সুব্রত সেন:
মৃণাল সেন বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার তিন সেরা পরিচালকের (সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল) একজন। এ নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু থাকতে পারে না। একথা সবাই জানে, বলেও থাকে। বরং প্রশ্ন হল, এঁদের তিনজনের মধ্যে মৃণাল সেনের অবস্থানটা ঠিক কোথায়?
আমরা দেখেছি সত্যজিতের পরিমিতি বোধ, ঋত্বিকের অদ্ভুত প্যাশন। এমন প্যাশন, যা দেখার পর দর্শক নড়েচড়ে বসত বাধ্য হন। মৃণাল কিন্তু এই দুজনের থেকে ভীষণই আলাদা। মৃণাল সেনের সারা জীবনের কাজে এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে যে সিনেমা দেখতে বসে অবাক হতে হয় পদে পদে। অবাক হই দেখে— যে লোকটা ‘ভুবন সোম’ করেছে, সে-ই করল ‘কোরাস’-এর মতো ছবি, তাঁরই সিনেমা ‘কলকাতা ৭১’। একই মানুষ তৈরি করেন ‘একদিন প্রতিদিন’, আবার সেই পরিচালকেরই অন্যতম ছবি ‘খারিজ’, এমনকী মৃণাল সেনই বানিয়েছেন ‘আকালের সন্ধানে’!
ব্যক্তিগত অভিমত, এই প্রত্যেকটা সিনেমা আলাদা আলাদা পরিচালকের হতেই পারত। আসলে পরিচালক মৃণাল সেনকে কোনও নির্দিষ্ট গণ্ডিতে ফেলা যায় না। তাই দেখি উনি ওঁর একেকটা ছবি একেক ভঙ্গিতে করেছেন। একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে মৃণাল সেনকে এভাবেই আবিষ্কার করেছি।
মৃণাল সেনের প্রায় প্রতিটি ছবিতে রয়েছে নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট। আগের সিনেমায় যা করেছেন তা যেন দ্বিতীয়বার তিনি করতে চান না। মনে পড়ছে ‘ইন্টারভিউ’র একটি দৃশ্যের কথা। যে দৃশ্যে চরিত্রটি বাসে করে যেতে যেতে ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকিয়ে দর্শকের সঙ্গে টানা কথা বলে যায়। এমন ফর্ম তথা ফর্ম ভাঙা আমরা তখন অবধি ভারতীয় সিনেমায় দেখিনি। ‘ভুবন সোম’-এও রয়েছে কতকটা কাছাকাছি ধরনের এক্সপেরিমেন্ট। যেমন, হঠাৎই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলে ওঠেন উৎপল দত্ত। আসলে মৃণাল দর্শককে মনে করিয়ে দিতে চান গল্প আর সিনেমার পার্থক্য। বলে দিতে চান, তুমি একটা গল্প দেখছ বটে, তবে মনে রেখো, এটা কিন্তু সিনেমা। এই আঙ্গিকটাই মৃণাল সেনের ট্রেডমার্ক, নিজস্বতা। আরও এক উদাহরণ ‘অন্তরীণ’। সেই ছবিতে কি আছে?

