সীমিতা মুখোপাধ্যায়
মিহি কুয়াশায়
১
কেন জানি না, ঘুম আসছে না আজ। সকালে মিহি এসেছিল আমাদের এখানে। ও যা সব বলে গেল, সেই কথাগুলোই মাথার মধ্যে কেমন কিলবিল কিলবিল করছে।
মিহি আমার পিসতুত বোন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় তুখোড়। বরাবরের কৃতি ছাত্রী। স্বভাবে শান্ত, স্বল্পভাষী, চাপা প্রকৃতির, একটু একা একা থাকতে ভালোবাসে। আজ প্রায় ১৩-১৪ বছর পর ওর সঙ্গে দেখা। মিহি সম্প্রতি ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে পিএইচডি করতে ঢুকেছে। ডাবলিনেই একটা ছোটখাটো ঘর ভাড়া নিয়েছে। আমি তো এদেশের, মানে রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ডের পুরনো পাপী। আমার স্বামী বহু বছর ধরে এদেশে কর্মরত আর সেই সূত্রে আমিও পড়ে আছি এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে। আমরা থাকি আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন থেকে ১৭০ কিলোমিটার দূরে ওয়াটারফোর্ড নামে একটি শহরে।
মিহিকে আমি চিরকাল একটু এড়িয়ে চলতাম। বাবা! এত পড়ুয়া মেয়ে! তার ওপর গম্ভীর। তবে ও ডাবলিনে আসার পর থেকে যেচে পড়ে নিজেকে ওর লোকাল গার্জেন ভাবতে শুরু করেছি, বিভিন্ন ভাবে ওকে সাহায্য করতে চেয়েছি। কিন্তু, আমার সাহায্যের বিশেষ প্রয়োজন পড়েনি মিহির। তাও ভদ্রতার খাতিরে ওকে বলেছিলাম, আমার বাড়িতে আসতে। জানি না, কী মনে করে আজ সকালে হঠাৎ ফোন- “জোনাকিদি, আজ তোমার বাড়িতে যেতে পারি?” আমি তো খুব খুশি।
মিহি আসতে ওকে অনেক আদর-আপ্যায়ন করলাম। এ কথা সে কথার পর ওকে জিজ্ঞাসা করলাম- “হ্যাঁ রে মিহি, তুই কী নিয়ে রিসার্চ করছিস রে?”
– “প্যারালাল ইউনিভার্স।”
সত্যি কথা বলতে কী কথাটা জীবনে এই প্রথমবার শুনলাম। ফলে বোকার মতো প্রশ্ন করে বসলাম- “সেটা আবার কী বস্তু? খায় না মাথায় দেয়?”
মিহি যথারীতি গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল- “বিষয়টা হল, আমাদের এই মহাবিশ্বের পাশাপাশি আরেকটা একই রকম ইউনিভার্স রয়েছে। বলতে পারো, একটা আরেকটার জেরক্স কপি। সেখানেও আরেকখানা তুমি আছো, আরেকখানা আমি আছি ….।”
এইটুকু শুনেই আমার মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল। কীসব খটোমটো ব্যাপার রে ভাই! বললাম- “ধ্যার! এরকম আবার হতে পারে নাকি?” মিহি একই রকম ঠাণ্ডা মাথায় বলে যেতে থাকল- “সেরকম পাকাপোক্ত প্রমাণ না থাকলেও থিওরিটিক্যালি এটা সম্ভব। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এই মহাবিশ্বের যেহেতু কোনও শেষ নেই তাই কোথাও একটা পৃথিবীর মতো গ্রহ থাকবেই, যেখানে তোমার মতো কেউ বা আমার মতো কেউ থাকতেই পারে। এরকম ভাবে সব গ্রহ, নক্ষত্রেরই একটা করে জেরক্স কপি থাকতে পারে। সুতরাং, বলা চলে এই গোটা ইউনিভার্সেরই একটা জেরক্স কপি বা মাল্টিভার্স রয়েছে।”
– “বাহ! বেশ ইন্টারেস্টিং তো!”
