বুদ্ধদেব হালদারঃ

কেউ দেখেনি তো অমলেন্দুকে?
অমলেন্দু এদিকসেদিক একবার চেয়ে দেখল। নাহ, চেনাশোনা কোনও মুখই দেখতে পাচ্ছে না। তবে রাস্তার দুপাশের অনেকেই তার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। অনেকের চোখে আবছা ক্রোধ। আবার অনেকের চাউনিতে থুতু ছেটানো ঘেন্না। মুখটা তুলে একবার সামনের দিকে তাকাল সে। বাসটা সোজা বেরিয়ে যাচ্ছে। অনেকটা দূরেই চলে গেছে। অমলেন্দু ডান হাতের চেটো দিয়ে নাক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তটা মুছে নিল আলতো করে।
এখনও এদিকটা সন্ধ্যা হয়নি। রাস্তাটা বেশ জ্যাম। শেষ বিকেলের অল্প আলোয় অফিস ফেরত লোকের ব্যস্ততা। ডানদিকের পাঁচিল ঘেরা মাঠটায় দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের সরঞ্জাম জড়ো করা হচ্ছে। হয়তো আর কয়েকদিন পর থেকেই কাজ শুরু হবে। যদিও পুজো এখনও প্রায় আড়াই মাসের মতোন দেরি। অমলেন্দু রাস্তার সন্ধিৎসু চোখগুলোর থেকে বাঁচার জন্য একটু জোরে পা চালাল। মনে মনে ভাবল, একটু দূরে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাবে। তারপর ট্যক্সি বা বাস কিছু একটা ধরে পৌঁছে যাবে শিয়ালদা। আশ্চর্যের ব্যাপার হল তার মনে কোথাও এতটুকু কষ্ট বা রাগ নেই। তার মোটেও দুঃখ হচ্ছে না। ক’টা বাজে দেখার জন্য বাঁ হাতের দিকে তাকাতেই বুঝতে পড়ল ধস্তাধস্তিতে তার কোয়ার্ট্জের রিস্ট ওয়াচটা বাসের মধ্যেই কোথাও খুলে পড়ে গেছে। ইসস্, ওটা তাকে ছোটো মামা এইচএস দেওয়ার সময় কিনে দিয়েছিলেন। ঘড়িটা অমলেন্দুর ভীষণ লাকি ছিল। অনেক বছরের পুরনো হলেও একটা অন্যরকম অনুভূতি ছিল ওই ঘড়িটার প্রতি। অথবা বলা চলে স্মৃতি। কারণ ছোটো মামা তো প্রায় তিন বছর আগেই মারা গেছেন। একটা বাইক অ্যাক্সিডেন্টে ছোটো মামাকে হারিয়ে ফেলেছিল অমলেন্দু ও তাদের পরিবার। সেসব কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। আলোছায়া বাস স্টপেজের থেকে খানিকটা এগিয়ে যেদিকে খালপাড়ের রাস্তাটা চলে গেছে, সেই তেমাথার দিকে এগোতে থাকল সে। রাস্তার পাশের গাছগুলোয় পাখিদের সম্মিলিত কলরব যেন অমলেন্দুকে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে। একটু আগেই হাওড়াগামী চুয়াল্লিশ রুটের একটি বাসেই যে অন্য লোকেদের হাতে তাকে অপমানিত ও মার খেতে হলো, তা যেন অমলেন্দুর মাথাতেই নেই। শার্টের পকেটটাও ছিঁড়ে গেছে। বাস কন্ডাকটার ছেলেটি যদি আজ না বাঁচাত, কী বিপদটাই না ঘটত! হয়তো সেই হুমদো-মুখো লোকটা একাই গলা টিপে শেষ করে ফেলত তাকে। যে ভাবে লোকটা ওর গলা চেপে ধরেছিল, এখনও বেশ ব্যথা করছে গলা ও ঘাড়ের কাছটায়। একটু জল খেলে অথবা চোখে মুখে জল দিয়ে নিলে কিছুটা সুস্থ হতে পারত। কিন্তু আশেপাশে তো কোনও কলই দেখতে পাচ্ছে না। অমলেন্দু বিমনা হয়ে হেঁটে চলল ঝিলপাড়ের দিকে। ওখান থেকেই অটো ধরে নেবে। তারপর সোজা শিয়ালদা।
