হিন্দোল ভট্টাচার্য
কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপের ঘটকালির কারণ প্রমা থেকে প্রকাশিত তাঁর কবিতাসমগ্রের প্রথম খণ্ড। যেখানে পড়েছিলাম যৌবন বাউল, নিষিদ্ধ কোজাগরী, রক্তাক্ত ঝরোখার মতো আশ্চর্য সব কাব্যগ্রন্থের আবিষ্ট করে দেওয়া সব কবিতা। যেন মনে হতো, এমন সব কাব্যিক অভিজ্ঞতার মধ্যে কবি আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন, যা আমার মধ্যে থাকা অসংখ্য অব্যক্ত অনুভূতিমালাকে ওলোটপালোট করে দিচ্ছে। মেঠো সুরের সঙ্গে মিশে যায় যাঁর কবিতায় আধুনিক জীবনের সংকট, আধুনিকতার সংকট, তাঁকে ঠিক কোন সময়ের কবি বলা যাবে, তা ঠিক কখনওই বুঝে উঠতে পারিনি। আর তাঁর কবিতার মধ্যে এক অদ্ভুত রহস্যময় সাপুড়ে বাঁশি বাজায়। তাঁর ছন্দের ব্যবহার কত সহজেই না বিষাক্ত ছোবলের মতো ঢুকে যায় রক্তের ভিতর। দার্শনিক বিপন্নতাকে এভাবে ছন্দের মধ্যে ব্যক্ত করতে খুব কম কবিকেই দেখেছি। যেহেতু নতজানু হয়ে বসেছিলাম তাঁর এই সব কাব্যগ্রন্থের কাছে, তাই এই সব কাব্যগ্রন্থগুলির সঙ্গে আমার এক প্রেমের সম্পর্কই আছে বলা যেতে পারে। তাঁর কাব্যব্যক্তিত্ব আসলে ভিড়ের মধ্যে নির্জনতার কথা বলে চলা এক বাউলের মতোই উদাসীন অথচ আসক্ত। এই ব্যাপারটি ঠিক বোঝাতে পারব না হয়ত। উদাসীনতার সঙ্গে আসক্তির যে কী সম্পর্ক! কিন্তু সম্পর্ক তো আছেই। সম্পর্ক থাকেই। একজন শিল্পী ততই বাহ্যিক উদাসীন হয়ে পড়েন, যত তিনি প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েন। তাঁর এই উদাসীনতা আসলে নিজের মধ্যে সম্পূর্ণ ঢুকে পড়ার সাধনার মতোই বিবিক্ত।
এই উদাসীনতার মধ্যেই যখন ঢুকে পড়ে মৃত্যুচেতনা, প্রেম ও সৌন্দর্যচেতনার মতো বিষয়, তখন কবি নিজে কবিতার সঙ্গে মিলে মিশে যান সন্দেহ নেই। আর শিল্পের সঙ্গে শিল্পীর এই লীন হয়ে যাওয়া বস্তুত শিল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। আমার এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, নিরভিসন্ধি বলতে আমি ঠিক কী বুঝি? সত্যিই কি আমি নিরভিসন্ধিতে বিশ্বাস রাখি? এর আগে একবার নিরভিসন্ধির কথা বলেছিলাম, যা জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন। নিরভিসন্ধির প্রকৃত দেখা পেতে গেলে আপনাকে অলোকরঞ্জনের কবিতার কাছে আসতেই হবে। আমাদের মধ্য দিয়েই আসলে প্রকৃতি তো আত্মপ্রকাশ করে। প্রকৃতির বলা নানা কথা আমাদের ধারক হিসেবে বেছে নেয়। আমাদের বাহক করে নিজের অরূপসন্ধানী মন নিয়ে রচনা করে এক আশ্চর্য অভিসার। এই অভিসার মানুষের চেতনাকে যে দৃশ্যমান জগতের অন্তরালে ঘটে চলা প্রাকৃতিক তথা মহাজাগতিক নিশ্চেতনার দিকে নিয়ে যায় আমাদের, যা তথাকথিত সময়রেখা বা সময়যাপনের মাধ্যমে ধরা যায় না, তা তো বলাই বাহুল্য। একটি মুহূর্তের মধ্যে যে অতীত ও আগামীর অনেক মুহূর্ত লুকিয়ে থাকে, তাকে চেনানোই সম্ভবত নিরভিসন্ধির কাজ।
এই প্রসঙ্গেই প্রেম ও মৃত্যুর কথা চলে আসে। বারবার ‘সম্ভবত’– এই শব্দটির কথা বলতে হচ্ছে বলে খারাপ লাগে। কিন্তু সম্ভাব্য কিছু ভাবনা নিয়ে তো আর নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যায় না। তবু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত-র এই কবিতাটি আমাকে অন্তত এমন এক সত্যের কাছে নিয়ে আসে, যেখানে প্রাকৃতিক নিরভিসন্ধিকেই এক আশ্চর্য মেধা ও হৃদয়ের যুগলবন্দিতে দেখতে পাই আমি। প্রেম এখানে এক নিশ্চেতনা। সম্ভবত বাংলা ভাষায় লেখা এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা এটি—
সমাধি এবং বাড়ি একাকার হয়ে গেল যেই
বাড়িতে অনবরত মোম জ্বালি আর সমাধিতে
খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়ি, কিন্তু কবরের প্রহরীরা
বলল এ পান্থসদনে যুগ্মশয়নের কোনো অনুমতি নেই
(নামঞ্জুর, ওষ্ঠে ভাসে প্রহত চুম্বন, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত)
কবর এক পান্থসদন, যেখানে যুগ্মশয়নের অনুমতি নেই। কিন্তু সমাধি এবং বাড়ি এখানে একাকার। একাকার হলেও, যিনি মোম জ্বালাচ্ছেন, শুয়ে পড়ছেন সেই সমাধিতেই যা কিনা বাড়ি, সেখানেও অনুমতি নেই তার প্রেমিকার সঙ্গে, তার সহযাত্রিনীর সঙ্গে যুগ্মশয়নের। মৃত্যুতেও তাঁরা এক নন। সমগ্র কবিতাটিতে মেটাফিজিকাল কবিতার কার্পে ডিম থিম। কিন্তু শেষ লাইনে এসে তা মেটাফিজিকাল কবিতার সমস্ত ব্যারিকেড্ ভেঙে ফেলে হয়ে উঠছে এক চিরন্তন দুঃখ ও সত্যযাপনের কবিতা। এক একটি কবিতা নিজেই এমন বিটোভেনের ফিফথ সিম্ফনির মতো হয়, যে তাকে নিয়ে আর নতুন করে কিছু বলার থাকে না। কোথাও একটা অভিমান কি আছে? আমাদের জীবন দুঃখময়– এই কথা বলে যে সত্য আমাদের নগ্ন নিশ্চল করে দিয়ে যায়, তার কাছে কি শেষপর্যন্ত জীবনযাপনের অনুমতি চাইতে হয়? মৃত্যু কি এতটাই শীতল এক সমাধি?
আমরা কেউই জানি না তাকে। অথচ তার সঙ্গে আমাদের নিত্য বসবাস চলতে থাকে। নিত্য দুঃখের আলো আমাদের দুচোখে আস্তে আস্তে সরিয়ে দেয় সমস্ত অন্ধকার পর্দা। এ জন্য হয়ত মৃত্যুকে করে তুলতে হয় প্রতিবেশী। তার সঙ্গে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে পড়তে হয় রাস্তার ধারে। হাসাহাসি করতে হয়। আবার এক চরম শূন্যতার মধ্যে জ্বালিয়ে রাখতে হয় মোমের প্রদীপ। কারণ তা নিভে যায়, ফুরিয়ে যায়। অন্ধকার হয়ে যায় সমস্ত কিছুই। কিন্তু শুধু মৃত্যুর কথা কেন? বিচ্ছেদের কথাই বা কেন? রবীন্দ্রনাথ তো তাঁর ছিন্নপত্রে বলেছিলেন, করুণরাগিনী ছাড়া বাস্তবে আর কিছু সেই সহজ মহৎ উদার ও গভীর হতে পারে না। কে বেশি অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে এখানে? সমাধি নাকি যে মোম জ্বালাচ্ছে সেই সমাধির ভিতরে?
কতদিন ধরে এই প্রশ্নের মুখোমুখি আমিও আছি পাঠক হিসেবে অলোকদা, কিন্তু যে রহস্যময়তার ছবি এঁকেছেন এই কবিতায়, তা যেন এক অনন্তের অসমীকরণ। কিছুতেই তার যাত্রা ফুরোয় না। শেষ নেই, শুরুও নেই। প্রশ্ন আছে, উত্তর নেই। বা, প্রশ্নই হয়ত উত্তর!
গ্রন্থ: ওষ্ঠে ভাসে প্রহত চুম্বন/ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত/এবং মুশায়েরা
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news