পার্থসারথি পাণ্ডা :
ঘটনাটা একই সঙ্গে একটু বিরোধের, অনেকটা বন্ধুত্বের এবং সেটা কবি ও মানুষ হিসেবে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবস্থানটিকেও স্পষ্ট করে দেয়। ঘটনাটা হল, এইরকম…
বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন তাঁরা সবাই জানেন যে, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ‘উলঙ্গ রাজা’ নামের একটি কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সেই কবিতায় একটি শিশু, নিষ্পাপ একটি শিশু সভ্যতার বর্বরতার দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করেছিল, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’ সেই প্রশ্নে নীরেন্দ্রনাথ বিদ্ধ করেছিলেন নব্য উপনিবেশবাদের আগ্রাসনকেও। বামপন্থী কবি বীরেন্দ্রর এই সপাট প্রশ্ন আর বিরোধিতা ভালো লেগেছিল। তাছাড়া পাঠকসমাজের মধ্যেও কবিতাটি বেশ আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু কবিতা লেখা ও কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কিছুকাল পরে একটি প্রভাবশালী পত্রিকার দপ্তরের চাকরিতে নীরেন্দ্রনাথের পদোন্নতি হল এবং মাইনে বেড়ে গেল। (বামপন্থীরা মনে করতেন সেই দপ্তরটি ছিল বুর্জোয়াদের আখড়া। ‘গৃহযুদ্ধ’ ছবিতে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সেরকম ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন।) ফলে, তাঁদের স্বরই যেন নীরেন্দ্রনাথ স্বর হয়ে উঠতে লাগল। ফরাসি চিত্রপরিচালক গোদার একবার বলেছিলেন, ‘তুমি যখন ঘুমিয়ে আছ, তখন তোমার রাতের ক্রিমের মধ্য দিয়েই তোমার শরীরে নব্য উপনিবেশবাদ বাসা বাঁধছে, তুমি জানতেও পারছ না।’ এও যেন তাই। শোষিত মানুষের কথা বলতে এসে নীরেন্দ্রনাথ শেষমেশ বিপক্ষ শিবিরেরই একজন হয়ে গেলেন? এই প্রশ্ন থেকেই একটি কবিতা লিখেছিলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘নীরেন, তোমার ন্যাংটো রাজা’। কবিতার কয়েকটি চরণ—
‘নীরেন! তোমার ন্যাংটো রাজা
পোশাক ছেড়ে পোশাক পরেছে!
নাকি, তোমার রাজাই বদলেছে?
………………………………
পোশাক ছাড়া নীরেন, তুমি,
তুমিও ন্যাংটো।
………………………………
কিন্তু তুমি বুঝবে কি আর;
তোমার যে ভাই, মাইনে বেড়েছে!
এই সমালোচনা নীরেন্দ্রনাথ বীরেন্দ্রর মতো সহযোদ্ধা ও বন্ধু এক কবির কাছ থেকে মাথা পেতে নিয়েছেন, এর কোন প্রত্যুত্তর দিয়ে আসর গরম করতে যাননি। কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে নামেননি। কিন্তু কেন এই সমালোচনা মাথা পেতে নিলেন নীরেন্দ্রনাথ?
