সীমিতা মুখোপাধ্যায়
১
ঘুঙুর নেশার ঘোরে পাগলের মতো কী যেন খুঁজে চলেছে।
বাড়িটা কালীঘাট এলাকায়। ঘুঙুরের মামার বাড়ি। দাদুর মৃত্যুর পর ওঁর উইল অনুসারে বর্তমানে যদিও এই বাড়ির মালিক ঘুঙুর নিজেই। খুবই পুরনো দিনের বাড়ি, হানাবাড়ি বলে এলাকায় বেশ নাম-ডাক আছে। রাত হলেই নাকি বাড়ির মধ্যে থেকে অদ্ভুত সব আওয়াজ আসে। বন্ধ বাড়িতে অশরীরী আত্মারা এসে প্রায়শ দাপাদাপি করে। ঘুঙুরের মুখে শুনেছি, ওর দাদু ছিলেন একদম বইয়ের পোকা। ভারী আজব মানুষ ছিলেন। পারতপক্ষে কারো সঙ্গে মিশতেন না। হঠাৎ হঠাৎ বাড়ির কাউকে না জানিয়ে কোথায় যেন চলে যেতেন। আবার ফিরেও আসতেন। নাতনিটি যে দাদুর বিশেষ প্রিয় ছিল, সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দাদুর স্থাবর-অস্থাবর যা ছিল সবই ওই নাতনি, মানে আমাদের ঘুঙুরকেই দিয়ে গেছেন।
বাড়ির দোতলায় দাদু নিজে যে ঘরটায় থাকতেন, সেই ঘরটাতেই এখন আমাদের আসর বসে। মদ, গাঁজা, চরস, কোকেন সবই চলে আমাদের। অভ্রদীপ কোত্থেকে একখানা সাউন্ড সিস্টেম জুটিয়ে এনেছে। সেখানে বাজতে থাকে একের পর এক হেভি মেটাল। চোখের সামনে তখন যেন অরোরা বোরিয়েলিস দেখতে পাই। কত রকম রঙের খেলা। শরীরটা কেমন হালকা হয়ে যায়। মনে হতে থাকে, জীবনটা যেন অনন্ত সুখের- কোনও দিন কারো কাছে অপমানিত হইনি, কখনও কোনও আঘাত পাইনি, কোনও দিন কোথাও প্রত্যাখ্যাত হইনি … মাথাটা ধুয়ে-মুছে একদম পরিষ্কার হয়ে যায়। মনটা ফুরফুর করতে থাকে। মনে হতে থাকে, আমি আর ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, বর্ণ নই। আমি এই পৃথিবীর রাজা।
সেদিনও সকাল থেকে আমাদের মোচ্ছব চলছে। সাউন্ড সিস্টেমটাকে এবার একটু নিস্তার দেওয়া হয়েছে। পাবক বেসুরে বন জোভির “ইটস মাই লাইফ” গাইছে এবং সেই সঙ্গে একটা অদৃশ্য গিটার বাজাচ্ছে, মানে গিটারটা আসলে নেই, কিন্তু, পাবক ভাবছে সেটা আছে। অভ্রদীপ খুব মন দিয়ে ওর গান শুনছে। ঘুঙুর কিছু একটা খুঁজে চলেছে। ওর দাদুর ঘরে বেশ কয়েকটা বইয়ের আলমারি। তাতে ঠাসা বই। অনেকক্ষণ ধরে আমি দেখছিলাম, ঘুঙুর একবার এ আলমারি ঘাঁটছে তো একবার ও আলমারি। উঠে গিয়ে ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম- “ওই, কী খুঁজেছিস?”
– “কী খুঁজছি? তা তো জানি না … তবে খুব দরকারি একটা জিনিস … এখানেই কোথাও আছে …।”
– “আচ্ছা, অনেক খুঁজেছিস। এখন গিয়ে বস। আমি খুঁজে দিচ্ছি।”
ঘুঙুর চুপচাপ গিয়ে বসে পড়ল। আমি খুঁজতে থাকলাম। পাবক এখন কী গান গাইছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অভ্রদীপ সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ বাদে ঘুঙুর বলল- “অ্যাই, পেলি?” পাব আর কী করে! কী খুঁজতে হবে তা-ই তো জানি না। বললাম- “একটু মনে করে বল না, কী খুঁজছিলিস, তাহলে সেটা খুঁজে পেতে একটু সুবিধা হয়।”
– “ছাড়, তোর দ্বারা হবে না।”
ঘুঙুরের দাদুর ঘরে আলমারি ছাড়াও আছে কাঠের একটা বিশাল বড় পালঙ্ক। ঘুঙুর দেখলাম হামাগুড়ি দিয়ে সেই পালঙ্কের নিচে ঢুকে গেল। সেখানে একটা সিন্দুক রাখা ছিল। ও দেখি ওই সিন্দুকটাকে ঠেলে ঠেলে বের করছে। আমিও হাত লাগালাম। সিন্দুকে একটা জং-ধরা তালা ঝুলছে। আমি আর ঘুঙুর মিলে তালাটা ধরে কিছুক্ষণ টানাটানি করলাম। তারপর ঘুঙুর বলল- “অভ্রদীপটাকে টেনে তোল তো। ও তালাটা ভাঙতে পারবে।” আমি অভ্রদীপকে এক ঠেলা মারলাম, ও খানিক হতচকিত হয়ে চোখ খুলল। বললাম- “তালাটা ভেঙে ফেল।” ও খানিকক্ষণ— “কেন?”, “কী তালা?”, “কীসের তালা?”, “কেন ভাঙব?” -এইসব করল। তারপর ওর জিম করা হাতের এক হ্যাঁচকা টানে তালাটা উপড়ে ফেলল। সিন্দুকের মধ্যে কিছু কাগজপত্র আর হাবিজাবি জিনিস। হাতির দাঁতের কাজ করা আরেকটা কাঠের বাক্স পাওয়া গেল। সিন্দুকে যে সব জিনিস ছিল তার মধ্যে এই বাক্সটাই একটু যা চমকপ্রদ। কাঠের বাক্সটা খুলে দেখা গেল, ভেতরটা লাল ভেলভেট দিয়ে মোড়া। তার মধ্যে রাখা আছে কালচে হয়ে যাওয়া একটা রূপোর বাক্স আর একটা চিরকুট। রূপোর বাক্সের ওপরে কীসব রাক্ষস-খোক্কস খোদাই করা জটিল এক কারুকার্য! আমার তো দেখে মনে হল, একটা খোক্কস, রাক্ষস-আঁকা চৌকো মতো টুলে বসে বিশাল বড় দূরবীন দিয়ে কী যেন দেখছে! এতক্ষণে পাবকের গান থেমে গেছে। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। বাক্সটা দেখে বলল- “এটা তো দারুণ রে! নিলামে দিলে কত টাকা উঠবে বল তো?” অভ্রদীপ বলল- “ধুর, এই কদাকার বাক্স কে কিনবে?” ঘুঙুর বলল- “এই কারুকাজ আমার খুব চেনা … আগে কোথাও দেখেছি।” আমি রূপোর বাক্সটা নিয়ে একটু নাড়ালাম। মনে হল ভেতরে কোনো ধাতব বস্তু রয়েছে। বললাম- “ভেতরে কিছু রয়েছে মনে হচ্ছে। কিন্তু, এটা খোলে কী করে?” ঘুঙুর চিরকুটটা খুলল। সাধারণত যা হয়, তাই। ওই কাগজের টুকরোয় হাতে আঁকা কয়েকটা সাংকেতিক চিহ্ন। প্রথমে একটা বাঁকা চাঁদ, তারপর সূর্য- তবে সূর্যটা শুধু নিচের দিকেই আলো দিচ্ছে, মানে সোলার-বিমগুলো শুধুমাত্র নিচের দিকেই আঁকা হয়েছে, তৃতীয় স্থানে এক জোড়া চটি, তারপর আবার ওই একই রকম দেখতে আরেকটা সূর্য, সবশেষে একটা ঘড়ি- তাতে বারোটা বেজে রয়েছে। আমি মাথা চুলকে বললাম- “প্রথমে চাঁদ … এক-এ চন্দ্র … মানে প্রথম সংখ্যাটা নিশ্চই ১।” ঘুঙুর বলল- “হয়তো না … চ আজ বাড়ি যাই। পরে এসব নিয়ে ভাবা যাবে আর কথাটা তোরা কেউ পাঁচ কান করিস না।”
