয়ে দেখি মাঝবয়সী দম্পতি। কমলেশ পালের সঙ্গে তাঁদের আজই সাক্ষাৎ। কিন্তু কবির কবিতা পড়েছেন ওঁরা। অনর্গল। সব বই আছে ওঁদের তাকে। আড্ডায় জানা গেল, একে ওকে জিজ্ঞাসা করে মাস ছয়েকের চেষ্টায় ঠিকানা আবিষ্কার করে তবে এসেছেন কবির কাছে। কেন? প্রিয় কবিকে একবার দেখবেন বলে। ওঁরা প্রবীন কবিকে অনুরোধ করছিলেন একে একে, আর প্রসন্ন কমলেশ পাল নিজেকে (কাব্যগ্রন্থ) খুলে পাঠ করছিলেন—
রাস্তায় সন্ত্রাস ঘোরে
আমি থাকি ঘরের ভিতরে।
চার-জোড়া কঠিন চোখ ঠিকরে পড়ে
মুখের উপরে।
… সে লোক কোথায় গেল, জেল-ভাঙা দস্যু পলাতক?
আপনার ভিতরে ঢুকে বেমালুম উবে গেল—
এটা খুবই সন্দেহজনক!… (সন্ত্রাস)
এইসঙ্গে জানাই যে ক্ষমতাহীন, কবিখ্যাতিহীন হওয়া সত্ত্বেও কমলেশ পালকে নিজের পয়সায় বই করতে হয়নি। ছোট হোক বড় হোক প্রকাশক জুটে গেছে। আরও জানানোর যে সেই প্রকাশকেরা অধিকাংশই কবির ভক্ত পাঠক। কেউ কেউ ওই একটি গ্রন্থেরই প্রকাশক। ব্যাস।
কিন্তু আজ একথা কেন তুললাম? কারণ কবিতা বাজারের আজকের স্লোগান—যখন সকলেই ঢাক পেটাচ্ছে, তখন তোমাকেও…। কিংবা গ্রুপ জয়েন করো। শহরের টিম, গ্রামের দল, শহরতলির ছাতার সদস্য হও। কিছু একটা করো। কবিতা লেখা ছাড়া বাকি সবকিছু!

কমলেশদা অসুস্থ। আমার বন্ধুর বয়স চুরাশি! বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন। সুগার ছিল। শরীরের কলকবজাগুলো আলগা হতে শুরু করেছে। কিডনির সমস্যা দেখা দিয়েছে বছর দুয়েক। এখন বাড়াবাড়ি। কদিন হল হাসপাতাল-বাড়ি চলছে। ডায়েলিসিস। অপ্রিয় সত্যিটা হল, যে কোনও দিন এগ্রহের মায়া ত্যাগ করতে পারেন আমার থেকে চুয়াল্লিশ বছরের বড় বন্ধুটি। আমাদের বছর কুরির সখ্য প্রস্তুত হয়েই আছে। বড় আক্ষেপটাও যে কেটেছে। কবি তো বটেই, আমিও ভাবতাম, কমলেশদার এই যে এত বিচিত্র সৃষ্টি, স্বতন্ত্র কাব্যজগৎ। তাঁর একটা ঠাঁই হবে না শেষতক! এই জন্য ভাবা, যেহেতু যত লিখেছেন তত বই হয়নি। লেখালিখির শুরু থেকে এযাবৎ অবধি অপ্রকাশিত লেখার সংখ্যাই যে বেশি। …একটা কবিতা সংগ্রহ যদি হত!
সেই আক্ষেপ মিটিয়েছে শূদ্রক। শূদ্রককে ভালোবাসা। এইসঙ্গে তরুণ প্রকাশককে বলব, ভবিষ্যতে এ বইতে কবির প্রকাশিত গ্রন্থনামগুলি উল্লেখিত হোক। রচনাকালপঞ্জীকে গুরুত্ব দেওয়া হোক, থাকুক বিস্তারিত কবি পরিচিতি। সেই সঙ্গে সৌম্য কবির একটা ছবি। এবং ‘কমলেশ পালের কবিতা’ এই মর্মে একটি ভূমিকা নিবন্ধ। এগুলি দু’মলাটে আসার পরেই বইটি সুসংহত হবে বলে আমার বিশ্বাস। সেটুকু হয়ে গেলে আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে কমলেশ পালের ‘কবিতা সংগ্রহ’টিকে কালের গর্ভে নিক্ষেপ করা যাবে।
কবিতা সংগ্রহ, কমলেশ পাল, ইতিকথা পাবলিকশন, ৫০০ টাকা
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news
এ লেখা না পড়লে আফসোস থেকে যেত