কবি ও মানুষ হিসেবে বীরেন্দ্রনাথ ছিলেন একেবারেই অকৃত্রিম। কোন ভান ভণিতা তাঁর ছিল না। তিনি মানুষের কথা বলতে এসেছিলেন, সারা জীবন মানুষের কথাই লিখে গেছেন। যখনই পন্থা আর আদর্শের দাবিদার খাড়া হয়েছে, তখনই তিনি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘রাস্তা কারও একার নয়’।
অনুশীলন সমিতির হাত ধরে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়ে তিনি গরীব ও মেহনতি মানুষের মুক্তি ও অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার এক নতুন মানে খুঁজে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই অচিরেই সভ্য হয়ে উঠেছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির। তারপর চোখের সামনে দেখেছেন পার্টির গাঙে বেনোজলের বান ডাকতে। তখনই মতান্তর ঘটেছে। ইতিমধ্যেই দেশটা স্বাধীন হয়ে যেতেই দেখেছেন শোষণের আর এক রূপ। আশাভঙ্গ হয়েছেন, দেখেছেন মানুষের স্বপ্ন নিয়ে চলছে আখের গোছানোর খেলা। পার্টির ধামাধারী আর স্বাধীন স্বদেশের ঘাড়ে চেপে বসা মানুষদেরও সেই একই অবস্থা। এরই প্রতিবাদে লিখেছিলেন ‘প্রতিবাদ’ কবিতাটি—
‘এভাবে মানুষ নিয়ে খেলা
মানুষের স্বপ্ন সাধ বিশ্বাস সম্মান নিয়ে
মানুষের মস্তিষ্ক হৃদয় নিয়ে
হৃৎপিণ্ড ধমনী রক্ত অস্থি নিয়ে খেলা
চক্ষু জঠর গর্ভ পৌরুষ মাতৃত্ব নিয়ে খেলা
…………………………………………
এর চেয়ে আর কী নরক, স্বাধীন স্বদেশ।’
বুঝলেন এখান-ওখান-সমস্তখানই সেই এক। কোথাও বিস্তৃত আকাশ নেই, কোথাও যেন সুস্থ আদর্শ নেই। আসলে, ‘…আমরা সবাই যে ন্যাংটো।/আমরা সবাই রাজা আমাদের এই/ রাজার রাজত্বে!’ কমিউনিজমের স্বপ্ন দেখলেই যে বিশ্বাসে না-মেলা সত্বেও কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগ রাখতে হবে, এমন ভাবনায় আস্থা ছিল না তাঁর। মধ্যপন্থী হয়ে বেঁচে থাকা তাঁর কাজ নয়। কাজেই ছেড়ে দিলেন পার্টির সভ্যপদ। কিন্তু তাই বলে সাম্যবাদের স্বপ্ন ছাড়লেন না। সমগ্র কবিতাবলী তার প্রমাণ।
প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ছিল তাঁর আজীবন। একটিও কবিতা তিনি প্রাতিষ্ঠানিক পত্রিকায় লেখেননি। আসলে সংগ্রামটা ছিল তাঁর মজ্জাগত, তাই কারও কাছে মাথা বিকিয়ে না-পার্টি, না-নয়া উপনিবেশ—কারো জন্যই তিনি কবিতার আকারে ইস্তাহার লিখতে বসেননি। কবিতার মধ্য দিয়ে সারাটা জীবন তাই আপোষহীন সংগ্রামের কথা বলেছেন, এমনকি আটের দশকে ঠাকুরপুকুর হাসপাতালে ক্যানসারের সঙ্গে মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে লড়তেও তাই তিনি লিখেছেন—
‘এ লড়াই মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের
আর হার-জিত দুটো কথাই যখন অভিধানে রয়েছে
বিনা যুদ্ধে কেউ কাউকে মাটি ছেড়ে দেবে না।
………………………………
কেউ কেউ বাড়ি ফেরে না, কিন্তু যারা ফেরে, তাদের
কণ্ঠে আমরা শুনতে পাই নবজীবনের গান।’
এভাবেই শেষ অব্দি সৎ-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ‘নবজীবনের গান’ শুনিয়ে যান যে কবি, তাঁর সমালোচনা মাথা পেতে নিতে তাই নীরেন্দ্রনাথের বাধেনি। এটা নীরেন্দ্রনাথেরও উদারতা। আর ঐ সংগ্রামী অস্তিবাদের জন্যই বাম-পদ ছেড়েও তিনি আমূল বামপন্থী। প্রসঙ্গত মনে করিয়ে দিই, আজ ২ সেপেটেম্বর, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news