Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / হিন্দোল ভট্টাচার্যের কলমে ভবঘুরের পাঠক্রম, দ্বিতীয় পর্ব

হিন্দোল ভট্টাচার্যের কলমে ভবঘুরের পাঠক্রম, দ্বিতীয় পর্ব

হিন্দোল ভট্টাচার্য:

“ তুমুল বৃষ্টির রাতে মনে হয় বাতাসতাড়িত

তোমার শরীর জুড়ে আমিও মেঘের মতো ভেঙে পড়ি, মুষলধারায়

তোমাকে ডুবিয়ে রাখি বুকজলে, বাঘের নিঃশ্বাসে

ঝড়ের দাপটে যেন শিকারিতাঁবুর মতো ফুলে ওঠে স্তন

যেন তুমি বলে ওঠো, ‘আর নয়, আর নয়, জনপদ ধ্বংস হয়ে যায়’

তারপর থেমে যাই, গোপন জানালা থেকে শেষবিন্দু জল ঝরে, পাশে

ছিন্ন টেলিগ্রাফ-খুঁটি পড়ে থাকে ঘন ধানখেতে

সমস্ত বিছানা জুড়ে মেঘাচ্ছন্ন চুল, হাওয়া, চকিত বিদ্যুৎ,

নিষ্ঠুর বিরতি—যেন ওলটানো লরির পাশে শুয়ে আছে জাতীয় সড়ক

‘আবার কি বৃষ্টি হবে, আরও ঝড়?’ তুমি চাপা, উদগ্রীব গলায়

আমাকে জিজ্ঞেস করো, কথা শুনে আকাশ স্তম্ভিত

‘অবশ্যই’- আমি বলি, সম্মোহিত লরির চালক”

(প্ররোচনা, রণজিৎ দাশ)

 

কয়েকদিন আগেই স্বয়ং কবির সঙ্গে এক নিভৃত আলাপচারিতায় তিনি বলছিলেন, প্রত্যেক বিশিষ্ট কবির বৈশিষ্ট্য হল একটি সিগনেচার ভাষা। কিন্তু সেটি কী? সেই ভাষাটি কি আপনা থেকেই আসে, না কি কবিকে খনন করে সেই ভাষাটিকে আবিষ্কার করতে হয়? ভাষাটির প্রাণের স্পন্দন তবে কি তার সিন্ট্যাক্সের ব্যবহারে না কি তাঁর বোধির অন্তর্গত জগতে? তিনি কি তবে কীভাবে বলতে হবে, তা নিয়েই ভাববেন, না কি কী বলছেন, সেটি নিয়ে।

এই ভাবনার কাছে এসে অনেক সময়েই মন যখন আটকে পড়ে যায়, তখন আবার এও দেখি, অনেক সময় কীভাবে বলতে হবে, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে কী বলতে হবে, সেটিও বদলে যাচ্ছে। যেন বা উপযুক্ত ভাষার জন্য অপেক্ষা করেছিল উপযুক্ত বিষয়। সেই বিষয়, সেই ভাবনা যেন স্বস্তি খুঁজে পেল তার বাহক ধারক ভাষার কাছে এসে। এবার আর প্রাণ ছটফট করবে না তাঁর। এবার আর মনে হবে না, বলা তো হল না সবকিছু। উপরের কবিতাটি যেমন। গোটা অভিজ্ঞতাটিই সঙ্গমের। হয়ত আগেও অনেকে লিখেছেন। অনেকবার লিখেছেন। কিন্তু এই কবিতায় তাকে আবিষ্কার করার রাস্তাটিই আলাদা। ফলে অভিজ্ঞতাটি চিরপুরনো হয়েও চিরনতুন। আর এখানেই কবির বোধির দৃষ্টি। প্রকৃতি মানেই তো শুধু সবুজ ঘাস, গাছ, মেঘ বা আকাশ বা দিগন্ত নয়। প্রকৃতি মানে এই আমাদের চারপাশে থাকা আটপৌরে পৃথিবীও। আমাদের নিত্যদিনের জীবনযাপনের মধ্যেও লুকিয়ে আছে প্রকৃতির সঙ্গে আলাপচারিতা, আমাদের জীবনকে অন্য একটি ক্যানভাসে খুঁজে পাওয়ার দীর্ঘ সাধনা।

মনে পড়ে বিনয় মজুমদারের ভুট্টা সিরিজের কবিতাগুলির কথা। কী নিপুণ ভাবে অভিজ্ঞতাগুলিকে যৌনতার নতুন প্রতীকের প্রেক্ষিতে তিনি পুনরায় রচনা করেছিলেন। যৌনতার যে সব প্রতীক আমরা জানতাম ঐতিহ্যের হাত ধরেই, তিনি সেই সব প্রতীককেই আবার নতুন করে জন্ম দিয়েছিলেন।

 

বসা শেষ হয়ে গেলে দেখা যায় ভুট্টা অতি সামান্যই নরম হয়েছে ।

নদী সোজা উঠে পড়ে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি গ্লাসের বাহিরে

রস লেগে আছে কিনা, নদী তার হাত দিয়ে আমার ভুট্টাটি

তখন — বসার শেষে ককনো ধরে না, ভুট্টা রসে ভেজা থাকে ।

আমি কিন্তু হাত দিই, ঘাসের উপরে হাত বোলাতেই থাকি,

ঘাস টেনে টেনে দেখি, অনেক অশ্লীল কথা অনায়াসে বলি ।

নদীর গ্লাসের দৃশ্য — গ্লাসের বাহিরটিকে প্রাণ ভরে দেখি

( গ্লাসের ভিতরে দেখি বসার সময় শুধু ) বসা শেষ হলে

গ্লাস খুলে দেখতে সে এখনো দেয়নি আমি বহির্ভাগ দেখি ।

হঠাৎ বেলের দিকে চোখ পড়ে, মুগ্ধ হয়ে যাই ।

বেল দুটি এ বয়সে অল্পপরিমাণ ঝুলে পড়েছে, সে দুটি

মনোমুগ্ধকর তবু চোখ ফের নেমে আসে নিচের গ্লাসের দিকে, সেই

গ্লাসের উপরিভাগ বসার সময়ে যতো দেখেছি

এখন এতটা নয়, সরু হয়ে পড়েছে, তা ঘাসগুলি ঘন হয়ে পড়েছে এখন ।

(বসার পরে, বিনয় মজুমদার)

 

এখানেও আমাদের বিস্ময়ের কাছে এনে দাঁড় করায় কবি বিনয় মজুমদারের ব্যবহৃত যৌনপ্রতীকগুলি। রণজিৎ দাশ যেখানে আবহমান প্রতীকের বাইরে এসে নাগরিক দৃশ্যযাপনের প্রতীকগুলি থেকে যৌনতার প্রতীক তৈরি করেন, আবহ তৈরি করেন, সেখানে বিনয় মজুমদার আবহমান প্রতীকগুলিকেও অতুলনীয় কাব্যভাষায় ব্যবহার করেন। বলা যায় দুজনের ভাষ্যই আলাদা হয়ে যায়। বিনয় মজুমদারের এই যৌনতার আবহরচনার মধ্যেও যৌনতার বর্ণনা ছাড়া আর অন্য কিছু এই ধরনের কবিতাগুলির মধ্যে সচরাচর চোখে পড়ে না। খুব অভিনব কাব্যভাষা ছাড়া, যেখানে তিনি ভুট্টা, রস, ঘাস, নদী, বেল- এই সমস্ত শব্দগুলিকে তার বহিরঙ্গের অর্থ থেকে বারবার বের করে আনেন প্রতীকী অর্থের মধ্যে। এখানে একজন প্রকৃত কবির কাজ। একটি শব্দের দূরের, কাছের নানা অর্থ থাকে। কবি, শব্দটির এই নানান ব্যঞ্জনাগুলিকে ব্যবহার করে, শব্দটিকে একটি বিশেষ অর্থের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান। তাঁর এই পর্যায়ের আরও একটি কবিতার কথা বলতে ইচ্ছে করে-

এখন ফুলকে খাই প্রায়শই কলকাতা গিয়ে ।

কয়েক বছর ধরে খাওয়া হলো, ছেলেও হয়েছে ।

আরো ছেলে মেয়ে চাই — এই কথা ফুলকে বলেছি,

খাওয়ার সময়ে আমি ধাক্কা দিতে দিতে এই কথাই বলেছি ।

ফুল তাতে রাজি আছে, এই ভাবে দুজনের জীবন চলেছে ।

ফুলের ঘরের পাশে আরো বহু ঘর আছে, প্রতিটি ঘরেই

নদী আছে, তারা সব আমার খাওয়ায় খুব সহযোগীতাই

করে থাকে, সর্বদাই ফুল যেই বলে ‘আজ একবার বসি’

অমনি সে নদীদের একজন জল এনে দেয় ।

আমরা খাওয়ার পরে সেই জলে কলা গুহা ধুই ।

আমি গেলে মাঝে মাঝে তাদের ভিতরে কেউ জিজ্ঞাসাও করে

‘আজ তুমি বসবে কি’ এইসব পরস্পর খাওয়ায় সহযোগিতা করে

সেখানে — আমার ফুল যেখানে রয়েছে সেই বাড়িটিতে

নদী আছে, প্রতিবার খাওয়ার পরেই ভাবি তারা সব দেবী ।

(যৌবন কাহিনী, বিনয় মজুমদার)

