সৌমিক কান্তি ঘোষ:
বস্তুত ঋত্বিকের ছবি আগামীকালের ছবি। অতীত ইতিহাসকে মনে করানোর স্মরণ বিম্মরণের অনবদ্য আলেখ্য। যা একমাত্র মহাকাব্যিক যাত্রাপথের সঙ্গেই তুলনীয়।
মনে পড়ে ‘কোমল গান্ধার ‘ ছবির সেই সিক্যুয়েন্স। পদ্মার এপারে দাঁড়িয়ে ভৃগু ও অনসূয়া; মাঝখানে বয়ে চলা পদ্মা যেন এক আড়াআড়ি বিয়োগ চিহ্ন। ওপারে ওপার বাংলা। অনিবার্যভাবে তাই প্রেমের সংলাপে এসে পরে দেশ ভাগের কথা। sound track এ প্রেমের সংলাপ ছাপিয়ে ওঠে মাঝিদের পাঁচপীড়ের বন্দনা। কখনও বা sound track গুঁড়িয়ে ভেঙে দেয় বন্ধ হয়ে যাওয়া রেল লাইনের প্রাচীর-স্তব্ধ কালো ফ্রেম। কানে ভাসতে থাকে… ‘দোহাই আলি, দোহাই আলি, দোহাই আলি… ‘।
ঋত্বিক-যন্ত্রণা আসলে দেশভাগ যন্ত্রণারই সমার্থক। তাই তাঁর প্রায় প্রতি ছবিতেই দেশ ভাগের দ্যোতনা আসে নানাভাবে নানারূপে। কখনও সে শকুন্তলা র মতো অনসূয়া হয়ে (যার দেশ নেই), কখনও বা সে নতুন ভাবে আশার ঘর বাঁধে নবজীবন কলোনিতে, কখনও বা সে বীভৎস কালী ( The terrible mother) হয়ে চমকে দেয় ভাঙা aerodrome-এ ঘুরতে থাকা বাচ্চা মেয়েটিকে যেন এক আসন্ন বিপদের কথা স্মরণ করায়— হ্যাঁ, দেশ ভাগ।

‘মেঘে ঢাকা তারা ‘, ‘কোমল গান্ধার ‘, ‘সুবর্ণরেখা ‘, ‘ তিতাস একটি নদীর নাম ‘… কোথায় নেই এই মহাকাব্যিক চিহ্ন? সর্বত্রই তা নিজস্ব দ্যোতনায় উজ্জ্বল। মেঘে ঢাকা তারায় ‘গ্রেটা মাদার ‘ উমা এবং উমার সঙ্গে শঙ্করের মিলন, কোমল গান্ধারে অনসূয়া ও ভৃগুর প্রেম এবং অনসূয়ার দ্বিখণ্ডিত সত্ত্বা একই সাথে অন্নপূর্ণার প্রাসঙ্গিকতা (ছবিতে আলোকিত কাস্তের তলায় শস্যের দেবী হিসাবে অনসূয়াকে দেখানো হয় )। সুবর্ণরেখায় মা কালী, তিতাসে পার্বতীকে কাঁধে তুলে শিবের তাণ্ডব—সর্বত্রই এই মহাকাব্যিক চিহ্ন বর্তমান। আসলে ঋত্বিক চান এই আত্মবিস্মৃত জাতটি যেন তার নিজস্ব অতীত ইতিহাস এবং পুরাণকে মনে রাখে তাই পরিচালক তাঁর অতি সহজ এবং শিথিল চিত্রনাট্যের আনাচে কানাচে গুঁজে দেন পৌরাণিক ইতিহাসের চিহ্নগুলিকে।
ঋত্বিকের জন্ম এক বিড়ম্বিত কালে। যুদ্ধ-দাঙ্গা-দেশভাগ-মন্বন্তর সবই তাই তাঁর ছবিতে উঠে আসে প্রাসঙ্গিকভাবেই। Hollywood ছবির রৈখিক বিন্যাস (linear narration)-কে পাশে সরিয়ে রেখেই তাঁর ছবিতে আধুনিকতার প্রবেশ (বক্তব্য এবং আঙ্গিকগতভাবেই)। একমাত্র তিনিই লিখতে পারেন “ছবিতে গল্পের যুগ শেষ হয়ে গেছে, এখন এসেছে বক্তব্যের যুগ।” ঠিকই তো শুধু ছবি কেন ইউলিসিস উপন্যাসে জেমস্ জয়েস কিংবা বেরট্রল্ড ব্রেসট্ তাঁর নাটক ‘ড্রামস্ ইন দ্য নাইট ‘-এ এই ধারার প্রবর্তন করেছিলেন।

আসলে ঋত্বিক কুমার ঘটক ছবি করেন হৃদয় দিয়ে। তার সঙ্গে সংযোজিত করতে হয় একটা অবচেতন মনের বাস্তব প্রেক্ষিতকে। ছবি দেখতে দেখতে তাই মনে হয় অনসূয়ার মধ্যে যে কালীদাসের শকুন্তলা এবং টেম্পপেস্টের মিরানদার বিভাজন রেখা দেখি সে আসলে তো দ্বিধা বিভক্ত বাংলারই মর্ম যন্ত্রণা। হয়তো এ গভীর মর্ম যন্ত্রণা থেকেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘নাম রেখেছি কোমল গান্ধার’ যাকে আবার বিষ্ণু দে সঞ্চারিত করে দেশ মাতার আত্মায়, আর এই সকল আপাত বিরোধিতার মধ্যেও ঋত্বিক কুমার ঘটক বিবাহের সুরের মধ্যে দুই বাংলার মিলনের কথাই বলেন—
আমের তলায় ঝামুর ঝুমুর
কলা তলায় বিয়া
আইলেন গো সুন্দরীর জামাই
মুকুট মাথায় দিয়া।।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news