দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়।
কয়েকদিন আগে ফেসবুকে লিখেছিলাম, কংগ্রেসের নতুন প্রজন্মকে বার্তা দিয়ে গেলেন জ্যোতিরাদিত্য। পোস্টটির নিচে যে কয়েকজন মন্তব্য করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই প্রশ্ন তুলেছেন কিসের বার্তা? কেউ বলেছেন গদ্দারির, কেউ বলেছেন লোভের ইত্যাদি ইত্যাদি। দল ছাড়া বিষয়টা মানুষ মোটের ওপর এই ভাবেই দেখে।
দল ছাড়ার আরও কোনও গুঢ় কারন থাকতে পারে কি?
মানুষের দায় নেই অতশত ভাবার। যিনি ছেড়ে যাচ্ছেন তিনি কি বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন তা ভাবতে বয়েই গেছে।
তবে জ্যোতিরাদিত্যের বার্তা তাঁর স্কুলের সহপাঠী রাহুল গাঁধি বুঝেছেন। কোনও রাখঢাক না করেই রাহুল বলেছেন, জ্যোতিরাদিত্য মনে করেছে এই দলে কোনও ভবিষ্যৎ নেই, তাই সে ওখানে (বিজেপিতে) চলে গেছে।
ঠিক এই বার্তাটাই সিন্ধিয়া নতুন প্রজন্মকে দিয়েছেন। অন্তত এই অধমের এমনটাই মনে হচ্ছে। সচেতন ভাবে অবশ্যই কোনও বার্তা দেন নি, তবে তাঁর মতো ১০ জনপথের অতি নিবিড় বৃত্তের একজন বাসিন্দার এ হেন সিদ্ধান্ত এই বার্তাই বয়ে আনছে।
কংগ্রেসের নতুন প্রজন্ম, যাঁরা রাজনীতিকে চব্বিশ ঘন্টার কাজ হিসেবে নিয়েছেন তাঁরা বুঝতে পারছেন মোদির ক্যারিসমা প্রতি নিয়ত তাঁদের বেগ দিচ্ছে। শত সমালোচনার পরেও ২০১৪-র মোদি আর ২০১৯-র মোদির ভোটের নিরিখে তেমন কোনও তফাৎ হয় নি। পর পর কয়েকটি বিধানসভা ভোটে বিজেপি হারলেও, আবার লোকসভা ভোটে বিধানসভার বিজেপি বিরোধী ভোটই যে মোদির পক্ষে পড়বে না, এ কথা অতি বড় কংগ্রেসীও জোর দিয়ে বলতে পারছেন না। দিল্লি নির্বাচনে নিজেরা লজ্জার মাথা খাওয়া ফলাফল করলেও মোদির পরাজয়ে আপের আনন্দ ভাগ করে নিতে চেয়েছিল কংগ্রেস, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল আপের কাছে বিজেপি হারলেও, মোদি কেজরিবালকেই জয় করে নিয়েছেন। মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের জয় কংগ্রেস কে অক্সিজেন দিয়ে ছিল। কিন্তু জ্যোতিরাদিত্যের দলত্যাগ নতুন প্রশ্ন তুলে দিল। শেষ পর্যন্ত কমলনাথ তাঁর সরকার বাঁচাতে পারবেন কি পারবেন না, সেটা সময় বলবে। তবে মসৃন ভাবে সাফল্য ধরে রাখাটা, সাফল্য লাভের চেয়ে কম সার্থকতা নয়। বরং বেশি। দলের বৃদ্ধতন্ত্র দুর করতে রাহুল অনেকদিন আগেই চেয়েছিলেন। পারেন নি। জ্যোতিরাদিত্য, শচীন, জিতেন্দ্র সিংহ, এঁদের সঙ্গে নিয়েই করতে চেয়ে ছিলেন। কিন্তু এআইসিসি-র ঘুঘুর বাসা ভাঙা তখন সম্ভব হয় নি। আহমেদ প্যাটেল, দিগ্বিজয় সিংহেদের মত পাকা মাথার সামনে দলটাকে নতুন করে গড়তে চাওয়া সিন্ধিয়া-সচিনরা একটু থতমতই খেয়ে ছিলেন। এআইসিসি দফতরের ঘরে ঘরে লস্যি অথবা ছাঁচ সহযোগে তখন রব উঠেছিল, অভিজ্ঞতার দাম তো দিতে হবে। জয়রাম রমেশের মত কয়েকজন ছাড়া নতুনদের ভাল চোখে নিতে পারেন নি প্রবীনদের অনেকেই।
২০০৪-এ সাংসদ হয়েছিলেন শচিন। মাত্র চার বছর পর ২০০৮-এ একদিন শচীনকে বলেছিলাম, ‘তুমি নতুন, প্রাদেশিক দলগুলোর সঙ্গে জোট নিয়ে তোমার ভাবনা কি?’ ‘তুমি নতুন’ বলায় সেদিন তিনি ভয়ানক চটেছিলেন আমার ওপর। আর আজ ২০২০-তেও এইসব শিক্ষিত, যোগ্য নতুন রক্তকে পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হাত কাঁপে কংগ্রেস নেতৃত্বের। একই কথা প্রযোজ্য জ্যোতিরাদিত্যের জন্যেও।
রাহুল যথার্থ বলেছেন। জ্যোতিরাদিত্য নিজের পলিটিকাল কেরিয়ার জলাঞ্জলি দিতে চান নি। আর এই বার্তাটাই তিনি দিয়েছেন কংগ্রেসের নতুন প্রজন্ম কে।
একে তো দলের সব কর্মী ও নেতাদের ওপর রাহুলকে প্রধানমন্ত্রী করার অলিখিত দায়িত্ব। তার ওপরে সেই সব বৃদ্ধ তালেবররা, যাঁদের জন্য দিল্লিকে ষড়যন্ত্রের কারখানা বলা হয়। নিন্দুকেরা বলে এঁরা নাকি রাজীব গাঁধির পায়েও বেড়ি পরাতে চাইতেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে পরাতেনও। রাজীব কোনও কাজের কাজ করার উদ্যোগ নিলে তাঁকে পিছন থেকে টেনে ধরতেন এঁরাই।
ইন্দিরার সময়ের এইসব মাতব্বরদের নিয়ন্ত্রণে রাখার মত ব্যক্তিত্ব রাহুলের নেই। কিংবা এমনও হতে পারে কোনও গুঢ় কারনে এঁদের ঘাঁটাতে চায় না ১০ জনপথ।
সে যাই হোক। রাজনীতির এই সংস্কৃতিতে হাঁপিয়ে উঠছেন সিন্ধিয়ার মত অনেকেই। সিন্ধিয়া পেরেছেন। অনেকে এখনও করে উঠতে পারার স্বপ্ন দেখেই দিনাতিপাত করছেন। সিন্ধিয়া বার্তা দিয়ে বেরিয়ে গেছেন। শচীন কিংবা শশী থরুরের মত শিক্ষিত প্রতিভাবান রাজনীতিকরা সে বার্তা বোঝেন নি তেমনও নয়।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news