পার্থসারথি পাণ্ড:
মায়ের সঙ্গে আলাপ হয়নি বুদ্ধদেবের। ১৯০৮ সালের ৩০ নভেম্বর ষোলো বছরের কিশোরী বিনয়কুমারী জন্ম দিয়েছিলেন তাঁকে। কিন্তু ছেলেকে জন্ম দেওয়ার চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই তিনি মারা গেলেন ধনুষ্টঙ্কারে। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর ভগবান বুদ্ধের মা-ও মারা গিয়েছিলেন, তাই বিনয়কুমারীর সন্তানের নাম রাখা হয়েছিল ‘বুদ্ধদেব’। মাকে চেনার মতো অবসর হয়নি ছেলের। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই জানেন মা জন্ম দিয়েই মারা গেছেন। মাকে নিয়ে তাঁর জীবনে কোন গল্পগাথা নেই, স্মৃতিও নেই। কেমন ছিলেন তিনি? জানা নেই।
বহুকাল মায়ের দুটি স্মৃতিচিহ্ন আগলে রেখেছিলেন দিদিমা—‘মুকুল’ পত্রিকার পাতায় আঁকাবাঁকা হরফে ‘বিনয়কুমারী’র হাতে লেখা নাম; আর একটি ছবি, বাবার সঙ্গে মায়ের, মা মারা যাবার পর তোলা, কিন্তু বন্ধ চোখের কিশোরীটির ছবি দেখে বুদ্ধদেবের মনে সেই বাল্যে কোনও আলোড়ন ওঠেনি। সেই কিশোরীটিকে মায়ের বাৎসল্য নিয়ে পাননি তো, তাই মায়ের মৃত্যুর তথ্যটা যেন আলোড়নহীন সহজসত্যমাত্র হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে। অকালমৃতা বিনয়কুমারীর কাছ থেকে না-পেলেও, মা জিনিসটা যে কী তার স্বাদ পেয়েছিলেন দিদিমা স্বর্ণলতার কাছ থেকে। দাদুকে ‘দা’ বলে সম্বোধন করলেও, দিদিমাকে ‘মা’-ই বলতেন তিনি। সেভাবেই তাঁকে পেয়েছেন, সেভাবেই তাঁকে চিনেছেন। এর কারণও আছে, স্ত্রীকে হারিয়ে বাবা ভুদেবচন্দ্র সন্ন্যাস নিয়ে কিছুকালের জন্য শোকে গৃহত্যাগ করেছিলেন। ফলে, জন্মের পর থেকেই বুদ্ধদেবের সব ভার এসে পড়েছিল দাদু ও দিদিমার ওপরেই। তখন তাঁরা কুমিল্লায়। শিক্ষক থেকে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়া দাদুর বদলির চাকরির জন্য অনেকবার ঠাঁই বদল হয়েছে তাঁর শৈশবে। এভাবেই একদিন তাঁরা এলেন নোয়াখালিতে। উঠলেন পর্তুগীজদের বানানো দারুণ সুন্দর এক বাড়িতে। বাড়িটা বুদ্ধদেবের খুব পছন্দ হল। এখানেই শৈশব ও কৈশোরের এক মাঝামাঝি লগ্নে, যখন দাদুর শিক্ষায় তাঁর বিশ্বসাহিত্যের পাঠ চলছে, মনে ভাষা ও ছন্দের দোলা এসেছে, তখনই লিখে ফেলেছিলেন জীবনের প্রথম কবিতা। লোকের মুখে শুনলেন, নোয়াখালির সুন্দর বাসাবাড়িটি অচিরেই নাকি সামনে দিয়ে বয়ে চলা নদীটি গ্রাস করবে। শুনে প্রিয় বাড়িটার জন্য মনে এলো দুঃখ। এই দুঃখে বাল্মীকির মতোই উঠে এলো পংক্তিমালা, ইংরেজিতে—
‘Adieu, adieu, Deloney House dear,
We leave you because the sea is near,
And the sea will swallow you, we fear.
Adieu, adieu.’
বাড়ির শোক তো পদ্য হল। কিন্তু মা? তাঁর জন্য কি কোন দুঃখমালাই ছিল না বুদ্ধদেবের মনে? রক্তের টানের সামান্যতম রেখা?
ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধদেব দেখেছেন, কোন রকম আত্মীয়তা অনুভব না-করে নিঃস্পৃহ হয়েই দেখেছেন, মায়ের সেই সবেধন ছবিটি স্থান পেয়েছে দিদিমার ঠাকুর ঘরে। ততদিনে বাবা ঘরে ফিরেছেন সন্ন্যাস ছেড়ে। তাঁর সঙ্গেও বুদ্ধদেবের আত্মীয়তা হয়নি, সম্পর্ক তৈরি হয়নি; এমনকি চারপাশে বন্ধু-আত্মীয়দের বাপ-ছেলের স্বাভাবিক সম্পর্ক দেখেও বাবাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়নি, না-ডাকতে পারাটাকে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়নি। হয়তো, এর জন্য বাবাও দায়ী। তাঁর নিঃস্পৃহতা দায়ী। হয়তো প্রব্রজ্যা থেকে সংসারে ফিরে যে এসেছিল, সে বাবা ভুদেবচন্দ্র নয়, মন মরে যাওয়া একটা মানুষ! বাবা ও মায়ের প্রতি বুদ্ধদেবের নিঃস্পৃহতার মূলে হয়তো কিছুটা উদাসীনতা আছে, আছে কিছুটা না-পাওয়ার অভিমান। এই না-পাওয়ার জন্য তাঁর শিশুমন এঁদের দুজনকেই দায়ী করত। কী জানি!

মধ্যমণি বুদ্ধদেব বসু, ডান দিকে সমরেশ বসু, বাঁদিকে সন্তোষকুমার ঘোষ
আবর্তিত পৃথিবীর বাতাসে ধীরে ধীরে মানুষের বয়স বেড়েছে, ছবিরও। তাতে ধুলো জমেছে, পোকার কারিকুরিতে ছায়াছবি আবছা হয়েছে, রঙ হয়েছে বিবর্ণ। জীবনে বাসা বদলের দোলায় অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। ওই ছবিটাও একদিন হারিয়ে গেল। তারপর? ছবিটা আসলে না-থাকার মধ্যেও একটা অস্তিত্ব ছিল মায়ের। সেটা হারিয়ে যেতেই বুকের ভেতরটায় যেন একটা শূন্যতা টের পেলেন বুদ্ধদেব। শৈশবের উদাসীনতাটা পুরোটা সত্যি ছিল না তাহলে! মেয়েকে অকালে হারিয়ে দিদিমা কোনওদিন পারেননি মেয়েকে নিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলতে। না-পাওয়াকে পাওয়ার পরতে বাঁধতে বুদ্ধদেবও কোনওদিন জানতে চাননি। কেন চাননি!—এই খেদ যত বয়স বেড়েছে বুদ্ধদেবকে তাড়িত করেছে। তাই বেলাশেষে ‘আমার ছেলেবেলা’ বইটিতে এক জায়গায় তিনি লিখেছেন—‘…মাঝে মাঝে মনে পড়ে ছবিটিকে, সেটি হারিয়ে গেছে বলে ঈষৎ যেন দুঃখও হয়। আমার কৌতূহল মেটাবার জন্য কেউ যখন আর বেঁচে নেই, তখন আমার জানতে ইচ্ছে করছে সে কেমন ছিল—আমার নাতনীর বয়সী ওই না-দেখা মেয়েটি; কেমন ছিল সে দেখতে, কেমন পছন্দ-অপছন্দ ছিল তার, বই পড়তে ভালবাসত কিনা, আমার মধ্যে তার কোন-একটি অংশ কি কাজ করে যাচ্ছে? মনে হয়, আমাকে জন্ম দেবার পরিশ্রমে যে-মেয়েটির মৃত্যু হয়েছিল, তার কিছু প্রাপ্য ছিল আমার কাছে, তা দেবার সময় এখনও হয়তো পেরিয়ে যায়নি।’
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news