পার্থসারথি পাণ্ডা :
এখনকার মতো তখনও ভাদ্রের শেষে কাশের বনে কচি কচি কাশমঞ্জরীরা মাথা তুলে শরতের আকাশের আয়নায় নিজেদের মুখ দেখে সচেতন সুন্দরীর মতো হাওয়ার দোলায় হেসে উঠত। জানান দিত পুজো আসছে। তখন গাঁয়ে গাঁয়ে মাটির বাড়ি, খড়ের চাল। দুই কুঠুরির ঘর, সামনে একফালি জলবারান্দা, বারান্দা ছাড়িয়ে অনেকখানি উঠন। দুর্গাপুজোর চারটে দিন মেয়েজামাই আত্মীয়স্বজন কুটুমবাটুমের ভিড় হত এই বাড়িতেই। ঘরে ঘরে তখন হ্যারিকেনের আলো, ছিপিতে ফুটো করে সলতে টুকিয়ে শিশির পেটে কেরোসিন ঢেলে জ্বালানো কুপি। হাতপাখার বাতাস। তালপাতার পাখা, কাপড়ে ফুল তোলা ঝালর বসানো বাঁশের ফ্রেমের পাখা, গম গাছের ডাঁটা দিয়ে বানানো পাখা — কতরকমের বাহারি পাখা যে ঘরের মেয়েরা বানিয়ে নিতেন তখন! অার সেইসব পাখার বুকে লিখে দিতেন এক কলম ছড়া —
‘তালের পাতায় জন্ম তোমার,
ওগো হাতের পাখা।
শীতকালের শত্রু তুমি
গ্রীষ্মকালের সখা।।’
মাটির ঘরের ভেতর অবশ্য শীতে বেশ ওম, গরমে শেতল। কিন্তু সারাবছর ইঁদুরের ভারি উৎপাত। জাঁতিকল, খাঁচাকল — হাজার কলকাঠি নেড়েও কিছুতেই কিছু হয় না। সারাটা ঘরের মেঝে, দেওয়াল, মায় খড়ের চাল অব্দি ইঁদুরের এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলত। পুজোয় জামাইকুটুম ঘরে আসবে, তাদের তো আর এমন ঘরে রাখা যায় না। তাই মাসখানেক আগে থেকেই চলত ঘর সারাইয়ের কাজ। ঘরের বাইরের দেওয়ালের ঝুল ঝাড়াই করে রঙ করা হত। রঙ হতো খড়িমাটি দিয়ে। গাঁয়ের পথে পথে পুজোর আগে মাথায় ঝাঁকা নিয়ে খড়িমাটি বেচতে আসত একদল লোক। খড়িমাটির খনি থেকে মাটি তুলে শুকিয়ে তারা নিয়ে আসত। অনেক খাটুনি তাদের। খড়ি বিক্রি হত বিনিময় প্রথায়। দু’সের ধানে এক সের খড়ি পাওয়া যেত।
রাতভর খড়িমাটি ভিজিয়ে জলে গুলে ন্যাতা দিয়ে সারা দেওয়ালে দুই কোটে রঙ করা হত। খড়িমাটির ছোঁয়ায় মাটির দেওয়াল হয়ে উঠত ধবধবে সাদা। কখনও কখনও খড়িমাটির সঙ্গে কাপড়ে দেওয়ার নীলবড়ি গুলে দেওয়ালে একটা নীলচে আভা ফুটিয়ে তোলা হত। ঘরদোর ঝকঝকে তকতকে হয়ে গেলে আর একটাই কাজ বাকি থাকত তখন, সেটা হল অলংকরণ। সরু কাঠির মাথায় পাতলা ন্যাকড়া জড়িয়ে তুলি বানিয়ে লাল-হলুদ গেরিমাটি ও আলতা দিয়ে নানান ফুল ও লতাপাতা আঁকা হত। এগুলো আঁকা হত মূলত দরজা ও জানালার তিন দিক ঘিরে। সদর দরজার ওপর মাকে আবাহন করে লেখা হত —
‘এসো মা আনন্দময়ী এ দীনের কুটিরে ‘।
তখন পাড়ায় পাড়ায় এতো পুজো তো আর হত না, চার মাইল পথ ঠেঙিয়ে একখানা পুজো দেখেও অজস্র অভাবের মাঝে অফুরন্ত আনন্দ পেতেন মানুষ। আজকের অনেক পাওয়ার মাঝে অবশ্য হারিয়ে গেছে সেই গ্রাম, আর হারিয়ে গেছে সেই আটপৌরে আনন্দযাপনের বাসনা। তবে, দেবীর আবাহনের দিকে সেদিনও যেমন গ্রামের মানুষ পথ চেয়ে বসে থাকতেন, আজও বসে থাকেন তেমনি…
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news