Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / একটি কাল্পনিক চরিত্র (গল্প)

একটি কাল্পনিক চরিত্র (গল্প)

মিহির  সরকার:

জিনিয়া খেলছে। আমাকে  নিয়ে খেলছে। আজকাল দেখা হয়। কথাও হয়। কিন্তু আমার কেবলই মনে হয়— জিনিয়ার সঙ্গে দেখা হয় কোনও গভীর জলের ভিতর। দেখা হয় শুধু যেন দেখা হয়। কেউ কারও কথা বুঝতে পারি না ।

তমালতরু  সকালে দাড়ি কামাতে কামাতে কথাগুলো ভাবছিল । মনে মনে ঠিক করে নিল— আজ অফিস থেকে আগে আগে  বেরিয়ে জিনিয়াকে ডেকে নেবে গঙ্গার  ধারে। জিনিয়া বেরতে পারবে কিনা দুপুরে ফোন করে জেনে নিতে হবে। ওর অফিসেও কাজের চাপ আছে।

স্নানঘরে ঢুকে তমালতরুর মনে হল সে যেন এক বিশাল শূন্যতার ভিতর ভেসে বেড়াচ্ছে। দিনে দিনে তার ভালবাসা যেন প্রদীপের  ভীরু  শিখা। সামান্য হাওয়ায় নিভে যেতে পারে। জিনিয়া কি একটা  ঝড় আনতে চাইছে? এখন কি একা একা সূর্য উদয় দেখতে ভালবাসে? এদিকে আমার ভিতরে থাকা টগবগে ঘোড়াটা  ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে এক নির্জন পাহাড়তলীতে  ছায়া খুঁজে বেড়াচ্ছে। না না  আজ জিনিয়াকে সরাসরি প্রশ্ন করে জানতেই  হবে— রমানাথ মিত্র কে?

 

অফিস যাওয়ার আগে মাকে প্রণাম করে তমালতরু। সেদিন মাকে প্রণাম করে অফিস বেরোবার মুখে তমাল তরু  শুনতে পেল— তুই বাবা আজকাল বড্ড দেরি করিস বাড়ি ফিরতে। কেন রে?

তমালতরু  মুচকি হেসে বলল, মা আগে সন্ধের পর বাড়ি ফিরলে উঠোনে একটা নদী আসত। পাখীরা গান গাইত। এখন যে আসে না।

তমালতরুর মা  হেসে বললেন— বিয়ে কর। দেখবি বাড়িতে সব সময় নদী বইছে। পাখি গান গাইবে। নতুন হাত নিয়ে আয়। আমি আর পারছি না।

জিনিয়ার কথা জানায়নি মাকে তমালতরু। বললেই বলবে, ঘরে তুলে নিয়ে আয়। আমি আর পারছি না।  তমাল জানে তার মা ভীষণ একা হয়ে গেছে। একমাত্র দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। আসানসোলে থাকে। বাবা দিল্লিতে এক বছর হল বদলি হয়েছেন। এখন মা আর ছেলের সংসার।

জিনিয়া যে তার হাত ধরবে সে ভরসাও  পাচ্ছে না তমাল।

অফিসে যাওয়ার পথে বাসে মনে পড়ল— আজ তো ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। বেশ  কিছুদিন ধরে বা-বুকে চিন চিনে ব্যথা অনুভব করছে তমালতরু। রাতে ভাল ঘুম হয় না। তা হলে আজ নয় কাল জিনিয়ার সঙ্গে দেখা করবে।

 

২      

ডাক্তারখানায় এসেই দেখল ভিড়। নাম লিখিয়ে বসল। বসে থাকতে থাকতে তমালতরু আপন  মনে ভাবছিল— সে যেন এক কুয়াশাছন্ন  জগতে  হাঁটছে। আকাশ ঝাপসা। পাখীদের উড়ান ঝাপসা। জিনিয়া ঝাপসা। জিনিয়াকে কি আমি বোঝাতে পারিনি যে আমি যেখানেই যাই, যত দূরেই যাই আবার ফিরে আসি তার বৃত্তের ভিতরে। জিনিয়া  আমাকে এক বিশাল বিরহে রেখে তুমি রোজ রমানাথকে নিয়ে আলোর ঝর্ণায় ভিজবে। কেন?

-তমালতরু   রায় কে ?

-আমি। আমি।

-আপনি আচ্ছা লোক তো? কতবার আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আপনার নাম ডাকলাম। কানে কম শোনেন নাকি?

-না মানে একটু অন্য খেয়ালে ছিলাম।

-ভিতরে যান। শুনুন মোবাইলটা  অফ করে নিন।

ডাক্তার শুভ্র মুখার্জির ঘরে তমালতরু সুন্দর সাজানো ঘর। আলোর বন্যা বইছে চারদিকে।

-বসুন। রিপোর্টগুলো এনেছেন?

রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে তমালতরুর নাক চোখ–মুখ-গলা-কান ভাল করে দেখলেন ডাক্তারবাবু। প্রেসার মাপলেন।  তারপর বললেন, আপনার সব কিছুই তো নরম্যাল।

ডাক্তারবাবু বুকে চিন চিনে ব্যথাটা রাতের দিকে বেশি হয়। ভয়ে ঘুমোতে পারি না ।

ডাক্তারবাবু গম্ভীর গলায়  বললেন— এটা আপনার মনের ব্যাপার। অফিসে খুব চাপে থাকেন বোধ হয়।

-তা তো থাকতে হয়। এখন অফিসে কাজ বেশি লোক কম।

-সকালে হাঁটুন। মনটা সব সময় হাল্কা রাখার চেষ্টা করুন। হাল্কা এক্সারসাইজ করতে হবে নিয়মিত। মনে রাখবেন এ যুগটা চাপের যুগ।

চুপচাপ কিছু ভেবে ডাক্তারবাবু দুটো ওষুধ লিখে বললেন— সকালে খালি পেটে একটা করে খাবেন পনেরো দিন। রাতে শুতে যাবার আগে এই ঘুমের ট্যাবলেটটা খাবেন সাত দিন। তবে ঘুমের ওষুধ কন্টিনিউ করবেন না। দিন পনেরো পরে আসুন। একবার দেখে নেব।

তমালতরু কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। কিছুতেই জিনিয়ার কথা বলতে পারল না।

বাইরে বেরিয়ে ঘড়ি দেখল তমালতরু। সন্ধে সাতটা দশ। মোবাইল অন করল।  দু’ পা হেঁটে  একটা চায়ের দোকানের সামনে আসতেই মোবাইল বেজে উঠল। জিনিয়ার ফোন— বলো জিনিয়া।

-ফোন অফ করে রেখেছিলে কেন?

 

ডাহা মিথ্যে কথা বলল তমালতরু— অফিসে মিটিং ছিল।

-আজ না হয় অফিসে মিটিং ছিল, গত দুদিনে একবারও ফোন করনি? কেন?

হঠাৎ  আসা দমকা হাওয়া  তমালতরুর চুল এলোমেলো  করে দিল। তমালতরুর মনের ভিতরও প্রবল হাওয়া।

-তমাল, আমার কথার জবাব দাও। গত দুদিন ফোন করনি কেন?

-কাজের চাপ ছিল।

-শোনো তমাল, আজ আমার অফিস থেকে বেরতে একটু দেরি হবে। তুমি পার্ক স্ট্রিটের মুখে এসে দাঁড়াও। কথা আছে। শোনো তুমি আগে এসে দাঁড়াবে।

পার্ক স্ট্রিটের মুখে দাঁড়ানোর দশ মিনিটের মধ্যে জিনিয়া এসে বলল, খুব খিদে পেয়েছে। খাওয়াবে তুমি?

রেস্তোরাঁয় বসার পর জিনিয়া  জানতে চাইল, এত গম্ভীর কেন? মিটিং-এ ঝার খেয়েছ?

-ঝার খাওয়া বলতে পারো। আরও কাজের বোঝা চাপাল।

তমালতরু মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল, আজ রমানাথ নিয়ে কোনও কথা নয়। হাওয়া নিয়ে কথা বলবে। সে সুযোগ জিনিয়া করে দিল— আজ কী হাওয়া বলোতো! শাড়ি ঠিক রাখা যাচ্ছে না। তোমারও চুল এলোমেলো হয়ে আছে। তবে ভালই দেখাচ্ছে।

তমালতরু মনে মনে বলল, একদিন আমার এলোমেলো জীবনটা দেখে বলবে— ভালই দেখাচ্ছে।

মিক্সড চাউমিন খেতে খেতে তমালতরু বলল— আচ্ছা জিনিয়া হাওয়া কোথা থেকে আসে বলতে পার?

জিনিয়া চোখে মুখে বিস্ময় এনে বলল, হাওয়া আবার কোথা থেকে আসবে, আকাশ থেকে, সাগর থেকে আসে। আমার তাই মনে হয়। তুমি  বল ঠিক বললাম?

– আচ্ছা জিনিয়া  মৃত্যু কোথা থেকে আসে জান?

জিনিয়া খাওয়া থামিয়ে কপট রাগে বলল, যত সব  বাজে প্রশ্ন। জানি না।

খাওয়া প্রায় শেষের দিকে, তমালতরু  বলল— জিনিয়া আমিও জানি না মৃত্যু  কোথা থেকে আসে। তাহলে এটা তো বলতে পারবে, ভালবাসা কোথা থেকে আসে?

চুপচাপ খাওয়া শেষ করে জিনিয়া গম্ভীর হয়ে বলল— আজ তোমার কী হয়েছে? আগে বলো, এই প্রশ্নগুলো কোথা থেকে আসে?

-তুমি কাছে আসলেই প্রশ্নগুলো  জেগে ওঠে মনের ভিতর।

-আর আমি না থাকলে?

-ঘুমিয়ে থাকে।

 

তমালতরুর মুখের দিকে তাকিয়ে জিনিয়া অবাক হয়। এক অচেনা তমালতরু। তার চোখে ক্লান্ত জীবনের ছায়া। জিনিয়া নরম  সুরে প্রশ্ন করে— সত্যি তুমি জানো না তমাল, ভালবাসা কোথা থেকে আসে?

-আমার জানাটা ভুল মনে হচ্ছে বলেই তোমার কাছে জানতে চাইছি।

জিনিয়া কফির কাপে চামচ ঘোরাতে ঘোরাতে  শান্ত কণ্ঠে  বলল–আমার মনে হয় ভালবাসা আসে ভালবাসা নামে একটা দেশ থেকে।

জিনিয়া ধীরে ধীরে হাত তুলে বুকের উপর রেখে বলল, তমাল এখানে থাকে ভালবাসার দেশ। তোমারও আছে। আমারও আছে। তমাল ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞাসা  করল, তোমার ভালবাসার দেশে নদী আছে?

আছে, বলেই জিনিয়া জিজ্ঞাসা করল, তোমার কী মনে হয়?

তমালতরু যেন ঘুমের দেশে তলিয়ে যাচ্ছে। ক্লান্ত নয়নে জিনিয়ার দিকে চেয়ে বলল, আমাকে একবার দেখাবে দেশটা?

জিনিয়া অবাক চোখে দেখে তমালতরুকে। মানুষটা অচেনা হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। জিনিয়া মাথা নামিয়ে বলল, এই দেশ দেখানো যায় না তমালতরু। গভীর নির্জনতায় অনুভব দিয়ে দেখতে হয়।

তমালতরু  উঠে দাঁড়াতেই  জিনিয়া জিজ্ঞাসা  করল, তমাল তোমার ভালবাসার দেশে নদী আছে? পাখি আছে?

-নদী ছিল শুকিয়ে গেছে জিনিয়া। আমার ভালবাসার দেশটা মরুভূমি। গাছ নেই। পাখি নেই। আছে শুধু এলোমেলো হাওয়া।

 

সেদিন প্রবল বৃষ্টি। জিনিয়ার ডাকে তমালতরু  বাবুঘাটে। নদীর বুকে বৃষ্টির খেলা দেখতে দেখতে তমালতরুর মনে প্রশ্ন— এত বৃষ্টির ফোঁটা নদীর বুক ভেদ করে কোথায় যায়? জিনিয়াকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে অন্য কথা বলল। দেখো জিনিয়া নদী আজ কত খুশি বৃষ্টি পেয়ে। কত কথা বলছে। শুনতে পাচ্ছ?

জিনিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে শরীরে ঢেউ তুলে বলল, আমার মনে হচ্ছে বৃষ্টি আজ যুবতী নারী। বৃষ্টির আদর খেতে খেতে চোখ বুজে শুয়ে আছে। জান  তমাল এক সময় আমার বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ভাল লাগত।

সেদিন তমাল আবিস্কার করল—  হাওয়া কোথা থেকে আসে, কীভাবে জন্ম হয় একটা নদীর।

 

এমন সময় জিনিয়ার ফোন বেজে উঠল। ফোনে কথা বলতে বলতে এক সময় জিনিয়া বলল— আমি এখন নদীর ধারে। তমালতরুর  সাথে। নদীর সঙ্গে  বৃষ্টির কথা শুনছি। দারুন লাগছে। এক সময় জিনিয়া বলল, ঠিক আছে কাল কথা হবে। টা টা।

-কার ফোন জিনিয়া?

-সত্যি কথাই বলব। রমানাথের ফোন।

তমালতরু  মনের ভিতর ঝড় শুরু হল। সঙ্গে  প্রবল বৃষ্টি। কিন্তু শান্ত সমাহিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল— কে রমানাথ?

-গত মাসে তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম মনে নেই?

কিছুক্ষণ দু জনেই চুপচাপ। নীরবতা ভেঙে এক সময় জিনিয়া টুক করে বলল, বন্ধুর মতো। ভাল ছেলে।

-কোথায় থাকে? কি করে?

-হরিদেবপুর। রেলে চাকরি করে।

– বন্ধু  তোমার জীবনে কতদূর  এসেছে?

-উঠোন পর্যন্ত।

বাঃ খুব ভাল। বলেই তমালতরু  অনুভব করল সে একটা গাঢ় শূণ্যতার ভেতর ডুবে যাচ্ছে। তমালতরু  ঝাপসা চোখে নদী দেখতে দেখতে বলল, জিনিয়া তোমার বন্ধু যদি কোনওদিন তোমার ভালবাসার দেশ দেখতে চায় দেখাবে?

বৃষ্টিতে হাত ভিজতে দিয়ে জিনিয়া বলল, রমানাথ অন্ধ।

হঠাৎ তমালতরু  ধারালো গলায় জিজ্ঞেস করে— অন্ধ তোমার উঠোন পর্যন্ত আসে কী করে?

 

-আপনি তমালতরু রায় বলছেন

-বলছি। আপনি?

-রমানাথ মিত্র। আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে। আজ বলা যাবে?

-যাবে। বলেই তমালতরু  বলল, কোথায় বসবেন বলুন। আমার অফিসে চলে আসুন সন্ধের পর। এই ধরুন ছটা নাগাদ।

-না অফিসে নয়, অন্য কোথাও বসা যায় না?

তমালতরু তার বুকের দ্রুত ওঠা নামা অনুভব করল। তার শিরা উপশিরায় রক্তের দৌড় ঝাঁপ।

 

ধর্মতলায়  এক অভিজাত রেস্তোরাঁয়  মুখোমুখি বসে আছে তমালতরু  আর রমানাথ মিত্র।  ঝিম আলোয় মায়াময় পরিবেশ। তমালতরু প্রথম প্রশ্ন করে— আপনি এখানে এলেন কী  করে?

-কেন পায়ে হেঁটে ।

-সে তো বুঝলাম। অসুবিধা হয়নি? আপনি তো আবার অন্ধ।

-কে বলেছে? জিনিয়া?

-থাক। জরুরি কথাগুলো সেরে ফেলা যাক। বলুন।

-তমালতরু বাবু  আমি অন্ধ নই। আপনাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আপনি সাদা জামা কালো প্যান্ট পড়েছেন। আপনার বুক পকেটে সিগরেটের  প্যাকেট। চোখে চশমা।

-তা হলে আপনি অন্ধ নয়।

-আপনাকে বলি আমি অনুভব শক্তি দিয়ে আরও গভীরে  দেখতে পাই।

-কী রকম শুনি। যদি আপনার বলতে আপত্তি না থাকে।

রমানাথ একটু সময় নিয়ে বলল, অনুভব শক্তি দিয়ে অনেক কিছু দেখতে পাই আমি। যেমন আপনার মন এখন অশান্ত। আপনার বুকের ভিতরটা মরুভূমি হয়ে আছে। একটা টলটলে নদীকে আপনি মেরে ফেলেছেন।

-প্লিজ স্টপ। আর শুনতে চাই না। আচ্ছা আপনি কি আমাকে বাচ্চা ছেলে পেয়েছেন?

তমালতরু চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে রইল। মনে মনে ভাবল এ তো সাংঘাতিক মানুষ।

যে মানুষ এত কিছু দেখতে পায় সে ভালবাসবে  কি করে? ভালবাসতে গেলে অনেক কিছু না দেখাই ভাল। দেখতে নেই।

চোখ খুলে বিনীত সুরে তমালতরু জিজ্ঞেস করল– রমানাথবাবু একটা সত্যি কথা বলবেন?

-আগে শুনি।

-জিনিয়াকে ভালবাসেন?

হো হো করে হেসে উঠল রমানাথ। এক সময় হাসি থামিয়ে কেটে কেটে রমানাথ বলল, এই কথাটা আপনি জানতে চাইবেন বলেই আজ আসা।

-বলুন। খোলাখুলি বলুন।

-খোলাখুলি বলার আগে জানতে চাইব  তমালতরুবাবু, জিনিয়ার মনের ভিতর দেখেছেন?

-মেয়েদের মনের ভিতর দেখা যায়?

-সবটা না হলেও কিছুটা তো দেখা যায়। সেটুকু  দেখেছেন?

-না। রমানাথ বাবু আপনি কি দেখেছেন?

-বন্ধু হিসেবে যেটুকু দেখা যায়…

 

 ৭

কী দেখেছেন? তমালতরু জানার জন্যে যেন ছটফট করে উঠল।

-দেখেছি জিনিয়ার কান্না ভেজা মন। ওর মনের ভিতর ফুটে ছিল যত ফুল সব শুকিয়ে যাচ্ছে।

-রমানাথবাবু আমি অন্ধ বলেই এ সব কিছু দেখতে পাইনি। জিনিয়া আমাকে ভালবাসে?

আপনি ওর ভালবাসার মনটাকে দেখতে পান?

-পাই।

-কীভাবে দেখতে পান?

উত্তর পাওয়ার আগে তমালতরুর  শরীর কেঁপে উঠল।

রমানাথ ফিস ফিঙ্গার তৃপ্তিসহ খেয়ে বলল, তমালতরুবাবু আপনি এই এপিসোডকে মনে করছেন ত্রিকোণ প্রেমের। তা নয়। আর এই এপিসোডের কোনও কোণে আমি নেই বলেই জিনিয়ার ভালবাসার মনটাকে দেখতে পাই।

তমালতরু  হঠাৎ রমানাথের  হাত ধরে কাতর সুরে বলল, আমি যে জিনিয়াকে সত্যি ভালবাসি। ও কি বুঝতে পারে না?

পারে। খুব বুঝতে পারে। আর পারে বলেই আপনাদের এই এপিসোডে আমাকে রেখেছে একটি কাল্পনিক চরিত্রে মাত্র। একটানা কথাগুলো বলে রমানাথ হাঁফায়। মুখে হাসি থাকলেও কোথায় যেন লুকিয়ে রয়েছে বিষণ্ণতা।

তমালতরু তখনও রমানাথের হাত ধরে আছে। এক সময় দুজনেই বাইরে এসে দাঁড়ায়। মাথার উপর তারা খচিত বিশাল আকাশ। রমানাথ এক সময় বলে, আসলে এই কথাটা বলতেই এসেছিলাম।

রমানাথের গলা বেশ ভেজা ভেজা মনে হল। তমালতরু একটা সিগরেট ধরিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে জিজ্ঞেস করল, রমানাথবাবু আপনাকে জিনিয়া কেন এই ভাবে চাইল? আর আপনি কি এই ভূমিকায় থাকবেন চিরকাল?