এই মুহূর্তে পৃথা নিশ্চয়ই অমলেন্দুর জন্য অপেক্ষা করছে? অমলেন্দু ওকে প্রাচী সিনেমা হলের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছিল। প্রায় একমাস পর ওরা আজ আবার দেখা করতে যাচ্ছে। অমলেন্দু কি এভাবে ওর সামনে যাবে? এই বিধ্বস্ত অবস্থায়! অসুবিধা কী আছে ! না-হয় কিছু একটা বানিয়ে বলে দেবে। কিন্তু বানিয়ে ও বলবেটা কী? কিন্তু কিছু একটা তো ওকে বলতেই হবে। না-হলে পৃথা যদি সত্যিটা জানতে পারে? আচ্ছা, পৃথা কি বিশ্বাস করবে? হয়তো সবকথা শুনে হেসে লুটিয়ে পড়বে ও। ওর হাসি আর থামতেই চাইবে না। অমলেন্দু সে কথা খুব ভালো করেই জানে।

উফ, আর একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল। কী জোর হোঁচট খেল। আনমনা হয়ে পথ চললে এরকমই হয়। নিজেই নিজেকে বিড়বিড় করে বলল। ঝিলপাড় ব্রিজের যেদিকটায় অটো পাওয়া যায়, সেদিকে এসে দাঁড়াল সে। পৃথার মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছে। গত মাসে স্যালারি পাওয়ার পরের দিনই তো ওরা দুজনে দেখা করেছিল। যেন কতোদিন আগের কথা। যেন সেসব দিনগুলো কত কত নদী সমুদ্র পেরিয়ে গিয়ে খোঁজ করলে তবে হদিস মিলতে পারে। সেদিনের সেই সন্ধেতে ওরা দুজন পরস্পরের মুখের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়েছিল। অমলেন্দুর বেশ মনে আছে। সেদিনটা অফিসে সান্যাল স্যারকে একটা ঢপ ঝেরে দিয়ে যা হোক করে কাল্টি মেরে দিয়েছিল। তবে রাহুলদা ব্যাপারটা পুরোটাই জানত। অফিসে একমাত্র সে-ই তো অমলেন্দুর অন্তরঙ্গ বন্ধু। যদিও রাহুলদা ওর থেকে প্রায় সাত বছরের বড়। যেকোনও ব্যাপারেই অমলেন্দুকে ভীষণভাবে সাপোর্ট করে। রাহুলদাই ওকে বলেছিল, ‘বলবি বাড়ি থেকে ফোন এসেছে স্যার, পিসি ভীষণ অসুস্থ। আর প্রয়োজন পড়লে আমি তো আছিই।’
একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির সিএফএ-র আন্ডারে অমলেন্দু কম্পিউটার অপারেটরের কাজ করে। ফলে সব সময় একটা প্রেসারের মধ্যেই থাকতে হয় তাকে। খুবই শান্ত ও ভদ্র টাইপের ছেলে অমলেন্দু। কথাবার্তায় বিনয়ী। কখনওই কোনও ব্যাপারে ‘না’ বলতে পারে না ও। সেজন্য মাঝেমধ্যে নানারকম ঝামেলার মধ্যেও পড়তে হয় ওকে। এই কিছুদিন আগের একটা ঘটনা। অফিস থেকে বেরবার মুহূর্তেই বাচ্চুদা এসে অমলেন্দুকে ধরল, ‘আরে আমার ওয়াইটিডি ফাইলটা একটু আপডেট করে দে না ভাই, না-হলে কাল আমি পুরো কেস খাব। তোকে টোটাল র-ফাইলটা সেন্ড করছি, তুই জাস্ট ভিলুকাপ মেরে আমাকে সিস্টেমের সঙ্গে সিরিয়াল নাম্বারগুলো ম্যাচ করে দে, ব্যাস, বাকিটা আমি বুঝে নেব।’ বলা বাহুল্য অমলেন্দু হাসি মুখেই বাচ্চুদার জন্য সেদিন আরও তিন চার ঘন্টা কাজ করে দিয়েছিল। মুখ ফুটে একবারও বলেনি, ‘পারব না।’
পৃথার সেদিনের সেই মুখটা বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে। নিউ আলিপুরের এক রেস্টুরেন্টের মনমুগ্ধকর আলোয় ওরা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। কেউ কারো থেকে চোখ সরাতে পারছে না। পৃথার শরীর ও স্বাস্থ্য দুটোই ভালো। শরীর বলতে স্বভাবতই তার সৌন্দর্য ও পবিত্রতার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু স্বাস্থ্য বলতে শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গের কথাও বোঝানো হচ্ছে। যে অঙ্গের স্পর্শ সুখের জন্য ছেলেরা ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে। যে স্পর্শ পাওয়ার জন্য ছেলেরা পুরুষত্ব অর্জন করতে বদ্ধপরিকর হয়। সেদিন পৃথা কি চোখের ইশারায় কিছু বলতে চেয়েছিল তাকে? কিছু কি বোঝাতে চেয়েছিল? হয়তো চেয়েছিল। কিন্তু অমলেন্দু তাতে আমল দেয়নি। আর এতেই হয়তো অপমানিত বোধ করেছিল পৃথা। কিছুক্ষণ আগেই টেবিলের তলায় অমলেন্দুর দুপায়ের উপর ইচ্ছে করে পা তুলে দিয়ে পৃথা ঘষটে দিচ্ছিল ওর পা দুটো। তখন তার মুখের দিকে তাকিয়ে অমলেন্দু বুঝতে চেয়েছিল শরীর কীভাবে সস্তা হয়ে ওঠে প্রেমের বাজারে। সত্যিই কি তাই? পৃথা মাংসের টুকরোটা চিবোতে চিবোতে খুব মৃদু স্বরে বলেছিল, ‘তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। এখনও সময় আছে পারলে পুরুষ হয়ে ওঠো।’ অমলেন্দুর মুখের দিকে তাকিয়ে সেদিন একচোখ টিপে বাঁকা ঠোঁটে হেসে উঠেছিল পৃথা।
অমলেন্দু পৃথাকে ভালোবাসে। এবং সে খুব ভালো করেই জানে যে পৃথাকে ছাড়া সে অসহায়। পৃথিবীর সমস্ত কিছুর বিনিময়েও সে তাকে নিজের জীবনে গ্রহণ করতে আগ্রহী। দীর্ঘ চার বছরের এই সম্পর্ক। তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল অমলেন্দুরই এক বন্ধুর দাদার বিয়েতে। তাদের প্রেম ঠিক যেন লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইটের সূত্র মেনেই শুরু হয়েছিল। দুচোখের ভালো লাগা কখন যে ভালোবাসায় পর্যবসিত হয়েছে তা তারা দুজনের কেউই কখনও বুঝতে পারেনি। এবং এখন তারা তাদের এই সম্পর্ক নিয়ে অনেকটাই সিরিয়াস। তারা দুজনেই বিয়ে করার সিদ্ধান্তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এবং হয়তো তাদের দুই পরিবার থেকেও ব্যাপারটা মেনে নেবেন সকলেই। অবশ্য পৃথা এখনই তাদের এই সম্পর্কটাকে সকলকে জানাতে চায় না। আরও একটু সময় নিতে চায়। আপাতত যতদিন না ও একটা ভালো চাকরি-বাকরি পাচ্ছে, ততদিন এরকমভাবেই ডুবে ডুবে জল খেতে চায়।
পৃথার কাছে গেলেই অমলেন্দু কেমন যেন একটু নার্ভাস হয়ে পড়ে। নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে ফেলে ভিতরে ভিতরে। কত ছেলে মেয়েকেই সে দেখেছে ঘনিষ্ট হয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে রাস্তাঘাটে উদোম সাহসী হয়ে উঠতে। অমলেন্দু সেসব ছেলেদের মতো নয়। সে পৃথাকে সম্মান করে। ভালোবাসে নিজের মতোন করে। এক অলৌকিক অস্তিত্বের ভিতর সে পৃথার কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস সে অনুভব করতে পারে নিজের বেঁচে থাকার মধ্যেই। অমলেন্দু জানে না পৃথাও ঠিক একইভাবে তাকে অনুভব করতে পারে কিনা? ভালোবাসতে পারে কিনা? অথচ প্রেমের মধ্যে শরীর অনিবার্য হয়ে ওঠে যখন, ঠিক তখনই পিছিয়ে আসে সে। ঠিক তখনই একটা ভয় কাজ করে ওর ভেতর। তখনই ও নার্ভাস ফিল করে। একটা বিষণ্ণতা কামড়ে ধরে ওকে।

