দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় :
সঞ্জয় সরকার :
নামের আমি, নামের তুমি, নাম দিয়ে যায় চেনা। সত্যিই তো ‘নাম’-এ কত কি না এসে যায়! রাজ্যের নাম পরিবর্তনও নাকি কতকটা সেই কারণেই। শুধু নাম পরিবর্তনের কারণেই ২৫ ধাপ এগিয়ে আসতে চলেছে রাজ্য। কোথায়? অধিবেশনে নাম ডাকার তালিকায়।
একটু বিস্তারিত বলা যাক।
রাজ্যের নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’, যা ইংরাজিতে হয় ওয়েস্ট বেঙ্গল(West Bengal)। অর্থাৎ নামের আদ্যক্ষর ডব্লিউ (W) হওয়ার কারণে সর্বভারতীয় সব ক্ষেত্রেই (তা সে নীতি আয়োগের বৈঠক হোক, বা আন্তঃরাজ্য নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক। অথবা আন্তঃরাজ্য উন্নয়ন কাউন্সিলের বৈঠক হোক বা জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা) একেবারে শেষের দিকে ডাক পেয়ে থাকেন এই রাজ্যের প্রতিনিধিরা। বছর দু’য়েক আগে দিল্লিতে এমনই এক বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে এমনই ‘বিরক্তিকর’ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন সকাল ৯ টা থেকে সারাদিন বসে থেকে অন্যান্য সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের বক্তব্য শোনেন তিনি। শোনেন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও। কিন্তু যখন তাঁর বলার সময় আসে তখন দেখা যায় প্রায় সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। কয়েকজন সরকারি আধিকারিক ছাড়া তখন প্রায় আর কেউ সেখানে ছিল না। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী বক্তব্য রাখার সময়ও পান মাত্র কয়েক মিনিট। সেদিনই বৈঠক থেকে বেরিয়ে নিজের ক্ষোভ উগরে দেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, ‘ধারে ও ভারে আমাদের রাজ্যের থেকে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য শুধুমাত্র অ্যালফাবেটিক্যালি আগে থাকার কারণে আগেই তাদের বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়ে যায়।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত এই কারনেই, রাজ্যের নাম বদলের জন্য উঠে পড়ে লাগেন। অন্তত বিষয়টি নিয়ে প্রচার এইরকমই। তবে এই যুক্তির গ্রাহ্যতা কতটা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। সরকারি কোনও অধিবেশনে কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তো বটেই, সরকারি যে কোনও প্রতিনিধি যদি শেষ দিকে বলার কারনে শ্রোতা না পায় তাহলে সেই দায় কতটা ইংরেজি বর্ণমালার আর কতটা সরকারি সংস্কৃতির সে ভাবনা ভাবার অবকাশ অবশ্যই আছে। পশ্চিমবঙ্গ নাম পাল্টে বাংলা হয়ে তালিকায় ওপর দিকে চলে এলেও কোনও না কোনও রাজ্য তো শেষ দিকে পড়ে থাকবেই। তাহলে সব রাজ্যই কী নাম বদলে ওপরে ওঠার চেষ্টা করবে! নাকি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সব রাজ্যের কথা যাতে সমান গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হয় সেই চেষ্টা করা হবে?
সরকারের যুক্তির সপক্ষে আরও কোনও কোনও কারন সরকার পক্ষ নিশ্চয়ই দেখাবে তবে তাদের দেখানো যুক্তির মধ্যে এই রোল কলের খাতা সংক্রান্ত কারনটিই প্রধান।
সরকার -বিপক্ষ কিংবা তৃণমূল-বিজেপি-বাম-কংগ্রেসের চেনা তরজার বাইরেও বিষয়টি নিয়ে ভাববার পরিসর কি নেই?
এমনিতে দুই বাংলার একটি প্রেমের সম্পর্ক আছে। আছে বিরহেরও। দুই বাংলার রবীন্দ্রনাথ আছেন, আছেন নজরুলও। পুৃবের আছে শামসুর-বেলাল, পশ্চিমের সুনীল-শক্তি। দুই বাংলার ভালবাসার কবিতা-র বন্ধন আছে আবার দুই বাংলাই রইল না কাছাকাছি-র শোক আছে। সব আছে। কিন্তু এই সবকিছুই একটা সীমিত পরিধির ভিতর। একটি সংস্কৃতিমনষ্ক, শিক্ষিত, আলোকিত, মুক্তচিন্তার চৌহদ্দিতে এই জগৎ সীমাবদ্ধ। সাধারণভাবে ছবিটা এমন নয়।
পশ্চিমবঙ্গের বাংলা নামকরণ সংক্রান্ত আলোচনায় এই ‘দুই বাংলা’র আলোচনা কেন এল তা স্পষ্ট করা দরকার। আলোচনাটি এল সরকার পক্ষের বাংলা নামকরণের প্রতি পক্ষপাতিত্ব নজর করে। বাংলা শব্দটি কোনও কালেই এ রাজ্যের নাম ছিল না। বাংলা একটি ভাষার নাম। বঙ্গের কথ্য হিসেবে বাংলার প্রচলন থাকলেও খাতায় কলমে এই ভূখণ্ড কখনওই বাংলা নয়। বরং বঙ্গ। মহাভারতেও বঙ্গের উল্লেখ আছে। বঙ্গের রাজা কুরু-পাণ্ডব যুদ্ধে কৌরবের পক্ষ নিয়ে ছিলেন। এমনকি তারও আগে মুনি বিশ্বামিত্র যখন রাজা ছিলেন এবং বশিষ্ঠের কামধেনু হরন করতে উদ্যত হয়েছিলেন তখনও আমরা বঙ্গের উল্লেখ পাই। বিশ্বামিত্রের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বশিষ্ঠের অনুমতি নিয়ে কামধেনু বিশালাকার ধারন করে। এবং তার সর্বাঙ্গ থেকে বেরিয়ে দলে দলে সৈন্য। তারা এদেশেরই এক একটি জাতি। পহ্লব, দ্রাবিড়, কলিঙ্গ প্রভৃতির সঙ্গে বেরিয়ে আসে বঙ্গও। এমনকি হুন, যবনও উদ্ভূত হয় কামধেনু থেকে। সুতরাং রাজ্যের নতুন নাম হিসেবে বঙ্গ নামটি উঠে আসতেই পারত। আসেনি। কেন আসেনি? সেখানেও আদ্যক্ষর ‘ব’ বা ইংরাজির ‘বি’ হওয়ার ফলে সরকারের ঘোষিত উদ্দেশ্য কোনওভাবেই বিঘ্নিত হত না। সরকারের এই বাংলা নামের প্রতি টান দেখে হুজুগে বাঙালির হল্লার মধ্যেও অনেকে ভ্রু কোঁচকাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গ নামের সঙ্গে যেহেতু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান জড়িয়ে আছে তাই তাঁর আদর্শের অনুগামীরা তো বিরক্ত হচ্ছেনই তার সঙ্গে আরও অনেকেই বিষয়টিকে ভাল ভাবে দেখছেন না। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ফাউন্ডেসনের অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে “ইতিহাসকে অস্বীকার করার চেষ্টা কিংবা শ্যামাপ্রসাদের অবদানকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’ সরকারের এই উদ্দেশ্যের মধ্যে অভিসন্ধি দেখছেন অনির্বাণ। কি সেই অভিসন্ধি? স্পষ্ট করেছেন সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ও লেখক তথা সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত। তাঁর কথায়, ‘বাংলা নামকরনের মধ্যে ষড়যন্ত্র আছে। অনেকদিন ধরে পরিকল্পনা চলছে দুই বাংলা, অসমের কিছু অংশ এবং বিহারের কিছু অংশ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র দেশ গঠন করার। বাংলা নামকরন সেই প্রক্রিয়ারই একটি অঙ্গ।’ অভিযোগ মারাত্মক। সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদকে মদত দেওয়ার অভিযোগ।
এই ধরনের অভিযোগ ওঠা আরও সহজ হচ্ছে কারন সরকারের কাছে যতটা বিধায়ক সংখ্যা আছে ততোটা শক্তপোক্ত যুক্তি নেই। রোল কলের খাতার যুক্তি যে ধোপে টেঁকে না তা সম্ভবত সরকারি মন্ত্রী-আমলারাও বোঝেন।
ইতিহাসকে অস্বীকার না করে, শ্যামাপ্রসাদের অবদানকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে, কোনও বিতর্কেরই জন্ম না দিয়ে ওয়েস্ট বেঙ্গলের জায়গায় ইংরেজিতে পশ্চিমবঙ্গ নামকরণ করে ডবলু থেকে পি অবধি উঠে আসতে পারত রাজ্য। কিন্তু ‘বি’ অবধি উঠে আসার জেদ ইতিহাসকে নামিয়ে দিচ্ছে বিস্মৃতির অতলে।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news