পার্থসারথি পাণ্ডা : 
বাঁশের খুঁটির গায়ে ত্রিপলের চাদর এঁটে বানানো সামনের দেওয়াল। সেটা ফুট তিরিশেক উঁচু। বাকি তিনটে দিকের দেওয়াল ক্রমশ নীচু হতে হতে পেছনে এসে মানুষ প্রমাণ হয়ে শেষ হয়েছে। সেখানেই পাশাপাশি দুটো গেট। একটা ছেলেদের, অন্যটা মেয়েদের এন্ট্রির জন্য। ভেতরে মাঝখানে লম্বালম্বি বাঁশের ব্যারিকেড। একদিকে মেয়েরা বসবে, অন্যদিকে ছেলেরা। বসার জন্য মেঝেতে বস্তা পাতা। মাথার ওপরে দড়ির মাচায় বস্তার ছাউনি। পুরো তাঁবুর চারদিকে তারকাঁটার বেড়া, যাতে অবাঞ্ছিত কেউ টিকিট ছাড়া টুক করে ঢুকে পড়তে না পারে। পাহারার জন্য রয়েছে ভেতরে বাইরে ভলান্টিয়ার। কিন্তু কথায় বলে, বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো। সেই গেরো খুঁজতে তখন বাইরে ইতিউতি চলছে। বাইরের ভলান্টিয়াররা রীতিমতো টহল দিচ্ছে। শুধু বাঁক অব্দি যাওয়ার অপেক্ষা। ফাঁকটুকু পেলেই তারকাঁটা গলে ঢুকে পড়া যাবে… ছবি শুরু হতে তখনও ঘন্টাখানেক দেরি। কাজেই অপেক্ষার জন্য হাতে অনেক সময়। গেটের সামনে সমানে চোঙা মাইকে চলছে ভাঙা গলায় অ্যানাউন্স– ‘আর মাত্র কিছুক্ষণ, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অপেক্ষার শেষ, শুরু হতে চলেছে নতুনগাঁয়ের রুপালি পরদায় দুষ্টুমিষ্টি রঙিন ছবি ‘নাগিনা’, নাগিনা, নাগিনা। যারা এখনো বাইরে অযথা ঘোরাঘুরি করছেন, তারা তাড়াতাড়ি টিকিট কেটে প্যাণ্ডেলের মধ্যে ঢুকে পড়ুন’… তারপরেই এক কলি ছড়া… ‘ আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ, নাগিনা দেখতে আসুন দাদা, সঙ্গে নিয়ে বউ’…
ফাঁক খুঁজতে এরই মধ্যে পুরো তাঁবুটা এক চক্কর ঘোরা হয়ে গেল, কপালগুণে বাইরের টহলদারদের মধ্যে পাওয়া গেল হেবোর কাকুকে। সে ভদ্রলোক জানে দুটাকার টিকিট কেটে এ-ব্যাটারা ঢুকবে না, আর এ ব্যাপারে স্বজনতোষণ করতে তিনি বেশ পছন্দ করেন, কাজেই তিনি প্রথামত খানিকটা এগিয়ে পিছন ফিরে দাঁড়ালেন। ফলে টুপটাপ করে তারকাঁটা গলে সটান ভেতরে ঢুকে যাওয়া গেল।
ভেতরে তখন বেশকিছু লোক জমেছে ইতিমধ্যেই। প্যাণ্ডেলের তলা দিয়ে ঢুকতে দেখেও, গা করল না কেউ, এ তাদের গা সওয়া। অবশ্য দু’একজন দাঁত বার করে যে হাসল না, এমন নয়। তাদের ডিঙিয়ে বসা গেল একেবারে সামনে। এখানে বসলে পা মেলে বসা যায়, মানুষের মাথায় পর্দা আড়াল হয় না। চাইলে শুয়েও দেখা যায়। কাজেই জায়গা দখলে রাখার জন্য পা মেলে বসে পড়া গেল। কেউ কিছু বলতে এলে তখন দেখা যাবে, শুরু হবে সমবেত ঝগড়া। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচ্যগ্র মেদিনী।
ততক্ষণে মাঝখানে একটা টেবিলে পোর্টেবল প্রজেক্টার মেশিন বসানো হয়ে গেছে। এদিক ওদিক করে বর্গাকার লাইটের ফ্রেম এডজাস্ট করে পর্দায় ফেলার কসরত চলছে। চলছে তো চলছেই। সে এক ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষার সময়।
তারপর একসময় দর্শকে দর্শকে ভরে গেল হল। তখন দু চারটি ট্রেলার চালিয়ে শুরু হল ‘নাগিনা’। ছবি চলছে বেশ। জমে উঠেছে একদম। তখন নাগিন শ্রীদেবীকে খুঁজে পেয়েছেন তান্ত্রিক অমরীশ পুরি। বাজাচ্ছেন বীণ। সেই বীণের তালে নাচছেন শ্রী। তখনও নায়িকার সৌন্দর্য আর নাচের হিল্লোল দেখে শিহরিত হবার বয়স নয়, বয়সটা মানুষ থেকে সাপ আর সাপ থেকে মানুষে বদলে যাওয়া দেখে অলৌকিক এক জগতে চলে যাওয়ার বয়স। সেই জগতে যখন জমিয়ে ফেলা গেছে নিজেকে, তখনই হঠাৎ হৈ হৈ! কি কি কি! রব উঠল, সাপ ঢুকেছে সাপ! কোথায় কোথায়! অমনি তিড়িং বিড়িং করে যে যেখান থেকে পারল উঠে ছুটতে লাগল। সেই ছোটাছুটির মধ্যে এসে ভিড়লেন ভল্যান্টিয়াররা। আবিষ্কার হল এক গোখরোর বাচ্চা। পর্দার একেবারে কাছাকাছি। অমরীশ পুরীর বীণ শুনে সে ব্যাটা ফণা নাচিয়ে ঢুকে পড়েছিল ভেতরে। তাকে সরানো হল, ছবি শুরুও হল, কিন্তু হাতপা ছড়িয়ে বসার মোহে আর সামনে বসতে সাহস হল না…
এসব অনেক দিনের কথা। দেখতে দেখতে সেও হয়ে গেল কুড়ি কুড়ি বছর পারের গল্প, সিডি পাইরেসির ধাক্কায় তাঁঁবু সিনেমার কনসেপ্টাই শেষ হয়ে গেল, যার সূচনা হয়েছিল হীরালাল সেনের হাত ধরে…
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news