ঘুঙুর দেখলাম, ওর আই-ফোন দিয়ে ওই রূপোর বাক্সের আর খোলা চিরকুটের একটা ছবি তুলল। তারপর যেখানকার জিনিস সব সেখানে রেখে দিয়ে আমরা চারজনে বেরিয়ে পড়লাম।
২
কিছুদিনের মধ্যেই আমরা আবার মিলিত হলাম ঘুঙুরের দাদুর বাড়িতে। প্রত্যেকে অসম্ভব নেশা করেছি। দাদুর সিন্দুক, রূপোর বাক্স সব আমাদের মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। হঠাৎ পাবকই মনে করাল- “হ্যাঁ রে ঘুঙুর, ওই ধাঁধাটার কিছু সুরাহা করতে পারলি?” অভ্রদীপ বলল- “কী হবে ওই ভুতুড়ে বাক্স খুলে?” পাবক বলল- “হতেও তো পারে ওর মধ্যে গুপ্তধন আছে?” আমি হা হা করে হেসে উঠলাম, বললাম- “ওইটুকু বাক্সে গুপ্তধন!” ঘুঙুর আমার হাতে জয়েন্টটা ধরিয়ে দিয়ে বলল- “রূপোর বাক্সে যে কারুকার্যটা করা আছে সেটা কী জানিস? পাকাল রাজার সার্কোফ্যাগাস। তখনই বলছিলাম না, চেনা চেনা লাগছে। ” পাবক বলল- “সার্কোফ্যাগাস মানে তো মমির ঢাকনা। আমি ঠিক বুঝেছিলাম, ওটা যে সে জিনিস নয়।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম- “পাকাল রাজাটা আবার কে?” ঘুঙুর বলল- “মায়া সভ্যতার একজন রাজা।” আমি বললাম- “মায়া সভ্যতার রাজার সার্কোফ্যাগাস তুই চিনলি কী করে?” ঘুঙুর বলল- “এটা বহু চর্চিত।” বলে ও ওর আই-ফোনটা এগিয়ে দিল, তারপর বলতে থাকল- “এটা দাদুর রূপোর বাক্স আর এই হল পাকাল রাজার সার্কোফ্যাগাস- ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করেছি। দুটো ছবি হুবহু মিলে যাচ্ছে, না?” হ্যাঁ, সত্যিই তো! ঘুঙুর গেল সিন্দুকটা টেনে বের করতে, অভ্রদীপ সাহায্য করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে পড়ল সেই রূপোর বাক্স। ঘুঙুর বলল- “বাক্সটা একটু ভালো করে দেখ। মনে হচ্ছে না, একটা লম্বা মাথাওয়ালা এলিয়েন স্পেসক্রাফটে করে কোথাও চলেছে?” আমি বললাম- “হ্যাঁ, তাই তো! কিন্তু, প্রাচীন রাজার সার্কোফ্যাগাসে এলিয়েন এল কোথা থেকে?” পাবক বলল- “তবে কি ওই রাজার সঙ্গে এলিয়েনদের যোগাযোগ ছিল? ঘুঙুর, তুই আগে “এক-এ চন্দ্র”-র চিরকুটটা দেখ।” ঘুঙুর কাগজের টুকরোটা মেলে ধরে ওই সূর্য দুটো দেখাল, জিজ্ঞাসা করল- “এগুলো কী বলত? … এর নাম অ্যাটেন। মিশরের দেবতা। তুতেনখামেনের নাম শুনেছিস তো তোরা? তুতেনখামেনের বাবা, ফ্যারাও অ্যাখেন্যাটেন, তার শাসনকালে মিশরে বহু-দেবদেবীর পুজো তুলে দিয়ে একেশ্বরবাদের প্রচলন করেছিলেন। অ্যাটেন ছিল অ্যাখেন্যাটেনের একমাত্র আরাধ্য দেবতা।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম- “অ্যাটেন মানে তবে কি সূর্য?” ঘুঙুর বলল- “অন্য কিছুও হতে পারে। সূর্য কি শুধু নিচের দিকে আলো দেয়? তোদের দেখে মনে হচ্ছে না, একটা ফ্লাইং সসারের থেকে নিচের দিকে আলো ফেলা হলে যেমন দেখাতে পারে, অ্যাটেন অনেকটা সেই রকম দেখতে?” পাবক বলল- “তারমানে তুতেনখামেনের বাবার সঙ্গেও এলিয়েনদের কানেকশন ছিল?” ঘুঙুর বলল- “সেটা কথা নয়। তাহলে কী দাঁড়াল? এক-এ চন্দ্র নয়, এক-এ অ্যাটেন। অ্যাটেন এক এবং অদ্বিতীয়।” আমি বললাম- “অর্থাৎ, দ্বিতীয় ও চতুর্থ স্থানে ‘১’। তাহলে প্রথম স্থানে কী হবে? এক-এ অ্যাটেন হলে তো আর এক-এ চন্দ্র হতে পারে না।” ঘুঙুর বলল- “অন্যভাবে ভাব। এটা তো চাঁদ নয়। চাঁদের কলা। চাঁদের কতগুলো কলা? ১৬ টা। প্রথম স্থানে ১৬ হবে।” পাবক বলল- “তৃতীয় স্থানে তবে কি ১১? মানে, চটিকে তো আমরা ১১ নম্বর বাস বলে থাকি।” ঘুঙুর খুশি হয়ে বলল- “ঠিক তাই। এবার লাস্টেরটা বল।” পাবক মাথা চুলকে বলল- “ঘড়ি… তাতে আবার বারোটা বেজে রয়েছে। সুতরাং ১২-ই হবে।” ঘুঙুর মাথা নেড়ে বলল- “কারেক্ট।” আমি বললাম- “তাহলে সিরিজটা কী দাঁড়াল? ১৬,১,১১,১,১২? এটাই পাসওয়ার্ড? কিন্তু এই নাম্বারগুলো দেব কোথায়? বাক্সে তো কোনও নাম্বার লক নেই। বাক্সটা এমনিই বন্ধ। অথচ খোলা যাচ্ছে না!” ঘুঙুর বলল- “১৬,১,১১,১,১২ -এটা পাসওয়ার্ড নয়। আরেকটু ভাব তোরা …” আমরা সবাই চুপ। কিছুক্ষণ বাদে ঘুঙুর আবার বলতে শুরু করল- “ইংরিজির ১৬ নম্বর অ্যালফাবেটটা কী? সেটা হল- পি।” আমি বললাম- “ওহ এইভাবে? তাহলে ১ মানে- এ।” অভ্রদীপ গাঁট গুনে গুনে বলল- “১১ মানে -কে।” পাবক বলল- “১২ মানে হচ্ছে গিয়ে – এল। তারমানে পাসওয়ার্ডটা হল- পি,এ,কে,এ,এল! পাকাল!” বলা মাত্রই একটা ফট করে শব্দ। বাক্সটা আপনা-আপনি খুলে গেল। দেখা গেল, ভেতরে একটা লোহার চাবি। আমি বললাম- “এ আবার কী কেস? এ যেন সেই “খুল যা সিম সিম”-এর মতো।” ঘুঙুর বলল- “আমারও তাই মনে হচ্ছে। এখানে এমনই সিস্টেম করে রাখা আছে, যাতে পাসওয়ার্ডটা মুখে বললেই বাক্স খুলে যায়।” পাবক বলল- “এ কী রূপকথা নাকি, ভাই?” ঘুঙুর বলল- “এতে এত আশ্চর্য হবার কী আছে? আমরা কথা বলে মোবাইলকে ইন্সট্রাকশন দিই না? গলার স্বরের মাধ্যমে কিছু একটা লক বা আনলক করা আজকাল তো হামেশাই হয়ে থাকে। আমার তো মনে হচ্ছে, এখানেও এরকম কোনও টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে, আর সেটা এতই সূক্ষ্ম যে আমাদের বোধগম্যের বাইরে।” অভ্রদীপ বলল- “তা-ই হবে বুঝলি, আমি সেদিন অত চেষ্টা করলাম, তাও খুলল না। আজ এমনিই খুলে গেল!” পাবক বলল- “কিন্তু, এই চাবিটা কীসের?” দাদুর ঘরে পালঙ্কের পাশে বিশাল একটা সেগুন কাঠের আলমারি রাখা। তার সমানে একটি টুলে দাদুর গ্রামোফোনটা এমনভাবে বসানো, যাতে কেউ ওই আলমারির ধারে-কাছেও ঘেঁষতে না পারে। ঘুঙুর ওই আলমারির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল- “মনে হচ্ছে এটা এই আলমারিরই চাবি। প্রথমত, এই আলমারির চাবিটা মিসিং ছিল। দ্বিতীয়ত, আলমারির দুই পাল্লায় খোদাই করা গোলাকার চিহ্ন দুটো দেখ। ওটা মায়া সভ্যতার চিহ্ন।” পাবক বলে উঠল- “পাকাল রাজার চরণে সেবা লাগে … চল অভ্রদীপ, গ্রামোফোনটা দু’জনে মিলে সরিয়ে ফেলি। আলমারিটা খুলতে হবে।” ঘুঙুরও ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। অবশেষে ওই চাবিটা দিয়ে আলমারিটা খোলা হল। খুলে দেখা গেল, আলমারিটা একদম ফাঁকা। পাবক মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল, বলল- “যাব্বাবা! আলমারিতে কিস্যু নেই! কীসের জন্য এত লেবার দিলাম, ভাই?” অদ্ভুত ব্যাপার আলমারিতে কোনও তাকও নেই। হ্যাঙ্গার ঝোলাবার জায়গাও নেই। এমন একটা আলমারি বানাবার মানেটাই বা কী! আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুঙুর কীসব যেন ভাবল। তারপর সোজা আলমারির মধ্যে ঢুকে গেল। আমরা তাকিয়ে দেখি ঘুঙরু হাওয়া, আলমারিতে ঢুকে মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল! পাবক বলল- “কী ভয়ানক! চল আমরা পালিয়ে যাই এখান থেকে।” আমি বললাম- “খবরদার কোথাও যাবি না। ও কোথায় গেল জানা দরকার … আমি আসছি।” বলে আমিও আলমারির মধ্যে প্রবেশ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে সব অন্ধকার। আগেকার দিনে টিভিতে “অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন” ঘটলে যেমন একটা ঝিরঝিরে-মার্কা স্ক্রিন চলে আসত, মনে হচ্ছে সেরকম একটা সুরঙ্গের মধ্যে দিয়ে চলেছি। পরক্ষণেই দেখি, এক অপূর্ব সুন্দর জায়গায় এসে উপস্থিত হয়েছি। চারিদিকে গোলাপি রঙের ঘাসফুল ফুটে আছে, শুধুই ফুল, ঘাস দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, কেউ যেন ফুলের কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে। তার মধ্যে হলদে, সাদা, লাল, নীল বিভিন্ন রঙের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাগজের টুকরোর মতো ঝাঁক ঝাঁক কোনও পতঙ্গ উড়ে বেড়াচ্ছে। জানি না, এগুলো প্রজাপতি কিনা। এত ছোট প্রজাপতি আগে কখনও দেখিনি। উফ সে যে কী দৃশ্য! গোলাপি রঙের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে চেরিফুলের মতো এক ধরণের গাছ। গাছে পাতা নেই। গাছ ভর্তি শুধু বেগুনি রঙের ফুল। চতুর্দিকে ম’ ম’ করছে ফুলের সুবাস। কী নির্মল বাতাস! ফুলের কার্পেট ভেদ করে চলে গেছে বাঁধানো রাস্তা। খানিকটা দূরে ঘুঙুরকে দেখতে পাচ্ছি। জায়গাটা পাহাড়ি। চারপাশে গোলাপি, নীল আর মভ কালারের পাহাড়। আকাশের রঙ ঠিক নীল নয়, বেগুনিই বলা চলে। পেছন থেকে হঠাৎ পাবকের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম- “এই মরেছে! এ আবার কোথায় এসে পড়লাম! এই অভ্রদীপটা আমায় ঘাড় ধরে আলমারিতে পুরে দিল। বলল, এক যাত্রায় পৃথক ফল হবে কেন!” দেখতে দেখতে অভ্রদীপও এসে পড়ল। যেন হঠাৎই আকাশ থেকে অবতীর্ণ হল। এসে মুগ্ধ হয়ে চারিদিক দেখতে লাগল। বলল- “এই, আমরা কি মরে গেছি? এটা নিশ্চই স্বর্গ।”