বেশ কয়েকমাস আগে একদিন কলেজস্কয়ারের বিদ্যাসাগর উদ্যানে দেখা করেছিল ওরা দুজন। একটা ফাঁকা বেঞ্চের একধারে বসে গল্প করছিল। বিকেলের দিকে এমনিতেই এদিকটায় খুব ভিড় হয়। কাছেই ইউনিভার্সিটি। ছেলেমেয়েরা ভিড় জমায়। আড্ডা মারে। প্রেম করে। হই হুল্লোড় আর জমজমাট জায়গাটায় বেশ কেটে যাচ্ছিল সময়। বিকেলের রোদ ফিরে যাচ্ছে আকাশের কোলে। ট্রামের ঘন্টা শোনা যাচ্ছে বসে বসেই। মানুষের ব্যস্ততার মধ্যেই তাদের এই যে মুহূর্তের টুকরো টুকরো অপলক চোখ চাওয়াচাওয়ি, এ যেন পৃথিবীর কোটি কোটি বছরের ইতিহাসের সারবস্তু।
‘ওটাকে তোর ভালো লাগে নাকি?’ হিহি করে হেসে ওঠে একদল ছেলেমেয়ে। সুইমিংপুল ঘেরা গ্রিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারছে একদল ছেলেমেয়ে। তাদেরই মধ্যে একটা মোটা করে মেয়ে বলে উঠল অপর একটা ছেলেকে। আর সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল দলের বাকি বন্ধুরা। অমলেন্দুদের বেঞ্চের সামনা সামনি, কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ওরা কথা বলছে। অন্য একজন ছেলে বলে উঠল, ‘মদন স্যারের মেয়েটাকে দেখেছিস?’
‘উফ্ফ্ গুরু বলিস নাআআআ..’ পাশ থেকে অন্য একটি ছেলে টোন কাটলো।
‘কেন রাতে ঘুম হবে না বুঝি!’ যে মেয়েটাকে ওই গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী দেখতে, সে এবারে বাকি ছেলেগুলোর দিকে ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল।
‘অলক তুই কিছু বলবি না ?’ মোটা করে মেয়েটা আবার বলে উঠেছিল।
অন্য একটি ছেলে চাপা অথচ স্পষ্ট গলায় বলেছিল, ‘ওই দুটো বাবা দশ কেজির মালসার মতোন।’
ছেলেমেয়েগুলো আবার সমবেত স্বরে হিহি করে উঠেছিল কুৎসিত আলোচনায়। তাদের হাসির মধ্যিখানেই দলের অপর এক ছেলে বলে উঠেছিল, ‘সত্যি বলছি মাইরি মদন স্যারের মেয়েকে পেলে ফাটিয়ে দেব অন গড।’
আবার হাসিতে ফেটে পড়েছিল সবাই।
অমলেন্দু উঠে গিয়েছিল সেখান থেকে। ওর কান দুটো গরম হয়ে গিয়েছিল লজ্জায়। কী যেন একটা ভয় কাজ করছিল ওর ভেতর। পৃথার সামনে খুব ছোট হয়ে পড়ছিল সে। কেমন একটা বিষন্নতা কাজ করছিল যেন ওর মধ্যে। ও কাউকে বলে বোঝাতে পারে না এসব। একটা লজ্জা, একটা ঘৃণা কাজ করছিল ওর মধ্যে। অথচ কিছুটা দূরে দুজনে হেঁটে যাওয়ার পর দেখল পৃথা ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। ও পৃথাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ওরকম হাসছ কেন ।’
‘ছেলেমেয়েগুলোর কথাবার্তা শুনলে?’