 

রণজিৎ দাশের প্ররোচনা নামক কবিতাটিতে যেমন পাচ্ছি ‘বাঘের নিঃশ্বাস’, ‘ শিকারিতাঁবুর মতো ফুলে ওঠে স্তন’, ‘জনপদ ধ্বংস হয়ে যায়’, ‘গোপন জানালা’, ‘ছিন্ন টেলিগ্রাফ খুঁটি’,  ‘ঘন ধানখেত’, ‘মেঘাচ্ছন্ন চুল, হাওয়া, চকিত বিদ্যুৎ,’ ‘ওলটানো লরির পাশে শুয়ে আছে জাতীয় সড়ক’, ‘সম্মোহিত লরির চালক’- এর মতো আপাত ভাবে যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কহীন দৃশ্যকল্প, আর সেগুলিকে যখন বাঁধছেন তিনি, তখন মনে হচ্ছে এ যেন এক অপূর্ব যৌনতার আধুনিক নাগরিক ভাস্কর্য। যেখানে সমস্ত অনুষঙ্গ তাদের নাগরিক পরিচিত অর্থের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত। যৌনতার এ  হেন নাগরিক ভাষ্য নান্দনিক  ভাবে তো বটেই, ভাষাকে এক নতুন আঙ্গিকে নতুন ভাবনার দিকে, ব্যবহারের চিন্তার দিকে আমাদের নিয়ে যায়। শব্দ ও প্রতীকগুলি তাদের লক্ষ্মণের গণ্ডী ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। ভাষাকে যে সুপরিকল্পিত ভাবে আক্রমণ না করেও আক্রমণ করা যায়, রণজিৎ দাশ ও বিনয় মজুমদারের কবিতাই তার প্রমাণ। বিনয় মজুমদারের ‘যৌবনকাহিনী’ কবিতাতেও তা-ই দেখি। ‘খাওয়ার সময়ে আমি ধাক্কা দিতে দিতে’, ‘ফুলের ঘরের পাশে আরো বহু ঘর আছে, প্রতিটি ঘরেই নদী আছে’, ‘আমরা খাওয়ার পরে সেই জলে কলা গুহা ধুই’- এই ধরনের ইঙ্গিতময় বর্ণনার মধ্যে শব্দ-ও যেন তার সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে।

 

যৌনতার প্রতীকগুলিকে নিয়ে মনে হতেই পারে, এগুলি তো ঠিক কবে থেকে যে আমাদের জীবনে, আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রবেশ করেছে তা সম্ভবত আমাদের জানা নেই। তার এক দীর্ঘ আর্কিওলজিকাল ও ঐতিহাসিক আবহমানতা আছে। কিন্তু সেগুলিও কবি বা শিল্পীর ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের ফল। তা না হলে, নদী, চাঁদ, হ্রদ—এই সবকিছুর সঙ্গে কেনই বা যৌনতার সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে পাবেন তাঁরা? কেন সেই আদি নাগরিক সভ্যতা থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের স্বপ্নে এবং শিল্পেও ঘুরে ফিরে আসে সেই কয়েকটি প্রতীক? এখানে রণজিৎ দাশ বা বিনয় মজুমদারের মতো কবি, প্রতীকগুলিকে আবহমানতার ঘেরাটোপ থেকে বের করে সমকালীন ও পরবর্তী সময়কালীন করেও তোলেন।

কিন্তু কোনও ব্যবহারকেই মনে হবে না আরোপিত। কারণ এখানে প্রতীক বা দৃশ্যকল্পের নির্মাণ নয়, আসল কথা হল, দৃশ্যের মধ্যে দৃশ্যকল্পকে দেখা, শব্দের মধ্যে দূরের শব্দকে দেখার অপেক্ষা, অভিজ্ঞতা। রণজিৎ দাশ এবং বিনয় মজুমদার এভাবেই সেই ব্যক্তিত্বপূর্ণ সিগনেচার ভাষার জন্ম দেন নিজেদের কাব্যের ভিতরেই।

 

 

 

 

Spread the love

Check Also

প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে বিয়ে, করোনায় মৃত্যু হল বরের দাদার

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বড় জমায়েত করে আচার-অনুষ্ঠান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে প্রশাসনের। …

গুণমান খারাপ বুলেট প্রুফ জ্যাকেটের, চিনের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চিনের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ২০ জন …

শান্ত প্যানগং বিগত ৫০ বছর ধরে কেন ভারত-চিন সীমান্ত উত্তেজনার বড় কারন? জানুন ক্লিক করে

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: ভারত ও চীনের সেনার মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *