Breaking News
Home / TRENDING / দুর্গতিনাশিনী (রবিবারের গল্প)

দুর্গতিনাশিনী (রবিবারের গল্প)

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়

১
আমার পিসি, দুর্গতিনাশিনী। তিনি নাকি সকলের ‘দুর্গতি’ নাশ করেন। পিতৃদত্ত নামটিও অবশ্য তাই।
আমাদের বংশের লোকেরা শুধুমাত্র নামকরণের মাধ্যমেই পরিবারের মেয়েগুলোর জীবন বরবাদ করে দিতে সিদ্ধহস্ত। তার আরেকটি জলজ্যান্ত প্রমাণ আমি নিজে। আমার নাম অমৃতকণা মুখোপাধ্যায়। কোনোদিন তো কেউ আমায় এই নামে ডাকলই না। স্কুলে, কোচিং-এ, পাড়ায়, এমনকী ঘরেও আমি ‘কণা’। এই ‘কণা’ নামটা শুনলেই আমার নিজেকে একজন মান্ধাতার আমলের বুড়ি বলে মনে হয়। এদিকে পরীক্ষার খাতায় “অমৃতকণা মুখোপাধ্যায়” লিখতে লিখতে দেখি অন্য বন্ধুদের ততক্ষণে দু-একটা শর্ট কোয়েশ্চেনের উত্তর লেখা হয়ে গেছে। একই রকমভাবে পিসির প্রসঙ্গ উঠলেই বাড়িতে বলাবলি হয়- “হ্যাঁ রে দুর্গতির কী খবর?”, “দুর্গতি কী করছে-টরছে কিছু খবর রাখিস?” একটা মানুষকে যদি ‘দুর্গতি’ বলে ডাকা হয়, তার চেয়ে দুর্গতির আর কী হতে পারে!
দুর্গতিনাশিনীর সঙ্গে আমার প্রথম যখন সাক্ষাৎ হয় তখন আমার ষোল বছর বয়স। শুনেছিলাম, পিসির নাকি ছোটবেলা থেকেই পুজো-আচ্চায় খুব মন। লেখাপড়া বেশি দূর না শিখলেও রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, উপনিষদ এসব গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পারত। বাড়িতে যা যা পুজো-পার্বণ হত, তার সব নিয়মকানুন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে জানত। শুধু তাই নয়, এ পাড়ায় ও পাড়ায় যেখানে যার বাড়িতে যে পুজো হত পিসি সেখানে চলে যেত এবং সব আচারবিধি শিখে-টিখে আসত। চোদ্দ বছর বয়স হতে না হতেই দুর্গতিনাশিনী নাকি দীক্ষা নিতে চেয়েছিল। আমাদের কুলগুরুর কাছে তার দীক্ষাও হয়ে গিয়েছিল। তার একবছরের মধ্যে পিসির বিয়ে হয়ে যায়। বেশ অবস্থাপন্ন ঘর, কল্যাণীতে নিজস্ব বাড়ি। ঈশ্বরে এমন ভক্তি আর এত রকম পুজোর বিধি জানে বলেই পাত্রপক্ষের পিসিকে খুব পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু, বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই দুর্গতিনাশিনীর দুর্গতির শুরু। পণ নিয়ে সে নাকি অকথ্য অত্যাচার! এ বাড়ির লোকজন বিয়ে-দিয়ে হাত-পা ঝেরে ফেলেছে, তাই তারা বিশেষ মাথা ঘামায়নি আর। তবে দুর্গতিনাশিনীকে বেশি দিন কষ্ট সহ্য করতে হয়নি। মাসখানেকের মধ্যে পিসির শ্বশুরবাড়ি পুরো সাফ। একমাত্র পিসেমশাই ছাড়া পিসির বাড়ির সকলেই একে একে দেহ রেখেছিলেন। লোকে বলে, পিসি নাকি কীসব তুকতাক করে নিজের দুর্গতি নিজেই নাশ করে ফেলেছিল। শুধু পিসির বাড়িতেই নয়, ওই পাড়াতেই যেন মড়ক লেগেছিল। প্রাণ বাঁচাতে অনেক লোকই পাড়া ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এদিকে শোকস্তব্ধ পিসেমশায়ের মাথায় কীসব গোলমাল দেখা দিয়েছিল, তারপর তিনিও একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যান। পিসেমশায়ের অন্তর্ধানের পর, এ বাড়ি থেকে নাকি পিসিকে ফিরিয়ে আনতে যাওয়া হয়েছিল। পিসি ফিরে আসেনি। তারপর থেকে পিসি কল্যাণীর এক প্রায় জনহীন গলিতে বসবাস করে। পার্শ্ববর্তী বাড়িগুলোর কোনোটি বারবার হাতবদল হয়েছে, যার হাতেই গেছে তার বাড়িতেই চরম অঘটন ঘটেছে বলে তিনি পুনরায় বাড়িটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। কোনোটি ভেঙে ফ্ল্যাট হতে গিয়ে নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাট ভেঙে পড়েছে। বিভিন্ন রকম ভৌতিক কার্যকলাপের জন্য একটি বাড়ি নাকি আধ-ভাঙা হয়ে পড়ে আছে। আর পিসি এখন পিশাচসিদ্ধ যোগিনী, ডাকসাইটে তান্ত্রিক “দুর্গতিনাশিনী মা” নামে বিখ্যাত হয়েছেন।