সামনে একটা টিলা। রাস্তাটা টিলার সামনে এসে ধাপে ধাপে উঠে গেছে টিলার ওপরে। আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম। টিলার মাথায় পৌঁছে দেখি, একটা বাঁধানো চাতাল। সেখানে কয়েকটা বেঞ্চ পাতা আছে। এখান থেকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। আমরা যে পাহাড়ের মাথায় আছি, সেই পাহাড়টা সমুদ্র থেকে সটান উঠে এসেছে। আসে-পাশের সব পাহাড়ই তাই। সমুদ্রের জল গাঢ় নীল। প্রত্যেকটি পাহাড়ে বেগুনি চেরিফুলের বন আর পাহাড়ের গায়ে গোলাপি ঘাসফুলের কার্পেট বিছানো। এখানে কোথাও একটু সবুজ নেই। সব জায়গায় বেগুনি রংটার অসম্ভব বাড়-বাড়ন্ত। একটাই মুশকিল এখানে, বড্ড ঠাণ্ডা। আমাদের কারোর সঙ্গে কোনও গরম জামা নেই। কী করেই বা থাকবে? মে মাসে কলকাতায় কেউ কি আর সোয়েটার পরে ঘোরে? আমরা চারজনে ওই বেঞ্চটায় গিয়ে বসেছি। সবারই বেশ শীত করছে। বসে বসে আমরা গল্প-গুজব করছি। এমন সময় অভ্রদীপ বলল- “ওই দেখ, আকাশে দুটো সূর্য অস্ত যাচ্ছে!” এতক্ষণ সূর্যের তেজ বেশি ছিল বলে বিষয়টা বোঝা যায়নি। অস্ত যাবার সময় আমরা লক্ষ্য করলাম, এখানে আকাশে একটা নয় দুটো সূর্য! পাবক বলল- “সেই জন্যই কি দাদুর চিরকুটে দুটো সূর্য আঁকা ছিল?”
আকাশের দিক থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। হলুদ, কমলা, লাল কত রকমের যে রঙের খেলা চলেছে! আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি ভগবান জানে। ঘুম ভাঙল অভ্রদীপের আর্তনাদে- “আমি কোথায় এখন?” চেয়ে দেখি, চারদিকে ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। ঘুঙুরের গলা পাওয়া গেল- “চিন্তার কিছু নেই। তোরা আমার দাদুর বাড়িতে।” ঘুঙুর উঠে গিয়ে খুট করে সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে দিল। পাবক হাই তুলতে তুলতে বলল- “দারুণ নেশা হয়েছিল আজ। কী সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলাম!” অভ্রদীপ বলল- “আরে আমিও!” তারপর দুজনের মধ্যে যা কথাবার্তা হল তাতে বুঝলাম, আমিও ঠিক সেই একই স্বপ্ন দেখেছি। আমি বললাম- “ঘুঙুর, তুইও কি এই স্বপ্নটাই দেখেছিস?” ঘুঙুর বলল- “স্বপ্ন নয়, ওই দেখ, আলমারিটা হাট করে খোলা। গ্রামোফোনটা সরানো।” আমি বললাম- “এ তো সেই “অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড”-এর মতো! আমরা তাহলে গিয়েছিলাম কোথায়?” ঘুঙুর বলল- “দাঁড়া, আগে ওই আলমারিতে চাবি দিয়ে আসি।” আলমারি বন্ধ করে ঘুঙুর ফিরে এল এবং বলতে শুরু করল- “আমার মনে হয়, আমরা পৃথিবী থেকে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে কোনও এক ভিনগ্রহে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম, যার বায়ুমণ্ডল আমাদের পৃথিবীর মতো, বাতাসে অক্সিজেন আছে, যে গ্রহে জল আছে, প্রাণ আছে, এমনকী বুদ্ধিমান প্রাণীরাও আছে। বুদ্ধিমান প্রাণীদের উপস্থিতির প্রমাণ হল, ওই রাস্তা, টিলায় ওঠার সিঁড়ি, বেঞ্চগুলো …” পাবক বলল- “এই গ্রহ এতদিন ধরে হাবল টেলিস্কোপের চোখে পড়েনি কেন?” ঘুঙুর উত্তর দিল- “আমরা যেখানে গিয়েছিলাম তা হয়তো হাবল টেলিস্কোপের রেঞ্জের বাইরে বা এই গ্রহের ব্যাপারে নাসা হয়তো সবই জানে, কিন্তু, আম-জনতাকে জানাতে চায় না অথবা এরকমও হতে পারে- ওই গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীরা নিজেদের গ্রহকে হাবল টেলিস্কোপের নজর থেকে কোনও বিশেষ টেকনোলজির দ্বারা লুকিয়ে রেখেছে।” অভ্রদীপ বলল- “কিন্তু, এতটা দূরত্ব আমরা নিমেষের মধ্যে পাড়ি দিলাম কী করে?” ঘুঙুর বলল- “দাদুর আলমারিতে নিশ্চই একটা “ওয়ার্মহোল” আছে।” আমরা তিনজনে সমস্বরে বলে উঠলাম- “ওয়ার্মহোল!” ঘুঙুর উঠে গেল। কিছুক্ষণ বাদে, অনেক খোঁজাখুঁজি করে, একটা আয়তকার কাগজ আর একটা পেনসিল নিয়ে আবার ফিরে এল। কাগজের দুই প্রান্তে মাঝখানের দিক করে দুটো ছোট গোল্লা আঁকল। তারপর বলল- “আমাদের মহাবিশ্বটাকে থ্রি-ডায়মেনশনাল না ভেবে এই কাগজটার মতো টু-ডায়মেনশনাল বলে কল্পনা কর আর ধরে নে এই কাগজটা অসীম মহাবিশ্বের একটা অংশ মাত্র। এই যে দুটো সার্কেল আঁকলাম, ভাব এর একটা আমাদের পৃথিবী আর একটা সেই সুন্দর গ্রহটা, যেখানে আমরা গিয়েছিলাম।” কাগজটা এবার ও মাঝ বরাবর এমনভাবে ভাঁজ করল, যাতে একটা গোল আরেকটা গোলের খুব কাছে এসে পড়ে। তারপর একটা পোড়া দেশলাইয়ের অংশ দিয়ে কাগজ ফুটো করে দুটো গোল্লাকে জুড়ে দিল। বলল- “এই দেশলাইয়ের টুকরোটা হল “ওয়ার্মহোল”, যার মাধ্যমে মহাবিশ্বের এক প্রান্ত থেকে খুব সহজে অন্য প্রান্তে চলে যাওয়া যায়। এটা একটা দু-মুখ খোলা টানেলের মতো জিনিস।” শুনে অভ্রদীপ বলল- “যত গাঁজাখুরি গল্প! এরকম আবার হয় নাকি?” ঘুঙুর বলল- “এগুলো আমার কথা নয় সোনা, স্বয়ং আইনস্টাইন বলে গেছেন। এই ওয়ার্মহোলকে আইনস্টাইন-রজেন ব্রিজও বলা হয়।” আমি বললাম- “আচ্ছা, আকাশে দুটো সূর্য কেন দেখলাম, বল তো?” ঘুঙুর বলল- “মহাকাশে এই রকম যমজ নক্ষত্র অনেক আছে। এসব ক্ষেত্রে মানিকজোড় নক্ষত্রকে ঘিরে সৌরজগতের সৃষ্টি হয়। আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে যেমন একটাই সূর্য, ওদের সৌরজগতের কেন্দ্রে তেমনি দুটো সূর্য।” পাবক বলল- “সবই বুঝলাম। কিন্তু, আমরা আবার এখানে ফিরে এলাম কী করে?” ঘুঙুর বলল- “এই, আজ উঠি রে। পরদিন সবাই সোয়েটার, জ্যাকেট সব নিয়ে আসিস। ফেরার রাস্তাটা জানতে যেতে হবে না?”
আমরা তবে আবার যাব! আমি, অভ্রদীপ আর পাবক আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম।

৩
দু-দিন পরেই আবার ডাক এল। সোয়েটার বের করতে গিয়ে মায়ের কাছে ধরা পড়ে গেলাম। মা বলল- “এই গরমে সোয়েটার কী হবে? বেড়াতে যাচ্ছিস নাকি?”
– “না না, কোথায় আর যাব?”
– “ওমা সেকি! তাহলে নির্ঘাত জ্বর এসেছে?” বলে মা গায়ে-মাথায় হাত দিয়ে জ্বর দেখতে লাগল। তারপর নিজেই বলল- “নাহ, জ্বর তো নেই।”
– “না, মানে … যদি জ্বর আসে, তাই সোয়েটার বের করে রাখছি।” মা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে চিৎকার করতে লাগল- “নেশা করে করে মাথাটা একেবারে গেছে। আর ওই ধিঙ্গি মেয়ে ঘুঙুর, দিবা-রাত্রি তিনখানা ছেলে নিয়ে ঘুরছে, আমার ছেলেটাকে একেবারে নষ্ট করে ছাড়ল!” এই আমাদের দেশ। সব কিছুতে মেয়েদেরই দোষ হয়। আমি, পাবক, অভ্রদীপ -কেউ তো আর বাচ্চা ছেলে নই। যা করছি, নিজেদের ইচ্ছেতে করছি। দোষ হচ্ছে শুধু ঘুঙুরের।
এক মুহূর্ত আর বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। তাই একটু আগে-ভাগেই বেরিয়ে পড়লাম। দাদুর বাড়ি গিয়ে দেখি ঘুঙুরও এসে পড়েছে। বসে বসে জয়েন্ট বানাচ্ছে। ঘুঙুরকে একা পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম- “একটা সত্যি কথা বল তো, যেদিন ওই রূপোর বাক্স আর চিরকুটটা পাওয়া গেল, সেদিন তুই হঠাৎ করে আমাদের মধ্যে থেকে উঠে গিয়ে কী যেন খুঁজতে শুরু করেছিলিস। তুই কি আগে থেকে জানতিস এই ঘরে বিশেষ কোনও জিনিস লোকানো আছে?”
– “আসলে আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন দাদু প্রায়ই বলত, এই ঘরে নাকি রূপকথার রাজ্যে যাবার চাবি-কাঠি রাখা আছে। সেদিন হঠাৎ কথাটা মনে পড়ে গিয়েছিল।”
– “এরকম কথা তো বলতে গেলে সব দাদু-দিদারাই তাদের নাতি-নাতনীদের বলে থাকেন। তুই খামকা কথাটাকে এত সিরিয়াসলি নিয়ে ফেললি কেন?”
– “দাদুর এই আলমারিটা নিয়ে আমার অনেক কাল ধরে একটা কৌতুহল ছিল। আলমারিতে কী আছে কেউ জানে না, আলমারির চাবি কোথায় তাও কেউ জানে না, এমনকী এই আলমারিটাকে কেউ কখনও খোলা অবস্থাতেও দেখেনি! এই আলমারিতে দাদুর কী সম্পত্তি লোকানো আছে সেটা আমার জানার ইচ্ছে ছিল।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই অভ্রদীপ এসে পড়ল। তারপর এল পাবক, এসেই বলতে লাগল- “অত সুন্দর একটা জায়গা থাকতে আমরা এখানে কেন নেশা করব? সব নিয়ে চল ওই গ্রহে চলে যাই।” ঘুঙুর বলল- “খবরদার না। যা নেশা করার এখানে করে নে। ওখানে গিয়ে নেশা করা যাবে না। বলা যায় না কী থেকে কী হয়।” অগত্যা আমরা দাদুর ঘরেই নেশা করতে বসে গেলাম। লক্ষ্য করলাম, ঘুঙুরের নেশায় মন নেই। একটা জয়েন্ট নিয়ে বসে আছে তো আছেই। পাবকের বেশ ভালোই নেশা হয়েছে। ও বলতে লাগল- “শোন, আমরা ভিন গ্রহে ট্যুর করাতে নিয়ে যাব। লাখ লাখ টাকা কামাব। নেশার জন্য আর চিন্তা করতে হবে না।” শুনে ঘুঙুর খুব রেগে গেল- “পাবক, তুই কি ইয়ার্কি পেয়েছিস? কোথায় যাই আমরা জানি না, জানি না সেখানে গেলে কোনও বিপদ হতে পারে কিনা, এমনকী ফেরার পথটাও জানি না, তুই ট্যুর করানোর স্বপ্ন দেখছিস? তোর নেশার কোন জিনিসটার অভাব হচ্ছে, আমাকে বল।” ঘুঙুর কোটিপতি ঘরের মেয়ে। আমাদের নেশার খরচ ঘুঙুরই বেশির ভাগটা বহন করে। বাকি টাকা অভ্রদীপ দেয়। আমি তো তস্য গরিব। পাবক পয়সাওয়ালা ঘরের ছেলে হলে কী হবে, ও বরাবরই একটু ধান্দাবাজ।
যাইহোক, এবার তো আলমারিতে ঢোকার পালা। যাবার সময় ঘুঙুর বলল- “কেউ মোবাইল নিয়ে যেতে পারবে না। মোবাইল এখানে রেখে যা আর পাবক, তুই সবার আগে যাবি।” বুঝলাম, ঘুঙুর পাবককে আর খুব একটা বিশ্বাস করতে পারছে না। একে একে আমরা চারজনে ওই গ্রহে গিয়ে উপস্থিত হলাম। কিন্তু, একি! ওখানে পৌঁছে দেখি তখন সূর্যাস্ত হচ্ছে। আমি ঘুঙুরকে বললাম- “কেসটা কী হল? আজ এই সময় সূর্যাস্ত হচ্ছে কেন?” ঘুঙুর বলল- “এই গ্রহটা কি তোদের পৃথিবীর হিসেব মতো চলবে রে? হয়তো এখানে ৩৬ ঘন্টায় দিন।” অভ্রদীপ বলল- “আর ১৮ মাসে বছর।” পাবককে দেখা গেল গাঁট গুনে কী সব যেন হিসেব করছে। আমরা টিলার ওপরে উঠে সূর্যাস্ত দেখলাম। আসতে আসতে আঁধার নামল। আকাশে তিনটে চাঁদ উঠল। মাথার ওপর জেগে উঠল অসংখ্য নক্ষত্র। আমরা টিলা থেকে নেমে এসে রাস্তায় বসে আছি। ফেরার পথ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। একটু দুর্ভাবনা হচ্ছে- আদৌ ফিরতে পারব তো! পরক্ষণেই নিজেকে বোঝাচ্ছি, না ফিরতে পারলেই বা কী? এ তো যেন সশরীরে স্বর্গবাস! এমন সময় অভ্রদীপ বলে উঠল- “অ্যাই, তোরা দেখ দেখ, টিলার ওপর ওটা কী হচ্ছে?” তাকিয়ে দেখি, টিলার মাথায় ষড়ভুজ আকৃতির একটা আলোকলেখা ফুটে উঠছে। দেখা মাত্রই ঘুঙুর বলল- “স্টারগেট!” তারপর “রান ফরেস্ট রান” বলে টিলার দিকে দৌড়তে লাগল। পেছন পেছন আমরাও ছুটলাম। হাঁপাতে হাঁপাতে টিলার মাথায় পৌঁছে দেখি, আগের দিন যে সিটটাতে বসে আমরা চারজন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, সেই সিটটাকে ঘিরেই স্টারগেট তৈরি হয়েছে। আমরা হাত ধরাধরি করে গিয়ে ওই বেঞ্চে বসলাম। সঙ্গে সঙ্গে সেই ঝিরঝিরে স্ক্রিনওয়ালা টানেল। অবশেষে দাদুর ঘরের মেঝেতে। পাবক বলল- “তার মানে বোঝা গেল, দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসার স্টারগেটটা খোলে। আগের দিন আমরা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ওখানেই স্টারগেট তৈরি হয়েছিল আর আমরা ঘুমন্ত অবস্থাতে স্টারগেট দিয়ে আবার এখানে ফিরে এসেছিলাম।” আমি বললাম- “সুতরাং, আমরা ওখানে যেতে যে কোনও সময়ই পারি। কিন্তু, ইচ্ছে মতো সময়ে ফেরত চলে আসতে পারব না।” অভ্রদীপ বলল- “এই স্টারগেটটা আবার কী বস্তু একটু বলবি কি কেউ?” পাবক বলল- “ধরে নে, ওয়ার্মহোল-টানেলের খোলা মুখ।” ঘুঙুর ঘাড় নেড়ে “হুঁ” বলল। পাবক আরও বলতে থাকল- “আচ্ছা, ফিরে আসার উপায়টা যখন জানা গেছে তখন তো আমাদের ট্যুরিস্ট নিয়ে যেতে কোনও অসুবিধা নেই, কী বলিস, ঘুঙুর?” ঘুঙুর যথারীতি আবার রেগে গেল। বলল- “তোর কী মনে হয়? আমার দাদুর ঘরে যে ওয়ার্মহোল রয়েছে দাদু সেটা জানত না? নিশ্চই জানত। জেনেও যখন এত গোপনীয়তা বজায় রেখেছিল, তার অবশ্যই কোনও কারণ থাকবে!” পাবক তখন “আরে ইয়ার্কি মারছিলাম”, “ইয়ার্কি মারছিলাম” বলে ম্যানেজ দিল। সেদিনকার মতো এখানেই ইতি।
৪
ওইদিন ফেরার পর থেকে সেই জায়গাটায় আবার যাওয়ার জন্য আমার, পাবকের আর অভ্রদীপের উৎসাহটা ঠিক যতখানি বেড়ে গিয়েছিল, ঘুঙুর ঠিক ততখানি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। সবচেয়ে বেশি উতলা হয়ে উঠেছিল পাবক। কিন্তু, ওই গ্রহে যাবার কথা উঠলেই ঘুঙুর কেন জানি না বিষয়টা সযত্নে এড়িয়ে যেত। অনেক পীড়াপীড়ির পর অবশেষে একদিন ঘুঙুরকে আবার আমাদের গ্রহান্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজি করানো গেল।
যাওয়ার দিন সকাল থেকে ঘুঙুরকে খুব উদাসীন এবং অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। জিজ্ঞাসা করে কোনও সদুত্তর পাওয়া গেল না। এবারে দেখলাম, ঘুঙুর সবার আগে আলমারিতে ঢুকে গেল। আমি পাবককে বললাম- “এবার তুই যা।” পাবক আমার ওপর বিস্তর চটে গেল, বলতে লাগল- “আমি যাবই না, যা। বুঝতে পারছি, তোরা কেউই আমায় বিশ্বাস করিস না। চোখে চোখে রাখতে চাস।” ঝামেলা এড়াতে অভ্রদীপ “আচ্ছা আচ্ছা আমি যাচ্ছি” -বলে আলমারিতে প্রবেশ করল। আমিও বিরক্তিতে অভ্রদীপের পিছন পিছন আলমারিতে ঢুকে পড়লাম। ওয়ার্মহোলের মধ্যে দিয়ে যথারীতি মুহূর্তের মধ্যে ভিন গ্রহে পৌঁছে গেলাম। কিছুক্ষণ পর পাবকও এল। কিন্তু, তখনও তার রাগ কমেনি। একা একা ঘুরে বেড়াতে লাগল। পাবক তখন টিলার ওপরে, আমরা নিচে, অভ্রদীপের দৃষ্টিশক্তি খুবই প্রখর, হঠাৎ ও বলল- “অ্যাই দেখ, পাবক মনে হয় জয়েন্ট বা সিগারেট কিছু একটা ধরাচ্ছে।” এই কথা শোনা মাত্র ঘুঙুর সম্বিত ফিরে পেল যেন, চিৎকার করে উঠল- “পাবক, না!” কিন্তু, ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। লাইটারের আগুন থেকে পাবকের গায়ে দাউদাউ করে আগুন ধরে গেল। যেন কেউ আগে থেকে ওর গায়ে কেরোসিন বা পেট্রোলজাতীয় কিছু একটা ঢেলে রেখেছিল। পাবক দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে টিলার ওপরে ছোটাছুটি করতে লাগল। ও যত দৌড়চ্ছে, আগুন তত বাড়ছে। আমি অস্ফুট স্বরে বললাম- “এটা কী করে হল?” অভ্রদীপ নিজের জ্যাকেট খুলতে খুলতে বলল- “এ ভাবে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। পাবককে তো বাঁচাতে হবে। তোরা সোয়েটার, জ্যাকেটগুলো সব খোল। এগুলো দিয়ে পাবককে জাপটে ধরতে হবে। ” ঘুঙুর ধমক দিয়ে বলল- “মাথা-টাথা কি একেবারে খারাপ হয়েছে তোর? কীভাবে ও জ্বলছে একবার দেখ ভালো করে। ওর ধারে-কাছে গেলে তোরাও মরবি।” বলে ঘুঙুর শক্ত করে আমার হাতটা ধরে রেখে দিল।
উদভ্রান্তের মতো ছোটাছুটি করতে করতে, পাহাড়ের যে দিকে সমুদ্র, মনে হল, যেন পাবক সেই দিকে পড়ে গেল। আমরা টিলার ওপরে উঠলাম। দেখি, ওপরের প্রত্যেকটা বেঞ্চে আগুন লেগেছে। যে সিটটাকে ঘিরে স্টারগেট তৈরি হত, সেটাও জ্বলছে। পাবককে দেখা গেল একটা আগুনের গোলার মতো গড়াতে গড়াতে পাহাড়ের গা বেয়ে নামছে। ও যেখান দিয়ে যেখান দিয়ে যাচ্ছে সব জায়গায় আগুন ধরে যাচ্ছে। সেই আগুন এক গাছ থেকে আরেক গাছে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ধোঁয়ার গন্ধে আর আগুনের তাপে টিলার ওপরে আর থাকা যাচ্ছে না। আমরা নিচে নেমে এসে সিঁড়িতে বসলাম। অভ্রদীপ বিড়বিড় করে বলতে লাগল- “এ তো দাবানল লেগে যাবে! সূর্যাস্ত হতে তো এখনও অনেক দেরি। অবশ্য, সূর্যাস্ত হয়েই বা কী হবে? স্টারগেট কোথায় আর তৈরি হবে? বেঞ্চটাও তো পুড়ে গেল!”
দাবানল আশেপাশের পাহাড়গুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে। ঘুঙুর শূন্য দৃষ্টিতে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে, হঠাৎ আপন মনে বলতে শুরু করল- “মনে হয়, এখানকার বায়ুমণ্ডলে কোনও দাহ্য গ্যাস আছে বা এমনও হতে পারে এই গ্রহের বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক বেশি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বেশির ভাগটা জুড়ে থাকে নাইট্রোজেন গ্যাস। নাইট্রোজেন নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো- না নিজে দাহ্য, না অক্সিজেনের মতো দহনে সহায়ক। নাইট্রোজেন আছে বলেই পৃথিবীতে মানুষ আগুনটাকে নিজের ইচ্ছে মতো ব্যবহার করতে পারে। এই গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীদের আগুন ছাড়া চলে কী করে? এখানে তো দেখছি, আগুনকে নিয়ন্ত্রণে আনা প্রায় অসম্ভব!” বাঁচব কি মরব তার ঠিক নেই, ঘুঙুরের এইসব ব্যাখ্যা শুনতে আমার একটুও ভালো লাগছিল না।
চতুর্দিকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। ঘুঙুর অভ্রদীপের কাঁধে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। বাঁচার আশা আমরা ছেড়েই দিয়েছি। এমন সময় সবার অলক্ষ্যে থেকে কে যেন আমাদের বাঁচার পথ খুলে দিল। আমি দেখতে পেলাম, সামনের রাস্তায় স্টারগেট তৈরি হয়েছে। ওদের ঠেলা মেরে বললান- “চল, ওই দেখ, স্টারগেট!” তিনজনে এক ছুটে সোজা স্টারগেটের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। তারপর সেই অদ্ভুত টানেল, পরক্ষণেই একটা অন্ধকার ঘর। ঘুঙুর উঠে লাইট জ্বেলে দিল। দেখলাম, আমরা আবার ওর দাদুর ঘরে ফেরত চলে এসেছি। বেঁচে ফিরতে পারব, ভাবতেই পারিনি। কিছুক্ষণ আমাদের কারোর মুখেই কোনও কথা নেই।
অভ্রদীপই প্রথম মুখ খুলল- “পাবকের তো যা হবার হল। এবার আমাদের কী হবে? পাবকের বাবা-মা আমাদের ছেড়ে কথা বলবে? পুলিস কেস তো হবেই। আমরা তিনজনেই ফাঁসব।” ঘুঙুর বলল- “পাবকের মোবাইলটা কোথায়? ওর মোবাইল, সিম সব নষ্ট করে ফেলতে হবে।” আমরা পাবকের মোবাইলটা তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু, পেলাম না। ঘুঙুর দেখলাম কাকে একটা ফোন করছে, কান থেকে মোবাইলটা নামিয়ে বলল- “যা ভেবেছি তাই, নট রিচেবল বলছে। পাবক শুধু নেশার জিনিস নয়, মোবাইলটাও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল ছবি তুলবে বলে। একা একা ঘুরছিল ছবি তোলার জন্যই।” আমি বললাম- “তবে কি ও সত্যিই স্পেস ট্যুরিজমের ব্যবসা করবে ভাবছিল?” ঘুঙুর বলল- “জানি না। তবে, ওর লাস্ট টাওয়ার লোকেশন এখানেই দেখাবে। তারপর থেকে ওকে আর ট্রেস করা যাবে না। কিন্তু, আমরা যেহেতু মোবাইল নিয়ে যাইনি, তাই আমাদের লোকেশন এটাই দেখাবে।” অভ্রদীপ বলল- “তার মানে আমরা ফাঁসছি।” ঘুঙুর বিরক্ত হয়ে বলল- “কেন ফাঁসব? আমাদের আদৌ কি কোনও দোষ আছে। ঘাবড়াস না। আমার বাবা কলকাতা শহরের এত বড় একজন ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্ট, বাবার কথায় এ শহরে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খায়। সব কেস ধামা চাপা পড়ে যাবে। কথা দিচ্ছি।” এসব কথা চলছে, ইতিমধ্যে দাদুর ঘরের পুরোনো দিনের হলুদ বাল্বটা দু-তিন বার দপদপ করে হঠাৎ নিভে গেল। ঘরময় অন্ধকার। লোডশেডিং নয়। খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, বাইরে ল্যাম্পপোস্টে আলো জ্বলছে। এমন সময় সারা ঘর ভরে উঠল পোড়া মাংসের গন্ধে। ঘরের মধ্যে চতুর্থ কোনও ব্যক্তির উপস্থিতি টের পাচ্ছি। একটা গোঙানির শব্দও শুনতে পাচ্ছি। অভ্রদীপ চাপা স্বরে বলল- “পাবক! ও বেঁচে আছে! ও ফিরে এসেছে! ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে!” ততক্ষণে গোঙানির আওয়াজটা অনেকটা কাছে এগিয়ে এসেছে। বুঝতে পারছি, মানুষের মতো কিছু একটা হামাগুড়ি দিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। খড়খড়ি দিয়ে আসা আলোতে দেখতে পেলাম, তার নাক, কান, চোখের পাতা সবই ঝরে গেছে, একটা হাত তুলে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে, সেই হাতের একটা আঙুলও নেই। চেনার কোনও উপায় নেই, তাও আমরা তিনজনেই অনুভব করলাম, এটা পাবক! ঘুঙুর ফিসফিস করে বলল- “ও বেঁচে নেই, ওই আগুনে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না।” আমি নিচু স্বরে বললাম- “তাহলে এটা কী?” ঘুঙুর ওই একই রকমভাবে চাপা গলায় বলতে লাগল- “পাবক বুঝতে পারছে না যে ও মারা গেছে।” অভ্রদীপ ফিসফিস করে বলল- “মারাই যদি গিয়ে থাকে তো ও এখানে এল কী করে?” ঘুঙুর গলা নামিয়ে বলল- “স্পেস ট্রাভেল যদি সম্ভব হয় তাহলে টাইম ট্রাভেল কেন সম্ভব নয়? ও ওয়ার্মহোল দিয়েই এসেছে। ওর জীবনের অন্তিম সময়টাতে ও আটকা পড়ে আছে। সেখান থেকেই চলে এসেছে।” বলেই ঘুঙুর পাবকের দিকে খানিকটা এগিয়ে গেল, পাবককে বলল- “তুই মারা গেছিস, পাবক। তুই চলে যা।” পাবক প্রতিবাদ স্বরূপ বোধহয় কিছু একটা বলার চেষ্টা করল। সেটা একটা হাড় হিম করা গোঙানির মতো শোনাল। ওর কি জিভটাও খসে গেছে? এরকম শব্দ একটা মানুষের গলা দিয়ে কী করে বেরতে পারে? ঘুঙুর আবার বলল- “পাবক, আমায় বিশ্বাস কর, তুই আর বেঁচে নেই। তোর আর কোনও কষ্ট নেই। তুই যা, শান্তিতে ঘুমো। তুই আর নেই রে, পাবক।” তারপরেও পাবক কিছুক্ষণ কুঁইকুঁই করল। ভয়ে আমার হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে। এমন সময় হঠাৎই দেখলাম, পোড়া মাংসের গন্ধটা গায়েব। ঘরে আর পাবকের উপস্থিতি টের পাচ্ছি না। আমাদের আরও অবাক করে দিয়ে দাদুর ঘরের বাল্বটা আবার জ্বলে উঠল। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল- “শর্টসার্কিট মনে হয়।” অভ্রদীপ বলল- “এখানে আর এক মুহূর্তও নয়।” ঘুঙুরও মাথা নেড়ে সায় দিল।
৫
স্বাভাবিকভাবেই রাত্রে ঘুম হল না। সারাদিন একের পর এক যা সব ঘটনা ঘটে গেল! যাও-বা একটু করে ঝিমুনি ভাব আসছে, ভয়ে-আতঙ্কে শিউড়ে শিউড়ে উঠছি। ভোরের দিকে জ্বর এল। যেই একটু চোখটা লেগেছে, ৬টা নাগাদ ঘুঙুরের ফোন। বলল- “তোদের বাড়ির কাছে পার্কটায় বসে আছি। একটু আসবি?” যাবার মতো শরীরের অবস্থা ছিল না। কিন্তু, মনে হল নিশ্চই খুব জরুরি দরকার। না হলে এত ভোরবেলা কেন এসে উপস্থিত হবে? কোনও রকমে বেরলাম। ঘুঙুরের সঙ্গে দেখা হতেই ও বলল- “অভ্রদীপ আর নেই।”
– “মানে! কী বলছিস! কী করে?”
– “প্রাথমিক ভাবে অনুমান করা হচ্ছে, ড্রাগ-ওভারডোজ।”
– “তোকে কে খবর দিল?”
– “অভ্রদীপের বাড়ি থেকে ফোন করে জানাল।”
– “রয়ে গেলাম তুই আর আমি। এবারে তাহলে কার পালা? আমার?”
– “আমার ওপর একটু ভরসা রাখ। কিচ্ছু হবে না তোর। দেখ, অভ্রদীপকে তো মরতেই হত। মাথামোটা ছেলে, কোথায় কী বলে বসে তার নেই ঠিক। ”
– “মানেটা কী? এসব কী বলছিস? আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে ।”
-“তোকে আরেকটাও খবর দেওয়ার ছিল।”
– “আবার কী?”
– “কাল মাঝরাতে আমার দাদুর ঘরে আগুন লেগেছিল। মনে হয় শর্টসার্কিট থেকে… সব পুড়ে ছাই।”
– “মানে ওই আলমারিটাও?”
– “কিচ্ছু নেই। সব ভস্মীভূত।”
মে মাসের গরমেও ভেতর থেকে কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছি। কে এই মেয়ে ঘুঙুর? এত কিছু ও কীভাবে জানে? ও যতটা জানে বলে মনে হয়, আসলে ও তার থেকে অনেক বেশি জানে। ও কি আদৌ আমার বন্ধু? এই মেয়েকে বোঝা আমার কর্ম নয়। ও সোজা মেয়ে নয় জানি। কিন্তু, কতটা কঠিন সে সম্পর্কে আমার কোনও ধারণাই নেই। ও বড্ড অন্যরকম, যেন এই জগতেরই নয়। আমার কি এখন এখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া উচিত? না, এই মেয়েটার হাতে সব কিছু ছেড়ে দেওয়া উচিত? বড় অসহায় লাগছে। সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে ঘুঙুরের চোখে-মুখে, ওর বুদ্ধিদীপ্ত চোখদুটো চকচক করছে। ও আমার কাঁধে হাত রাখল, বলল- “সিগারেট খাবি?”
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news