Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / এক অসুস্থ কবি ও অসামান্য বাংলা কবিতা

এক অসুস্থ কবি ও অসামান্য বাংলা কবিতা

 কিশোর ঘোষ:

একজন অসুস্থ বাঙালি কবি ও অসামান্য বাংলা কবিতার সম্পর্ক আমরা আগেই জেনেছি। একাধিক উদাহরণ হতে পারে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে বিনয় মজুমদারের ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’র কথা। তেমনই এক মর্মস্পর্শী কবিতার বই গত শতাব্দীর নয়ের দশকের অন্যতম শক্তিশালি কবি সুবীর মণ্ডলের ‘লাইফ লাইন’।

জীবন ও মৃত্যুর বর্ডার লাইনে দাঁড়ানো সুবীরদা আমায় ফোন করেছিল সেবার। মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছিল নিশ্চিত। ফোনেই বলল, শেষবারের মতো দেখে যা ভাই। উত্তরে ওর দুর্গানগরের ফ্ল্যাটে গেলাম। তখন ক্যানসারে-যন্ত্রণায় না বসতে পারছে, না শুতে। কোনও ভাবেই কাবু করতে পারছে না বেঁচে থাকাটাকে (যা আমরা কেউ পারি না এক জীবনে!)। অবস্থা দেখে বুঝতে পারলাম, ক’মিনিট ক’ঘন্টা, বড়জোর ক’দিনের মধ্যে ফ্রেম বন্দি হবে আমার আর সুবীরদার সম্পর্কের দৃশ্যগুলো। বইমেলায়, লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় (নন্দন চত্ত্বরে), কফি হাউজে, বসন্ত কেবিনে, ফেবারিটে, প্রেসির বারান্দায়, সংস্কৃত কলেজের সিড়িতে বসে কত আড্ডা, কলেজস্ট্রিটের ট্রাম লাইন হেঁটে শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরা, মাঝে চায়ের দোকানে থমকে বেপরোয়া বাংলা কবিতা-খিস্তি-মন্ত্র-চা-সিগারেট….!

সেদিন ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতেও অবাক করে দিচ্ছিল সুবীরদা। নতুন কবিতা শুনিয়ে অবাক করছিল। মৃত্যুপথের অভিজ্ঞতায় বোনা সে সব কবিতা। না, একটা মানুষ নিমতলার ইলেকট্রিক চুল্লিতে প্রবেশ করতে করতেও কবিতা লিখেছে বলে অবাক হইনি আমি। অবাক হয়েছিলাম ওঁর প্যাশান দেখে। যতটুকু সময় কবিতা পড়ল ততক্ষণ যেন সুস্থ, নীরোগ, নিটোল জন্ম (মৃত্যুর প্রবেশাধিকার নেই সেখানে)। আচ্ছা, সেদিন যাকে দেখেছিলাম সেই কি অমৃতস্য পুত্রাঃ! এমন দেখার পরে কি বলতে পারি না— কবিতা অনন্ত, আর সেই অনন্তকে যখন ভালোবেসে গ্রহণ করেন কবি, তখন তিনিও অনন্ত। ম্যাজিক করে। অমর নয়, কিন্তু অনন্ত! পুণ্যশ্লোক দাশগুপের ‘উডবার্ণ ওয়ার্ড’ পড়তে পড়তে এতগুলো কথা মনে পড়ল।

‘উত্তর শিলালিপি’ থেকে প্রকাশিত ‘উডবার্ণ ওয়ার্ডে’ অবশ্য কেবলই কবির শেষ কদিনের দুনিয়াদারি নেই। আরও অনেক আছে। অনেক আনন্দময় ব্যথার কথা আছে, অনেক ব্যথাতুর আনন্দের কথা। তবে সেসবও যেন মৃত্যুরসে দ্রবীভূত ‘হাসনুহানা’, ফুটে আছে পাতায় পাতায়। হয়তো পুণ্যশ্লোক মারা গেলেন বলেই এমন মনে হচ্ছে! কিন্তু না, এই কবি দেখেছেন—খাবার ট্রলি এসে দাঁড়ালো সম্মুখে/ মাদার ডেয়ারির দুধ, সেদ্ধ ডিম/ রুটির প্যাকেট।/ জাফরির ফাঁক গলে ঝগড়ুটে পাখি/ দেখে নিল মেনু/ পাকা পেয়ারার স্বাদ অমৃত সমান।’

