দেবাশিস দাশগুপ্ত, সাংবাদিক :
তৃণমূল নেত্রীর ভার্চুয়াল ভাষণের পর আজ রাজ্যের বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নান দাবি করেছেন, জানুয়ারি মাসেই তৃণমূল দলটা ভেঙে যাবে। তাঁর আরও দাবি, অন্তত ১০০ জন এমএলএ এবং ২০ জন মন্ত্রী তৃণমূল ছেড়ে দেবেন। মান্নান সাহেবের এই বিস্ফোরক দাবি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে হই চই পড়ে গিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কোন সূত্র থেকে তৃণমূলের (TMC) অন্দরের এই খবর পেলেন? নাকি তিনি স্রেফ হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলেন এই খবরটি? প্রবীণ কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নানকে (Abdul Mannan) যতটুকু চিনি, তাতে এটুকু অন্তত বুঝেছি, তিনি উল্টোপাল্টা বলার লোক নন। সত্যিই এমন হলে সেটা একটা মেগা ইভেন্ট হবে রাজ্য রাজনীতির ক্ষেত্রে। আর না হলে মান্নান সাহেবকে বিস্তর খিল্লি হজম করতে হবে। প্রশ্ন উঠবে তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা নিয়েও।
এই কথা বলার জন্য তৃণমূল তো আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে পারে। তিনি যা বলেছেন, তাতে গোটা দলেরই চূড়ান্ত মানহানি হয়েছে। নেত্রী যখন আজ জোর গলায় দাবি করেছেন, ২০২১ সালে ফের তৃণমূলই সরকার গড়বে, বিজেপির জামানত জব্দ হবে, তখন কংগ্রেস দলনেতার এই বিস্ফোরক দাবি অবশ্যই রাজনৈতিক মহলে চর্চার দাবি রাখে। গত লোকসভা ভোটের পর মুকুল রায় (Mukul Roy), কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের মতো অনেক বিজেপি নেতা দাবি করেছিলেন, শতাধিক তৃণমূল বিধায়ক বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রী ও এই দাবি করেছেন। তার পর দেড় বছর কেটে গিয়েছে। কিছুই হয়নি।
নেত্রী আজ বিজেপির কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি চায়, দেশে যেন আর কোনও রাজনৈতিক দল না থাকে। ওরা চায়, ওয়ান পার্টি, ওয়ান নেশন। ঠিকই বলেছেন। নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে থেকেই কংগ্রেসমুক্ত ভারতের কথা বলে আসছেন। লক্ষ্যনীয় হল, একই ভাবে এই রাজ্যে তৃণমূল নেত্রীও চান, এখানে যেন আর কোনও বিরোধী দল না থাকে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেই তিনি সিপিএম, কংগ্রেসকে মুখে আঙ্গুল দিয়ে চুপ থাকতে বলেছেন। বিজেপি যে ভাবে টাকা আর গায়ের জোরে একের পর এক কংগ্রেস বা অন্য বিরোধী শাসিত রাজ্যের সরকার ভাঙার খেলা খেলছে, ঠিক তেমনি ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই এখানে তৃণমূল অন্য বিরোধী দল ভাঙার খেলায় নেমেছে। আর ক্ষমতায় আসার পর তো পঞ্চায়েতের বিভিন্ন স্তর থেকে শুরু করে এমএলএ, এমপি পর্যন্ত ভাঙিয়ে নিয়েছে। এভাবে তারা অনেক পুরসভা, পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদ দখল করেছে।
অতীতের সিপিএমের (CPM) কায়দায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বহু পঞ্চায়েতের ক্ষমতা পেয়েছে। রাজ্যে এই খেলায় পিছিয়ে নেই বিজেপিও। আজ নেত্রী বলছেন, বিজেপি গণতন্ত্র হত্যা করছে। তাই গণতন্ত্র রক্ষায় তিনি অন্য দলগুলিকেও পাশে পেতে চান। আবার তিনিই বলছেন, যাঁরা কংগ্রেসে আছেন, সিপিএমে আছেন, বিজেপিতে আছেন, তাঁরা তৃণমূলে চলে আসুন। এও তো বকলমে বিরোধীশূন্য রাজ্য গড়ারই ডাক। কংগ্রেস আর সিপিএম নেতাদের বক্তব্য, আমরা মমতা ব্যানার্জির কাছ থেকে গণতন্ত্রের পাঠ নেব না।
আজ তৃণমূল নেত্রীর ভাষণ মন দিয়ে শুনলাম। সামনে বিধানসভার ভোট। কাজেই রাজনীতির কথা তাঁকে বলতেই হবে। প্রধান বিরোধী বিজেপি এবং কংগ্রেস, সিপিএমকে আক্রমণ করতেই হবে। তিনি তা করেছেনও। কিন্তু রাজ্যের মানুষ যে আজ করোনা এবং আমপান ঝড়ে বিদ্ধস্ত ও জেরবার হয়ে রয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণে তা নিয়ে খুব উদ্বেগ শোনা গেল না। রাজ্যের বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে চিত্র নিত্যদিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ফুটে উঠেছে, তার কোনও উল্লেখ শোনা গেল না।
আমপান ঝড়কে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে শাসক দলের বিরুদ্ধে, তাকে কার্যত লঘুই করে দিলেন নেত্রী। তাঁর দাবি, ছোট দু একটি ঘটনা নিয়ে বিরোধীরা রাজনীতি করছে। যদিও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলছে। তিনি ভাষণে মানুষের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করলে বরং তারা খুশি হত। যাই হোক, ভোটে শেষ কথা বলবে জনতা জনার্দন। করোনার আতঙ্কের মধ্যেই ভোটের দামামা বেজে গিয়েছে। শাসক দল বলছে, বিরোধীরা করোনার মধ্যেই রাজনীতি করছে। বিরোধীরা বলছে, রাজনীতি তো করছে শাসক দল।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news