উত্তম বিশ্বাস:
সানাইবাদক
সুধন্য সাধুখাঁ মস্ত বড় সানাইবাদক। এই কথাটি সে পৃথিবীর পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ সবখানেই ছড়িয়ে দিতে চায়। সে কারণে তার সানাই মোটে থামায় না সে। বিবাহ নয়, কোনও মাঙ্গলিক আচার আহ্নিকও নয় সে কেবল সুরের আনন্দেই সারাক্ষণ সানাই বাজায়। জীবনে আর কিছুই শেখেনি সুধন্য। তাকে থামাতে পারে এমন মানুষও এ তল্লাটে একটিও খুঁজে পাওয়া যায় না! ওর এই সানাই থামলে নাকি গ্রহ-তারকাদের আহ্নিক গতি থমকে যাবার সম্ভাবনা আছে। এটা অবশ্য সুধন্য নিজেই মনে করে। অথচ ওর দুঃখ একটাই, ও যখন সানাইয়ে ডুব দেয় অমনি গাঁয়ের প্রতিটি ঘর আলো নিভিয়ে দরজা জানলার কপাট এঁটে দেয়। এমন কি সুধন্য যে মেয়েটাকে ভালোবাসে সেও সুধন্যর সানাই শুনলে কানে হেডফোন গুঁজে দিয়ে অন্যমনস্কের মতো সরে দাঁড়ায়। সুধন্যের বুড়ি মা অবশ্য বার কয়েক উঠোনে মাদুর বিছিয়ে লোক টানার চেষ্টা করেন, “একবার শুনেই দেখো না। কী অসম্ভব মহিমা আছে ওর সুরে!”
কিন্তু কেউ আমল দিল না এমন আদেখলেপনায়, “ধুর! এই নাকি সানাই! শিক্ষিত লোকেরা এখন দু’মুঠো ভাতের জন্যে কত না কৌশলে ঘরে বসে কাঁদে!” একে আকালের বৎসর। তার ওপরে ধম্মষাঁড়ের অত্যাচার। মানুষ এখন দিনে রাতে চব্বিশ ঘণ্টা আগুনের মালসা মাথায় করে নিয়ে হাঁটছে। কে শুনবে অমন ঘ্যানঘেনে রাগিনী!
—“তাহলে এ বাঁশি কেউ কি শুনবে না?” এই আক্ষেপ মনের মধ্যে গুড়ো করতে করতে একসময় মরিয়া হয়ে উঠল সুধন্য। একদিন খুব ভোর ভোর সে তার বুড়ো বাবাকে চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে উঠোনে নিয়ে এল। বাটনাবাটা নোড়া দিয়ে তার দাঁতকপাটি গুড়ো করে দিল। তারপর বিচালিকাটা বটি দিয়ে গলার নলিটা ফাঁক করে ফেলল। কাটা কৈতরের মতো ছটফট করতে লাগল ছিন্নমস্তা সুধন্যর বাপ। সুধন্যর বুড়ি মা তার শুকনো কচ্ছপের নাড়ির মতো শরীর কাঁচিয়ে যেই না কটু খিস্তি আর শাপশাপান্ত মাখিয়ে কোকিয়ে কেঁদে উঠল, অমনি উঠোনের চারপাশ থেকে অনেকগুলো লোক এসে ওদের বাড়িটাকে ঘিরে ফেলল।
—“এই জানোয়ার সুধন্য বাইরে আয় বলছি!” ধৈর্য্যহারা মানুষ যে যার ভাষায় চিৎকার করতে লাগল। সুধন্য ভেতর থেকেই সানাইয়ে ফুঁ দিল। হঠাৎ উঠোন ভর্তি লোকগুলো পাথরের পুতুল হয়ে গেল। সুধন্যর রাক্ষুসী মা’কে বিশাল বড় এক বাজপাখি এসে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গেল। অমনি অমাবস্যার চেয়েও গাঢ় মেঘ অন্ধকার করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। ভোর ভিজিয়ে সকাল এল। দুপুর গড়িয়ে গোধূলী। তখনও লোকগুলো শুদ্ধ আত্মা সন্তদের মতো সানাইয়ের স্বরে স্বরে স্নান করতে লাগল।
একসময় গাছগাছালিতে পাখিরা প্রহর মেপে পাখা ঝাড়া দিয়ে ডেকে উঠল। তবু লোকগুলো নড়ল না। উঠোন দিয়ে বরবধূর পালকি নিয়ে ছয় বেহারা তাদের আদিমকালের আদিরসাত্মক গান গাইতে গাইতে চলে গেল। একজন অপরূপা যুবতী সবচেয়ে মোটা ভুঁড়িওয়ালা পাথরের পেটে আলত করে হলুদ মাখিয়ে দিল। তবু লোকগুলি নড়ল না। একসময় মাঠে মাঠে শুকনো বীজতলা ফেটে অঙ্কুর বার হল। তবু লোকগুলো নড়ল না।
দশদিগন্ত ব্যেপে তখন এক আশ্চর্য নীরবতা! কেবলমাত্র সুধন্যর সানাই দ্রিমি দ্রিমি লয়ে ঘুরে ঘুরে পৃথিবীকে আলিঙ্গন করতে লাগল। এই ফাঁকে সুধন্যর বুড়ি মা জোনাকি হয়ে উড়ে এল স্বর্গের সুরভী তীর্থে থেকে। এখন চালতা গাছের পাতায় ঝুলে ঝুলে উনিও মধুর হাসি হাসছেন!
একসময় সুধন্যর ঠোঁট দুটো অসাড় হয়ে এল। বাঁশিখানি ফেলে দিয়ে বাপের মৃতদেহের ওপর একবার চুমু খেল। মুহূর্তে পাথরগুলি আবার মানুষ হয়ে তাদের কৌতূহলী হাত পা নিয়ে পূর্বের মতো নড়াচড়া করতে লাগল।
একজন ছুটে গিয়ে একথালা জুঁইফুল এনে সুধন্যর পায়ের কাছে রাখল।
একজন তাদের মন্দির থেকে পেতলের বড় একটা ঘণ্টা খুলে এনে জোরে জোরে বাজাতে লাগল।
একজন অনেককালের একখানি পুরনো ধর্মীয় পুঁথি এনে ওর ওপর আগুন ছুড়ে মারল।
আর বাদবাকি যারা ছিল, তারা সমবেতভাবে হাততালি দিয়ে সুধন্যকে অভিনন্দন জানাল।
চলে যাবার আগে সুধন্যর বাঁশিখানি ছুঁয়ে দ্যাখার জন্যে অনেকের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেল। হঠাৎ ওর বুড়ি মা ছিন্ন মুণ্ডুটা জুড়ে দিয়ে, ওর বাপকে ঘাড় ধরে ঠেলে বসিয়ে দিল।
সুধন্যর বাপও হাততালি দিল।
সকলের হাঁ হাওড়া ব্রিজ হবার উপক্রম, “ও বুড়ো তুমি মরনি?”
—“মরেছি বৈকি! ছেলেটা আমার স্বীকৃতি পেল, সমাজ মেনে নিল! আমিও যে আনন্দ পেয়েছি এটা ওকে না জানিয়ে একেবারে মরি কী করে বলো!”
………………………..
উত্তম বিশ্বাসের জন্ম ১৯৮০ সালে। বনগাঁর এক অখ্যাত সীমান্তগ্রাম সুটিয়ায়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে এমএ। পেশায় শিক্ষক। প্রকাশিত গ্রন্থ ‘নদীতৃষ্ণা ও অলৌকিক মাছেরা’ ২০১৮ (গল্পগ্রন্থ)। উপন্যাস ‘বন্ধ্যানদীর বালিহাঁস’ ২০১৯,। কাব্যগ্রন্থ ‘জলটুঙি’ ২০১৯,। প্রকাশের পথে ‘মাটির সিন্দুক’ (গল্পগ্রন্থ) বইমেলা ২০২০। ২০১৮ সালে পেয়েছেন ‘রামমোহন রণজিৎ পাল সাহিত্য পুরস্কার’। ভালোবাসেন লেখালিখি ও গান।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news