সুদীপ্ত দাস:
মহালয়া, পানিহাটি, তর্পণ— আমাদের এদিকটায় সমার্থক। যাকগে, সেবার দেখি কচুরিপানার দলা পাকানো ঝাঁকটা ভেসে যাচ্ছে। ওই দূরে আরও একটা। আরও আরও আসছে। অথচ স্রোতের টান গৌণ। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে কচুরি ছেড়ে কচুরিপানার দিকে তাকিয়ে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। বেঁধে দেওয়া সময় যে মোটে দশ থেকে বিশ মিনিট। বড়জোর পাক্কা পঁচিশের মধ্যে কাজ সারতে হবে।
বছর কুড়ি আগের ভোরটা হঠাৎই মনে পড়ল। সারা রাত জেগে দুর্গাপুজোর জন্য কলা চুরি। ঘর্মাক্ত শরীর। অথচ জেগে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে ঘুমকে ফাঁকি দিয়ে মনের ভিতর অক্লান্ত রানার। গুনগুন গান ক্লাব প্রাঙ্গনে বাজছে। এদিকে আমরা অন্ধকারের বুক ফাঁটিয়ে ঝেড়ে আনছি এক-একটা কলার নির্ভেজাল বংশ। আমাদের দোষ কী! সবই তো মায়ের জন্য। এতে ঠাকুর কেন ঠাকুর্দারও সাধ্যি নেই পাপ দেবার। আর তাছাড়া ভোরের গঙ্গাস্নানে সব পাপ ধুয়ে সাফ হয়ে যাবে। কারণ আজ পাপমুক্ত চুরির বাৎসরিক দিন।
মহালয়ার সে সকালগুলো আজও যেন এক! একান্তই নিজের ইচ্ছায় না কি ভোরের নিষ্কলঙ্ক প্রবাহে সব সকাল থেকে এ সকাল আলাদা হয়ে ওঠে! একটু আবেগপ্রবণই বটে! তবে সেবার ওই কচুরিপানার ভেসে যাওয়ার দৃশ্যই মৃত্যুঘুম টেনে আনছিল আমার জন্য। কেন বলি।
গঙ্গায় তখন ভাটার টান। জল চলেছে সাগর পানে। অথচ দেখে মনে হচ্ছে গোবেচারা নিস্তরঙ্গ। তখন পানিহাটির স্নানঘাট টইটম্বুর। সিঁড়িতে তর্পণ আর পূজারীর ভিড়। পূর্ণ্যার্থীদের স্নানকর্মে ঠাসাঠাসি হাল। ঘাটের উত্তরে বেশবাস পালটে মহিলাদের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরা, আর দক্ষিণে শ্মশানঘাট। পরবর্তী তর্পণের জন্য তৈরি হওয়া সদ্য পিতৃ-মাতৃহীন মুখগুলো…।
কিন্তু আমার স্রোতের দিকে কচুরিপানার মতো সাঁতার দিতে দোষ কী! না হয় পরের ঘাটে উঠব। ভাবতে ভাবতেই জলে ঝাঁপ। কিন্তু একি! মা গঙ্গা স্রোতের দিকে টানছে বটে, তবে দক্ষিণ ঘাটের দিকে না, বরং মাঝগঙ্গায় অভিমুখ। যতই উল্টো সাঁতার দিই কিংবা পাড়ের দিকে ফেরার চেষ্টা করি ততই মাঝ-নদীতে টানে! যাই হোক সাসপেন্স তেমনটাও ছিল না। থাকলেও দেখত কে!
গঙ্গাঘাটে কোথাও কোথাও বাঁশ ভিজিয়ে রাখা হয়। পানিহাটির ঘাটের কাছেও আছে। ওই বাঁশের নাগাল পেয়েই সে যাত্রায় রক্ষে। ঘাটযাত্রার থেকে বেঁচে ফেরা।
তারপর অনেকগুলো বছরকে পেছনে ফেলা, অনেকগুলো পিতৃপক্ষের অবসান। অথচ মহালয়ার সকাল আসে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ মন্ত্রে। ভোরের আলোয় মনচোরা স্মৃতির আখ্যান।
তবে বলছিলাম না, সাসপেন্স তেমন ছিল না। থাকলেও দেখতো কে! হ্যাঁ, দেখেছিল একজন। নাম পুঁটে।
পুঁটিরাম সেদিন বাঁশের মাচায় বসে মাছ ধরছিল। ও এগিয়ে এসে সাহায্য না করলে সেবার গঙ্গায় গঙ্গাপ্রাপ্তি নিশ্চিত ছিল। কে জানে, মা দুর্গার আশীর্বাদে আজীবন এমন অবশম্ভাবী দুর্ঘটনা কাছাকাছি পুঁটিরামরা থাকবে কি না!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news