সীমিতা মুখোপাধ্যায়
১
আজ দুপুর থেকে পামেলির মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। চারদিন হল, কুয়াশার পুরু মোড়কে মুড়ে দিল্লি শহরটা বড় বিষন্ন হয়ে আছে। সব সময় যেন একটা দম আটকানো ভাব। পামেলি এ অবশ্য নতুন দেখছে না। প্রত্যেক বার নভেম্বর পড়তে না পড়তেই শুরু হয় এই বিকট কুয়াশার উপদ্রব। পামেলির অস্বস্তিটা অন্য কারণে।
লাঞ্চ ব্রেকে প্রতিদিনই পামেলি একটু ফেসবুকে ঘেঁটে নেয়। আজ দুপুরে ফেসবুক খুলতেই দেখে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, এমিলি সোম নামের জনৈক ভদ্র মহিলা পাঠিয়েছেন। নামটা দেখে পামেলির বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। এত বছর পর! তা নয় নয় করে কুড়ি বছর তো হবেই। কেউ কি পামেলির সঙ্গে কুৎসিত ঠাট্টা করছে? কিন্তু, এমন একটা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কে-ই বা মজা করতে যাবে? তাছাড়া, জানার মধ্যে জানত তো ঘনিষ্ঠ কিছু আত্মীয়-স্বজন। এমনও হতে পারে, ঘটনাটা আসলে কিছুই না, নেহাত কাকতালীয়। একই নাম-পদবী কি দু-জন মানুষের থাকতে নেই? এসব সাত-পাঁচ ভেবে পামেলি ভদ্র মহিলার প্রোফাইলে ক্লিক করে। নিশ্চয়, প্রোফাইল থেকে কিছু না কিছু ক্লু পাওয়া যাবে। অন্তত তাই তো উচিত। তাতে পামেলির খটকাটা আরও দৃঢ় হল। গোটা প্রোফাইলে মহিলার কোনও ছবি তো নেই-ই, তার ওপর শুধুই পুতুলের ছবিতে ভরা। স্বাভাবিক ভাবেই এই রহস্যময়ী এমিলি সোম নিজের প্রোফাইলে নিজের সম্পর্কে কোনও তথ্যই দিয়ে রাখেনি। রাশি রাশি পুতুলের ছবিই পামেলিকে আশ্চর্য করেছে সব থেকে বেশি। এই পুতুল নিয়েই তো … তাও ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা অ্যাক্সেপ্ট না করে এমনিই রেখে দিয়েছিল।
অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে মনের কুয়াশা আর বাইরের কুয়াশা মিলে পামেলির অবস্থা দুঃসহ করে তুলছিল। মনে পড়ছিল অনেক কথা … অনেক কথা … আবছা আবছা স্মৃতি।
পামেলি সোমের দিদির নাম এমিলি। পামেলির থেকে বছর তিনেকের বড়। ছোট বেলা থেকে এমিলির পুতুল নিয়ে ছিল মারাত্মক অবসেশন। ছোট বড় মিলিয়ে এমিলির কম পুতুল ছিল না। এমিলি সারা দিন-রাত্রি পুতুল নিয়ে পড়ে থাকত। এমনকি পুতুলের সঙ্গে থাকার জন্য এমিলি স্কুলেও যেতে চাইত না। বলা বাহুল্য, এমিলির পড়াশোনাতেও একেবারেই মতি ছিল না। এমিলির পুতুলে পামেলির হাত দেওয়া দূর অস্ত এমিলির ঘরে ঢোকার অধিকার অবধি ছিল না। পামেলিকে পুতুলগুলোর ধারে-কাছে দেখলেই সে ক্ষেপে যেত। এমিলির সবচেয়ে প্রিয় ছিল, ইভা বলে দু ফুট সাইজের একটি মেম পুতুল। অসাধারণ দেখতে ছিল পুতুলটাকে। হঠাৎ করে দেখলে মনে হত, পুতুলটা যেন জীবন্ত। এমিলি বলত, ইভা নাকি ওর মেয়ে। একদিন হয়েছে কী, এমিলি স্কুলে গেছে, পামেলি কোনও এক কারণে স্কুল যায়নি। পামেলি তখন খুবই ছোট, মোটে ৭ বছর বয়স। দিদির অনুপস্থিতিতে পামেলি চুপিচুপি দিদির ঘরে ঢুকে পড়ে। বহু প্রত্যাশিত সেই সব পুতুলগুলোকে হাতের কাছে পেয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখতে থাকে। ইভাকেও কোলে তুলে নেয়। আহ! কী নরম তুলতুলে ছিল পুতুলটা। পামেলি ইভাকে খুব আদর করছে, খুব আদর করছে। এমন সময় কখন যে এমিলি স্কুলে থেকে ফিরে এসেছে পামেলি টেরই পায়নি। ‘কেন কোলে নিয়েছিস তুই ইভাকে?’— দিদির চিৎকারে চমকে ওঠে পামেলি। আর তার হাত থেকে পুতুলটা পড়ে যায়। তারপর যা হয় তা অভাবনীয়। ‘তুই আমার মেয়েকে ফেলে দিলি! মেরে ফেললি আমার মেয়েকে।’— বলে এমিলি তারস্বরে চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকে। মা এসে কত বোঝায় তাকে। ‘পুতুল কখনও মরে না। তোর মেয়ের কিছু হয়নি। ও ঠিক আছে।’ এমিলির কান্না আর থামে না। একটা সময় মায়েরও বিরক্তি চলে আসে, দেয় ঘা-কতক। তারপর অদ্ভুতভাবে চুপ করে যায় এমিলি। সেদিন রাতেই এমিলি মাত্র দশ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। বাড়ি থেকে চলে যাবার সময় ওই ইভা পুতুলটিকেও সঙ্গে করে নিয়ে যায়। তারপর থেকে কম থানা-পুলিস হয়নি। কাগজে ছবি ছাপা হয়। যা যা করণীয় সবই করা হয়। কিন্তু, এমিলিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে বাড়িতে কেউ আর এমিলির কথা তোলে না বটে। তাও পামেলি বোঝে, মায়ের মনে এমিলির জন্য কোথাও একটা ক্ষত রয়ে গেছে। পামেলিও আজ কুড়ি বছর ধরে একটা অবান্তর অপরাধবোধ বয়ে বেড়াচ্ছে। নিজেকে অনেক বুঝিয়েছে পামেলি। তাও খচখচানিটা যেন যেতেই চায় না, কী দরকার ছিল দিদির ঘরে ঢোকার, ওর পুতুলে হাত দেবার!
এত দিন পর সে কি সত্যিই ফিরে এল? পামেলি স্থীর করল, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা সে অ্যাক্সেপ্ট করবে। তা না হলে তো জানা সম্ভবই নয় যে ফেসবুকের এই এমিলি সোম আদৌ তার দিদি কিনা। কিন্তু, মাকে ফোন করে সে এখনই এ ব্যাপারে কিছু জানাবে না। মা আবার হয়তো আশায় বুক বাঁধবে। পরে যদি দেখা যায় এ অন্য কেউ, মা আবার নিরাশ হবে। ওই জায়গাটা শুধু-শুধু আবার খুঁচিয়ে তো কোনও লাভ নেই। এমিলির জন্য এমনিতেই মা অনেক কষ্ট পেয়েছে, বহুকাল ধরে পেয়েছে। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা পামেলি অ্যাক্সেপ্ট করে নিল।
২
দুদিন কেটে গেল, কোনও সাড়া-শব্দ নেই। তাও পামেলির হাত মাঝেমাঝে আপনা-আপনিই চলে গেছে এমিলি সোমের প্রোফাইলে। কোনও সময়ই তাকে অনলাইন দেখেনি। পামেলিরও আগ বাড়িয়ে ওই মহিলার ইনবক্সে কিছু লেখার সাহস হয়নি। যদি এ অন্য কেউ হয়, তবে তাকে আর কী বা বলার আছে। আর যদি সত্যিই এই মেয়ে পামেলির হারিয়ে যাওয়া সেই দিদি হয়ে থাকে তাহলেও বুঝে-সুজে কথাবার্তা বলাটাই শ্রেয়। ছোটবেলায় যা ছিল! বড় হয়ে, ভগবান জানে সে কেমন হয়েছে।
আজ লাঞ্চব্রেকের সময় ফেসবুক খুলতেই দেখে ইনবক্সে একটি বার্তা! হ্যাঁ, এমিলি সোমই পাঠিয়েছে— ‘কেমন আছিস, পাম?’ পাম! এই নামে তো পামেলিকে শুধু তার বাড়ির লোকেরাই ডাকে। দিদিও পাম বলেই ডাকত। তবে কি! তবে কি! অতি উৎফুল্ল হয়ে পামেলি দেখে এমিলি সোম অনলাইন! পামেলি লিখল— ‘কোথায় আছিস, দিদি? কেমন আছিস? জানিস, তোকে আমরা কত খুঁজেছি? মা কত কেঁদেছে তোর জন্য?’
– ‘আমি দিল্লিতে আছি। খুব ভালো আছি।’
-‘সেকি আমিও তো গত তিন বছর ধরে দিল্লিতে!’
-‘কী করিস দিল্লিতে?’
-‘চাকরি করি। একদিন দেখা হয়?’
-‘অ্যাড্রেস দিচ্ছি। চলে আয়।’
বলে এমিলি দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত এলাকার ‘ডলস হাউজ’ নামে একটি পুতুলের দোকানের ঠিকানা দিল। আবার পুতুল! পুতুল নিয়ে যে এমিলির বাড়াবাড়িটা বিশেষ কমেনি সেটা পামেলি ভালোই বুঝতে পারছিল। নইলে ফেসবুকের অ্যালবাম ভর্তি খালি পুতুলের ছবি রাখে? বেছে বেছে, দেখো, একটা পুতুলের দোকানে চাকরি জোগাড় করেছে। ভালো আর থাকবে না? তবে দেখা তো করতেই হবে। একবার সামনা-সামনি সাক্ষাৎ না হলে এ ধোঁয়াশা পুরোপুরি কাটবে না। পামেলি লিখল– ‘রবিবারই আমার একমাত্র ছুটির দিন। রবিবার যদি যাই?’
– ‘তাহলে সামনের রবিবারই আয়।’
পামেলিও রাজি হয়ে গেল। আজ অফিস থেকে বেরিয়ে দেখল আকাশটা বেশ পরিষ্কার। বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে পামেলি বাড়ির পথে পা বাড়াল। নাহ, এখনও মাকে ও কিছু জানাবে না। রবিবার দেখাটা হোক আগে।
বাড়িতে এসে পামেলি ‘ডলস হাউজ’ দিয়ে গুগল সার্চ দিল। তাতে জানতে পারল, এটি দিল্লির অতি পুরনো এক পুতুলের দোকান। খুবই নামকরা। নানা দেশের তো বটেই এমনকী এই দোকানে কিছু অ্যান্টিক পুতুলও কিনতে পাওয়া যায়। সারা দেশ কেন সারা পৃথিবীর পুতুলপ্রেমীদের স্বর্গ বলা চলে এটিকে। দোকানের বর্তমান মালিক মিসেস ও’ কোনর, একজন আইরিশ মহিলা। এমিলি একদম ঠিক জায়গায় গিয়েই পড়েছে তার মানে।
৩
দেখতে দেখতে রবিবার এসে পড়ল। সব উৎকণ্ঠার আজই অবসান হবে। দোকানটা খুঁজে পেতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হল না। পামেলি ঠিক সময় মতো দোকানের সামনে পৌঁছে গেল। কাঠের কারুকার্য করা ভারি দরজা ঠেলে পামেলি সোজা ঢুকে গেল দোকানের ভেতরে। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে! ছোট-বড়-সাদা-কালো বিভিন্ন রকমের, বিভিন্ন আকৃতির পুতুল চারদিকে। এদিক-ওদিক দেখতে দেখতেই পামেলি হঠাৎ আবিষ্কার করল একটি মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তাকে দেখে পামেলি চিনতে পারল ঠিকই। কিন্তু, সঙ্গে সঙ্গে মাথাটাও বোঁ করে ঘুরে গেল। প্রথমত, মেয়েটির বয়স বোঝার কোনও উপায় নেই। হিসাব মতো তো দিদির এখন বয়স হওয়া উচিত ৩০। এই মেয়েটিকে দেখে মনে হবে বড় জোর ষোলো থেকে সতেরো। তার থেকেও বড় কথা হল, পামেলিকে যদি একটা পুতুলে রূপান্তরিত করে দেওয়া হয় তাহলে তাকে যেমন দেখতে লাগবে এই মেয়েটিকে অবিকল সেই রকম দেখতে! এ যে ওর দিদি সে বিষয়ে পামেলির আর কোনও সন্দেহ নেই। তাও, কেমন যেন একটা লাগছে। কোনও মানুষ এরকম নিখুঁত পুতুলের মতো সুন্দর হতে পারে?
পামেলি তাও একটু হাসার চেষ্টা করল। এমিলি এসে বোনকে জড়িয়ে ধরল। এমন উষ্ণ অভ্যর্থনায় পামেলি একদম অপ্রস্তুত। এমিলি বলল- ‘কী ভাবছিস জানি। এমন পুতুলের মতো হলাম কী করে, তাই তো?’ পামেলি একটা ঢোক গিলে বলল- ‘না ঠিক তা না। তাও মনে হচ্ছিল … কী সুন্দরীই না হয়েছিস!’
– ‘এমনি এমনি নয় রে। রেগুলার ডায়েট, জিম। তাছাড়া ষোলোটা সার্জারি করিয়েছি।’
পামেলি মনে মনে ভাবছে, এমিলির নিশ্চই খুব বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে। ষোলোটা শখের সার্জারি সাধারণ ঘরে কি আর কেউ করাতে পারে? এমিলির ব্যাপারে তো এবার একটু জানতে হবে। পামেলির মনে উঁকি দিচ্ছে হাজারো প্রশ্ন। কোথা থেকে যে শুরু করবে ভেবে পাচ্ছে না। একটু চুপ করে থেকে পামেলি জিজ্ঞাসা করল- ‘হ্যাঁ রে, তুই কি এই দোকানের এমপ্লয়ি?’
– ‘বলতে পারিস, আমিই মালিক।’
– ‘মিসেস ও’ কোনর? গুগলে দেখলাম যে …।’
– ‘উনি আমার মা। মানে আমি ওনার পালিতা কন্যা।’
– ‘আচ্ছা! তুই দিল্লি এলি কী করে?’
– ‘সে অনেক গল্প। শোন, সামনেই আমার ফ্ল্যাট। যাবি নাকি? বসে কথা বলা যাবে।’
এই এলাকায় ফ্ল্যাট! তা তো হবেই। এমন বিখ্যাত দোকানের মালকিনের মেয়ে বলে কথা! পামেলি রাজি হয়ে গেল। খানিকটা পথ হাঁটতেই ওরা পোঁছে গেল একটি বিলাসবহুল হাউজিং কমপ্লেক্সে। লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে এমিলি বলল- ‘সেকেন্ড ফ্লোরে। সিঁড়ি দিয়ে যেতে পারবি না লিফট নেব?’ পামেলি তাড়াতাড়ি করে বলে উঠল- ‘সিঁড়ি দিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে।’ এমন ফিগার কনসাস দিদির সামনে কী আর করে? দিদির অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে ঢুকে পামেলির আবার চক্ষু ছানাবড়া! বিশাল বড় অ্যাপার্টমেন্ট। দামি দামি আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো। চারদিকে শুধুই আভিজাত্যের চিহ্ন। আর এখানেও দেওয়াল ভর্তি তাকে তাকে রাখা অজস্র পুতুল।
পামেলিকে বসিয়ে রেখে ‘দাঁড়া আসছি’ বলে এমিলি অন্দরমহলে উধাও হয়ে গেল। পামেলি বসে আছে তো আছে। চতুর্দিকে শুধু পুতুল আর পুতুল। যেদিকে তাকাচ্ছে সেদিকে পুতুল। পুতুল দেখতে দেখতে বিরক্ত ধরে যাচ্ছে পামেলির। হঠাৎ, একটা জিনিস খেয়াল করতেই পামেলির শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা চোরাস্রোত নিচের দিকে নেমে গেল। পুতুলগুলো নিজে নিজে স্থান পরিবর্তন করছে। একটু আগে যেটাকে এক জায়গায় দেখে ছিল, পরক্ষণেই দেখছে সেটা অন্য জায়গায় সরে গেছে। তার বদলে সেই জায়গায় এসেছে অন্য একটা পুতুল। না না, এ কখনও হতে পারে না। আসলে দিদিকে নিয়ে পামেলির স্নায়ুর ওপরে ক’দিন ধরে বেশ ভালোই চাপ পড়েছে। তারই ফলশ্রুতি এসব। জাস্ট মনের ভুল। ও কিছু না … পরক্ষণেই পামেলি আঁতকে উঠে দেখল, ওর পাশে, সোফাতে একটা কালো রঙের পুতুল বসে আছে। এতক্ষণ তো এটা চোখে পড়েনি! আগে ও এই পুতুলটাকে খেয়াল করল না! পামেলির গা ছমছম করতে লাগল। কিন্তু, দিদির গল্পটা তো জানতে হবে। অগত্যা, বসে রইল চুপচাপ। কিছুক্ষণ বাদে এমিলি এক প্লেট কেক-পেস্ট্রি আরও কিছু খাবার-দাবার সাজিয়ে পামেলির সামনে এনে হাজির করল। পামেলির ততক্ষণে সব খিদে মিটে গেছে। মানে মানে এখান থেকে বেরুতে পারলে যেন বাঁচে। এমিলি সেই সময় আরও অবাক করে দিয়ে বলল, ‘কী রে, ভয়েতে তো পুরো কাঁটা হয়ে আছিস। পুতুলে কেউ ভয় পায়? খা এখন। তারপর যাবি।’ অবাক কাণ্ড! এমিলি জানল কী করে যে ও ভয় পেয়েছে? ও যে পালাতে চাইছে সেটাই বা বুঝল কী করে? পামেলি তাও অস্ফুট স্বরে বলল, ‘আসলে … আমার শরীরটা ঠিক লাগছে না … খাবার ইচ্ছে নেই …।’
– ‘তাই বুঝি? পুতুলেরা জানিস তো মানুষের মনের কথা বুঝতে পারে?’
এ কথা শুনে পামেলি কেঁপে উঠল। কোথায় এসে পড়ল ও! এ কে? কী করতে চায়? এমিলি আবার মুখ খুলল— ‘বেশ তুই যখন কমফোর্ট ফিল করছিস না, তখন আজ না হয় বাড়িই চলে যা। অন্য দিন আসিস। তবে যাবার আগে আমার মেয়েকে একবারও দেখবি না?’ মেয়ে? তার মানে দিদি বিবাহিত? কাকে বিয়ে করল? নাকি সিঙ্গেল মাদার? এই ভুতুড়ে মহিলার বিয়ে হওয়া আর না হওয়া! কিছু মনে মনে ভাবতেও এখন ভয় লাগছে পামেলির। কোনো মতে বলল, ‘মেয়েকে আন। দেখি।’ অমনি এমিলি ‘ইভা’ বলে হাঁক পারল। ডাকা মাত্রই ভেতরের ঘর থেকে বছর তিনেকের একটি শিশুকন্যা টলোমলো পায়ে বাইরের ঘরে চলে এল। বাচ্চাটার সোনালি চুল। ধপধপে ফরসা। গালদুটো লাল আপেলের মতো। কিন্তু, এ কাকে দেখছে পামেলি! এ তো অবিকল সেই ইভা পুতুল। একটুও ভুল হচ্ছে না পামেলির। ইভা পুতুলকে ওর দিব্যি মনে আছে। ইভা পুতুলের সঙ্গে দিদির একটা ছবি ছিল। ইভাকে ভুলে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। পামেলির মনে হতে লাগল, চারপাশের পুতুলগুলোর মধ্যে যেন একটা চাপা ফিসফিস চলছে। এসব সত্যি সত্যি ঘটছে? নাকি দুঃস্বপ্ন। পামেলি এবার নির্ঘাত অজ্ঞান হয়ে যাবে। এমিলি বলছে, ‘পুতুলেরা মরে, জন্মায়, কথা বলে, অসুস্থ হয় …।’ পামেলি দায় সারা বিদায় জানিয়ে এমিলির ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। বেরোনোর পরেও ওর মনে হতে থাকে, করিডোর জুড়ে যেন অদৃশ্য পুতুলেরা দাপাদাপি করছে। অধৈর্যের মতো বারবার লিফটের সুইচ টিপতে থাকে। লিফট আসছে না দেখে সিঁড়ি দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে নামতে থাকে। তাও যেন মনে হতে থাকে, একদল পুতুল ওর পেছন পেছন খিলখিল করে হাসতে হাসতে নিচে নামছে। সিঁড়ি যেন শেষ আর হচ্ছে না। উঠেছিল তিন তলায়। নামছে যেন পাঁচ তলা থেকে…।
অবশেষে পামেলি রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। আবার জমাট কুয়াশা। নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
বাড়ি ফিরেও ট্রমা কাটছে না পামেলির। এই মনে হচ্ছে টেবিলের ওপর একটা পুতুল বসে। পরক্ষণেই মনে হচ্ছে আলমারির মাথায় একখানা পুতুল। শিউড়ে শিউড়ে উঠছে বারবার। আজ তো মাকে ফোন করার কথা ছিল, না? কী বলবে ও মাকে? কী খবর দেবে? তাও একটা কল করল পামেলি। মাকে বলল— ‘মা, দিদির সন্ধান পেয়েছি।’
– ‘বলিস কী রে! কোথায় আছে সে? কেমন আছে?’
– ‘মা, দিদি না … দিদি পুতুল হয়ে গেছে!’
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news