Breaking News
Home / TRENDING / এবার নববর্ষে একটাই প্রার্থনা, আমাদের ভবিষ্যৎ ভূত মুক্ত হোক!

এবার নববর্ষে একটাই প্রার্থনা, আমাদের ভবিষ্যৎ ভূত মুক্ত হোক!

 শাশ্বত কর:

আজকের দিনটায় আমার খালি খালি জেনাসের কথা মনে হয়। রোমান ঈশ্বর। দুই মুখের একখানা পাতা অতীতে, আর একটা ভবিষ্যতে! ওরে বাবা, ভবিষ্যৎ বলতেই এখন আমার আবার কেমন একটা ভূত ভূত ফিলিং হয়! অবিশ্যি ভূত মানে তো কেবল দাঁত খিঁচোনো স্কন্ধকাটা আর ‘শ্যাওড়া গাছে আলতা পরা নাক ঝোলানো শাকচুন্নি’ নয়, ভূত মানে অতীতও! এমনও (শেষ) বসন্ত দিনে অতীতের পাতা এট্টু আধটু খুলবোনি?

অতীত তো আর কেবল এক দিন নতুবা এক সালের অতীত নয়-রে বাপ! নয়া দিন বরণের ঝলমলে ঐতিহ্য! সে মহারাজাধিরাজ শশাঙ্ক প্রবর্তিতই হোক, নতুবা দিল্লে-ইলাহি আকবর বাদশার ট্যাক্সো আদায়ের মক্সোই হোক— নয়া সালের আগমন মানে আনন্দ। টলটলে জলের নীচে খলবলে চুনো মাছের মত আনন্দ! বেঁটে লম্বু বুড়ো বাচ্চা… সব্বাই জানি— যতই ‘লতুন গাছে লতুন লতুন ফুল ফুটিয়াছে’ বলে চিৎকার উঠুক, দিন পোহালেই নৈমিত্তিক কম্মযোগে পয়লা বৈশাখ কয়লা হতে বাধ্য, তবু মন তো শাখামৃগ! ডালে ডালেই নৃত্যানন্দ, ডালে ভাতেই নিত্যানন্দ।

বচ্ছরকার না পাওয়ার ধুলো, অপমানের ধুলো, অসম্মানের ধুলো, ইচ্ছে চাপার দুঃখ-হাওয়ার ধুলো… এমনি কত ধুলো আশার ফুঁয়ে অথবা আশার সঞ্চালনে উড়িয়ে দেবার দিন এই নববর্ষ। নতুন আশার কল্পবৃক্ষ। যাক, যা গেছে তা যাক! নয়া দিন তুমি শুভ হয়ে এসো বাবা, আঁধার উঠোন আলো পাক!

এও এক বৈচিত্র্যের ঐক্যসাধন বটে। কত কিসিমের জনতা জনার্দনের কত কিসিমের চাহত! সাবজি টু পাবজি, নোকরি টু ছোকড়ি, সিবিআই টু জয় নিতাই, জার্সি টু কুর্সি… কত্ত গপ্পের কত্ত চাওয়া! জল ন্যাকড়ায় আসন মুছে ফুল বেলপাতা পুষ্পাঞ্জলি, হলদিরামের লাড্ডু! ওম গাং গণেশায় নমঃ! সিদ্ধিদাতা হে, সিদ্ধি দাও বাবা! কাজে কম্মে কেবল সাফল্য দাও, বিফল যদি হতেই হয় তবে সে নয় হোক শত্তুরের বেয়াল্লিশ জনু! মনুর এই অবোধ সন্তানের শিকেয় জয়টিকে আজ পরাও বাবা!

নববর্ষের লাল খাতা, মানে হালখাতা! তাকে হাল্কা চালে নিয়েছো কি কাল খতম! আদি অকৃত্রিম বিজিনেস ফান্ডা বস! ঠাণ্ডার গেলাস হাতে ধরিয়ে বকেয়া টঙ্কা ক্যাশ! ব্যস! মুখে হাসি জিবে জল, বগলে ক্যালেন্ডার, বাঙালি বাড়ি চল। তবে সেও এক দিন আছিল-রে মোশয়, সেও এক খান দিন আছিল! আহা! দুপুর বেলায় সিদ্ধিদাতার পূজো! নতুন খাতা-তেল সিঁদুর, নতুন শাড়ি-মালকিন, নতুন জামা-পোলাপান! বিকেল হলেই ফটফটে ধুতি, গাল ভরা হাসি-জর্দা ভরা পান! হালখাতায় প্রাপ্য লেখা হচ্ছে, মালিকের হাত ঘুরে গ্রাহকের হাতে উঠে আসছে বড়সড় এক মিষ্টির প্যাকেট আর সবাহন মা লক্ষ্মী্র বাংলা সালের ক্যালেন্ডার! গ্রাহকের ছেলে প্যাকেট হাতব্যাগে ঢোকাতে গিয়ে নাড়ছে চাড়ছে আর বেমালুম ফুটবল মাঠের শব্দ ফুটছে প্যাকেটের ভিতরে! খটখটে লাড্ডু হয় তো সেমসাইড গোল করে বসেছে, স্ট্রাইকার নিমকি ডিফেন্ডার গজাকে কাটাতে গিয়ে ল্যাং মেরে বসেছে রেফারি দানাদারের হাঁটুতে! ফুরর ফুর্! ফাউল!

সে নিন্দুকেরা যা বলে বলুক, বাঙালির তো আর তখন মাল্টিপ্লেক্স, শপিং মল ছিলোনিরে বাপু! এত দেখনদারিও ছিলনি! হালখাতা মানে তাই একটা উৎসব বটে। ন’মাসে ছ’মাসেও নয়, সারা বছরে এই একটা দিনে বাবা আপিস থেকে ফেরবার পথে মিষ্টি তো বটেই সঙ্গে কোল্ড ড্রিঙ্কসও! স্বপ্নের বুজকুড়ি ওঠা কাচের বোতল! গোল্ডস্পট, সিট্রা, থামস আপ, মাজা, মিল্কোজ, বিজলিগ্রিল— সপ্তম স্বর্গে একদিন বাস! বাড়িতে ফ্রিজ নেই, লোহার বালতিতে টিউবওয়েল অথবা পাতকোর ঠান্ডা জল, তাতে বোতল চোবানো! পাকা আমের মত আদরে তাদের জল থেকে তোলা হয়। বঁটিতে নয় চাবিতে তাদের মুক্তি। স্টিলের গেলাসে তরল আনন্দ! তার পর ‘বজ্রের চাখন’ জনিত নাক জ্বলা ঝাঁঝ— উদ্গার! রাইট চয়েস বেবি! আহা!

এ তো গেল অতীত। আর ভবিষ্যৎ? সে কথা তো অতীতেও ভাবা হয়েছে, ভবিষ্যতেও ভাবা হবে। আশ্চর্য এক গোলক ধাঁধা! একই সূর্য নামে-ওঠে, ওঠে-নামে। তবু কত নতুন নতুন দিন! এ কোনও  প্রহসনের ইশতেহারের অঙ্গীকার তো আর নয়, যে পশ্চাতে গদি লাগলো তো সব চলিল সলিল খাবলে বিস্মৃতির অতলে! এ হল সৃষ্টির স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ ভৈরবী! চাকার ঘূর্ণনের শিক্ষা দান। প্রকৃতির চেয়ে বড় শিক্ষক তো আর কেউ নয়! সেই মহান শিক্ষকের পাঠশালায় তাই ঘুরে ঘুরে আসে নানান শিক্ষার পরব! হাতে ধরে স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিদের শিখিয়ে দেন— ভারি মন হালকা করো, গাছের মত ঝরিয়ে নাও হলুদ পাতা, মেঘের মত ঝরিয়ে দাও জল, মাছের মত বয়ে যাও গভীরে থেকে গভীরে, তবু ক্লেদ লাগতে দিয় না! চৈত্রসেলের স্টক ক্লিয়ারিং না হলে নতুন রাখার জায়গা কোথায়? আনন্দের এই মহা সমারোহে আনন্দেই থেকে যাও, আনন্দেই ভেসে যাও! বিচিত্র যে গুরু গম্ভীর চাদরখানা গায়ে চড়িয়েছো, নিজের বলে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে না-হ’ক ঝগড়া বাধাচ্ছো। সে সবের কোনোটিই আদতে তোমার নয়। জগতের আর পাঁচটা স্বাভাবিক বয়ে যাওয়ার মতই জীবনের নাও তরতর বয়ে যায়। কেবল সমস্যা মনের আকাশ! সেই আকাশেই নতুন দিনের সূর্য ওঠাবার জন্যে নববর্ষের এত আয়োজন! নইলে আনন্দের আলো মেখে ভোর তো রোজই হয়।

চাকার নিয়ম মেনে এবার গোড়ায় ফিরে আসি। ওই যে বলেছিলাম, বর্ষশেষ হোক অথবা নববর্ষ, এমন দিনে আমার খালি খালি মহান জেনাসের কথা মনে আসে। সেই কথার রেশ টেনেই ছালা গুটোই। ‘আমার যে দিন গেছে চলে’ তার স্মৃতি তো সবসময় সুখের, আর যে দিন আসবে বলে দোরে খটখটাচ্ছে, সেই দিনের জন্যে প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞ থেকে শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে এবার প্রার্থনা করি। বলি, ভবিষ্যৎ শুভ হোক! ভবিষ্যৎ আনন্দময় হোক! ভবিষ্যৎ মানবিক হোক! ভবিষ্যৎ ভূত মুক্ত হোক!

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *