Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’, আজ শেষ পর্ব

ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’, আজ শেষ পর্ব

 সৌমিককান্তি ঘোষ

গত সংখ্যার পর…

তার ভরন্ত ফরসা মুখে দীঘল কালো চোখ, বাঁ ঠোঁটের নীচে কালো তিল। তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নেয় কাশীনাথ। ঘটি নিয়ে আলগোছে জল খেয়ে বাঁ হাতের চেটো বুকের উপর রেখে হাঁফ ছাড়ে নাসিফা। ডুকরে উঠে বলে, “আব্বু আমাকে আর ঘরে তুলবেনি, জাহান্নামে বাস হবে গো আমার।” আবার মুখে ওড়না গুঁজে কাঁদতে শুরু করে সে। সদানন্দ কাশীনাথের নামাবলীতে টান দেয়, “দেখতো, নগা মনে হচ্ছে না! এদিকেই যেন দৌড়ে আসছে।” “হ্যাঁ তাই তো!” উঠে দাঁড়ায় কাশীনাথ, সঙ্গে সদাও। হন্তদন্ত হয়ে মন্দিরের চাতালে প্রায় আছড়ে পরে নগা, “কাশী, কাশী, কী করেছিস কাশী? শেষে কিনা একটা মুসলমানের মেয়েকে।” আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল নগা। “থাম্, কী হয়েছে তাই বল”, কাশীনাথের গলায় দৃঢ়তা। “ঐ দিকে যে আগুন জ্বলছে কাশী, সারা গ্রাম এক হয়ে আসছে এই শ্মশান পানে। মেয়েটাকে ছেড়ে দে, তুই পালা কাশী তুই পালা।” নগা যেমনি ঝড়ের বেগে এসেছিল তেমনি নিমেষে অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেল। ঘুরে দাঁড়ালো কাশীনাথ, “কালু আর ভোলাকে খবর দে সদা, আমি নাসিফাকে নিয়ে মায়ের ঘরে ঢুকলাম, কেউ যেন ঘরের দরজা না খোলে। উঠো আমার সঙ্গে এসো।” এক হ্যাঁচকা টানে নাসিফাকে নিয়ে মায়ের ঘরের দরজায় খিল দেয় কাশীনাথ। সদানন্দ অবাক হয়, এ যেন অচেনা অন্য কাশীনাথ। আর কিছু ভাবার আগেই সে বুঝে গেল যাই হোক না কেন এখুনি কাশীনাথের কথা পালন করতে হবে। চূড়ান্ত ব্যস্ততায় সে দৌড়াল সাধু, কালুর খোঁজ করতে।
নগার কথাই ঠিক হল। সাধু কালুর সঙ্গে যখন সদানন্দ মায়ের দরজার সামনে পাহারায় দাঁড়াল ততখণে গ্রামের প্রান্ত মুখে আগুনের শিখা পুঞ্জীভূত হতে শুরু করেছে। ঐ পুঞ্জীভূত আগুন যেন ক্রমশই এক সর্পিল আলোর রেখা হয়ে অন্ধকারের আবছায়ায় সরীসৃপ কীটের মতো ঢেউ খেলিয়ে মন্দিরের দিকেই আসতে লাগল। চেঁচিয়ে উঠলো সদানন্দ, “দেখ ওরা আসছে, পারবি তো?” মনে মনে ভাবল দুটো নিতান্তই কচি বয়সের ছেলে, মা রক্ষা করো, হায় বিধাতা, কালো অন্ধকারের নিসর্গ চেতনায় অন্যায় অনাচারের কুশ্রী চারিত্র-দৈন্যতা বিচারের ভার কাদের উপর দিলে! তাদের বীরবাহু বীরত্ব আস্ফালনে কেঁপে উঠল শ্মশান কালীর মন্দির। সাধু কালু হাতে লাঠি নিয়ে জোড় হয়ে দাঁড়াল। মায়ের ঘরের দরজার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল সদানন্দ। অসংখ্য মশালের আলোয় ভেসে যেতে লাগল এই মন্দির চত্বর। সদানন্দ লক্ষ করল এই ভিড়ে যেমন মনু সর্দার আছে তেমনি আছে রশিদ চাচাও।

ভীড়ের মধ্যে থেকে লাঠি হাতে বেড়িয়ে এল রশিদ চাচা। “নাসিফাকে ছেড়ে দে।” সদানন্দ বলে উঠল, “চাচা আমার কথা শোনো, নাসিফাকে আমরা ধরে রাখিনি। ও প্রাণ ভয়ে মন্দিরে ছুটে এসেছিল, মা ওকে আশ্রয় দিয়েছে, আর ঐ মনুরাই ওকে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছিল, জিজ্ঞেশ করো ওকে।” কথাগুলো একটানা বলে সদানন্দ এগিয়ে গেল রশিদ চাচার দিকে। লাঠি ঠুকে চেঁচিয়ে উঠল রশিদ চাচা, “খবরদার, আল্লার নামে বলছি, গল্প বলিস না সদা, কাশীনাথ কোথায়? বেরিয়ে আসতে বল্, আমার নাসিফাকে নিয়ে আয়।” পিছু হটে সদানন্দ, চেঁচিয়ে ওঠে মনু সর্দার, শালাকে শেষ করে দেব।” “শেষ করবি কর।” বুক চিতিয়ে এগিয়ে যায় সদানন্দ। মনু সর্দারের চোখে চোখ রেখে বলে, “তোরা মিথ্যে বলছিস, কাশীনাথ কিছু করেনি। সে নাসিফাকে বাঁচিয়েছে। আশ্রয় দিয়েছে। মা তোদের ক্ষমা করবে না।”
“শালা, চাষার বেটাটাকে তখন শেষ করলি না কেন? তোর বড় রোয়াব হয়েছে না! এক কোপে নাবিয়ে দেব, “সদানন্দের দিকে ঘাড় শক্ত করে তাকায় মনু সর্দার।” কাশীনাথ নিশ্চয় মায়ের ঘরে, এই তোরা এদিকে আয়, দরকার হলে দরজা ভাঙব। মন্দিরে এসব নষ্টামি করতে দেব না।” নড়ে ওঠা ভিড়টা যেন গিলতে এলো সাধু কালুকে। খড়কুটোর মতো উড়ে গেল তারা। সদানন্দ দুহাত আর পিঠ দিয়ে দরজা আগলে দাঁড়াল। “আল্লা কসম নাসিফার কিছু হলে তোদের ধড় থেকে মুণ্ডুগুলো আলাদা করে দেব। শালা কাপুরুষের বাচ্চা বেরিয়ে আয় বলছি।” রশিদ চাচার হুঙ্কারে কেঁপে উঠল রাতের বাতাস। ক্ষণিকের নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল সমস্ত পরিবেশ। কেউ কোনও শব্দ করছে না। নিদারুণ এক নির্জনতা। হঠাৎই খিল পড়ার আওয়াজ হল, মায়ের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এল কাশীনাথ, পিছনে নাসিফা। কাশীনাথকে ঠেলে রশিদ চাচা এগিয়ে এল। অস্ফুট স্বরে শুধু মুখ থেকে বেড়িয়ে এল, “নাসিফা।” মুখ তুলে তাকালো নাসিফা। মাথা থেকে বরখার ঘোমটা কাঁধে নেমে এসেছে। উন্মুক্ত সিঁথিতে জ্বলজ্বল করছে তেল রঙা সিঁদুর। ফর্সা কপাল থেকে এক টুকরো সিঁদুর যেন গলে নেমে এসেছে নাকের উপরিভাগে।” কী করেছিস তুই নাসিফা? কী করলি এটা?” রাগে কাঁপতে লাগল রশিদ চাচা। এগিয়ে এসে চুলের মুঠি ধরতে গেল নাসিফার। সরে এল কাশীনাথ। চাচার ডান হাতের কব্জি তখন কাশীনাথের পাঁচ আঙুলের মধ্যে। “খবরদার চাচা, ও এখন আমার বউ। মা’কে সাক্ষী রেখে ওকে বিয়ে করেছি। ওর গায়ে হাত তুলবে না।” হাত ছাড় কাশীনাথ, ও আমার মেয়ে, আমি ওর নিকাহ দেব। তোর সাহস হয়ে কী করে ওকে ছোঁয়ার?” এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয় রশিদ চাচা। “আল্লার রাজত্বে কী ছোঁয়া বারণ? বলছি না আমি ওকে বিয়ে করেছি। মায়ের পায়ের সিঁদুর লাগিয়ে দিয়েছি ওর কপালে।” নাসিফাকে পিছনে টেনে নেয় কাশীনাথ। “শালা শুয়ার, মার সবাই মেরে শেষ করে দে।”

মনু সর্দারের নির্দেশে একদল অনিয়ন্ত্রিত উন্মত্ত পশু ঝাঁপিয়ে পড়ল কাশীনাথের ওপর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লুটিয়ে পড়ল সদানন্দ। সদানন্দকে বাঁচাতে ভিড়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল কাশীনাথ। কিন্তু হায় বাস্তব বড় নির্মম। ঐ উন্মত্ত জনতাকে ঠেকানোর সাধ্যি ছিলো না এই দুই জনের। অস্পষ্ট আবছায়ায় মৃতপ্রায় আচ্ছন্নতায় কাশীনাথের কানে ভেসে এসেছিল, “আব্বু আমাকে ছেড়ে দে, আমি ওর কাছে যাবো, ঠাকুরকে আমি নিকাহ করেছি।”
“সকলি তোমারি ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী মা তুমি।” কাশীনাথের গলার স্বরে হঠাৎই ঘোর কাটলো সদানন্দের। “অ্যাঁ, কাশী কিছু বলছিস?” “বলছি, এ জগতে আর কোথা থেকে ঘুরে এলি? তুই তো এ জগতে ছিলি না সদা!” সদানন্দ কোন কথা বলল না। তার শুধু মনে পড়ল, সেই রাতের পর থেকে কেউ কোনদিনও রশিদ চাচা আর নাসিফাকে এ গ্রামে দেখোনি। রাতের অন্ধকারে কাশীনাথকে অনেকেই নাকি মুসলমান পাড়ায় নাসিফার খোঁজ করতে দেখেছে। কিন্তু ইনশাল্লাহ, নাসিফার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। দৃশ্য জগতের পশ্চাতে যে আর এক জগত বিদ্যমান তার খোঁজ কি আমরা সবসময় পাই!! হা ঈশ্বর, স্বপ্ন ও জাগরণের, লৌকিক এবং অতিলৌকিক শক্তির মধ্যবর্তী অবস্হায় মানব জীবনের অসহায়তা, কাশীনাথ ও নাসিফার জীবনের অপূর্ণ প্রতিচ্ছবি সুস্পষ্ট করে দিল।
“এবার তুই বাড়ি যা সদা,” দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে কাশীনাথ। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে সদানন্দ। ”কিছু বলবি?” কাশীনাথ ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেশ করে। সদানন্দ দাঁড়িয়ে থাকে, “আচ্ছা কাশী, নাসিফাকে তোর মনে পরে? এমনি এক রাতে।” কাশীনাথ হাত তোলে, “বাড়ি যা সদা অনেক রাত হল।” পিছন ফিরে দরজা বন্ধ করে সে। খিল তোলার শব্দ হয়। সদানন্দ হাঁটতে থাকে বাড়ির পথে। বৃষ্টির ঝাপটায় আরও ভিজে যায় সে। সদানন্দের মনে হয় রাতে বৃষ্টিটা আরও বাড়বে।

( সমাপ্ত)

Spread the love

Check Also

রবিবারের কবিতা, রঙ্গীত মিত্র

  রঙ্গীত মিত্র   পরিত্যক্ত পুকুর ——————– ভাঙা পাঁচিলের পিছনের অতীত মধ্যরাতে বাদুড়ের সঙ্গে কথা …

আজ লোকটার ভেতরে শীত, বাইরে পৌষ, সব্যসাচী হাজরা’র কবিতা

সব্যসাচী হাজরা লোকটা-১ দঙ্গলভাইরা কোথাও জেগে থাকে শ্মশানের ম্যাপে আগুনের ভাইহো চলার হুবহু বলো থাকেনা …

রবিবারের কবিতা, কিশোর ঘোষ

 কিশোর ঘোষ চলুন বেড়িয়ে আসি ছুটি কি শালুকফুলের মূল? পিংলার পলিউশনহীন তারা? রাতের মতোন দিন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!