পার্থসারথি পাণ্ডা : 
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আমরা জানি বিধবাবিবাহের প্রবর্তক হিসেবে, ‘বর্ণপরিচয়’-এর রচয়িতা হিসেবে। আর এও জানি মানুষটা আমাদের পরিচিত আর পাঁচটা লোকের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিধবাবিবাহ চালু করতে গিয়ে তিনি ঘর বাঁচাতে বসেননি। প্রথম বিধবাবিবাহ শুরু করেছিলেন তিনি নিজের ছেলে নারায়ণচন্দ্রের বিয়ে দিয়ে। ওই যে কথায় বলে ‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখায়’–এটাই ছিল তাঁর স্বভাব। বাঙালের জেদের কথা তো আমরা শুনি, বিদ্যাসাগর প্রমাণ করেছেন মেদিনীপুরীয়দেরও জেদ কম নয়। সংস্কৃত কলেজের লাইব্রেরিতে রাতের পর রাত জেগে ‘পরাশর সংহিতা’ ঘেঁটে ঘেঁটে বিধবাবিবাহের বিধান বের করে তিনি বিরুদ্ধ পণ্ডিতদের মুখ বন্ধ করেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধতায় তাঁর জীবন দূর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অসম্ভব জেদ দিয়ে তিনি তার মোকাবিলা করেছিলেন।
এই জেদি মানুষটাই ভেতরে ভেতরে ছিলেন প্রচন্ড রসিক। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বলি।
বিদ্যাসাগরের বিয়ে হয়েছিল মাত্র পনের বছর বয়সে। তো, সেকালে বাসরঘরে একটা মজার খেলা ছিল, সেখানে অনেকগুলো মেয়ের মধ্য থেকে নিজের সদ্য বিয়ে করা বউটিকে খুঁজে নিতে হত। না পারলে ভীষণ শাস্তি সমবেত কানমলা! বিদ্যাসাগর বাসরে ঢুকে বউ আর চিনতে পারেন না। ছাদনাতলায় এক পলকের একটু দেখায় কোনরকমে শুভদৃষ্টি হয়েছে। লজ্জায় ভালো করে তাকাতেই পারেননি, দেখা তো কোন ছার। সেই এক পলকের দেখা না-দেখায় চেনা যায় নাকি! এইরকম অবস্থায় বিদ্যাসাগরের মাথায় এক দুষ্টুবুদ্ধি খেলে গেল, তিনি করলেন কি, একটা টুকটুকে সুন্দর মেয়েকে ধরে বললেন, এই হল আমার বউ! আর যায় কোথায়, বাসরঘরে মারাত্মক হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। টুকটুকে মেয়েটি যত বলে, আমি আপনার বউ না, আর কেউ…। বিদ্যাসাগরমশাই ততই বলেন, উঁহু, আমি ঠিক চিনেছি , তুমিই আমার বউ। মেয়েটি হ্যাঁচকা টানে হাত ছাড়াতে চায়, কিন্তু নাছোড়বান্দা ঈশ্বর তার হাত এমন শক্ত করে ধরেছেন যে কিছুতেই আর ছাড়াতে পারে না। শেষে কেঁদেকেটে হার মেনে মেয়েরা বলে যে, ওকে ছেড়ে দাও, তোমার কানমলা শাস্তি বাতিল, আমরাই তোমার বউকে খুঁজে বের করে দিচ্ছি। তারপর নববধূ দয়াময়ীদেবীকে যখন তারা ভেতরের ঘর থেকে বের করে আনল তখন, বিদ্যাসাগরের হাত থেকে নিস্কৃতি পেয়েছিল মেয়েটি। বিদ্যাসাগরমশাইয়ের মুখেও ফুটে উঠেছিল যুদ্ধ জয়ের হাসি।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news