আছে কেবল টেলিফোনে দু’জন মানুষের কথোপকথন। এবং ছবিটা হয়ে উঠল ওয়ার্ক অব আ মাস্টার।
এইসঙ্গে মনে রাখা ভালো, যে মৃণাল সেনের ছবি খুব বেশি দর্শক পছন্দ করতেন না। হলে গিয়ে ওঁর প্রচুর সিনেমা দেখেছি। বেশিভাগ সময়েই হল ফাঁকা থাকত। ‘একদিন প্রতিদিন’ আর ‘খারিজ’ ছাড়া বক্সঅফিস রেজাল্ট মোটেই ভালো ছিল না।
একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে মনে হয়, মৃণাল সেনের ছবিতে রয়েছে নিজস্ব দর্শন। ছবি দেখতে দেখতে এও মনে হয়, যে উনি যেন সিনেমাটাকে নিয়ে ‘ছেলেখেলা’ করতে বসেছেন। যেন বা প্রতিটি সেকেন্ডে আমাদের মনে করিয়ে দিতে চান, যে সিনেমা এমন বা সিনেমা তেমন—ইত্যাদিতে তাঁর বিশ্বাস নেই। তাই ওঁর সিনেমা ভাবনাটাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যেতে দেখি।
‘ভুবন সোম’ আমার বিশেষ পছন্দের ছবি। ‘একদিন প্রতিদিন’ও। তবে ‘খারিজ’ তত ভালো লাগেনি। আলাদা করে বলব, তেলুগু ছবি ‘ওকা উরি কথা’র কথা।
ব্যক্তি মৃণালদার সঙ্গে যখন পরিচয় হয় তখনও ছবির কাজ শুরু করিনি। আমি তখন পেশায় সাংবাদিক। স্টেটসম্যানে চাকরি করি। দিল্লিতে থাকি, রাজনৈতিক সংবাদদাতা। মৃণালদা সে সময় সংসদে রাজ্যসভার সদস্য (রাষ্ট্রপতি মনোনীত)। তখনই প্রথম কাছ থেকে দেখি মানুষটাকে। আলাপ হতেই বুঝতে পারি চূড়ান্ত আড্ডাবাজ। সংসদ ভবনের করিডোরে ওঁর সঙ্গে দেখা হলেই আড্ডা শুরু হয়ে যেত। মৃণালদার দাঁড়ানোর ভঙ্গিটাও ছিল মজার। সাধারণত উনি সঙ্গীদের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াতেই ভালোবাসতেন। এবং ঘন ঘন সিগারেট ধরাতেন। যাই হোক, সে সময় আমরা বেশ কিছু বাঙালি সাংবাদিক দিল্লিতে থাকি। মৃণালদা আমাদের সঙ্গে রীতিমত আড্ডা দিতেন।
২০০১ সাল। আমার প্রথম ছবি ‘এক যে আছে কন্যা’র প্রিন্ট হয়ে গেছে। নন্দন ৩-এ একটা প্রাইভেট শো-র ব্যবস্থা করেছি প্রিন্টটা কেমন হল দেখার জন্য। সেই শো যখন শুরু হব হব, খেয়াল করি মৃণালদা নন্দন থেকে বেরোচ্ছেন। এগিয়ে গিয়ে বলি, দাদা, একটা ছবি বানিয়েছি। উনি খুব অবাক হয়ে বলেন, তুমি আবার ছবি বানাচ্ছ কেন! তুমি তো সাংবাদিক। উত্তরে বলি, দেখে যান না ছবিটা।
মৃণালদা দেখলেন। বেরোনোর সময় বললেন, জানো তো সুব্রত, অনেক ফিল্মমেকাররা আমাকে ওদের ছবি দেখার জন্য ডাকে। আমি না করতে পারি না। তো তোমার ছবিটাও সেরকম দেখলাম। এবং সত্যি বলছি, অনেক দিন পর একটা ছবি দেখলাম, যেটা দেখতে দেখতে আমি ঘুমিয়ে পড়িনি।

মৃণালদার ছিল এইরকম সেন্স অব হিউমার। ওঁর রসবোধ প্রসঙ্গ উঠল যখন তখন আরেকটা ঘটনা বলি। সেবার ‘একদিন প্রতিদিন’ দেখে একটা প্রশ্ন করেছিলাম। একটা শট নিয়ে। ওই ছবিতে একটা প্যান শট ছিল। সঙ্গে ইতিহাস ভিত্তিক ন্যারেশান। সম্ভবত ‘১৮৫৭ সাল, তখন অমুক তমুক…’ জাতীয়। তো ওঁকে জিজ্ঞেশ করেছিলাম, ওই শটটায় হঠাৎ ঐতিহাসিক ন্যারেশানের প্রয়োজন পড়ল কেন? মৃণালদার উত্তর— আসলে ইতিহাস নিয়ে খুব ছবি হচ্ছে ভাই। সত্যজিৎ করলেন ‘শতরঞ্জ কী খিলাড়ি’। ভাবলাম, ইতিহাস নিয়ে আলদা ছবি করতে তো পারছি না, তা এই দৃশ্যটাতেই ঐতিহাসিক টাচ দিয়ে দিই। বলেই সিগারেট ধরিয়ে খুব হাসতে লাগলেন।
