সৌগত রায় বর্মন
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল, অপু ও দুর্গা ছিল, কু–ঝিকঝিক রেলগাড়ি ছিল, শিউলিফুলের সাজি ছিল, ফুল চোর ছিল, ‘বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ’ ছিল, খড় ছিল, মাটি ছিল, হ্যাফপ্যান্ট পরা ভূবনডাঙার কিশোর ছিল এবং ছিল নীলকণ্ঠ পাখির ঝাঁক। সবই ছিল হয়তো এখনও আছে। নেই শুধু নীলকণ্ঠ শিবের পাখি। পুরাণে বর্ণিত এই পাখিকে বলা হয় শিবের পোষ্য। দশমীর দেবীভাসানের পর কেউ যদি নীলকণ্ঠ পাখিকে তার মনের কথা বলে, পাখি কৈলাসে স্বয়ং শিবের কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দেয়। এই পাখি কিন্তু মোটেই পুরাণ ভিত্তিক অলীক পাখি নয়। ভালো করে খুঁজলে আজও হয়তো দেখা যেতে পারে। শিবের পাখি বলা হয় কারণ দুজনেই নীলকণ্ঠ। ইংরেজিতে একে বলা হয় ইন্ডিয়ান রোলার। বৈজ্ঞানিক নাম করেসিয়াস বেঙ্গালেনসিস। হিন্দিতে পালাপিট্টা আর বাংলায় নীলকণ্ঠ। মূলত হিমালয়ের তরাই অঞ্চলে এই পাখিরা এখনও দুর্লভ হয়ে যায়নি।
আমার সাংবাদিক জীবনের প্রথম কৈশোরে জলপাইগুড়ি থেকে এক বন্ধুর চিঠি পেলাম। অনুরোধ করেছে তাদের গ্রামের পুজো দেখে যেতে। জলপাইগুড়ি সদরের অদূরেই তার গ্রাম। সে লিখেছিল পুজোর চারটে দিন নাকি তাদের গ্রামে নীলকন্ঠ পাখি নামে। একা নয়, এক ঝাঁক। রোজ পড়ন্ত বিকেলে। দশমীর পর থেকে তাদের আর দেখা যায় না! হয়ত মানুষের ইচ্ছের খবর নিয়েই তারা উড়ে যায় কৈলাশে। গ্রামের মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে কবে তাদের ইচ্ছে পূরণ হবে। কারোর হয়, কারোর হয় না। আবার অপেক্ষা সামনের পুজোয় কবে নীলকন্ঠের ঝাঁক আসবে। ইচ্ছে ডানায় লিখে দেবে তাদের বাসনার স্তব, স্তোত্র।
বন্ধুর অনুরোধ ফেলতে পারলাম না। আমার লৌকিক মনে বারবার উঁকি দিতে লাগল অলৌকিক কিছু প্রত্যক্ষ করার বাসনা। সারা বছর কিন্তু ‘শৈব বন্ধুরা’ আসে না। আসে কেবল পুজোর চারদিন। বিজ্ঞান হয়তো কোনও ব্যাখ্যা দেবে কিন্তু এই প্রতিবেদকের রোম্যান্টিক মন সেই মুহূর্তে ব্যাখ্যার চাইতেও নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে কার্যত বিভোর হয়ে গেল।
৩০ বছর আগের এক সপ্তমীর হালকা শীতের সকালে পিঠে ব্যাগ, এস এল আর ক্যামেরা আর দূরপাল্লার লেন্স নিয়ে পৌঁছে গেলাম নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। নির্দিষ্ট জায়গায় বন্ধু আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। বহুদিন বাদে কলেজের বন্ধুকে পেয়ে আমাদের নানাবিধ জিজ্ঞাসা ও উত্তরের মধ্যে দিয়ে স্টেশন চত্তরেই কেটে গেল ১ ঘন্টা।
বন্ধুর গ্রামে পৌঁছাতে লেগে গেল প্রায় ঘন্টা দুয়েক। প্রথমেই তার বাড়ি। তুলাইপাঞ্জি চালের ভাত, ঘি আর শুক্তো দিয়ে শুরু হল খাওয়াদাওয়া। সঙ্গে বাটি সাজিয়ে নানাবিধ তরকারি। কিন্তু মন বড় চঞ্চল— কখন পুজোর মন্ডপে যাব। দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রাম ধাতে নেই, সেই বয়সে থাকার কথাও নয়। খেয়ে দেয়ে ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে মণ্ডপে। আজকালকার পুজোর সঙ্গে আকাশপাতাল তফাত। নিতান্তই নিরাভরণ মণ্ডপে আটচালা সাবেকি দুর্গা। যেখানে যা থাকার সব কিছু সেখানেই আছে। কিন্তু দুর্গার মাথার উপর ঠিক শিবস্থানে ঝুলছে একসারি পাখি। তেমন তো আগে কখনও দেখিনি, আমার বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে বন্ধু বলল, ওগুলোই নীলকন্ঠ পাখি। তবে আসল নয়, পুতুল। আসল হোক বা নকল, সেই প্রথম নীলকণ্ঠ পাখি দেখলাম আমি। মাথায় এবং গলায় নীল পালক যেন নীলিমা রচনা করে রেখেছে। তাই তো হওয়া উচিৎ। নীল নীলিমায় যার অনিকেত যাতায়াত তার রং তো নীলাভই হবে। আমি পটাপট ছবি তুলতে লাগলাম। তখন ডিজিটালের যুগ নয়, ফিল্ম গুনে গুনে ছবি তুলতে হত। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম দেবী দুর্গার মুখের রং নীলাভ। শুধু তাই নয়, লক্ষ্মী বাদে সব প্রতিমাতেই নীলের ছোঁয়া! আমার প্রশ্নের জবাবে বন্ধু বলল, এই অঞ্চলটায় একসময়ে বৌদ্ধ ধর্ম বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। চৌথুপীর সংঘারামে এখনও তেমন খননকার্য হয়নি। বিশেষ করে বজ্রযান ধর্ম মত। বৌদ্ধরাও পৌত্তলিক, বিশেষ করে মহাযান ও বজ্রযানরা। তাঁদের আরাধ্যা দেবী তারা ও নীল সরস্বতী। আমাদের গ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্গা পুজোয় বৌদ্ধ ছাপ রয়ে গেছে। এখানে একটা গুপ্ত যুগের লুপ্ত বৌদ্ধ বিহারও ছিল। এখন মাটির ঢিপি। আমি বললাম, তাহলে শিব কোথা থেকে এল। উত্তরে জানা গেল, বৌদ্ধদের মূর্তিপুজোর ট্র্যাডিশন ধরে পরবর্তী হিন্দু যুগে সনাতন শিব, দুর্গা, কার্তিক, গণেশ এসেছে। লক্ষ্মী ও সরস্বতী এসেছে তারও অনেক পরে। মহালক্ষ্মীর ধারণা দুর্গার অনেক শতাব্দী আগের। দুর্গা সম্ভবত কর্ণাটক থেকে বাংলায় পা রেখেছে। বৌদ্ধরা, বিশেষ করে মহাযান ও বজ্রযানরা তন্ত্রের মাধ্যমে শিব ও শক্তির পুজো করত। হর-গৌরীর যুগল রমনমুদ্রা অর্থাৎ অর্ধ্বশায়িত শিবের ধ্বজায় উপস্থাপিতা দেবী চণ্ডী বা কালীকাই শক্তির উৎস। শিব উত্থিত না হলে সৃষ্টি অনাসৃষ্টি হয়ে যাবে। ধরণি কর্ষিত হবে না, ফসল ফলবে না। মানুষের এই আর্তিই নীলকণ্ঠ পাখি শিবের কাছে পৌঁছে দেয়। এই পর্যন্ত বলে বন্ধু হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। বলল, সময় হয়ে গেছে। সূর্য আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পশ্চিমাকাশে বিশ্রামে যাবে। লগ্ন উপস্থিত। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শিবের পাখির পাল পূজাঙ্গনে নামবে।
আমরা প্রাঙ্গনে এসে দাঁড়ালাম। বন্ধু সাবধান করে দিল, প্রথমেই ক্যামেরা বের করিস না। ঘাবড়ে গিয়ে হয়ত নামবেই না। চুলোয় যাক ক্যামেরা, ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। নীলকণ্ঠ পাখির দর্শন আমাকে করতেই হবে। প্রতিটি মুহূর্ত মনে হচ্ছে সময়কে যেন পিছিয়ে দিচ্ছে। লৌকিক, অলৌকিক বা আধিলৌকিক, যাই হোক না কেন এ দৃশ্য মানসপটে ধরে রাখতে হবে। ধীরে ধীরে সেদিকেই অনেক মানুষ আসতে লাগল। কিন্তু কি সুশৃঙ্খল। কোথাও কোনও শব্দ নেই। প্রকান্ড এক নৈঃশব্দ যেন নেমে এসেছে পুজো প্রাঙ্গনের মাঝে। মাঝখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে দূর দুরান্তের মানুষ নিঃশব্দে বসে আছে ধ্যানস্থ হয়ে। ধীরে ধীরে প্রায়ান্ধকার আলোর মধ্যে সবাই আকাশের দিকে তাকাল। আসছে, ওরা আসছে। প্রবল স্তব্ধতার মধ্যে যেন নিম্নগামী এক দঙ্গল পাখির ডানার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। অবশেষে তারা এল। ঘাড় কখনও উঁচু করে, কখনও বেঁকিয়ে যেন পর্যবেক্ষণ করল সমবেত প্রতীক্ষমান ভক্তদের। তাঁদের কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর তারা আলতো করে উড়ে গেল দেবীমণ্ডপে। আমরা বাইরে অপেক্ষারত। ভিতরে যাওয়ার সাহসই নেই কারোর। ভিতরে কী ঘটছে তা জানার কোনও উৎসাহই কারোর নেই। জানার দরকারই বা কী? দেবতার পাখি দেবতাদের সঙ্গে কী আলাপচারিতা করছে তা জানার অধিকার কি মানুষের থাকে! ঠিক সান্ধ্যলগ্নে বেরিয়ে এল তারা। তারপর ধিরে ধিরে উড়ে গেল আকাশে। নীলপাখির দল নীল দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত কানফাটা স্তব্ধতা। সেদিন প্রথম অনুভব করেছিলাম নৈঃশব্দ্যের শব্দ কত প্রখর। লোকচক্ষুর অন্তরালে ওরা উড়ে যাওয়ার পরেই প্রবল কাসর, ঘন্টা আর ঢাকঢোলের আওয়াজে শুরু হল আরতি। জানি না কোন অজ্ঞাত কারণে আমার চোখ চলে গেল মাটির পাখিগুলোর দিকে। একটা যেন দ্বন্দ্বমূলক অস্বস্তি মাথার ভিতর কাজ করতে শুরু করল। কেন? কেন?
পরের দুদিনও একইভাবে পাখির দল এলো। সংখ্যায় বেশি। একটু যেন ছটফটে। ছোট্ট পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কেন ওরা এত ছটফট করছে? তখনও পর্যন্ত জানা ছিল না।
দশমীতে কোনও পাখি নামেনি। গ্রামের লোকের তাতে কোনও হেলদোল নেই। তিনদিন তারা তাঁদের পার্থিব অপার্থিব সব ইচ্ছেই পাখিদের জানিয়ে দিয়েছে।
শোভাযাত্রা সহযোগে দশমীর বিসর্জন শেষ হল। কেমন জানি একটা শূন্যতা গ্রাস করল। পরের বছর নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজ মিলবে তো?
বন্ধুসহ শূন্য মণ্ডপে ফিরে এলাম। একটাই প্রদীপ জ্বলছে। শূন্যতার মাঝে এক টুকরো আশা যেন। এই শূন্যতা অনুভব করার মধ্যে একটা আনন্দও আছে। আছে বিহ্বলতা। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকার পর অজান্তেই তাকালাম ঝুলন্ত মাটির পাখিগুলোর দিকে। একি! একটা পাখিও তো নেই! তাহলে কি দেবী ভাসানের পর পাখিদেরও বিসর্জন হয়ে গেল। কিন্তু বিসর্জনের সময়ে আমি তো ছিলাম। কেউ তো পাখিগুলোকে জলে ভাসায়নি! হঠাৎ মনে পড়ে গেল দ্বিতীয় দিনের কথা। অস্বস্তির কথা। প্রথমদিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিন পাখি মন্ডপে নামার পরেই মনে হয়েছিল নীলকণ্ঠের সংখ্যা যেন কম। ভেবেছিলাম মনের ভুল। নিষিদ্ধ অলৌকিকের দিকে টান তো মানুষের থাকেই। কিন্তু এ আমি কী দেখছি?
একটাও পাখি নেই! বিহ্বল দৃষ্টিতে বন্ধুর দিকে তাকালাম। বন্ধু যেন তৈরিই ছিল। রহস্যময় হাসি হেসে বলল, উড়ে গেছে, মুক্ত বিহঙ্গে কৈলাসে পাড়ি দিয়েছে!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news