সৌগত রায় বর্মন:
মহালয়ার সঙ্গে দুর্গাপুজোর সম্পর্কই নেই। ১৯৩১-এ রচিত হয় ‘সম্পর্ক’। জরুরি অবস্থায় রাজনীতি হল মহালয়া নিয়েও!কিন্তু হারলেন মহানায়ক, জিতলেন বীরেন্দ্র।
ঊষা লগ্নের শিউলি ভোরে ঘরে ঘরে মহালয়ার চণ্ডীপাঠ। তার মানেই পুজো আসছে বা এসেই গেছে। এভাবেই মহালয়ার সঙ্গে দুর্গাপুজোর একটা অবিচ্ছদ্য সম্পর্ক আমরা রচনা করে নিয়েছি মানসপটে। এই রোমান্টিকতায় আঘাত করা মোটেই ভালো কাজ নয়। কিন্তু সত্যি কথাটা না বলার কোনও কারণ নেই।
কেউ যদি বলে মহালয়ার সঙ্গে দুর্গাপুজোর সম্পর্কই নেই তাহলে এমনিতে আঘাত পাওয়ার কিছুই নেই। তবু দীর্ঘ এক বছর প্রতীক্ষার পর পুজো আসছে। মহালয়ার সকাল তেমনি একটি দিন, যেদিন থেকে বাঙালির আর ঘরে মন বসে না। শিউলি ফুল, নীল নীলিমা, নতুন জামা, নতুন শাড়ি, মনে হয় কবে পরব, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরব, চুটিয়ে প্রেম করব, আর দেদার জাং ফুড খাব। এ সবই সত্যি। এসব মানেই আনন্দ। পুরাণ চর্চা নয়। জানার কোনও শেষ নাই, জানা কথা জানলে ক্ষতি কি?
মহালয়া আসলে সূর্য বা পিতৃপক্ষের শেষ দিন। ঊষা লগ্নে শুরু হবে দেবীপক্ষ যা চন্দ্রের গতিপথের উপর নির্ভর করছে। পিতৃপক্ষ শেষ, দেবীপক্ষের সূচনা। আমরা সবাই জানি রামচন্দ্র অকালবোধন করে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। ভাগ্যিস তিনি পিতৃপক্ষে বোধন করেননি তাহলে হয়ত পুজো এগিয়ে আসত প্রবল গ্রীষ্মে বা শ্রাবণের প্লাবনে। মহালয়ার তিথিতে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করাই ভারতীয় রীতি। কিন্তু পিতৃপুরুষকে তর্পণের সঙ্গে রামচন্দ্র কৃত দেবী দুর্গার কী সম্পর্ক?
১৯৩১ সাল পর্যন্ত কোনও সম্পর্ক ছিল না। সম্পর্কটি রচিত হয় আকাশবাণীর সৌজন্যে। ১৯৩০ সালে আকাশবাণীর অধিকর্তাদের মনে হল এই দিন তো সবাই তর্পণের জন্য ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠেই পরে, তাদের জন্য একটা অনুষ্ঠান করলে কেমন হয়? কী অনুষ্ঠান হবে? সামনেই পুজো, চণ্ডীপাঠই হবে আদর্শ অনুষ্ঠান। গ্রন্থনা করবেন কে? বাণীকুমার। পাঠ করবেন কে? বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। সুর দেবেন কে? পঙ্কজকুমার মল্লিক। শুরু হল বিশাল কর্মকান্ড। শেষে ১৯৩১ সালে মহালয়ার পূণ্য তিথিতে সরাসরি সম্প্রচারিত হল চণ্ডীপাঠ। তখনও পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান লাইভ হত। আকাশবাণী কলকাতার বিশাল স্টুডিওতে ধূপ ধুনো জ্বালা হত। মাঝরাত থেকে সকল শিল্পী ও কলাকুশলীরা আসতেন পবিত্র দেহমনে। ঠিক ভোর চারটের সময়ে শুরু হত ‘জাগো, জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিনী…’। তার সঙ্গে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদার আওয়াজ, ‘যা দেবী সর্বভূতেষু…’। আকাশবাণীর ইতিহাসে কলকাতায় এই অবদানের রেকর্ড আজ পর্যন্ত কেউ ভাঙতে পারেনি। না স্বয়ং উত্তমকুমারও নয়।
এভাবেই মহালয়ার সঙ্গে তৈরি হল দুর্গা পুজোর একটা ‘অবিচ্ছেদ্য’ সম্পর্ক। পরিশেষে একটা কথা না বললেই নয় যেটি একটি লুক্কায়িত তথ্য। জরুরি অবস্থার সময়ে চণ্ডীপাঠকে বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অশুভ শক্তির বিরূদ্ধে শুভ শক্তির উত্থান যাতে না ঘটে তাই উদাত্তকণ্ঠী বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে বাদ দিয়ে উত্তরকুমারকে দিয়ে ‘নরম’ চণ্ডীপাঠের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যা ডাহা ফ্লপ বলে আজও চিহ্নিত হয়ে আছে।
হায় রাজনীতি, চণ্ডীকেও সেন্সর করতে হল।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news