জ্যোতিস্মিতা রায় : 
কয়েকদিন আগে একটা খবর পড়েছিলাম। তারপর থেকেই ভাবনাটা দানা বাঁধে মনে। ভিক্ট্রি সাইন বানিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছিল ওরা পাঁচজন। পাকিস্তানের আসন্ন নির্বাচনের পাঁচ মনোনীত প্রার্থী। এরা সকলেই ‘থার্ড জেন্ডার’ বা তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি । এরকম ছবি ভারতে কেন হতে পারে না? পুঁচকে দেশ পাকিস্তান। কট্টর, অভ্যন্তরীণ ডামাডোলে বিপর্যস্ত, সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর; তারা যদি এতে সড়গড় হতে পারে, তবে ভারত কেন এখনও জড়সড়? সেই কবে শবনম বানো এসেছিলেন, তারপর দু’ দশক পেরিয়ে গিয়েছে, ‘থার্ড জেন্ডার’ থেকে আর তেমনভাবে কেউ এগিয়ে আসেননি। আসবেনই বা কী করে, পরিস্থিতি তো একইরকম আছে। কয়েকদিন আগে কথা হচ্ছিল এক প্রবীণ মৌলবীর সঙ্গে। তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজে মেনে নেওয়া’ আর ‘মর্যাদা’ দেওয়া এক নয়। ধর্ম অনুমতি দিলেও মানুষ কি ধর্মের মর্যাদা রেখেছে? সত্যিই তো, সেই পূরাণকাল থেকে এঁদের আমরা ব্যবহার করে এসেছি। বাড়ি থেকে পতিতালয়, যুদ্ধের ময়দান থেকে ভোটের ময়দান, শুধুই ব্যবহার করেছি আমরা, মর্যাদা দিতে পেরেছি কি? শুনেছি, অনেক লড়াই করে শবনম বানো রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। মধ্য প্রদেশে বিধানসভা ভোটে জিতে ১৯৯৮ সালে বিধায়ক হন তিনি। টানা ৫ বছর নিজের কেন্দ্র সামলেছিলেন শবনম। ভেবেছিলেন, তাঁর পর আরও অনেক ‘থার্ড জেন্ডারের’ প্রতিনিধি এগিয়ে আসবেন রাজনীতির ময়দানে। শবনমের সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গিয়েছে। মধ্য প্রদেশ থেকেই আরও দু’ একবার ‘থার্ড জেন্ডারের’ প্রতিনিধি মেয়র বা নেতা হয়েছেন। কিন্তু যে পরিবর্তন হওয়া উচিত ছিল তা হয়েছে কি? তাহলে এই তো পরপর কতগুলো নির্বাচন হয়ে গেল, ‘থার্ড জেন্ডার’ থেকে একজনও প্রতিনিধি ছিল কি? দিল্লির এলজিবিটি কমিউনিটির এক সদস্য, নাম প্রকাশ করা যাবে না, ছবি দেওয়া যাবে না, এই শর্তে কথা বলতে রাজি হয়েছিলেন। তাঁকে এই প্রশ্নটা করায় অনেকক্ষণ চুপ থেকে তিনি বলেন, রাজনীতি তো অনেক দূরের কথা। ‘রোটি, কপড়া, মকান’-টাই জোগাড় হয়ে ওঠে না অনেকের। খালি পেটে, বিদ্রুপ নিয়ে লড়াই কতজন করতে পারেন? আপনার এই প্রশ্নটা আর কাউকে যেন করবেন না! হাসবে শুনে। তবুও প্রশ্ন করি। পশ্চিমবঙ্গের ট্রান্সজেন্ডার বোর্ডের সদস্য রঞ্জিতা সিনহাকে। পাকিস্তানের খবরটা শুনে উচ্ছ্বসিত রঞ্জিতাদি। তাই তো! এভাবেই তো স্বপ্ন দেখার শুরু। কিন্তু এ দেশের কথা বলতেই অন্য সুর তাঁর গলায়। যে দেশে সরকার ‘থার্ড জেন্ডার’কে শুধুই ভোটার বানিয়ে ‘সব করে ফেলেছি’ মনে করে; সে দেশে প্রতিনিধিত্ব করা যায় না। কথায় কথায় রঞ্জিতাদির কাছ থেকেই জানতে পারি দেশের বেশিরভাগ রাজ্যে কিছু করাই হয়নি ‘থার্ড জেন্ডার’ প্রতিনিধিদের জন্য। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, চাকরি—কোনওটাই দেওয়া হয়নি তাঁদের। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তো ‘থার্ড জেন্ডারের’ জন্য আলাদা শৌচালয় করার কথা ঘোষণা করেই ক্ষান্ত দিয়েছেন। তবে রঞ্জিতা, আমার সেই ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ বন্ধুটি, আরও যত ‘থার্ড জেন্ডারের’ প্রতিনিধি আছেন, তাঁদের লড়াই কি শুধু আলাদা ‘পাব্লিক টয়লেটের জন্য? তার থেকেও বড় প্রশ্ন, সব দ্বিধা পেরিয়ে যদি রাজনীতির ময়দানে আসেন তাঁরা, দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলি কি সেই সুযোগ দেবে ‘থার্ড জেন্ডারকে’? কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য বলছেন, তৃতীয় লিঙ্গের কোনও যোগ্য প্রতিনিধি পেলে দল নিশ্চয় টিকিট দেবে। বিজেপি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয় বলছেন, তাঁদের দলে এ ধরনের দৃষ্টান্ত নেই। ফলে দল টিকিট দেবে কিনা, তা বলা যাচ্ছে না। কিন্তু বিজয়বর্গীয়’র প্রশ্ন, দল টিকিট দিলেও সমাজ তা মানবে কি? কতটা ভোট পাবেন ‘থার্ড জেন্ডার’ প্রার্থী? মানে প্রশ্নটা ঘুরেফিরে সেই প্রবীণ মৌলবীর প্রশ্নে গিয়ে ঠেকল! ‘মর্যাদা দিতে পারব তো?’
লড়াইটা তার মানে আইনের নয়, ধর্মের নয়। কিছুটা অধিকারের এবং অনেকটা ভাবনা চিন্তার। কিম-ট্রাম্পের বৈঠক, মোদির ফিটনেস চ্যালেঞ্জ, দিল্লির দূষণ, চন্দ্রযান, সাংবাদিকের হত্যা নিয়ে আলোচনা হয়, চায়ের কাপে তুফান ওঠে, কিন্তু ‘থার্ড জেন্ডার’ অধরাই থেকে যায়। পাকিস্তানের সেই হাসিমুখের পাঁচ বৃহন্নলার ছবি কাঁটাতার পেরিয়ে ভারতে ঢুকতে পারে না। কেন? তবে কবির ভাষায় বলি, ‘প্রশ্নটা খুব সহজ, আর উত্তরও তো জানা।’
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news