এবারে হয়েছিল কী, ক্লাস টেন-এ উঠে আমার মনটা কেমন কাটা যাওয়া ঘুড়ির মতো উড়ু উড়ু হয়ে উঠেছিল, কথা নেই বার্তা নেই লাগাম ছাড়া হয়ে কখনও এ আকাশে কখনও ও আকাশে উড়ে বেড়াত। তার ওপর দোসর হয়েছিল মোবাইল গেম। বাড়ির লোকের তো মহাচিন্তা- সামনে মাধ্যমিক! এমনিতে বহু বছর কেউ পিসির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি। তাও, আমাদের এই মধ্যবিত্ত সমাজে প্রয়োজনের সঙ্গে চক্ষুলজ্জা জিনিসটা যেহেতু ব্যাস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়, তাই এত বছর পর দুর্গতিনাশিনীর শরণাপন্ন হতে কেউ বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না। আমার যদিও ছোটবেলা থেকেই এসব তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-মাদুলি-আংটি, জ্যোতিষ কোনো কিছুতেই তেমন বিশ্বাস ছিল না। তবে যে পিসির এত গল্প শুনেছি, তাকে একবার দেখবার খুব ইচ্ছা ছিল। তাই বাড়ির লোকেরা যখন আমাকে দুর্গতিনাশিনীর কাছে নিয়ে যাবে বলে ঠিক করল, আমি আর বিশেষ আপত্তি করলাম না।
মা একদিন আমায় নিয়ে কল্যাণী রওনা দিল। কোন্নগর থেকে কল্যাণী কম পথ নয়। খুঁজে খুঁজে পিসিদের পাড়ায় পৌঁছনো গেল। পিসিদের গলিতে ঢুকতেই মনে হল চের্নোবিলের মতো কোনো এক পরিত্যক্ত নগরীতে প্রবেশ করেছি। চারিদিকে পোড়োবাড়ি। ইঁটের ফাঁক দিয়ে গাছ বেরিয়ে কোথাও কোথাও তা মহীরুহের আকার ধারণ করেছে। কোনো কোনো বাড়ি দেখে ছোটবেলায় বইতে পড়া ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগানের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে! “দুর্গতিনাশিনী মা”-এর হোর্ডিং দেখে পিসির বাড়ি সহজেই চিনতে পারলাম। এ বাড়ির অবস্থা অবশ্য বেশ ভালো। দেখেই বোঝা যায়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয়। তার মানে দুর্গতিনাশিনীর রোজগারপাতি মন্দ হয় না।
মাকে দেখা মাত্রই দুর্গতিনাশিনী চিনতে পারল। বাপের বাড়ির লোক এসেছে দেখে খুবই উৎফুল্ল হয়ে উঠল। আমাদের যথাযথ আদর-আপ্যায়ন করা হল। দুর্গতিনাশিনীর পরনে ছিল লাল সিল্কের শাড়ি, সঙ্গে লাল ব্লাউজ। গলায় অগণিত রুদ্রাক্ষের মালা। চুলে তখনও জটা পড়েনি, পড়ব পড়ব করছে। মাথায় চওড়া করে সিঁদুর পরা। কপালে এত্ত বড় লাল টিপ। আমার পরিচয় জেনে এবং আমার নামটি শুনে পিসি বলল- “তা অমৃতকণা, কীসে পড়া হয়?” এই প্রথম কাউকে আমার পুরো নাম ধরে সম্বোধন করতে শুনলাম! মা বিশেষ ভূমিকায় না গিয়ে তাড়াতাড়ি কাজের কথায় চলে এল। আমার জন্মকুণ্ডলীটাও মা বগলদাবা করে নিয়ে এসেছিল। পিসি আমার কোষ্ঠী বিচার করল, হাত-ফাত দেখল। তারপর বলল- “এ মেয়ের তো পড়াশোনায় কোনো বাধা নেই।” মা আমতা আমতা করে বলল- “সেকি দুর্গতি, কোনো মাদুলি-টাদুলি লাগবে না বলছ!” পিসি বলল- “কিচ্ছু লাগবে না। অমৃতকণার এই অন্যমনস্কতা সাময়িক। কিছু দিনের মধ্যেই কেটে যাবে। ও ভালো ফল করবে।” আমার ভারী অবাক লাগল। আমি তো শুনেছিলাম, এইসব তান্ত্রিক বা জ্যোতিষীদের কাছে গেলেই এরা একগাদা শিকড়-বাকড়, তাবিজ, আংটি ইত্যাদি যা পারে গছিয়ে দেয়। তেমন হলে আমার বাড়ির লোক পয়সা খরচ করতে পিছপা হত না। কিন্তু, পিসি তো সে দিকেই গেল না! আমরা যে আত্মীয়তার কথা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম, হয়তো সেই আত্মীয়তার কথা মাথায় রেখে পিসি আমাদের সঙ্গে কোনো ব্যবসায় যেতে চায়নি।
ইতিমধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। এমন সময় দুর্গতিনাশিনীর দোতলায় ধুপধাপ ধুপধাপ শব্দ হতে শুরু করল। পিসি স্বগতোক্তির মতো করে বলল- “ওই তেনারা এলেন!” তারপর সিঁড়ির কাছে গিয়ে চিৎকার করে কীসব “হ্রিং ত্রিং” মন্ত্র উচ্চারণ করল। তাতে ধুপধাপটা একটু যেন শান্ত হল। ততক্ষণে মায়ের মুখটা পাঁশুটে বর্ণ ধারণ করেছে। দুর্গতিনাশিনী ভেতর-ঘরের দিকে মুখ করে হাঁক পাড়ল- “সরস্বতী, যা, ওপরের ঘরে একটু ধুনো দিয়ে আয় তো।” “যাই মা” বলে ভেতরের ঘর থেকে যে মহিলাটি বেরিয়ে এলেন তিনি পিসির থেকে অন্তত বছর দশেকের বড় হবেন বলে মনে হল। দুর্গতিনাশিনী কী করে এই মহিলার মা হতে পারে তা আমার মাথায় ঢুকল না। এদিকে মা কোনোমতে “আজ আসি গো দুর্গতি, অনেকটা পথ যেতে হবে” বলে বিদায় নিয়ে নিয়েছে। আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে সেখান থেকে তো রীতিমত দৌড়! বাড়িতে ফেরার পর সকলে বলল- “আসলে দুর্গতির সবটাই বুজরুকি। ও কি থোড়াই কিছু জানে? জানলে নিদেনপক্ষে একটা মাদুলিও দিতে পারল না?”
এই হয় আসলে। যেমন, আমাদের পাড়ার বাসুডাক্তারের তেমন পসার নেই। কিছু গরিব-দুঃখী ছাড়া সচরাচর বাসুডাক্তারের কাছে কেউ যায় না। কারণ, কেশে মুখ দিয়ে রক্ত উঠে গেলেও বাসুডাক্তার বলবেন- “কাশ আরও কাশ, ও এমনি কমে যাবে। কথায় কথায় অত ওষুধ খেলে ইমিউনিটি বাড়বে কী করে?” লোকে বলে- “ও ডাক্তারি জানলে তবে তো ওষুধ দেবে। ব্যাটা পাসই করেনি। ডাক্তার হল আমাদের প্রমথ।” প্রমথবাবু ভালো ডাক্তার হবেন না কেন, সামান্য কাশি নিয়ে যাও, দুটো অ্যান্টিবায়োটিক, একটা সিরাপ, সঙ্গে একটা ভিটামিন, একটা লিভার টনিক! আর কী চাই? ছোটবেলায় এসব না বুঝলেও যত বড় হয়েছি তত বুঝেছি, বাসুডাক্তারের মতো ডাক্তারদের এ সমাজে ঠিক কতখানি প্রয়োজন। যাইহোক, পিসির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সেই রকমই হয়েছিল। দুর্গতিনাশিনীর ওপরে আমার বাড়ির লোকেরা ভরসা রাখতে পারেনি। আমাকে অন্য কে এক জ্যোতিষীবাবার কাছে নিয়ে যাবার কথা উঠেছিল। এবারে আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাই। বলি- “আর কোত্থাও আমি যাব না। জোর করা হলে আমি লেখাপড়াই ছেড়ে দেব।” বাড়ির লোকেরা আর আমায় ঘাঁটাতে আসেনি।
দুর্গতিনাশিনী খুব একটা ভুল বলেনি। মাধ্যমিকে আমার দুর্দান্ত ফল হল। কিন্তু, বাড়ির কাউকে দেখলাম না পিসিকে আমার রেজাল্ট জানানোর ভদ্রতাটুকু দেখাতে। প্রয়োজনে পিসিকে মনে পড়েছিল। প্রয়োজন ফুরিয়েছে, আবার সবাই পিসিকে ভুলে গেছে। বিষয়টা আমার একদমই ভালো লাগেনি। কিন্তু, হল কী, সপ্তাহ খানেক কাটতে না কাটতে একদিন দেখি, খবরের কাগজে কল্যাণী নিবাসী “দুর্গতিনাশিনী মা”-এর বিজ্ঞাপন! সেখান থেকে ফোন নম্বর নিয়ে একদিন পিসিকে ফোন করলাম, বললাম- ” আমি কণা বলছি, চিনতে পারছেন পিসি?” ওপার থেকে ভেসে এল- “আরে আমার অমৃতকণাকে চিনতে পারব না? তোদের কারো ফোন নম্বর নেওয়া হয়নি সেদিন। তাই ফোন করে খোঁজ নিতে পারি না। হ্যাঁ রে, তোর রেজাল্ট কেমন হল? পিসির কথা মিলেছে তো? …”
পিসির বিজ্ঞাপনে যেমনটা লেখা থাকে সেসব সত্যি না মিথ্যে জানি না। তবে, মানুষটার প্রতি আমার কেন জানি না খুব মায়া হত। হিসেব মতো সেই পনের বছর বয়স থেকে একা একা জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। কী অদ্ভুত মনের জোর! আর কেউ সম্পর্ক রাখুক না রাখুক, আমি তারপর থেকে প্রায়শ পিসিকে ফোন করে খবরাখবর নিতাম।

২
দেখতে দেখতে দু-বছর কেটে গেছে। ততদিনে আমি উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে ফেলেছি। উচ্চমাধ্যমিকেও যথারীতি ভালো ফল হয়েছে। জয়েন্টেও র‍্যাঙ্ক করেছি। কল্যাণী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে ভর্তিও হয়ে গেছি। মুশকিলটা হল, যখন হোস্টেল পাওয়া গেল না। নিদেনপক্ষে একটা ভালো মেস বা পেইংগেস্টও না! কোন্নগর থেকে কল্যাণী ডেলি-প্যাসেঞ্জারি প্রায় অসম্ভব। স্বাভাবিকভাবেই আবার আমার বাড়ির লোকেদের দুর্গতিনাশিনীর কথা মনে পড়ে গেল। বাবা আমায় ডেকে বলল- “বলছি কী, যতদিন না ভালো একটা মেস বা পেইংগেস্ট কিছু পাওয়া যাচ্ছে ততদিন তুই যদি দুর্গতির বাড়িতে গিয়ে থাকিস …” শুনে মা হাঁ হাঁ করে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এল। বাবার উদ্দেশে বলতে লাগল- “তোমার মাথাটা কি একেবারেই গেছে? ওই ভূতের বাড়িতে মেয়েটাকে থাকতে বলছ কী বলে?” শেষে আমি বললাম- “আমি ওইসব ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করি না। পিসির যদি কোনো সমস্যা না হয় আমার পিসির বাড়িতে থাকতে অসুবিধা নেই। মোট কথা, ক্লাস কামাই করা যাবে না।” মুখে এসব বললেও, আমি ভালো করেই জানতাম পিসির বাড়িতে কিছু একটা রহস্য লুকিয়ে আছে।
পরদিন ছিল রবিবার। বাবা আমায় নিয়ে সোজা এসে উপস্থিত হল দুর্গতিনাশিনীর বাড়ি। তলে তলে যদিও আমার সব আপডেটই আমি ফোন মারফত পিসিকে জানাতাম। এক যুগ পর ভাইকে দেখে পিসি তো পুরো হেসে-কেঁদে একসা, তার ওপর আমি পিসির বাড়িতে থাকব শুনে তো খুশিতে একদম আত্মহারা। বাবাকে তো বলেই দিল- “পিসির এত বড় বাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে আর আমার অমৃতকণা মেসে থাকতে যাবে কোন দুঃখে?” বাবা যদিও আমায় পেয়িংগেস্ট হিসেবেই রাখতে চেয়েছিল। পিসি সে শুনবে? রাগ করে বলল- “দুর্গতিকে এত বড় কাঙাল পেয়েছিস যে সে নিজের ভাইঝিকে রাখতে দু হাত পেতে পয়সা নেবে!” সেদিনের মতো আমরা ফিরে এলাম।
সোমবার সকালে বাবা-মা দুজনে মিলে আমায় বাক্স-প্যাটরাসহ দুর্গতিনাশিনীর বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে গেল। যাবার সময় মা খুব কাঁদছিল। আমারও মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল- কোনোদিন তো এর আগে বাড়ি ছেড়ে, মা-বাবাকে ছেড়ে থাকিনি। তাও মাকে বললাম- “তুমি একদম চিন্তা করো না। আমি পিসির কাছে ভালোই থাকব।” মা আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল- “কিছু গন্ডোগোল বুঝলে ফোন করিস। আমরা রাতবিরেত হোক, যখনই হোক ঠিক তোকে এসে নিয়ে যাব।” আমিও ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম বটে তাও কি বুঝি না কোন্নগর থেকে কল্যাণী যখন-তখন দৌড়ে আসাটা অত সহজ নয়?
পিসির বাড়িতে নিচের তলার একটা ঘরে আমার থাকার বন্দোবস্ত হল। এ বাড়িতে দুটো সদর দরজা। একটা দিয়ে ঢুকে পিসির চেম্বার- সেখানে সকাল হলে রোজ ভক্ত সমাগম ঘটে। আরেকটা দরজা মূল বসতবাটির।
এখানে আসার পরে পরেই পিসি মিষ্টি মিষ্টি কথায় আমার ওপর বেশ কয়েকটা শর্ত আরোপ করল। শর্ত ঠিক নয়, পিসি বক্তব্য অনুসারে সেগুলো হল অনুরোধ। প্রথমত, আমি যে দুর্গতিনাশিনীর ভাইঝি তা কাউকে বলা চলবে না। দ্বিতীয়ত, বাড়িতে কোনো বন্ধু আনা তো দূর অস্ত আমি কোথায় থাকি সে কথাটি অবধি কাউকে বলা চলবে না। তৃতীয় শর্ত বা অনুরোধটি সব চেয়ে আশ্চর্যজনক- আমি কখনও কোনো অবস্থাতেই দুতলায় উঠতে পারব না! কারণ, দোতলাটা পিসির সাধনার জায়গা, সেখানে প্রবেশ করতে গেলে শুদ্ধ মনে প্রবেশ করতে হয়। নয়ত খুব বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
এদিকে পিসির এখানে আমার যত্ন-আত্তিরের কোনো অভাব হচ্ছে না। এলাহি খাওয়া-দাওয়া। পিসি একদম যাকে বলে রাজার হালে রেখেছে আমায়। শুধু পিসি নয়, পিসির ওই মেয়ে সরস্বতীদিও আমার খুব খেয়াল রাখে। হ্যাঁ, ও যেহেতু পিসির মেয়ে, বয়স যা-ই হোক না কেন ওকে আমি দিদি বলেই ডাকি। অবাক কাণ্ড, সরস্বতীদিও উল্টে আমায় দিদি বলেই ডাকে!
সরস্বতীদির কিন্তু ওপরতলায় এন্ট্রি আছে। আরেকজনেরও আছে, এবাড়িতে আসার পর তাকে আমি চিনেছি, তিনি হলেন ডাক্তারকাকা। তিনি দুবেলা নিয়ম করে স্কুটি চালিয়ে এসে সোজা দোতলার ঘরে চলে যান। পিসিকে দেখে-টেখে কিছুক্ষণের মধ্যে আবার তিনি ফেরত চলে যান। এসব রোজই দেখি। একদিন তো সরস্বতীদিকে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম- “পিসির কী এমন অসুখ গো, দুবেলা ডাক্তার দেখতে হয়?” সরস্বতীদি বলেছিল- “মায়ের তো সুগার, ইনসুলিন নিতে হয়। প্রেশারটাও খুব আপ-ডাউন করে। ডাক্তারকাকা এ বাড়ির অনেক দিনের চেনা-পরিচিত। তাই দুবেলা এসে মাকে দেখে যায়।” এসব শুনে আমার কেন জানি না মনে হল, ডাক্তারকাকার ব্যাপারটা নিয়ে আর না ঘাঁটতে যাওয়াই শ্রেয়।
এবার ভূত-প্রেতের বিষয়টায় আসি। সন্ধ্যে থেকে ওপরতলায় মাঝেমাঝেই ধুপধাপ শব্দ হয়, কখনও কখনও একটা গোঙানির আওয়াজ শুনতে পাই, মাঝেমধ্যে মনে হয় ওপরের ঘরে ভারী শিকল ঘষটাতে ঘষটাতে কে যেন নড়ে-চড়ে বেড়াচ্ছে, এসব ছাপিয়ে কখনও কখনও শুনতে পাই দুর্গতিনাশিনীর তারস্বরে মন্ত্র পড়ার আওয়াজ। বাড়িতে এসব বলি-টলি না। মা এমনিতেই আমার জন্য খুব চিন্তা করে। এই বৃত্তান্ত জানলে তো আর রক্ষে নেই!
কলেজে যেসব নতুন বন্ধু-বান্ধব হয়েছে তাদের সবার খুব কৌতুহল আমি কোথায় থাকি সেটা জানার জন্যে। তাদের বলেছি, আমি পিসির বাড়িতে থাকি, পিসি খুব কড়া, বন্ধু-বান্ধব দেখলেই খচে ফায়ার হয়ে যাবে, তাই আমি আমার ঠিকানা কাউকে জানাতে চাই না। এইসব বলে বন্ধুদের কোনোমতে চুপ করিয়ে রেখেছি।
এভাবে বেশ দিন কেটে যাচ্ছিল- খাচ্ছি-দাচ্ছি, কলেজ যাচ্ছি, পড়াশোনা করছি, সপ্তাহ শেষে বাড়ি যাচ্ছি। ভূতের উৎপাতটাও বেশ গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় একদিন রাত্রে, একটা ভয়ংকর শব্দে ঘুম ভেঙে গেল! এ কোনো মানুষের গলার আওয়াজ হতে পারে না। জন্তুরও না। যেন কোনো দানবের চিৎকার। প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে উঠতে না উঠতে আবার সেই হাড় হিম করা ডাক। আমি একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুলতেই দেখি সরস্বতীদি ছুটে এল। ওপর থেকে পিসির মন্ত্র পাঠের শব্দও ভেসে আসছে। সরস্বতীদি বলল- “ওপরে জিনভূত খেপেছে। তুমি ঘর থেকে একদম বেড়িও না। মা জিনভূতকে শায়েস্তা করছে।” ভয় পাইনি বললে মিথ্যে কথা বলা হবে। বাড়িতে ফোন করতে গিয়েও করলাম না। এত রাতে ওদের জানিয়ে কী হবে? অত দূর থেকে ওরা দুশ্চিন্তা ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারবে? অগত্যা কানে বালিশ চাপা দিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। জিনভূত অনর্গল গর্জন করে যাচ্ছে। পিসির পুজোপাঠও চলছে। এরমধ্যে কী করে জানি না আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল ভোররাতে, স্কুটিতে স্টার্ট দেবার শব্দে। জানলার খরখরি ফাঁক করে দেখলাম- ডাক্তারকাকা! পরিবেশ তখন বেশ শান্ত, কোথাও কোনো সাড়া-শব্দ নেই।
সকালে জলখাবারের টেবিলে দেখলাম পিসি অনুপস্থিত। বাধ্য হয়ে আবার সরস্বতীদিকে জিজ্ঞাসা করলাম- “পিসি কি অসুস্থ? ভোরবেলা ডাক্তারকাকা এসেছিলেন মনে হল!” সরস্বতীদি বলল- “হ্যাঁ, গো দিদি। রাতভোর মায়ের ওপর দিয়ে যা ধকল গেল! জিনভূতকে বশে আনতে গিয়ে মায়ের শরীরটা খারাপ করে গেছে। ডাক্তারকাকা এসে ইঞ্জেকশন দিল। মা ঘুমোচ্ছে। মায়ের রেস্ট দরকার।” শরীর তো আমারও খারাপ লাগছিল। রাতে ঠিকঠাক ঘুম হয়নি। নেহাত কলেজ না গেলেই নয়, তাই কলেজ চলে গেলাম। পিসির সঙ্গে দেখা হল সেই ডিনারের সময়। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, পিসি পুরো বিধ্বস্ত। এবার হল কী, আমার মুখ ফসকে বেরিয়েই গেল- “পিসি, অনেক তো হল। এবার তোমার জিনভূতটাকে ছেড়েই দাও।” পিসি খানিকটা চমকে উঠে আমার দিকে চেয়ে রইল। তারপর বলল- “তুই তো আমার মতোই মুখার্জ্জী বাড়ির মেয়ে। আমাদের বাড়ির মেয়েরা কিন্তু খুব সাহসী হয়। আমি জানি, আমার অমৃতকণা ভয় পায়নি। জিনভূত কোনোদিন নিচে নেমে আসবে না, এইটুকু জেনে রাখ। আর তুই তো বুদ্ধিমান মেয়ে, এসব বাড়িতে বলে মাকে যেন ভয় পাওয়াসনি।” শুনে আমিও বললাম- “তুমি আমাকে বোঝ আমি জানি। আমি কাউকে কিছু বলিনি, বলবও না।”

৩
মাস-খানেক কেটে গেছে। প্রতিদিনের রুটিন ধুপধাপ তো আছেই এরমধ্যে মাঝরাতে জিনভূতের খেপে ওঠা, তাকে দাবিয়ে রাখতে পিসির রাতভোর মন্ত্রপাঠ, পিসির অসুস্থ হয়ে পড়া, ডাক্তারকাকার স্কুটি নিয়ে রাতবিরেতে দৌড়ে আসা এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি বেশ কয়েকবার হয়েছে। আমি এগুলোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি। এর মধ্যে কাছেপিঠে বেশ কিছু মেস, পেয়িংগেস্ট খালি হবার খবর কানে এসেছিল। কিন্তু, পিসিকে ছেড়ে যেতে মন চায়নি। সারা জীবন তো একা একা কাটিয়েছে। এত দিন বাদে রক্তের সম্পর্কের কাউকে কাছে পেয়ে পিসির যে পরিতৃপ্তি সেটা নষ্ট করতে ইচ্ছে করেনি। তাছাড়া, পিসি আমার দুর্দিনের আশ্রয়দাতা। এখন তাকে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া যায় নাকি? তাছাড়া পিসি এত ভালোবাসে, এত যত্ন নেয় আমার।
তো সেদিন কী হয়েছে, সন্ধ্যে থেকেই জিনভূতের অল্পবিস্তর উৎপাত শুরু হয়েছিল। মাঝরাতে দোতলায় যেন কুরুক্ষেত্র শুরু হল। কী ভয়ঙ্কর আওয়াজ! বাধ্য হয়ে আমি দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। বাইরের ঘরে অন্ধকার। আমি বেরিয়ে আসতেই সরস্বতীদি ছুটে এল। আমায় বলল- “ভেতরে ঢুকে যাও দিদি। মা তো আছে। ভয়ের কিছু নেই।” আমিও কী একটা বলতে গিয়েও বললাম না। ঘরে ঢুকে আসব আসব করছি। এমন সময় ওপরে কী যেন ভেঙে পড়ার শব্দ হল, সেই সঙ্গে পিসির আর্তনাদ। কী করব যেন ভেবে পাচ্ছি না। সরস্বতীদি বলছে- “দিদি তুমি ভেতরে যাও। আমি একবার ওপরে যাই। গিয়ে দেখি কী হল।” আমি সরস্বতীদির হাতদুটোকে শক্ত করে ধরলাম। বললাম- “একদম চুপ। ওই দেখো।” অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে দানবের মতো একটা কিছু নিচের তলায় নেমে আসছে। যেমন লম্বা, তেমনি চওড়া। বিকট গন্ধ বেরচ্ছে গা দিয়ে। ঘাড় কুঁজো হয়ে আছে। মুখ দিয়ে একটা বিটকেল গোঙানির শব্দ বের করছে। সরস্বতীদি ফিসফিস করে বলল- “এবার কী হবে?” আমি এক মুহূর্তও না চিন্তা করে দৌড়ে গিয়ে সদর দরজাটা হাট করে খুলে দিয়ে চলে এলাম। জিনভূত ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামল। হাট করা দরজা দিয়ে লাইটপোস্টের আলো ঢুকছিল। জিনভূত সেইদিকে এগিয়ে গেল। তারপর আস্তে আস্তে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ আমাদের রুদ্ধশ্বাসে কেটে গেল। সরস্বতীদি বলল- “ও তো চলে গেল। মাকে কী জবাব দেব?” আমি সদর দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম, নির্জন গলি দিয়ে জিনভূত কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। দরজা বন্ধ করে দিয়ে ফিরে এসে সরস্বতীদিকে বললাম- “ওপরে গিয়ে দেখ পিসির কী হয়েছে।” সরস্বতীদি ওপর থেকে ঘুরে এসে বলল- “মায়ের মাথা ফেটে গেছে, স্টিচ করতে হবে।” আমি বললাম- “ডাক্তারকাকাকে ডাকো, বলো সার্জেন নিয়ে আসতে। বা কাছাকাছি কোনো হসপিটালে যদি নিয়ে যাওয়া যায় …” সরস্বতীদি বলল- “আমি নম্বর দিচ্ছি, তোমার ফোন থেকে ফোন করো।” নম্বরটা নিয়ে আমি ফোন করলাম। অনেকক্ষণ বাজার পর ডাক্তারকাকা ফোন ধরলেন। আমি বললাম- “আমি দুর্গতিনাশিনীর ভাইঝি বলছি। পিসির মাথা ফেটে গেছে। আপনি তো সাইকিয়াট্রিস্ট। একজন সার্জেন লাগবে।” ডাক্তারকাকা বললেন-“আমি সাইকিয়াট্রিস্ট তুমি জানলে কী করে? … ঠিক আছে, আমি আসছি। আমার একজন সার্জেন বন্ধু আছে তাকে নিয়েই আসব।” কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তারকাকা তাঁর সার্জেন বন্ধুকে নিয়ে এসে পড়লেন। আমি ততক্ষণে ভীষণ ক্লান্ত, প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে। ওঁরা এসেছেন দেখে ঘরে গিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাঙল দুপুরবেলা। সরস্বতীদি ঘুম থেকে তুলে দিয়ে বলল- “চলো দিদি, দুটি খেয়ে নেবে চলো।” খেয়ে-দেয়ে আবার গিয়ে শুয়েছিলাম। বিকেলবেলা সরস্বতীদির মুখে শুনলাম পিসি নাকি আমায় ওপরে ডেকেছে। তো গেলাম। ওপরে যেতেই সেই দুর্গন্ধটা নাকে এল যেটা কাল জিনভূতের গা থেকে পাচ্ছিলাম। দোতলায় পিসির বিশাল ঠাকুর ঘর। তারই একপাশে পিসি খাটে শুয়ে, মাথায় ব্যান্ডেজ। পাশে আরেকটা ঘর। সেই ঘরের দরজা ভেঙে পড়ে আছে, ভেতরে একটা ভারী শিকল রাখা রয়েছে। আমি পিসির ঘরে ঢুকে খাটের কাছে এলাম। পিসি হাতের ইশারায় বসতে বলল। আমি খাটের ধার ঘেঁষে বসলাম। তারপর বললাম- “পিসেমশাই কি প্রথম থেকেই এরকম ছিল?” পিসি আমার কথা শুনে মোটেও আশ্চর্য হল না। মৃদু স্বরে বলতে লাগল- “নাহ রে। বিয়ের পর উনি ভালো মানুষই ছিলেন। কী এক অজানা জ্বর ঢুকল বাড়িতে। পুরো বাড়ি শেষ। রয়ে গেলাম আমি আর উনি। শুধু এ বাড়ি নয়। আসেপাশের সব বাড়িতেই একই হাল। পাড়া ছেড়ে লোকে ভয় পালাতে লাগল। তোর পিসেমশাই এই ধাক্কাটা সহ্য করতে পারলেন না। পাগল হয়ে গেলেন। তখন থেকেই ডাক্তারকাকার সঙ্গে পরিচয়। ওঁর কাছে নিয়ে যেতাম, কিন্তু কাজ কিছুই হচ্ছিল না। তারপর …” আমি উৎকণ্ঠার সঙ্গে বলে উঠলাম- “তারপর কী? এই অবধি আমি সবটাই প্রায় আন্দাজ করে উঠতে পেরেছিলাম। বাকীটা বলো।” পিসি বলতে থাকল- “একদিন ডাক্তারকাকা এসে বললেন, আমেরিকায় নাকি কী এক ওষুধ বেরিয়েছে। কাজ হলে একদম অব্যর্থ। তোর পিসেমশাই একদম ঠিক হয়ে যাবে। ওরা বিনাপয়সায় দেবে সেই ওষুধটা। কিন্তু, মুশকিলটা হচ্ছে ওষুধটা এখনও অবধি কোনো মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হয়নি। তাই ওরা তৃতীয় বিশ্ব থেকে একজন মানুষকে খুঁজছে যার ওপর এই ওষুধটা পরীক্ষা করা যায়।” শুনে আমি বললাম- “সেই তো, প্রথম বিশ্বের মানুষের ওপর তো আর এইসব মামদোবাজি চলে না। ভয়ানক ব্যাপার তো। তারপর এই ওষুধে হিতে বিপরীত হলে?” পিসি বলে চলল- “ওরা বলেছিল, ওষুধে যদি আরও খারাপ কিছু হয়ে যায় তখন ওরা এককালীন একটা ক্ষতিপূরণ দেবে আর পেসেন্টের সারাজীবনের খরচার সব দায়িত্ব নেবে।” আমি বললাম- “তুমি রাজি হয়ে গেলে?” পিসি বলল- “এ ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না। রিস্ক আমাকে নিতেই হত। প্রথম প্রথম আত্মীয়-স্বজনেরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও আস্তে আস্তে সবাই হাত গুটিয়ে নিচ্ছিল। এ ভাবে লোকের কাছে চেয়ে-চিন্তে কত দিন চলতে পারে? হয় পিসেমশাই সুস্থ হোক, না হয় ক্ষতিপূরণের টাকাটা আসুক। এসব ভেবে আমি “হ্যাঁ” বলে দিয়েছিলাম।” আমি বললাম- “ওষুধে কাজ নিশ্চই হয়নি।” পিসি বলতে লাগল- “না, কাজ হয়নি উল্টে মানুষটা আর মানুষই রইল না। ভায়লেন্ট হয়ে গেল। ক্ষতিপূরণের টাকাটা অবশ্য পেয়েছিলাম। মাসে মাসে চিকিৎসার টাকাটাও আসে। ভালো টাকাই দেয় ওরা।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম- “টাকাটা কীভাবে আসে তোমার কাছে?” পিসি বলল- “আসে ডাক্তারকাকার অ্যাকাউন্টে। কী একটা ফেলোশিপের টাকা হিসেবে।” শুনে আমি বললাম- “বুঝলাম, আর সরস্বতীদির গল্পটা কী? ও তো একজন ট্রেন্ড নার্স।” পিসি হেসে বলল- “সেটাও বুঝে গেছিস। ওর সাতকুলে কেউ নেই। একটা মানসিক রোগীদের হাসপাতালে নার্স ছিল। ডাক্তারকাকাই ওকে এনেছেন। এখন তো ও আমার ঘরের লোক হয়ে গেছে।” আমি বললাম- “এখন তাহলে কী করণীয়?” পিসি বলল- “কী আর করব? বহুবছর আগে যে মানুষের নাম নিরুদ্দেশের খাতায় উঠে গেছে তাকে নিয়ে আজ আর পুলিসের কাছে নিখোঁজ-ডায়রি লিখতে যাওয়ার কোনো তো মানে হয় না।”

এরপর দিনদুয়েক কেটে গেছে। একদিন শুনলাম, আমাদের কলেজের গেটের কাছে বিরাট লম্বা-চওড়া, দানবের মতো এক পাগল এসে উপদ্রব করছিল। সরকারি হাসপাতালের গাড়ি এসে তাকে তুলে নিয়ে গেছে।

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *