নীল রায়:
সুপ্রিম কোর্টের রায়কে প্রথমে নৈতিক জয় বলে দাবি করলেও পরে পিছু হঠল তৃণমূল কংগ্রেস। মঙ্গলবার বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর ৩ সদস্যের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। এরপরই রাজধানীতে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া দিয়ে জানানো হয়, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আসলে রাজনৈতিক জয় হয়েছে তৃণমূলের। এক্ষেত্রে মূলত চারটি কারণ দেখানো হয় বাংলার শাসক দলের পক্ষ থেকে। ৪টি কারণ ছিল এরকম। ১) সুপ্রিম কোর্ট কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং সিবিআইকে একটি নিরপেক্ষ জায়গায় বৈঠক করতে বলেছেন। মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন, এই নিরপেক্ষ জায়গাটি হল শিলং। ২) কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে সিবিআই কোনওভাবে বাধ্য করতে পারবে না কিংবা তাকে গ্রেফতার করতে পারবে না। ৩) অন্য দিকে কেন্দ্র অভিযোগ করেছিল যে রাজ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং সাংবিধানিক সংকটের পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। কোর্ট এই দাবিকে নস্যাৎ করেছে। ৪) আদালত অবমাননার ব্যাপারে আদালত মুখ্যসচিব, ডিজি, এবং সিপিকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হলফনামা দিতে বলছে। তবে ২০ তারিখ আবার শুনানি হবে। সেই অনুযায়ী, কোর্ট সিদ্ধান্ত নেবে ব্যক্তিগত হাজিরা দিতে হবে কিনা এবং সেই সংক্রান্ত আদেশ সুপ্রিম কোর্টের সেক্রেটারি জেনারেল জানিয়ে দেবেন।
এমন প্রতিক্রিয়ার কিছু পরেই সেটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় তৃণমূলের পক্ষ থেকে। যদিও এর মধ্যে দলী কর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে স্থানীয় স্তরে নিজেদের জয় উল্লাস শুরু করে দেন। কিন্তু এদিনের শুনানিতে কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে সিবিআইয়ের সামনে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ নির্দেশ দেয়, সিবিআইয়ের তদন্তে সবরকম সাহায্য করতে হবে রাজীব কুমারকে। তবে তাঁকে এখনই গ্রেফতার করা বা তাঁর বিরুদ্ধে সে রকম কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। একথাও বলা হয়।
এদিন সকালে শুনানি শুরু হতেই প্রথমে সিবিআইয়ের অ্যাটর্নি জেনারেল কেকে বেনুগোপাল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই চিটফান্ডের তদন্ত ভার নিয়েছিল সিবিআই। তার আগে চিটফান্ড কাণ্ডের তদন্তের জন্য স্পেশাল ইনভেস্টিগেটিং টিম তথা এসআইটি গঠন করেছিল রাজ্য সরকার। এসআইটি-র নেতৃত্বে ছিলেন রাজীব কুমার। তদন্তের সময়ে এসআইটি প্রচুর নথিপত্র, ইলেকট্রনিক তথ্য প্রমাণ, কল রেকর্ড ইত্যাদি সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু বারবার সেগুলি চাওয়া সত্ত্বেও তা দেওয়া হয়নি সিবিআইয়ের হাতে। কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে বার বার নোটিস পাঠানো সত্ত্বেও তিনি সিবিআইয়ের সামনে হাজিরা দেননি। রাজ্য সরকারের তরফে কংগ্রেস নেতা তথা আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি বলেন, কলকাতার পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে যে ভাবে সিবিআই হানা দিয়েছে তার আসল উদ্দেশ্য হল তাঁকে অপদস্থ ও অপমান করা। তথ্য প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে কোনও এফআইআরও করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, সিবিআই যদি তদন্তের ব্যাপারে সত্যিই সিরিয়াস হত, তা হলে রাজীব কুমারকে কিছুদিন পর পর চিঠি পাঠাতো। একবার নোটিস পাঠাচ্ছে তো পরের নোটিস পাঠাচ্ছে এক বছর পর। রবিবারের সিক্রেট অপারেশন চালানোর মতো কোনও তাড়া আগে দেখা যায়নি কেন! অথচ কলকাতার পুলিশ কমিশনার সিবিআইকে আগেই জানিয়েছিলেন যে, কোনও নিরপেক্ষ জায়গায় তিনি সিবিআইয়ের অফিসারদের সঙ্গে বসতে রাজি আছেন। যেহেতু এসআইটি ভেঙে গিয়েছে, এবং ওই তদন্ত কমিটির বাকি সদস্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন, তাই একবার পুরনো টিমের সঙ্গে সিবিআই বসলেই সব কথা সেরে নেওয়া যেত।
প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ এই বিষয়ে বলেন, কলকাতার পুলিশ কমিশনার যখন সিবিআইয়ের সঙ্গে বসতে রাজি, তখন তিনি দ্রুত হাজিরা দিন। এ কথা শুনে রাজ্য সরকারের তরফে বলা হয়, সিবিআই যদি তাদের কলকাতার অফিসে বা দিল্লিতে রাজীব কুমারকে ডাকে তা হলে তাঁর পদ মর্যাদায় আঘাত লাগবে। তৃতীয় কোনও জায়গায় দেখা করলে ভালো হয়। তা শুনে প্রধান বিচারপতি বলেন, ঠিক কথা, মেঘালয়ের শিলংয়ে গিয়েই সিবিআইয়ের সামনে হাজিরা দিতে পারেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার। কিন্তু তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না বা কোনও কঠোর ব্যবস্থা তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া যাবে না এখন।
রাজীব কুমারকে জেরা করার অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি এদিন সুপ্রিম কোর্ট আদালত অবমাননার নোটিস জারি করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যসচিব মলয় দে, রাজ্য পুলিশের ডিজি বীরেন্দ্র, কলকাতা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে। ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাঁদেরকে নোটিসের জবাব দিতে হবে। হলফনামা দায়ের করে তাঁরা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার পর ২০ ফেব্রুয়ারি আবারও এই মামলার শুনানি হবে। এদিন ধরনা মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং এই রায়কে দলের নৈতিক জয় বলে দাবি করেন। মুখ্যমন্ত্রীর এহেন দাবি ও শাসকদলের উল্লাস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়।
তিনি বলেন, যেহেতু আদালত অবমাননার অভিযোগের ক্ষেত্রে হলফনামা দিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে রাজ্য পুলিশের ডিজি, মুখ্য সচিব ও কলকাতা পুলিশের আধিকারিককে, তাই আপাতভাবে ধরে নেওয়া যেতেই পারে যে আদালত অবমাননার অভিযোগ গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নিয়েছে আদালত। রাজীব কুমারকে শুধু গ্রেফতার করা যাবে না বা নিরপেক্ষ জায়গায় জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশের পাশাপাশি তাঁকে সব রকম সহযোগিতা করতেও বলেছে আদালত। এমন পরিস্থিতিতে শাসক দল কিভাবে নিজেদের নৈতিক জয় বলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।”
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news
Mamata niche pore chhupche. Pisike jera korle sob sotti beriye jabe.