‘এক যে আছে কন্যা’র প্রিমিয়ারেও আসেন মৃণালদা। পরের দিন আমাকে ফোন করেন। ফোনে প্রথমে দু’একটা টেকনিক্যাল প্রশ্ন করেন। তারপর যা বলেন তাতে খুবই অবাক হই। বলেন, তোমার তো আঙুলের ডগায় সিনেমা। অনেকটা গোদারের মতো। আরও বলেন, তোমাকে আমি একটা সাজেশান দেব? আমি বলি, দিন না। মৃণালদা বলেন, উচ্চবিত্তদের নিয়ে ছবি করো না, এতে সমাজের কোনও লাভ হবে না।
মৃণাল সেনের এই কথায় থতমত খাই। উনি আরও বলেন, তোমার হাতে যখন ছবিটা আছে, অতএব অন্যরকম ছবি করার কথাও ভেবো।

আরেকটি ছবি করেছিলাম, ‘স্বপ্নের ফেরিওলা’। সেই প্রিমিয়ারেও এসেছিলেন মৃণালদা। যদিও ছবিটা ওঁর ভালো লাগেনি। সরাসরি বলেন, এ ধরনের ফেয়ারিটেল বা ফ্যান্টাসির উনি বিরোধী। এবং ফের পরামর্শ দেন, পৃথিবীতে অনেক বিষয় রয়েছে সুব্রত, কলকাতায় অনেক এমন জীবন রয়েছে, যা নিয়ে ছবি করা যায় এবং করা দরকার।
আজকে এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে, এতগুলো সিনেমা করার পর মনে হয়, মৃণালদা ঠিকই বলেছিলেন।
মৃণাল সেন টাকা করার জন্য সিনেমা করেননি। ব্যক্তি জীবনেও দেখনদারি ছিল না। অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। ওঁর প্রয়াণের পরে জানতে পারলাম মৃণালদা তাঁর ডাক্তারকে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, শোভাযাত্রা ইত্যাদি যেন না হয়। তাঁর জীবনের মতো মৃত্যুটাও যেন সাদামাটা থাকে। কোনওরকম বাড়াবাড়ি চাননি উনি।
আসলে মৃণাল সেন যে ছাপোষা জীবনের গল্প নিয়ে সিনেমা করেছেন, সেই জীবনের মতোই জন্মে, জীবনধর্ম পালন করে, নিরিবিলি চলে গেলেন। (টেলিফোন ভিত্তিক সাক্ষাৎকার। অনুলিখন: কিশোর ঘোষ)
………………………………………………………………………………………………………………………………………………
সুব্রত সেন একাধারে সাংবাদিক, সাহিত্যিক এবং পরিচালক। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় দু’টি প্রথম শ্রেণির দৈনিকে রাজনৈতিক সংবাদদাতার দায়িত্ব সামলেছেন। অসংখ্য ছোটগল্প ও একাধিক উপন্যাস লিখেছেন। তবে বাংলা ছবির সফল পরিচালক হিসেবেই তাঁর অধিক পরিচিতি। ‘এক যে আছে কন্যা’ প্রথম ছবি। যা মুক্তি পাওয়া মাত্র সাড়া ফেলে দেয়। এই ছবির জন্য নবীন পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান । তাঁর একাধিক ছবি দেশ-বিদেশের সম্ভ্রান্ত চলচ্চিত্র উৎসবে স্থান করে নিয়েছে। পেয়েছেন সম্মাননা। ‘নীল নির্জনে’, ‘হঠাৎ নীরার জন্য’, ‘বিবর’-এর মতো ৯টি ছবি করেছেন সুব্রত সেন। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে তাঁর বিতর্কিত তথ্যচিত্র ‘কালী’।
………….
শীর্ষ অলঙ্করণ: কৃষ্ণেন্দু ঘোষ
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news