সৌগত রায়বর্মন:
প্রতিমা বিসর্জন মানে বেঁচেবর্তে থাকা নদ-নদীরও বিসর্জন! কতকটা জানা কথা। সেই জানা কথাকে অন্যভাবে দেখেছিলেন ‘পথের পাঁচালি’র জনক। তাঁর অপূর্ব এক ছোটগল্পে।
তবে প্রত্যেক মহৎ কাহিনির অন্তরালে আরও এক কাহিনি থাকে। বিভূতিভূষণ বন্ধোপাধ্যায়ের ‘মেঘমল্লার’ এমনই এক ছোটগল্প। সম্ভবত কোনও এক সরস্বতী পুজোর বিসর্জনের পর লেখক দেখেছিলেন— দেবী প্রতীমা ভেসে যাচ্ছে নদীপথে। তার সারা অঙ্গ যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা আছে ফুলমালার শেকল। তন্মুহূর্তে বিভূতিভূষণের মনে হয়েছিল ‘বন্দিনী সরস্বতীর’ ভাবনা। ওমনি লেখা হয়ে গেল ‘মেঘমল্লার’। কাহিনি বর্ণিত সরস্বতীকেও বন্দি করেছিল এক হিন্দু তান্ত্রিক। ফলে থেমে গেল সঙ্গীত। স্তব্ধ হল ছবি ও কবিতা। বাঁশিতে সুর উঠল না। চারিদিক স্তব্ধ। যেন ‘শেষের সে দিন…’। মানুষ হাসে না, কাঁদে না। নিঃশব্দ হয়ে গেছে আকাশ, বাতাসের মঙ্গল বারতা। কিন্তু সরস্বতীর বন্দিদশা কাটবে কী করে? এগিয়ে এলেন এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। দেবী বাগেশ্বরীকে যেভাবেই হোক মুক্ত করতে হবে তন্ত্রের হাত থেকে। শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনের বিনিময়ে বৌদ্ধ শ্রমণ মুক্ত করেন দেবী সরস্বতীকে।
অশ্রুসজল কাহিনি। বিশেষত্ব হল ফুলমালায় বন্দিনী দেবীকে মুক্ত করলেন এক মুক্ত শ্রমণ।
কাহিনির অন্তরালের কথা এই প্রতিবেদককে শুনিয়েছিলেন স্বয়ং বিভূতিভূষণ-পুত্র কথাসাহিত্যিক তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। এই কাহিনি বলতে বলতে তারাদাসদার দু’চোখে আশ্রুধারা নেমে এসেছিল। আমাদের ভারতভূমির সনাতন ধর্মের পুজো হয় ধুমধাম করে। বিসর্জন হয় আরও ধুমধাম সহযোগে। যে মূর্তি তিলতিল করে গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় চার মাস ধরে, তাকে কেন ডুবিয়ে দেওয়া হবে পচা পুকুর বা ডোবার জলে? নদীর কথা বাদই দেওয়া হল। এই বিসর্জন প্রথা শুধু যে দুর্গাপুজোর সময়ই হয়, তা তো নয়। যে কোনও মূর্তিকে পুজোর পরই বিসর্জন দেওয়া হয় এদেশে। সারা ভারতের দিকে তাকালে কালী, কার্তিক, সরস্বতী, গণেশ-এর হাজার হাজার মূর্তি ভাসান দেওয়া হয় প্রতি বছর। ফলে নদীর বায়োলজিকাল অক্সিজেন ডিমান্ড কমে যায়, কমে যায় নাব্যতা, যা পরিবেশের পক্ষে ভয়ংকর ক্ষতিকর।
সাধারণত মূর্তি বানানো হয় মাটি দিয়ে। সেটাই প্রচলিত রীতি। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিমা তৈরি করা হয়ে থাকে প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে। এবং তার ওপর যে রঙ লাগানো হয়, তা রাষায়নিক, ফলত বিপজ্জনক।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর সারা ভারতে নদীবক্ষে এক লক্ষেরও বেশি প্রতিমার বিসর্জন হয়, এবং তা একসময় নয়। বছরের নানা সময়। ফলে জল পরিশ্রুত হওয়ার সময় পায় না। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত নদীর জলে ভাসানের বিষক্রিয়া নিয়ে সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড একটি বিশেষ রিপোর্ট তৈরি করেছিল। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী কলকাতার নদীর জলে পাওয়া গেছে ১৬.৮ টন বার্নিশ তেল, ৩২ টন গর্জন তেল এবং ৫০ টন নানারকম কেমিকাল মিশ্রিত রঙ। ফলে নদীর জলে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছিল ম্যাঙ্গানিজ, শিশা, পারদ এবং ক্রোমিয়াম। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতি লিটার জলে বিষের মাত্রা বাড়ছে ০.৯৯ শতাংশ হারে।
দুর্গাপুজো যদি বর্ষার আগে আগে হত, তাহলে ভয়ের কিছু ছিল না। বর্ষা ভেজা নদী হয়তো বিষ প্রতিহত করতে পারত কিছুটা। কিন্তু শারদীয়া উৎসব শরৎ-এ। সামনে শীতকাল। অতএব বৃষ্টি হবে না। বিষের মাত্রা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে বলা বাহুল্য। তাহলে উপায়?
এ এক উভয়সংকট। এ দেশের প্রধান ধর্ম পৌত্তলিক। মানুষ মূর্তিকে ভক্তিভরে পুজো করে। নিজের আশা আকাঙ্খার কথা জানায়। অন্যদিকে এই ভয়ংকর বিষক্রিয়া! সমাধানের একটা উপায় নিশ্চয়ই আমাদের খুঁজে পাওয়া উচিত।
প্রথমত, নিয়ম হোক— মাটি, খর ও জৈব রঙ ছাড়া মূর্তি বানানো যাবে না। শব্দবাজি যদি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তবে প্রতিমা তৈরিতেও দায়িত্ববোধ দেখানো সম্ভব। পাশাপাশি যে প্রতিমা বিষর্জন দেওয়া হবে, তা হোক প্রতিকী। মাপে হোক ক্ষুদ্রকার। থিম পুজোয়ে ব্যবহৃত বস্তু সামগ্রী সংরক্ষণ হোক নয়। এখন তো ইন্সটলেশন আর্টের যুগ। এবং পুজোর অপূর্ব শিল্পকর্ম ছড়িয়ে দেওয়া হোক গ্রামে-গঞ্জে, পথে-প্রান্তরে। তা না হলে কিন্তু বড় বিপদ আসছে সামনে।
দেবী বাগেশ্বরীর গলায় ফুলের মালাকে শৃঙ্খল মনে হয়েছিল বিভূতিভূষণের। কিন্তু বিসর্জনের নামে যে বিষ ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য নদীর জলে তার জন্য কি আমরা একটুও সচেতন হব না?
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news