বিস্তারিত আলোচনার পরিসর নেই এগদ্যে। তাই প্রথম কবিতা গুচ্ছেই ঘোরাফেরা করব। আমার বিশ্বাস, তাতেই পাঠক বর্তমান গ্রন্থটির প্রতি তাড়িত হবেন। তবে একটি কথা না বললেই নয় যে, যদিও এগ্রন্থের সিরিজ কবিতাগুলি পড়তে পড়তে কবির জীবন সন্ধেকে অনুভব করা যায়, তথাপি তা ভীত, সন্ত্রস্ত করে না পাঠককে। এত প্রসন্ন শেষযাত্রা সচরাচর চোখে পড়ে না। আমাদের কবি যেন বা উপভোগ করছেন তাঁর জীবন ভ্রমণের শেষ সাইড সিন, শেষ কটা দিন, ঘন্ট, মিনিট। তাই লিখতে পারেন, ‘ব্যাকরেস্ট, ইলেকট্রিক কেৎলির চা/ লেখার কাগজ, চিন্তার স্রোত,/ আমি বেশ আছি…’।

‘আমি বেশ আছি’র পর কেন তিনখানা ডট? পুণ্যশ্লোক তাঁর গ্রন্থনাম কবিতায় পর্যটক চোখে খেয়াল করেন, ‘আমাকে যারা দেখতে আসেন,/ তারা কবি, মন্ত্রী, আর বৃদ্ধা-যুবতী’। মেধাবী কবি আরও জানান, ‘চোয়াল বসে গেছে, আহা/ বুকের পাঁজর খুলে খুলে/ গুণে দেখছেন—আহা, আহা/ সেলফি সরব, গালে গাল ঠেকিয়ে/ ছবি তুললেন কেউ, তার স্বামী/ ক্লিক করলেন, আহা আহা…’ ফের তিন ডটের মধ্যে অনেক কথা কি লুকোনো রইল!

কাব্য ভাষায় অতি মিষ্টভাষী এই কবি সুকৌশলে অন্তরের উত্তাপ রেখে গেলেন বুঝি তাঁর অন্তিম কাব্যগ্রন্থে। তবে রাগ, ঘেন্নার উপর ছড়িয়ে দিয়ে গেলেন চিনির দানার মতো ভালো ভালো কন্ট্রাস্ট শব্দ! যাতে করে কবিতা আরও কবিতা হয়ে ওঠে। তবে উষ্মাকেও শেষতক উপেক্ষা করেন পুণ্যশ্লোক। তাই তাঁর উচ্চারণ, ‘চল পানসি চল/ অন্য কোথাও আরও সুন্দর আছে/ অন্য ভালোবাসা আছে/ প্রেমপত্র আছে/ বর্ণময়, সবুজ’। না, এই পংক্তির পর দাড়ি কমা নেই। কারণ প্রেমিক কবি যখন একথা লিখছেন তার কিছুদিন পরেই যে তাঁকে অনন্তে পাড়ি দিতে হবে। ওই অনন্তে যাওয়াটাই যে বিনয়, সুবীর, পুণ্যশ্লোকের মতো আত্মার পাখির চোখ।

উল্লেখ্য, জীবন সায়হ্নে গুরুতর অসুস্থ পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্তকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আনতে হয়। এই সময় কবির পাশে দাঁড়ান এক কবি। ‘বন্ধু’ কবির নাম সুবোধ সরকার। সংবাদ পাওয়া মাত্র পশ্চিমবঙ্গ কবিতা অকাদেমির সভাপতি সুবোধ হাসপাতালে ভর্তি থেকে শুরু করে পরবর্তী চিকিৎসার বন্দোবস্ত করেন। পাশে না দাঁড়ানোর যুগে, পরিকল্পিত কুৎসার অন্ধকার টানেলে সুবোধদাকে ধন্যবাদ নয়, ভালোবাসা জানাই।

উডবার্ন ওয়ার্ড/ উত্তর শিলালিপি/ ১০০ টাকা

Spread the love

Check Also

প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে বিয়ে, করোনায় মৃত্যু হল বরের দাদার

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বড় জমায়েত করে আচার-অনুষ্ঠান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে প্রশাসনের। …

গুণমান খারাপ বুলেট প্রুফ জ্যাকেটের, চিনের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চিনের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ২০ জন …

শান্ত প্যানগং বিগত ৫০ বছর ধরে কেন ভারত-চিন সীমান্ত উত্তেজনার বড় কারন? জানুন ক্লিক করে

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো: ভারত ও চীনের সেনার মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *