অচিন্ত্য বিশ্বাস (প্রাক্তন উপাচার্য) : 
‘মহাভারতের সময় ইন্টারনেট ছিল’- এই মন্তব্য করে সম্প্রতি এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব। তাঁর এই ভাবনাকে সমর্থন জানান একদা পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং বর্তমানে ত্রিপুরার রাজ্যপাল তথাগত রায় । তবে এই নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় উপহাসমূলক কার্টুন ও ব্যঙ্গচিত্র উপচে পড়ছে। তবে বিপ্লব কুমার দেবের এই ভাবনা কী শুধুই কল্পনা? আমাদের পোর্টালে তাঁর মতামত জানিয়েছেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস ।
দার্শনিক লেভি স্ট্রাউস বিজ্ঞানকে ভণ্ড সত্য বলেছিলেন, তাঁর মতে বিজ্ঞান সম্পূর্ণ সত্য বুঝতে ব্যর্থ। তার আজকের আবিষ্কার দু দিন পরেই বাতিল হয়ে যায়। গ্যালীলিও যখন বাইবেলের বিশ্ব- কেন্দ্রীক জগৎ ব্যাখ্যা (জিও সেন্ট্রিক কসমোলজি) কে অস্বীকার করেন তখন তাঁকে অত্যাচার সহ্য করতে হয়। বিজ্ঞানের সত্য ও ধর্মের বিশ্বাসকে অস্বীকার করতে গিয়ে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় তাকে ঠিক মতো অনুসরণ করলে লেভি স্ট্রাউসের কথার মর্ম বোঝা যাবে।
আর্কিমিডিস বা মিশরের আলকেমিস্টরা তো জানতেন না সূর্য স্থির, পৃথিবী তাকে পরিক্রমা করে। অথচ তাঁদের আবিষ্কার তো মিথ্যা নয়। তাহলে জিও সেন্ট্রিক হোক বা সোলার সেন্ট্রিক বিশ্বদৃষ্টি বা কসমোলজির দিকে তেমন নজর না দিয়েও বিজ্ঞান প্রযুক্তি অগ্রসর হতে পারে । নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব বিশ্ব দৃষ্টিকে নতুন মহাকাশ তত্ত্বে স্থাপন করল আর আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ সেই তত্ত্বকে খণ্ডন করে নতুন বিশ্বদৃষ্টির জন্ম দিল । ফলে বিজ্ঞান আর দর্শন- আরও ভাল করে বলবো, বিজ্ঞানের দর্শন নতুন নতুন ক্ষেত্রে যাত্রা করে, আর পুরোন ভাবনাকে পরিহার করতে থাকে। বিজ্ঞান প্রযুক্তি তাই, কিছুতেই নিত্য পূর্ণ হতে পারে না। হয় না।
আজকাল একটি বিচিত্র বিতর্ক উঠে এসেছে। ভারতব্যাপী বিজ্ঞানের পক্ষপাতী একদল মানুষ বিজ্ঞান আর ‘অপবিজ্ঞান’ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন। আমার দেখা বেশ কিছু বিজ্ঞানী রসায়ণাগারে টাঙিয়ে রাখেন দেবতা বা গুরুদের ছবি । অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগে গলায় ঝোলানো দেবতাকে প্রণাম করে ছুরি ধরেন শল্য চিকিৎসক। তাদের অপবিজ্ঞানী বলব না নিশ্চয়। তবে কোনটা অপবিজ্ঞান? কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন: ‘ জামার আস্তিনের তলে তাবিজ আর গেঞ্জির নীচে পৈতে লুকিয়ে এক নৈকষ কুমিরের ছা আমাকে বুঝিয়ে গেল কি করে জগৎটাকে বদলাতে হবে’। এরকমই চলছে! কিছু স্ব-ঘোষিত বিপ্লবী বলছেন, তাঁদের মত সত্য কারন তা বিজ্ঞান। কোনও অভিমত কখনও বিজ্ঞান হতে পারে না একথা তাঁরা জানেন না। পৃথিবীর সর্বত্র তাদের ওই বিপ্লবী মতবাদ মুখ থুবড়ে পড়েছে – অথচ তা বিজ্ঞান? এইসব বুজরুকিতে সকলকে বিশ্বাস করানো কঠিন। অথচ সেই চেষ্টা গণমাধ্যমগুলির সমবেত হই হুল্লোড়ের মধ্যে চালু হয়েছে । গর্জনে বাড়ি মাথায় উঠেছে।
ইদানীং কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মুখে বিচিত্র সব কথা শোনা গিয়েছে বটে। গণেশের গজমুণ্ড থেকে প্রমাণিত হয় সে যুগে প্লাস্টিক সার্জারি ছিল। মৃত সঞ্জীবনীর প্রমাণ তো রামায়ণেই আছে! প্রযুক্তি বিদ্যার অধ্যাপক তথাগত রায় বলছেন, পুষ্পক রথ কি নিছকই কল্পনা? তিনি এখন ত্রিপুরার রাজ্যপাল । কিন্তু আগেই ত্রিপুরার তরুণ মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব বলেছেন, মহাভারতের যুগে ইন্টারনেট ব্যবস্থা না থাকলে সঞ্জয় কীভাবে দৃষ্টিহীন ধৃতরাষ্ট্রকে মহাভারতের যুদ্ধের অবিকল বর্ণনা দিলেন? আর যায় কোথায়? শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। প্রশ্ন- উপেক্ষা-ব্যঙ্গ- তামাশায় মুড়ে রয়েছে সামাজিক গণ মাধ্যম বা সোশাল মিডিয়া। বলা হচ্ছে তাহলে তার প্রমাণ লোপাট হয়ে গেল কেন? কীভাবে? একধাপ এগিয়ে বলা হচ্ছে, আসলে আমাদের দেশে বিজ্ঞান কখনওই বিকশিত হয়নি। এখানে ধর্ম- কুসংস্কার- বর্ণ ও জাতি ব্যবস্থা সব সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে।
সত্যি কি তাই? ভারতের ভাষা বিজ্ঞান চর্চায় পাণিনির তুল্য আর একজনের নাম খুঁজে দিন । ফ্রয়েডের বহু বহু আগে এ দেশে বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’ রচিত হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে চরক- সুশ্রুত- চার্বাকের অবদান কে অস্বীকার করবে? শূন্য (০) আবিষ্কার কি ভারত থেকেই হয়নি? উত্তর ভারতের বহু মন্দির মুসলমান যুগে ভেঙে ফেলা হয়েছে ।, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের মীনাক্ষীপুরম, মধ্য ভারতের খাজুরাহো, পূর্ব ভারতের ঊনকোটি বা উড়িষ্যার জগন্নাথ- লিঙ্গরাজ বিশেষত কোনার্ক মন্দির কি আমাদের দেশের অবিস্মরণীয় শিল্প- ভাস্কর্য- স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে না? ইলোরার কৈলাস মন্দির একটি মাত্র পাহাড় কেটে তৈরি। এর নির্মাণ শৈলি জগতের বিস্ময়। অজন্তার গুহাচিত্র কি নিছক শিল্প কলা- ধর্মকথা? এর পিছনে বিজ্ঞান নেই? ছিল না?
ব্রক্ষ্মগুপ্ত, আর্যভট্ট, ভাস্করাচার্য প্রভৃতি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভারতের বিজ্ঞান সাধনার উজ্জ্বল ইতিহাস বহন করে না কি? পুণা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নার্লেকর প্রতিষ্ঠিত আয়ুকা অতিথি শালায় মাঝে মধ্যে থেকেছি। ওদের বাগানে গ্যালিলিও- নিউটনের মূর্তির পাশে আর্যভট্ট- ভাস্করাচার্যের মূর্তিকে কেউ ‘অপবিজ্ঞান’ বলবেন না।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় লিখেছিলেন ভারতীয় রসায়ন শাস্ত্রের ইতিহাস ‘হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি’। সে গ্রন্থ বিশ্বের সর্বত্র সমাদৃত। আলবেরুনির ‘ভারত বিবরণে’ আছে ভারতের বহু বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতির পিছনে এই জ্ঞান কাণ্ডের সম্পর্ক আছে।
বেদ- উপনিষদ-পূরাণ- ভাগবত-গীতা প্রভৃতি ধর্মশাস্ত্র ও সাহিত্য কর্মে মাঝে মাঝে বিজ্ঞান দৃষ্টি ও দর্শন উঠে এসেছে। সূক্ষ্ম ও স্থুল, ক্ষণ ও মহাকাল, ধূলিকণা থেকে পরম ও চরমের ইঙ্গিত পাওয়া যায় এইসব জ্ঞান কাণ্ডে । শ্রদ্ধাহীন মানুষ, পূর্ব পুরুষকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভাবা, উন্মার্গগামী অত্যাধুনিক তরুন এইসবের মধ্যে বিজ্ঞানের দর্শনকে খুঁজে পাবেন না সন্দেহ নেই। কুম্ভকর্ণের যুদ্ধ দেখে বানর সৈন্যরা বলেছিল, এ কি যন্ত্র মানুষ? কল্পনা কখনো কখনো ভবিষ্যত সম্ভাবনাকে ছুঁয়ে যায়। পুষ্পক রথ বা নারদের ঢেঁকি অনেকটা সেরকম। সঞ্জয়ের ধারা বিবরণও হয়তো তাই। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বেরা এমন করে মানুষের মনে উৎসাহ উদ্দীপনা সঞ্চার করতে চাইছেন কিনা জানি না। দেশে এখন অতীত ভারতের গৌরব প্রতিষ্ঠার রাজনীতি চলছে। আর সেজন্যই এসব বিতর্ক ঘনিয়ে উঠেছে বলে মনে করি। এর সঙ্গে বিজ্ঞান না হোক, বিজ্ঞান দর্শনের যোগ আছেই। আর কেউ অস্বীকার করবেন না- আমাদের এই পবিত্র মাতৃভূমি দর্শন শাস্ত্রে অত্যন্ত অগ্রসর ছিল । লেভি স্ট্রাউস লিখেছেন, দর্শন বিজ্ঞানের তুলনায় অনেক পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের ইঙ্গিত দেয়। এসব না বুঝে বিতর্কে নামলে যা হয়- সাজে ভরে যায় সব কিছু- শেষে দুটি একটি লেজের ডগা থাকে। সুকুমার রায় এরকম বিতণ্ডাকে খিল খিল্লির মুল্লুকে বিড়ালের ঝগড়া হিসেবে কবিতায় লিখেছিলেন বটে। এ তল্লাটে বিজ্ঞান- দর্শন কিছুই নেই আছে রাজনীতির মারপ্যাঁচ।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news