‘সবকটা ছোটোলোক একেবারে।’
দুজনে কিছুক্ষণ নীরবে একসাথে হেঁটে যাওয়ার পর পৃথা অমলেন্দুর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে চেপে রেখে বলেছিল, ‘ক্ষমতা আছে তোমার?’
কখনও কখনও অমলেন্দুর মনে হয়েছে পৃথা হয়তো তার ভদ্রতা ও রুচিশীলতাকে অক্ষমতা ভেবে বসেছে। কিন্তু তা তো আসলে নয়। অমলেন্দু জানে শরীর আসলে কী। সে ভালো করেই বোঝে যৌবনের রঙ ঠিক কেমন হয়। অনুভূতির পারদ কামড়ে ধরে শরীরে। মগজ দিশেহারা হয়ে ওঠে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, আজ পর্যন্ত কখনওই সে পৃথাকে নিয়ে ওসব কিছু ভাবতেই পারেনি। করা তো অনেক দূর কি বাত। অমলেন্দু কিছুতেই পৃথাকে নিয়ে এসব ভাবতে পারে না। শুধু পৃথাই বা কেন? কোনও মেয়েকে নিয়েই সে কখনও মনের মধ্যে একটা আয়েশি সম্ভোগের কল্পনাচিত্র তৈরি করেনি। কারণ, এসব তার ভালো লাগে না। কেমন একটা ভয় করে। বিষন্ন লাগে। এই সব মুহূর্তে তার ভূতে পাওয়ার মতোন অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়।
পৃথার সঙ্গে কথাবার্তায় আলাপচারিতায় সে স্পষ্টতই বুঝতে পারে তার অভিপ্রায়। তার কামনা-বাসনার মধ্যে কোনও ঢাকাঢুকি নেই। কোনও আড়াল আবডাল নেই। সে বড্ড খোলামেলা। অনেক স্পষ্ট করে পৃথাকে যখন অমলেন্দু বোঝার চেষ্টা করে তখন সেখানে কোথাও নম্রতা, পবিত্রতা, অলৌকিকতা জিনিসগুলো আর থাকে না। শুধুমাত্র নারীর সুস্বাদু অঙ্গগুলো তার ছায়ার সামনে উঠে আসে। কিন্তু অমলেন্দু সেসব ছুঁতে পারে না। একটা অদৃশ্য দেওয়াল তাকে আলাদা করে রাখে সবসময়।
অমলেন্দু খণ্ডতায় বিশ্বাসী নয়। সে পৃথাকে সামগ্রিক রূপে পেতে চায়। মানুষের অন্তর্স্থিত সৌন্দর্যের সঙ্গে সে মিলনে আবদ্ধ হতে চায়। শুধুমাত্র শরীর নয়। এই শরীর যে দৈবিক আধারের উপর নির্ভর করে বেড়ে উঠেছে, সেই নির্মল আধারটিকেও চাই তার। এরকম তো নয় যে সে অক্ষম। অথবা সে পৃথাকে ছুঁয়ে দেখতে চায় না। সে পৃথাকে চায়। খুব গভীর ভাবেই চায়। অথচ, কোথায় যেন অমলেন্দুর মনে হয় পৃথা পরিপূর্ণ নয়। অর্ধেক জীবনে জীবিত সে। কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে গেছে পৃথার এই বেঁচে থাকার মধ্যে। অমলেন্দু সেই অবশিষ্টটুকুই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চায়। সেই অসম্পূর্ণটুকুই ভালো করে বুঝিয়ে দিতে চায় সে ।
কিন্তু পৃথা কি এসবের ধার ধারে! সে কি কখনও বুঝে উঠতে পারবে অমলেন্দুকে? নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে মেলে দিতে পারবে তার কাছে? মানুষের শরীর তো সস্তার বিছানাতে জ্বলে উঠে বিছানাতেই ছাই হয়ে যায়। কিন্তু তারপর? সম্পর্কের পালকিটাকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যায় কোন রতনে? মানুষের মন কি এতটাই সস্তা। সন্ধেবেলার শহুরে গলির মোড়ে দাঁড়ান যারা শরীরের মতোন সহজলভ্য? নাহ, অমলেন্দু নিজের ভালোবাসাটাকে এসবের সঙ্গে কখনওই এক করে দিতে পারবে না। কখনওই সে সস্তা করে ফেলতে পারবে না তার প্রেমকে। হয়তো পৃথা নিজে থেকেই একদিন সবকিছু বুঝতে পারবে। অনুধাবন করতে পারবে তার প্রেমিকের আত্মার নিরোগ জ্যোৎস্নাটাকে।
আজ বৃহস্পতিবার। দুদিন আগে ফোন করে পৃথাই দেখা করার কথা জানিয়েছিল অমলেন্দুকে। সেই মতোন অফিস ডুব মেরে দিয়েছে সে। কয়েকদিন আগে পৃথা ফোন করে বলেছিল, ‘এই শোনো, বৃহস্পতিবার দেখা করতে চাই। অফিস ডুব দাও ওই দিন। দরকার আছে।’
অবশ্য কী দরকার সে কথা ফোনে কিছুই জানায়নি। অমলেন্দু বলেছিল, ‘রবিবার হলে ভালো হত। মান্থ এন্ডিংয়ে অ্যাবসেন্ট করলে খুব প্রবলেম হয়।’
‘না বৃহস্পতিবার ছাড়া আমার হবে না। রোববার পড়ানো থাকে আমার। একটা নতুন টিউশনি নিয়েছি।’
অমলেন্দু জানে পৃথার সঙ্গে বকবক করে লাভ নেই। ও আর দিন পরিবর্তন করবে না, তাই রাজি হয়ে যায় ‘ঠিক আছে, ওই দিনই ফিকসড রইল।’
‘রাগ করলে? লক্ষ্মীটি আমার।’
আর কোনও কথা হয়নি তাদের মধ্যে। তবে পৃথা তাকে বলেছিল প্রাচীতে একটা ভালো সিনেমা এসেছে। ফার্স্ট শো-টা ওরা দেখবে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে কলেজস্কয়ারে। ওখানেই বাকি সময়টা আড্ডা মেরে কাটাবে। কলেজস্কয়ারে আড্ডা মারতে অমলেন্দুর বেশ ভালো লাগে। ওদিকটায় ওদেরকে তেমন ভাবে কেউ চেনে না। তাই নিশ্চিন্ত। কিন্তু হঠাৎ সিনেমা দেখতে যাওয়ার প্ল্যানটা পৃথা কি মনে মনে আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিল? মাসের শেষে এমনিতেই হাতে বিশেষ টাকাকড়ি নেই। তার মানে আবার এটিএম থেকে কিছু তুলতে হবে। পৃথার অন্তত বোঝা উচিৎ। মাসের শেষে অসুবিধা থাকে সকলেরই। অমলেন্দুর একটু রাগ হয় পৃথার উপর। এর আগেও ওরা একসঙ্গে সিনেমায় গেছে বহুবার। আসলে সিনেমা দেখাটা উপলক্ষ মাত্র। ওটা সেকেন্ডারি। পৃথা জেনেশুনে শেষের দিকের কোণার সিট নাম্বার দেখে টিকিট কাটাবে অমলেন্দুকে দিয়ে। এটা জানা কথা। আর তারপর যা হয় আর কি। একবার তো অমলেন্দুকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করে দিয়েছিল। এমনকি পিঠের দিকে আঁচড়ে খামচে রক্ত জমিয়ে দিয়েছিল। প্রেমিককে আদরে ভরিয়ে দিতে চায় সে। তার কোনও হুঁশ থাকে না সেসময়। কিন্তু অমলেন্দুর অস্বস্তি হয়। ভাল্লাগে না ওর।

হেমচন্দ্র নস্কর রোড থেকে কিছুটা হেঁটে এসে সিআইটি মোড়ে এসে বারো নম্বর বাসটা ধরে নিলেই ভালো হত। কিন্তু অতটা আবার হেঁটে যেতে কারোর ভালো লাগে নাকি? তাই বাড়ির সামনে গলির মোড় থেকেই চুয়াল্লিশটায় উঠে পড়েছিল অমলেন্দু। ভেবেছিল, এই ভরদুপুরে বাসে ভিড়টা একটু কম হবে। ও বাবা এ যে ঠিক উল্টোটা! মারাত্মক ভিড়। সিট পাওয়া তো দূরের কথা, একটু শান্তিতে দাঁড়িয়ে যেতে পারলে হয়। একটা ভদ্রস্থ ফাঁকফোকড় খুঁজতে খুঁজতে মাঝের দিকে এসে লেডিজ সিটের সামনে দাঁড়ায় অমলেন্দু। যাক, এবার একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে সে। বাসে ট্রেনে ঠিকঠাক পজিশন না নিতে পারলে যে কী হ্যাপায় পড়তে হয় যারা ডেইলি পেসেঞ্জারি করেন তারা খুব ভালো করেই জানেন।
একবার পিছনে ঘুরে ডানদিকে তাকাল। হ্যান্ডিক্যাপ সিটটা যদিও ফাঁকা আছে। কিন্তু ওর বসতে ইচ্ছে করল না। অবশ্য ওর বসার আগেই দুজন বসে পড়ল। মুখে গুটকা চিবোতে চিবোতে বসে পড়া সেই দুজনকে ওদেরই আরেক বন্ধু একটা অদ্ভুত ইশারা করল। ওরা তিন জনেই হেসে উঠল। তারা সম্ভবত হিন্দিভাষী। তাদের কথাবার্তা ও বেশভুষা দেখে অমলেন্দুর তাই-ই মনে হল। এই টাইপের ছেলেগুলোকে সে একদম সহ্য করতে পারে না। ভিড়ের মধ্যে ওই তিনটি ছেলে যেন লোক দেখানো গল্প গুজবে মেতে উঠল। মাঝেমধ্যেই তারা কোড ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলছে আর গুটকা খাওয়া কালো দাঁতগুলো বের করে জোরে জোরে হাসছে।
‘আপনি আমার ওড়নাটা ছাড়বেন?’
অমলেন্দু লক্ষই করেনি। তার বাঁ হাতটা লেডিস সিটের হাতলে একটি মেয়ের ওড়না চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আসলে এত ভিড়ে অমলেন্দু ঠিক খেয়াল করেনি। মেয়েটার দিকে তাকাল সে। সুবেশী, তন্বী। চশমার মোটা ফ্রেমে বন্দি ক্যাটস আই তাকে আরও বেশি রূপসী করে তুলেছে। বেশ ভিড় বাসটায়। রাসমনি বাজার বাসস্টপের কিছুটা আগে একটু জোরে ব্রেক কষলেন ড্রাইভার। আর ড্রাইভারের এহেন অবিমৃশ্যকারিতায় রেগে গিয়ে কেউ কেউ কন্ডাকটারের উদ্দেশ্যে অপভাষা প্রয়োগ করলেন। বাস আবার স্পিডে এগোতে লাগল। আলোছায়া স্টপেজে আসার আগেই ক্যাটস আই মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। সম্ভবত তার গন্তব্য চলে এসেছে। অমলেন্দু একটু পিছিয়ে এল। সামনের দিকে একটি সিট খালি হয়েছে। বেশ কয়েকজন নামবেন এই স্টপেজে। যেমন করেই হোক একটা সিট পেতে হবে তাকে। নাহলে এতটা পথ কি সে দাঁড়িয়ে যাবে!
পিছনের সেই তিনটি ছেলে হঠাৎ অমলেন্দুর কাছে সরে এল। তাদেরই একজন অমলেন্দুর প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়াল। বাস এসে থেমেছে স্টপেজে। সকলে হুড়োহুড়ি বাধিয়ে দিল নামার জন্য। গা ঘেঁষে দাঁড়ানো ছেলেটি সামনের সেই মেয়েটির কাঁধে প্রায় থুতনি রেখে দিল। আর তার বুকটা মুঠো করে চেপে ধরল এক হাতে। স্পষ্ট দেখল অমলেন্দু। ভিড়ের মধ্যে মেয়েটি এমন ভাবে আটকে পড়েছে যে ঘুরে দেখার আগেই ছেলেগুলো মুহূর্তেই সেখান থেকে বেড়িয়ে বাস থেকে নেমে পড়েছে চোখের পলকে। অমলেন্দু কাঁপছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। মেয়েটি পিছনে ঘুরে অমলেন্দুর দিকে তাকিয়েই চেঁচিয়ে উঠলো, ‘শয়তানের বাচ্চা। ছোটোলোক আমার গায়ে হাত দেওয়া…!’