তমালতরুর দেওয়া সিগরেটে আগুন ধরিয়ে  রমানাথ বার  কয়েক ধোঁয়া ছড়ে বলল, তমালতরুবাবু, মেয়েরা সব সময় একটা নিরাপত্তার বলয়ে থাকতে ভালবাসে। সেই সঙ্গে  নারী একটি কাল্পনিক চরিত্রকে সব সময় পাশে চায়। সেই কাল্পনিক চরিত্রের পাশে বসে সে গল্প করবে, এক সঙ্গে হাঁটবে বহু পথ। তাকে নিয়ে সে ঘুমোবে। এও একটা সম্পর্ক, অবৈধ  নয়। আমরা অবৈধ  ভাবি।

জোরে জোরে সিগরেটে  টান মেরে ক্লান্ত গলায় রমানাথ বলে, তমালতরু বাবু আমি যে জেনে ফেলেছি জিনিয়ার কাছে আমি নামগোত্রহীন একটা কাল্পনিক চরিত্র মাত্র। আমি যে জেনে ফেলেছি, জিনিয়া তার ভালবাসার দেশ আমাকে কোনওদিন দেখাবে না।

 

রমানাথ চলে গেল। মানুষের ভিড়ে রমানাথ, জিনিয়ার বন্ধু, আমাদের এপিসোডের কাল্পনিক চরিত্র  হারিয়ে গেল। অথচ কিছুদিন আগেও আমি রমানাথকে খুন করার পরিকল্পনা  করেছিলাম। এখন ভাবলেই মনে মনে কষ্ট পাচ্ছি। তমালতরু আপন মনে ভাবছে। আবার একটা সিগরেট  ধরায়। জিনিয়ার সঙ্গে কথা বলতে খুব ইচ্ছে হতেই ফোন বের করল। জিনিয়া ফোন ধরেই বলল, মনে পড়ল তা হলে? কোথায়?

-তুমি  কোথায়?

-হাজরার মোড়ে। রমানাথের জন্য অপেক্ষা করছি। জিনিয়া উত্তর দিয়েই হাসতে শুরু করল।

তমালতরুর প্রচন্ড হাসি পেল। কিন্তু সে হাসি চেপে গম্ভীর গলায় বলল, কে রমানাথ?

-জান না? গত মাসেই তোমার সঙ্গে আলাপ করালাম। সব ভুলে যাও। আমার বন্ধু।

তমালতরুর আবার প্রচন্ড হাসি পেল। সে হাসি চেপে রাখল। রমানাথের সঙ্গে একটু আগে ঘটে যাওয়া আড্ডার কথা চেপে গেল। শান্ত স্বাভাবিক গলায় বলল, ও হো এবার মনে পড়েছে। ঠিক আছে বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা মেরে বাড়ি যাও। কাল আমাকে একটু সময় দিও।

জিনিয়া কিছু বলতে চাইল। তমালতরু তার আগেই ফোনের লাইন কেটে দিল।

 

আজকাল  তমালতরুর বাঁ বুকে সেই চিনচিনে ব্যথাটা আর হয় না।

Spread the love

Check Also

প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে বিয়ে, করোনায় মৃত্যু হল বরের দাদার

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বড় জমায়েত করে আচার-অনুষ্ঠান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে প্রশাসনের। …

গুণমান খারাপ বুলেট প্রুফ জ্যাকেটের, চিনের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চিনের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ২০ জন …

শান্ত প্যানগং বিগত ৫০ বছর ধরে কেন ভারত-চিন সীমান্ত উত্তেজনার বড় কারন? জানুন ক্লিক করে

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: ভারত ও চীনের সেনার মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *