Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’

ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’

 সৌমিককান্তি ঘোষ

 

কাশীনাথ বামুন

গত সংখ্যার পর—

 

“ঠাকুর এসেছে গো” উঠোন থেকে সদানন্দের বউ হাঁক দেয়, “টিনের দোরে আসনটা দাও, বসুক ওখানে, আমি আসছি”, মাথায় কাপড় দিয়ে ঘর সংলগ্ন টিনের ছাউনির তলায় আসন বিছিয়ে দেয় সদানন্দের বৌ। “ঠাকুর এইখানে বসুন, ও আসছে,” ধুতির কোঁচা সামলে কাশীনাথ মুখে একটা শব্দ করে আসনের ওপর বসে। “বৃষ্টিতে মাঠে জল থৈ থৈ করছে, আনাজগুলো তো পচছে, তাই কোদাল নিয়ে মাঠে আল কাটতে গেসলো, এই ফিরলো, দুটো ভাত নিয়ে বসেছে। আপনি বলেন ঠাকুর ওর হল বলে”, এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো ব’লে পিছন ফিরে সদানন্দের বউ। গলা খাঁকারি দিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে সদানন্দ। গামছাটা টিনের দোরের ভিতরের দিকে চারিয়ে দিয়ে, হাঁটুর উপর লুঙ্গিটা তুলে কাশীনাথের সামনে বাবু হয়ে বসে। “তুমি দুটো খেয়ে ভাত ও জল ঢেলে দাও, কাল সকালে এক মুঠো খেয়ে ডাঙার জমিটা কাটতে যাবো।” বউয়ের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে কোমড়ে জড়ানো লুঙ্গি থেকে বিড়ির বান্ডিল বের করে সে। একটা বিড়ি বের করে এগিয়ে দেয়। বিড়িটা মুখে দিয়ে ইশারায় আগুন চায় কাশীনাথ। সদানন্দ উঠে কুলুঙ্গী থেকে দেশলাই বাক্সটা ছুঁড়ে দেয় কাশীনাথের কোলে। “এবেলা পুজো হয়ে গেল তাহলে!” সদানন্দ সামনে বসে পরে। খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে উত্তর দেয় কাশীনাথ, “হাঁ মায়ের কাছে হাজিরা দিয়ে এলাম, সকালে যেতে পারিনি, মা আমার অভুক্ত থেকে যেত রে।” পায়ের উপর পা তুলে বসে কাশীনাথ। সদানন্দ বিড়িটা দাঁতে চেপে ঘাড় নিচু করে বাইরে হাত বাড়ায়। “নাহ্ জলটা একটু ধরেছে মনে হচ্ছে।” “হাঁ তবে রাতে আরও হবে মনে হয়। আকাশের কান্না কখন বাড়ে কমে বোঝা মুশকিল।” ” তা যা বলেছিস, মাঠ আর পুকুর এক হয়ে গেল, ফসলের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল রে কাশী।” “সব মায়ের ইচ্ছা, তোর আমার হাতে কিছু আছে? মা-ই সবাইকে দেখবে।” একটু থামে কাশীনাথ, “তোর তো তবু সংসার, ছেলে পিলে সবই আছে। আমার আর কে আছে বল! মা-ই সব আমার কাছে, সাধু কালুকে বলেছি মরলে দেহটার সৎকার করিস।” “তুই তো তবু ভালো আছিস কাশী, দুবেলা মায়ের দেখা পাস, আর আমি এই বয়সেও জল, কাদা, মাটি, নাহ্ আর ভালো লাগে না। এরপর যেদিন মরব, এ গ্রাম ও গ্রাম থেকে ছেলে মেয়েরা আসবে, দেহটাকে টানাটানি করবে। মরেও শান্তি নেই।”

দুজনেই খানিক নিশ্চুপ। সন্ধ্যার পশ্চাতে জীবন সায়াহ্নে দুই বন্ধুর কথোপকথনে অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করল। বাতাসে জলীয় বাষ্পের ঘনত্ব বেড়ে পরিবেশকে যেন হঠাৎই ভারী করে তুলল। দূরে হরিবোল রবের মধ্যে দিয়ে আরো একবার যেন প্রতিষ্ঠিত হল জীবনের শেষ সত্য। সদানন্দের বউ অন্ধকারের মধ্যেই মাথায় কাপড় ফেলে হ্যারিকেনের আলোয় উঠোন থেকে খুঁটি নিয়ে চলল গোয়াল ঘরের দিকে। ‘হাম্বা’ শব্দ বিদীর্ণ হল পরিবেশের গাঢ়ত্ব। এও এক জীবন সত্য। সারাদিন পর বাছুরকে কাছে পেয়ে মায়ের আনন্দ-ধ্বনি। তার যে দুধের বাঁট টনটন করছে, সদানন্দের বউ বাছুরের মুখ ঠেকিয়ে দেয় তার মায়ের বাঁটে। বাছুরের গা চাটতে শুরু করে মা। গোয়াল ঘরের দরজায় আগল তোলে সদানন্দের বউ। টিনের দোরে শুধু জ্বলতে থাকে দুটো আগুনের ফুলকি।
“নাহ্ এবার উঠিরে সদা, রাত বাড়ছে।” টিনের দোর থেকে পা দুটো উঠোনে রাখে কাশীনাথ। লুঙ্গি ঝেড়ে উঠে পরে সদানন্দ। “আমি কি তোর সঙ্গে খানিকটা যাবো? ওদিকটায় তো আলোর ছিটেফোঁটা দেখছি না।” হালকা ঝিঁঝিঁর সুর, আর রাতের নির্জনতাকে অবাক করে হা হা শব্দে হেসে ওঠে কাশীনাথ, “ওরে সদা ভুলে যাস না আমি কাশীনাথ, মায়ের চরণে আমার বাস, আমাকে ডরাবে কে? আর আমার আছেটাই বা কী? ” সদানন্দ চুপ করে থাকে, নিগূঢ় নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে কাশীনাথের অট্টহাসি যেন বর্ষার ঘন কালো মেঘের মধ্যে এক ঝলক বিদ্যুৎ, যা সদানন্দকে আছড়ে ফেলে যৌবনের চর-ডাঙায়। সেদিনও ছিল এমনি এক বর্ষা মুখর রাত। কাশী সদ্য মায়ের আরতি শেষ করে মাকে শীতল দিচ্ছে। এখনই মন্দিরের দরজায় তালা চাবি দেওয়ার শব্দ হবে। সদানন্দ তখন শ্মশানের দিককার দাওয়ায় বসে বাঘ-বন্দির ছক কাটছে। দুই বন্ধু এক হাত খেলে তবে বাড়ির পথ ধরবে। কিন্তু হায়! বিধাতা হয়তো অন্য কিছু ভেবে রেখেছিল। নিস্তরঙ্গ, শান্ত, নির্জন রাত হঠাৎই কাতর আর্ত চিৎকারে কেঁপে উঠল। সদানন্দ হাতের খড়ি ফেলে এগিয়ে এল মন্দিরের সামনের দিকে। ততক্ষণে মায়ের ঘরে চাবি দিতে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কাশীনাথও। আবছা অন্ধকারে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও এটুকু পরিষ্কার কোনও একটা মেয়ে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এদিকপানেই ছুটে আসছে। পিছনে একটি ছোট দল, কয়েকজনের হাতে লাঠি সোটাও আছে মনে হল। ঘটনার আকস্মিকতায় সদানন্দ আর কাশীনাথ দুজনেই কিছুটা হতবাক। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটি রাস্তা ছেড়ে মন্দিরের ঢাল বেয়ে নেমে এল। সদানন্দের সামনে দিয়ে আছড়ে পরল মায়ের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ানো কাশীনাথের চওড়া বুকের উপর, “আমাকে বাঁচাও ঠাকুর।” কাশীনাথের হাত থেকে তালাচাবি পড়ার ঠক্ করা আওয়াজ কানে এল সদানন্দের।