– “তোমাকে একটা ঘটনা বলি জোনাকিদি। তাহলে জিনিসটা বুঝতে তোমার আরও সুবিধা হবে। ২০০৮ সালের ১৬ই জুলাই। ল্যারিনা গার্সিয়া নামে ৪১ বছরের এক স্প্যানিশ মহিলা সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, তিনি যে বিছানায় শুয়ে ছিলেন তার বেডশিটের রঙ বদলে গেছে। তিনি খুব অবাক হলেন। অফিস গিয়ে আবিষ্কার করলেন তিনি যে ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন, তিনি সেই ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন না। বছর খানেক আগে ওই অফিসের যে ডিপার্টমেন্টের কাজের অফার তিনি রিজেক্ট করেছিলেন এখন সেই ডিপার্টমেন্টের সেই পোস্টে চাকরি করেন। অ্যাম্নেসিয়া বা ভুলে যাওয়ার রোগ হয়েছে ভেবে তিনি ডাক্তারের কাছে ছোটেন। ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে জানিয়ে দেন যে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনি এই মানসিক চাপ কাটাতে কিছু দিনের জন্য দেশের বাড়ি চলে যান। তিনি জানতেন তার বোনের কাঁধে একটি অপরেশন হয়েছে। বাড়ি গিয়ে শোনেন, তার বোনের নাকি কোনো অপরেশনই হয়নি! ল্যারিনার বাড়ির লোকেরাও জানান যে সে নাকি আগের ল্যারিনা আর নেই, বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে তার মধ্যে।”
বেশ টানটান উত্তেজনা রয়েছে গল্পটার মধ্যে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছি। মিহিও বলে যাচ্ছে- “তারপর ল্যারিনা সোশাল মিডিয়ায় তার এই অভিজ্ঞতার কথা পোস্ট করে। চারিদিকে হইচই পড়ে যায়। এই নিয়ে প্রচুর আলোচনা চলে। অবশেষে অনেক ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে ল্যারিনা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে সে প্যারালাল বিশ্ব থেকে এই পৃথিবীতে এসে আটকে পড়েছে। এই পৃথিবীর ল্যারিনার সঙ্গে ওই পৃথিবীর ল্যারিনার সব কিছু মিলে গেলেও কিছু কিছু জায়গায় অমিল রয়েছে, যেমন ধরো, অন্য ডিপার্টমেন্টের জব অফার অ্যাক্সেপ্ট করা বা না করা ইত্যাদি।”
– “কিন্তু, অন্য বিশ্ব থেকে সে এই বিশ্বে এল কী করে?”
– “কোনও পোর্টালের মাধ্যমে এসে পড়েছিল হয়তো।”
– “মানে?”
-“মানে এই ধরো, হোয়াটসঅ্যাপ। নিমেষের মধ্যে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছবি, ভিডিও কত কী চলে যাচ্ছে। সেরকমই কোনও মাধ্যমের দ্বারা একটা মানুষ এক বিশ্ব থেকে আরেক বিশ্বে চলে আসতে পারে না কী?”
-“হুঁ, আসতেই পারে। বুঝলাম। কিন্তু, ল্যারিনা এখন কোথায়?”
-“ল্যারিনা নিখোঁজ।”
-“যাব্বাবা! একজন জলজ্যান্ত মহিলা একদম হাওয়া হয়ে গেল! এমনও তো হতে পারে যে সে একগাদা ঢপ দিয়ে নিজেই এখন গা ঢাকা দিয়েছে?”
– “হতে পারে … কিন্তু ।”
– “কিন্তু কী, বল।”
– “না কিছু না।”
– “তুই কিছু লোকাচ্ছিস।”
– “আসলে … তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না, আমার সঙ্গেও ছোটবেলায় এরকম হয়েছিল।”
– “বলিস কী! আগে কখনও বলিসনি তো?”
– “মা সবটা জানে। মাকে বলেছিলাম … তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি … আমি জানতাম, আমি বি সেকশনে পড়ি। সেদিন ক্লাসে ঢুকতে গিয়ে দেখি এ সেকশনের মেয়েরা সব ওই ক্লাসে বসে আছে। ওরা বলল, ওটা বি সেকশন। আমি নাকি এ সেকশনে পড়ি। বেশি পড়াশোনা করে আমার মাথাটাই নাকি খারাপ হয়ে গেছে বলে ওরা আমায় নিয়ে খুব হাসাহাসি করল। আমি এ সেকশনে গেলাম। দেখি, এত দিন যাদের সঙ্গে বি সেকশনে পড়েছি তারা সেখানে বসে। তারাও বলল, আমি নাকি বরাবর এ সেকশনেই পড়ি। ব্যাগ খুলে বই খাতা বের করে দেখি, সবের মলাটে “এ সেকশন” লেখা। বাড়িতে এসে মাকে বলতে মাও একই কথা বলল, আমি নাকি এ সেকশন! তারপরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখেছি, আমার জানার সঙ্গে বাস্তবটা মিলছে না। মামার বাড়ি গিয়ে শুনলাম, আমার দিদিমা নাকি একবছর আগে মারা গেছেন। অথচ আমি সেটা জানি না। এই স্ট্রেস সহ্য করতে না পেরে আমার জ্বর এসে গিয়েছিল। ধুম জ্বর, মা কপালে জলপটি দিচ্ছে … এখনও ভাবলে আমার বুক কেঁপে ওঠে … মা আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখছে … হঠাৎ বলল- “তুই কে বলত? তুই তো আমার মিহি নোস!”
শোনা মাত্র আমারও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। মিহিকে দেখে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হতে লাগল- কে এ? কোথা থেকে এসেছে? এ আদৌ মানুষ তো!
তারপর মিহি যদিও আর বেশিক্ষণ থাকেনি। যাবার সময় আমি মিহিকে জিজ্ঞেস করলাম- “তোর কী মনে হয়? এই প্যারালাল ইউনিভার্সের রহস্য তুই উদ্ধার করতে পারবি?”
– “এখনই কিছু বলতে পারছি না। তবে মনে হয়, কিছু না কিছু অবদান রেখে যেতে পারব।”
এই সব ভয়ের কথা শুনলে কি আর ঘুম আসে কখনও! এমন যদি আমারও হয়- সকালে উঠে দেখলাম এ আমি আর সে আমি নেই, অন্য কোনও “আমি” হয়ে গেছি?

২
মিহি ডাবলিনে এসেছে আজ প্রায় তিন বছর হতে চলল। চিরকালই মেয়েটা অসামাজিক প্রকৃতির। এদেশে আসার পর প্রথম প্রথম তাও যোগাযোগ রাখত। এখন তো রাখে না বললেই চলে। আমার সঙ্গে রাখিস না রাখিস না, নিজের মাকে তো একটু ফোন-টোন করবি! সেটাও করে না। পিসি দিনের পর দিন মেয়ের কোনও খোঁজই পায় না, আমার কাছে মাঝেমধ্যেই খুব দুঃখ করে। এবারে বিজয়ার প্রণাম জানানোর জন্য যেই কল করেছি, পিসির সে কী কান্না! মেয়েকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে। আমায় বলল- “দেখ, জোনাকি আমার মনটা বড্ড কু গাইছে। ও ঠিক আছে তো? এত কীসের পড়ার চাপ রে, সপ্তাহে একবারও ফোন করতে পারে না। আর ফোন করলেও কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থের মতো কথাবার্তা বলতে থাকে। আমার কী মনে হয় জানিস? ও কোনও কারণে খুব ভয় পেয়ে আছে।” মিহিকে চোখের দেখা দেখিনি প্রায় ৮-৯ মাস হতে চলল। ফোন করলে বেশি কথা বলতে চায় না। সব সময়ই নাকি ও খুব ব্যস্ত। পিসির কথা শুনে আমারও কেমন একটা ভয় ভয় মতো করতে লাগল। তাও পিসির কথা উড়িয়ে দেবার ছলে বললাম- “মেয়ে দূরে আছে, মায়ের মন, চিন্তা করবে স্বাভাবিক। ও ঠিকই আছে। তাও আমি যে করেই হোক ওর সঙ্গে একবার দেখা করব। তারপর তোমায় জানাচ্ছি।”
তার ক’দিন বাদেই আমাদের বাড়িতে একটা বিজয়া সম্মিলনী হওয়ার কথা। এখানে যে ক’টা বাঙালী পরিবার আছে তাদের নিয়ে একটু খাওয়া-দাওয়া হই-হুল্লোড় হবে, এমনটাই ঠিক ছিল। মিহিকেও ফোন করে আসতে বললাম। সে জানাল- “না গো জোনাকিদি, আমার হবে না। আমার তো ফেলোশিপ শেষ হতে চলল। কাজটাও অনেকটা এগিয়ে এসেছে। এই মুহূর্তে আমার সময় নষ্ট করার একদম সময় নেই। নয়তো তীরে এসে আমার তরী ডুববে।” মিহির কথা শুনে আমার বেশ বিরক্ত লাগল। তাই আর কথা বাড়াইনি।
বিজয়া সম্মিলনী ভালোয় ভালোয় মিটে গেল। তার দিন কয়েক পর হঠাৎ আমার বাড়িতে মিহি এসে হাজির। উস্কো-খুস্কো চুল, চোখের তলায় কালি, কাঠির মতো রোগা হয়ে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে, নিজের দিকে একেবারেই নজর দেয় না। হাবভাবও কেমন যেন পাগলের মতো! না পিসির চিন্তা অমূলক নয়। ওকে দেখে ঘরে বসালাম। জল-টল দিলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম- “কী হয়েছে বল তো তোর?” মিহি চুপ করে মাথা নিচু করে বসে রইল। আমি সেদিন বাড়িতে একটু পায়েস রেঁধেছিলাম। মিহিকে এনে দিলাম। এমন ভাবে ও খেতে লাগল, যেন অনেক দিন কিছু খেতে পায়নি। দেখে সত্যি খুব কষ্ট হল। খাওয়া শেষ করে বলল- “আর আছে?” মিহি খাবার চেয়ে খাচ্ছে এ যেন অবিশ্বাস্য! বাকী পায়েসটুকুও আমি এনে দিলাম, সঙ্গে ঘরে বানানো কেক। ও সব খেল বসে বসে। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলাম- “মিহি কী হয়েছে বলবি কি?”
– “আমায় কে একটা ফলো করে। সব সময়।” ওর চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। আমি বললাম- “সে কে? তুই গার্ডাকে জানাচ্ছিস না কেন?” গার্ডা মানে হল আইরিশ পুলিস।
– “গার্ডা কিছু করতে পারবে না।”
– “কে বলল তোকে? এটা ইন্ডিয়া নয়। এদেশে পুলিস খুব এফিশিয়েন্ট। তুই রিপোর্ট করে তো দেখ। তেমন হলে আমি তোর সঙ্গে থানায় যাব।”
– “লাভ হবে না। যে ফলো করে তাকে আমি দেখতে পাই না। অদৃশ্য কেউ।”
পড়ে পড়ে এর দেখছি সত্যিই মাথা গেছে। যাকে দেখতে পাওয়া যায় না, সে যদি ফলো করে মানুষ কী করে বুঝবে? সবটাই মিহির মনের ভুল। পড়াশোনায় ভালো হলে কী হবে, মনে হয় ছোট থেকেই মেয়েটার মাথায় বিস্তর ছিট আছে। ওই যে বি সেকশন থেকে এ সেকশন হয়ে যাওয়া-র গল্পটা বলেছিল, সেসবই ওর পাগলামি। পিসি যে বলেছিল “তুই তো আমার মিহি নোস”, সেটা জ্বরের ঘোরে দেখা ওর হ্যালুসিনেশন। এ মেয়ের অবিলম্বে ট্রিটমেন্ট হওয়া দরকার। তো আমি মিহিকে বললাম- “দেখ, আমার মনে হয় তোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে যাচ্ছে। তোর কাউন্সেলিং করানো দরকার। যাবি একজনের কাছে? খুব ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট।”
– “আমার হাতে আর বেশি সময় নেই। কাজটা শেষ করতেই হবে। তুমি জান না, আমার এই কাজটা কতটা ইম্পরট্যান্ট। আমি সম্পূর্ণ নতুন একটা দরজা খুলে দিতে চলেছি।” আমি লক্ষ্য করলাম, নিস্তেজ হয়ে পড়া মিহির চোখ-মুখ হঠাৎ যেন উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
– “ওকে। যা ভালো বুঝিস কর। আমি তোর ভালোর জন্যই বলছিলাম।”
– “রাগ করো না জোনাকিদি। আমি পাগল নই। পাগল হলে আজ এই জায়গায় আসতে পারতাম না। এইগুলো দেখো।” বলে মিহি নিজের ব্যাগ হাতড়ে কয়েকটা চিরকুট বের করল। আমায় দিয়ে বলল- “পড়ো।” চিরকুটগুলো খুলে দেখি পরিষ্কার, খাঁটি বাংলা ভাষায় কিছু লেখা। একটায় লেখা- “যে পথে চলেছ তা ভয়ানক।” আরেকটায় লেখা- “ঘরের মেয়ে এবার ঘরে ফিরে যাও।” তার পরেরটায়- “সব সত্যি জানতে নেই।” আরেকটিতে- “যে দরজা খুলতে চাইছ তাতে সর্বনাশ হবে।” মিহিকে বললাম- “এগুলো কী? কোথায় পেলি? তোকে কি কেউ শাসাচ্ছে?”
– “প্রত্যেক দিন এই রকম একটা করে চিরকুট আমার ব্যাগ থেকে পাই।”
– “মানে? কোন ব্যাগ?”
– “ল্যাপটপ ব্যাগ।”
– “কে তোর ব্যাগে এই চিরকুটগুলো রাখছে?”
– “জানি না।”
– “কলেজে এই ব্যাগ নিয়ে যাস তো?”
– “হ্যাঁ।”
– “সিম্পল। তোর ডিপার্টমেন্টেরই কেউ এটা করছে, যে তোর কাজে খুব জেলাস ফিল করে … তোর ডিপার্টমেন্টে কেউ বাঙালী আছে?”
– “নাহ।”
– “নাই বা থাকল। কলেজে তো নিশ্চই বাঙালী আছে। গোটা আয়ারল্যান্ডে অনেক বাঙালী আছে। তোকে ভয় দেখাতে কেউ হয়তো এগুলো কোনও বাঙালীকে দিয়ে লিখিয়ে আনছে। তাছাড়া ইনটারনেটের যুগে সবই সম্ভব। চাইলে আমিও আজ জাপানি ভাষা লিখে দেখিয়ে দিতে পারি।”
– “ব্যাপারটা অত সোজা নয়। এটা হুবহু আমার হাতের লেখা। বিশ্বাস না হলে লিখে দেখাচ্ছি।”
– “মানেটা কী? ঠিক আছে তুই লিখে দেখা।” মিহি খাতা-পেন বের করে খসখস করে কীসব লিখতে লাগল। তারপর খাতাটা আমার হাতে দিল। কী আশ্চর্য! দুটো হাতের লেখা একদম এক! মিহির কি তবে অ্যাম্নেসিয়া হল? ও কি নিজে এসব লিখে নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখছে আর পরে সেগুলো দেখে নিজেই ভয় পাচ্ছে? ওর একটু রেস্টের দরকার। আমি বললাম- “ক’দিন ছুটি নিয়ে আমাদের এখানে থাকতে পারবি না?”
– “না গো। আর তো ক’টা দিন। একটু কষ্ট করে নিই …”
– “আরেকটা কথা বল তো, এখানে তোর কোনও বাঙালী বন্ধু আছে? খুব ক্লোজ? যে তোর বাংলা হাতের লেখাটা অবধি জানে? মানে, এমনও তো হতে পারে কেউ তোর বাংলা হাতের লেখা নকল করে তোকে ভয় দেখাচ্ছে।”
– “প্রথমত আমি কারো সঙ্গে মিশি না। তাছাড়া এখানে এসে থেকে কখনও বাংলা লিখিইনি। প্রয়োজনই পড়েনি।”
আরও কিছুক্ষণ বসে থেকে মিহি সেদিনের মতো ডাবলিন ফিরে গেল। যাবার সময় বলে গেল- “শোনো জোনাকিদি, এসব আবার মাকে বলতে যেও না যেন।”
– “বলব না মানে? আলবাত বলব। তুই এমন অসভ্য মেয়ে পিসিকে একটু ফোন করে নিজের খবরটুকুও তো দিতে পারিস না।”
– “আসলে টাইম ডিফারেন্সটাই সমস্যা। সারাদিন পর সন্ধ্যেবেলায় যখন আমি ফ্রি হই তখন দেশে গভীর রাত্রি।”
– “ঠিক আছে আমি যদি তোকে রোজ রাতের দিক করে একবার ফোন করি তুই রিসিভ করে উদ্ধার করবি তো?”
– “তুমি রাতে কখন শুতে যাও?”
– “তা এগারোটা সাড়ে এগারোটা তো হয়ই।”
– “ঠিক আছে, শোয়ার আগে আমায় ফোন করো। আমি ধরব।”
– “না ধরলে কিন্তু পিসিকে সব রিপোর্ট হবে -এই বলে দিলাম।”
সত্যি সত্যি হয়তো পিসিকে আমি এসব জানাব না। পিসি এমনিতেই যা টেনশনে আছে, এগুলো শুনলে তো আর রক্ষে নেই। কিন্তু, মিহির সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটা আবশ্যক। সেইজন্যই ছোট্ট করে এই হুমকিটা দিয়ে রাখলাম।

৩
মিহির সঙ্গে চুক্তি মতো রোজ রাত্তিরে শোবার আগে আমি ফোন করি। ওর কুশল নিই। পিসিকেও জানিয়ে দিয়েছি, আমি এখন নিত্য মিহির খোঁজ খবর রাখছি। মিহি কাজ নিয়ে ব্যস্ত, টাইম জোন আলাদা বলে ও দেশে সচরাচর ফোন করতে পারে না। পিসিও কিঞ্চিত নিশ্চিন্ত।
দিন কয়েক বেশ কাটল। সেদিন ছিল ৩১শে অক্টোবর, হ্যালোইনের রাত। রাত্তির সাড়ে এগারোটা হবে। অন্য দিনের মতো মিহিকে ফোন করেছি। মিহি ফোন তুলল না। আবার করলাম। এবারও বেজে বেজে কেটে গেল। বেশ কয়েক বার ফোন করার পর মিহি ফোন তুলল। শুনি মিহি বলছে- “তৃতীয় সুর, ষষ্ঠ সুর, মিহি চলল বহু দূর।” বলেই ফোনটা কেটে দিল। মিহি কী উন্মাদ হয়ে গেল? আমি ফোন করেই যাচ্ছি, ফোন করেই যাচ্ছি। রিসিভ আর করে না। সারাদিনের খাটাখাটনিতে আমিও খুব ক্লান্ত ছিলাম, কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে! সকালে ঘুম ভাঙতেই আবার মিহিকে ফোন করলাম। কোনও উত্তর নেই। ঘরের কাজ কিছুটা সামলে ডাবলিনের উদ্দেশে রওনা দিলাম। এর ফাঁকে ফাঁকে বেশ কয়েকবার মিহিকে রিং করেছি। যথারীতি ও ফোন ধরেনি। কী হল রে বাবা মেয়েটার! ভীষণ উৎকন্ঠার মধ্যে রয়েছি।
মিহিদের অ্যাপার্টমেন্টটা তিনতলা। ও থাকে টপফ্লোরে। ওর ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় নক করলাম। কোনও সাড়া নেই। ফোন করলাম। বাইরে থেকে শুনতে পাচ্ছি ওর ফোন বাজছে। কিন্তু, ফোন ধরছে না। আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে দরজার হাতলে যেই একটু চাপ দিয়েছি অমনি দরজাটা খুলে গেল। ঘরে ঢুকে দেখি ঘরের অবস্থা লণ্ডভণ্ড। মোবাইলটা মেঝেতে পড়ে আছে। ল্যাপটপটা বিছানায়। ল্যাপটপ ব্যাগটা চেয়ারে। মিহি ঘরে নেই। ল্যাপটপ ফেলে কি আর ল্যাবে চলে যাবে? তাও ভাবলাম ট্রিনিটি কলেজে গিয়ে ওর ডিপার্টমেন্টে একবার ঢুঁ মেরে আসি। ওখানে গেলে হয়তো কিছু একটা সূত্র পাওয়া যাবে।
ডিপার্টমেন্টে গিয়ে খোঁজ করে জানতে পারলাম মিহি যথারীতি সেখানেও নেই। ওর সুপারভাইজার রিওনার সঙ্গে দেখা হল। ওনাকে বিষয়টা জানাতে উনি বললেন- “আপনার বোন যেমন মেধাবী, ঠিক তেমনি পরিশ্রমী। প্রথম দিকে তো দারুণ কাজ করছিল। বেশ কিছু ভালো পাবলিকেশনও হয়েছিল। কিন্তু, ৮-৯ মাস আগে ও একটা বিশেষ কাজে হাত দিয়েছিল। কাজটা কী সে বিষয়ে ও আমাকেও কিছু জানাতে চায়নি। মিহির ওপর আমার পূর্ণ আস্থা ছিল। ওকে আমি কাজের ব্যাপারে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিলাম। কিন্তু, আমি দেখলাম, যত দিন যেতে লাগল ওর মধ্যে তত পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। সব সময় কেমন ভয় পেয়ে থাকত। সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখত, এমনকি আমাকেও! কাজের কথা জিজ্ঞেস করলে বলত, ও নাকি কিছু দিনের মধ্যে সবাইকে চমকে দিতে চলেছে … যাইহোক, আমার মনে হয় আপনার একবার গার্ডারের কাছে যাওয়া উচিত।”
বুঝতেই পারছি, এবার থানায় যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। তাও আবার ফিরে এলাম মিহির ফ্ল্যাটে, যদি ওই চিরকুটগুলো খুঁজে পাওয়া যায়। ওর ব্যাগ ঘাঁটাঘাঁটি করলাম, নাহ, কোনও কাগজের টুকরো পেলাম না। উল্টে দেখলাম, ব্যাগে ওর পার্স আর আই-কার্ড রয়েছে। ওর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে পাশে এক রিটেল শপে ওর ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম। ম্যানেজার পাকিস্তানি। উনি বললেন, মিহি মাঝেমাঝে ওই দোকানে আসত, গতকাল সন্ধ্যেবেলাও এসেছিল।
তারপর থানায় গেলাম। সেখানে গিয়ে সব জানালাম- মিহি কী নিয়ে রিসার্চ করছিল, ওই চিরকুট, রিওনা যা যা বলেছিলেন, সব। সেইসঙ্গে থানায় যা যা করণীয় ছিল সব করলাম। পুলিস অফিসার প্যাডি আমায় আশ্বস্ত করে বললেন- “আমরা সব রকম ভাবে চেষ্টা করব আপনার বোনকে খুঁজে বের করার। আপনি এখন ওয়াটারফোর্ড ফিরে যান। কিছু তথ্য পেলে আপনাকে অবশ্যই জানাব।”
একরাশ আতঙ্ক আর দুর্ভাবনা নিয়ে সেদিনের মতো আমি বাড়ি ফিরে এলাম। পিসিকে আমি কী বলব জানি না।
পরদিন সকালে প্যাডির ফোন- “আপনাকে একটু ডাবলিনে আসতে হবে, ম্যাডাম। সিসিটিভি ফুটেজ দেখানোর ছিল।” আমিও পড়ি কী মরি করে ডাবলিন ছুটলাম। থানায় গিয়ে মিহির কেস ফাইলটার কথা বলতে আমায় কিছুক্ষণ বসতে বলা হল। তারপর প্যাডি এসে আমায় ভেতরের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে বললেন- “মনকে একটু শক্ত করুন।” অজানা আশঙ্কায় আমার বুকের ভেতরটা ধরাস করে উঠল। আমি বললাম- “আমি রেডি।”
প্রথম ফুটেজ, ১লা নভেম্বর রাত ১২টা বেজে ৩ মিনিট, অর্থাৎ, মিহির সঙ্গে আমার শেষবারের মতো কথা হওয়ার ১৫ মিনিট পর। মিহির ঘরের দরজাটা দেখা যাচ্ছে। বন্ধ দরজা। হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল। মিহির ঘরে অন্ধকার। তারপর … এ কী দেখছি আমি! মিহি ঘর থেকে বুকে হেঁটে বেরিয়ে আসছে। যেন কোনও অদৃশ্য শক্তি ওকে টেনে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে চলেছে। এ দৃশ্য দেখে ভয়ে আমার হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে চাইছিল। মিহি ঘর থেকে বেরল। তারপর দরজাটা আপনি আপনি বন্ধ হয়ে গেল। ওইভাবেই বুকে ভর দিয়ে মিহি করিডোর দিয়ে চলেছে। প্যাডি বললেন- “ও ফায়ার এক্সিটের সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে।”
দ্বিতীয় ফুটেজ, মিহি ওইভাবেই ঘষটে ঘষটে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। নামছে বললে ভুল হবে। ওইভাবে নামা কোনোও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ওকে কেউ একটা টেনে নিয়ে যাচ্ছে, যাকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।
এইভাবে সিঁড়ি দিয়ে নামার পর দেখা গেল, অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে ওই একই ভাবে মিহি বুকে হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছে। তারপর ফুটপাত ধরে চলেছে। এইভাবে যেতে যেতে হাল্কা কুয়াশায় ও মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি প্যাডিকে জিজ্ঞেস করলাম- “এর পরের ফুটেজ?”
– “এর পর আর নেই। আর কোনও ক্যামেরায় আপনার বোনকে দেখা যায়নি।”
– “তার মানে? মেয়েটা উবে গেল নাকি?”
-“শান্ত হন ম্যাডাম। আপনি জল খাবেন?”
সত্যিই ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। প্যাডির কাছ থেকে জল চেয়ে খেলাম। তারপর বললাম- “মিহির ল্যাপটপটা আপনারা সিজ করেছেন? আমার মনে হয় ওই ল্যাপটপের মধ্যেই ওর অন্তর্ধানের রহস্য লুকিয়ে আছে।”
– “ল্যাপটপটা আপনাকে দেখাচ্ছি। অপেক্ষা করুন।”
– “ল্যাপটপটা কি আপনারা ফরম্যাট করা অবস্থায় পেয়েছেন?”
– “না। দেখুন অন করছি।”
প্যাডি মিহির ল্যাপটপটা এনে অন করে দিলেন। কালো স্ক্রিন। কিছুক্ষণ বাদে ওই কালো স্ক্রিনের মধ্যে রক্তাক্ষরে লেখা কয়েকটি লাইন ভেসে উঠল, হ্যাঁ, বাংলা ভাষায়, বাংলা হরফে- “সত্যিটা যারা জানতে চায়/ তারা সব হারিয়ে যায়/ মিহি কুয়াশায়!” প্যাডি বলে চলেছেন- “এরপর আর কিছু আসছে না। এই লেখাটাই থাকছে। আমাদের এক্সপার্ট এসেও ট্রাই করেছেন। কোনও সুরাহা করতে পারেননি। আচ্ছা, এটা কী আপনাদের মাতৃভাষা? ইংরেজিতে তর্জমা করে বলতে পারবেন, কী লেখা? হ্যালো ম্যাডাম, কী হল আপনার? …”আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরচ্ছে না। আমি বুঝতে পারছি, কে যেন এসে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে … আমার ঘাড়ে তার নিঃশ্বাস পড়ছে … আমি পিছন ঘুরে দেখব না … কিছুতেই না … কারণ আমি জানি, যে এসে দাঁড়িয়েছে তাকে আমি দেখতে পাব না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news