অমলেন্দু কিছু বলার আগেই মেয়েটি তার জামা ধরে টানা হেঁচড়া করতে থাকে। চড় বসায় তার গালে, পিঠে। আঁচড়ে দিতে থাকে। সেই সঙ্গে কয়েকজন প্যাসেঞ্জারও উঠে এসে অমলেন্দুকে মারতে শুরু করে। কন্ডাকটার হয়তো কিছুটা হলেও ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পেরেছে। সে কোনো মতে লোকের হাত থেকে অমলেন্দুকে ঠেকায়। ভিড়ের মধ্যে বেশ গন্ডগোল শুরু হয়ে যায়। বাসের বাইরে নামিয়ে আনে কয়েকজন তাকে। দু’চারজন রাস্তায় দাঁড় করিয়ে তাকে চড় কষায়। সঙ্গে চলতে থাকে অকথ্য গালি গালাজ। বাসটা স্টার্ট নিয়ে যেই চলতে শুরু করল অমনি সকলে উঠে গেল আবার। ভিড়টা অনেকটাই হালকা হয়ে আসে। অমলেন্দু দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার ধারে। কী থেকে যে কী হল কিছুই বুঝতে পারলো না সে। রাস্তার লোকের চোখ থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য সে খালপার ব্রিজের দিকে হাঁটা দিয়েছিল। ওখান থেকে অটোতে উঠে যেতে পারলে তবেই স্বস্তি।
অমলেন্দুর মনে কিন্তু কোনও ক্ষোভ নেই। সে মনে মনে চেয়েছিল সেই ছেলেগুলো যেন শাস্তি পায়। হয়তো তাদের প্রাপ্য শাস্তিটাই অমলেন্দু ভোগ করেছে। কিন্তু তাতে যেন অমলেন্দুর কোনও কষ্ট হচ্ছে না। বরং তার পরিবর্তে অন্য একটা ব্যাপার সে ফিল করছে। তার মনে হচ্ছে ওই হাতটা আসলে তারই ছিল। ওই স্পর্শটা সে চেয়েছিল। ওই নরম মাংসের উত্তেজনা সে অনুভব করতে পেরেছিল সেই মুহূর্তে। অমলেন্দু যেন মনে মনে মেয়েটিকে সম্ভোগ করতে চেয়েছিল। মেয়েটির রূপ সেই যেন চুমুক দিয়ে পান করতে চেয়েছিল।
অমলেন্দু মনে মনে আজ পৃথাকে খুব বেশি করে চাইছে। সিনেমার ওই অন্ধকারের আড়ালে আজ সে পৃথাকে গলিয়ে ফেলতে চাইবে অজানা এক উষ্ণতায়। পৃথা কি বাধা দেবে তাকে ? পৃথা কি বারণ করবে? করলেও আজ কিছুতেই সে কোনও কথাই শুনবে না। তাকে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে খেতে চায় সে আজ। পৃথার সুস্বাদু যোনিতে সে ঢুকিয়ে দিতে চায় তার পৌরুষ, অন্ধকার ও ভালো লাগা অসুখ। পৃথিবীর প্রতিটা ছেলেই যেমন করে চায় মেয়েদের, ঠিক সেভাবেই আজ অমলেন্দু পৃথাকে চাইবে। হয়তো এভাবেই পৃথা অমলেন্দুকে চেয়ে এসেছে এতকাল। দূরে গাড়ির শব্দে মুখ তুলে তাকাল অমলেন্দু। একটা অটো আসছে। অমলেন্দু তাকিয়ে দেখল। হাত নেড়ে ইশারায় দাঁড়াতে বলল অটোটাকে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news