“নাসিফা” অস্ফুট স্বরে বলে উঠল সদানন্দ। মুসলমান পাড়ার রশিদ চাচার মেয়ে কাশী।” কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল সে, বাঁ হাতের ইশারায় কাশীনাথ থামাল সদানন্দকে। ততক্ষণে একটা ছোট ভিড় মন্দিরের সামনেটায় জমাট বেঁধে গেছে। আশ্চর্য এক নীরবতা ছেয়ে গেল, ঝিরঝিরে বৃষ্টির সঙ্গে এলোপাথাড়ি হাওয়া, লন্ঠনের দপদপ করতে থাকা আলো, শশ্মানের পোড়া গন্ধ আর শকুনের তির্যক ডাকে সমগ্র পরিবেশটা যেন সহনীয় অনুষঙ্গে মূর্ত হয়ে উঠল। ভীড়ের মধ্যে থেকে বেড়িয়ে এল মনু সর্দার। গ্রামে তার বড় দাপট। “ওকে ছেড়ে দে কাশী, আমরা ওকে নিয়ে যাব।” মনু এগিয়ে এল কাশীর দিকে; মন্দিরের সিঁড়িতে পা দিতেই হুঙ্কার দিয়ে উঠল কাশীনাথ, “খবরদার, এক পা এগোলে ফল ভালো হবে না বলছি। ফিরে যা মনু, মায়ের মন্দিরে কোনও অঘটন আমি ঘটতে দেব না।” অজান্তেই সদানন্দের মাথার উপরেও হাত উঠে গেল। নাসিফা খামচে ধরলো কাশীনাথের পিঠের পেশী। থমকে গেল মনু, নড়ে উঠলো ভিড়, তাদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠলো মনু, “কি দেখছিস, ছিনিয়ে আন মেয়েটাকে।” সদানন্দ দেখল ভিড়ের মাথার উপর লাঠিগুলো যেন একজোট হচ্ছে। এক লাফে সে কাশীনাথকে আড়াল করে দাঁড়ালো। “একদম এগোবি না মনু, কাশীনাথের গায়ে হাত পরলে সে হাত গুঁড়িয়ে দেব।” ক্রমেই ভিড়টা আরও কাছে চলে এল। কে একজন যেন ধাক্কা মেরে ফেলে দিল সদানন্দকে। ভেসে এল মনু সর্দারের গলা, “চাষার পোটাকে আগে শেষ কর, শালা স্যাঙাত হয়েছে।” মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সদানন্দ। বাঁশ, লাঠি, কঞ্চি পড়তে লাগল সদানন্দের শরীরে। হঠাৎই ভেজানো দরজা ঠেলার শব্দ কানে এল সদানন্দের সঙ্গে কাশীনাথের হুঙ্কার, “শালা শুয়োরের দল, ক্ষমতা থাকে তো আমাকে মার, এগিয়ে আয়।” কোনক্রমে চোখ খুলে তাকাল সদানন্দ, কিন্তু এ কি দেখছে সে, কাশীনাথের গা থেকে খুলে পরছে লাল নামাবলী, ধুতির কোঁচা সর্পিয় আকৃতিতে কোমড়ে জড়ানো, চওড়া বুকে আতঙ্কে চোখ বুজে নাসিফা আর পেশীবহুল হাতে কাশীনাথ তুলে নিয়েছে মায়ের হাতের খাঁড়া। এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, এক অনুপলব্ধ সত্য, ইতিহাস নিহিত বিলোড়িত মুহূর্ত, স্বয়ং শিব যেন পার্বতীকে জড়িয়ে ধরে আছে। এক অতিলৌকিক, অপর আলোয় উদ্ভাসিত হতে লাগল এই শশ্মানকালীর মন্দির প্রাঙ্গণ, একজনও এগিয়ে এল না, মনু সর্দার হাত তুলে ইশারায় কী যেন বলল, সদানন্দ বুঝতে পারলো না। ক্লান্ত, অবসন্ন দেহে চোখের পাতা বুজে এল সদানন্দের। অনন্ত অতলে যেন তলিয়ে যেতে লাগলো সে, ধোঁয়া ধোঁয়া আলোয় দেখতে পেল কাশীনাথ যেন জলের ঘটি নিয়ে তার মাথার কাছে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ জলের ছিটেতে সদানন্দের সঙ্গা ফিরল। হাওয়ায় জলের ঝাপটা এসে লাগলো মুখে। “আর কতদূর যাবি সদা, আমার বাড়ি যে চলে এল।” কাশীনাথের গলার শব্দে বুঝতে পারল বহুদূরের অতীত ছুঁয়ে সে ফিরে এসেছে বর্তমানের আলো আঁধারির পথে। মুখে কিছু বলল না, শুধু কাশীনাথের পিঠ স্পর্শ করল সে। কেমন যেন একটা আচ্ছন্ন ভাব তাকে পেয়ে বসেছে। বার বার ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে সেই সুদূর অতীতে। সে বড় অস্থির সময়। একই জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা মানুষগুলো একে অপরকে অবিশ্বাসের চোখে দেখতে শুরু করে। যে লোকটা মন্দিরে গেল সে আর দরগায় গেল না, যে লোকটা দরগায় গেল সে আর মন্দিরমুখো হতে চাইল না। অবিশ্বাস আর অসহিষ্ণুতা একটা শান্ত গ্রামকে রাতারাতি শান্তিহীন করে তুলল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সদানন্দ। যখন তার জ্ঞান এল তখন মাথার কাছে বসে কাশীনাথ, হাতে জলের ঘটি। একটু দূরে থামে হেলান দিয়ে বসে নাসিফা। দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। ধড়মড় করে উঠে পড়ে সদানন্দ। কাশীনাথের দু’কাঁধ চেপে ধরে। “কী হল? ওরা কোথায় গেলো? ”

“চলে গেল” নির্লিপ্ত উত্তর কাশীনাথের। বড় অদ্ভুত পরিস্থিতি, অথচ সহনীয় অনুষঙ্গে মূর্ত। ঘটিটা রেখে মায়ের দরজার সামনে হেলান দেয় কাশীনাথ। সদানন্দ উঠে বসে, নাসিফা তখনও কেঁদে চলেছে। কারোর মুখে কোনও কথা নেই; রাত বেড়ে চলেছে, লন্ঠনের আলো একটু যেন বেশিই দপ্দপ্ করছে, বৃষ্টির ওঠাপডার সঙ্গে দমকা হাওয়া, দূর থেকে শেয়ালের ডাক, সব মিলিয়ে এক অজানা অস্থিরতা পেয়ে বসল সমগ্র পরিবেশকে। নিস্তব্ধতা ভেঙে সদানন্দ জিজ্ঞাসা করল, “এখন কী করবি কাশী?”

কাশীনাথ উত্তর দেয় না, জলের ঘটিটা এগিয়ে দেয় নাসিফার দিকে, “কেঁদো না জল খেয়ে নাও, মা নিশ্চয় একটা ব্যবস্থা করবে।” এক চোখ জল নিয়ে মুখ তোলে নাসিফা।

(ক্রমশ)

Spread the love

Check Also

‘মুখে মুখ দিয়ে ছিনিয়ে নিচ্ছি চুম্বন আর ভাত’, কবিতাগুচ্ছ, সবর্না চট্টোপাধ্যায়

 সবর্না চট্টোপাধ্যায় খিদে কিছুটা স্তব্ধ হলে ভাবি কিভাবে কেটে যাচ্ছে রাত। মুখে মুখ দিয়ে ছিনিয়ে …

রবিবারের কবিতা, কমলেশ পাল

 কমলেশ পাল:   কী জানি চন্দনচুয়া কী জানি চন্দনচুয়া চুনেতে খয়ের চুমুতে নারীকে আর রাঙাতে …

ধারাবাহিক ‘ভাষার ভাসান’, আজ ‘পেটকাটা মূর্ধন্য ষ’, ‘খিঁয়, ‘ঋ-ফলা’ কোথাকার!

 সংকল্প সেনগুপ্ত: বাংলা ভাষা জীবনানন্দে (দাশ) যা সতীনাথে (ভাদুড়ী) তা না, হুতুমে যেমন তার থেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *