তরুণ সেন:
পরিবর্তনের পর বাংলা এবং বাংলাবাসী আর কিছু পাক বা না-পাক গুচ্ছপ্রকল্পের মতো গুচ্ছের নিষ্ফল প্রতিশ্রুতি যেমন পেয়েছে, তেমনি গুচ্ছের সফল মা-ও পেয়েছে! শ্লোগানে মা, সৃজনে মা, সম্বোধনে মা! নব শাসনে মা যেন সর্বভূতে সংস্থিতা! পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে মা এলেন শ্লোগানে, শিল্প চলে গেল! মাতৃশ্লোগানে শোনা গেল, জয় মা মাটি মানুষের জয়! বামজমানা বিদেয় হল। আমরা দাঁত কেলিয়ে গাইতে শুরু করলাম, ‘শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা’। স্রোতে ভাসলাম। একেই বলে ‘মাতৃশক্তি’! বাড়ির হাওয়া বদল করতে মা-কে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর কালচারে সদ্য অভ্যস্ত বাঙালির তাই শুনে প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল! দিদি বই লিখলেন, ‘নন্দী মা’। মাতৃমন্ত্রে নান্দিমুখ হল! এদিকে বাঙালি হেদিয়ে মরছে, ‘শিল্প কই, শিল্প কই’ বলে! আক্কেল দেখো! আরে ভাই, শ্লোগানে শিল্পই তো ছিল না। মা ছিলেন, মা আছেন, মা থাকিবেন!
জ্বালাময়ী মাতৃমুখী শ্লোগানটা হাইজ্যাক হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা ছিল! প্রাক্তন বঙ্গশাসকদের আমলের আটের দশকে বিশিষ্ট পালাকার ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় একটা জব্বর পালা লিখেছিলেন, যার নাম ছিল, ‘মা মাটি মানুষ’। কিন্তু ওঁদের তো একটাই দোষ, সাম্যবাদের দিকে যতটা ঝোঁক, গ্রাম্যবাদে ততটাই অমনোযোগ (শেষ দিকে মনোযোগ অবশ্য বেড়েছিল, তবে বড্ড বেশিমাত্রায়)! মার্কসদার পাঠশালে পড়ে, ওঁরা যেটা সময়ে বুঝলেন না, সেই সার সত্য দিদি ঠিক ক্যাচ করে নিয়েছিলেন সময়ের সন্ধিক্ষণেই। আরে বাবা, আফটার অল বঙ্গদেশ মাতৃভক্তের দেশ! যে-দেশে বৌমা-তে মা, ঠাকুমা-তে মা, দিদিমা-তে মা, দেবীমা-তে মা, এমনকি খান্ডারিণী সৎমা-তেও মা; যে-দেশে মায়ের নামে বিদ্যাসাগর ভরা বর্ষার দামোদর পেরিয়ে যান, যেখানে উমা মায়ের আগমনী গেয়ে ভাটের দল ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে হাজির হন–সেখানে মাতৃমন্ত্রে নির্বাচনের বৈতরণী পার হয়ে ভোট ভিক্ষের ঝুলি ভরিয়ে ফেলাটা এমন কি বিচিত্র!
জঙ্গল মহলের উন্নয়নের অনেক উপহারের মাঝে দিদির সেরা উপহার, জঙ্গলমহলবাসীকে একজন ‘মা’ উপহার দেওয়া। ভারতী ঘোষ। সন্তানেরা তাঁকে পেলেও প্রথমটায় ঠিক চিনতে পারেননি। কিন্তু দিদির চোখে তাঁর মাতৃময়ী রূপ আড়াল হল না, তিনি অভিধা দিলেন, ‘জঙ্গলমহলের মা’। অমনি ভারতী ‘জঙ্গল মহলের মা’ হয়ে গেলেন! ‘আমি গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম, ‘সুন্দর’, সুন্দর হল সে’। কিন্তু দুর্জনের সে সুখ সহ্য হল না! সে গোলাপের ছায়ায় কড়া রোদ এসে ঢুকল একসময়। হা কাণ্ডে, সোনা কাণ্ডে সে এক জেরবার অবস্থা! শুরু হল মন কষাকষি, দর কষাকষি। দুর্জনেরা বলে তারই জেরে নাকি বাঘের ঘরে মায়ের বাসা, সবুজ থেকে স্যাফ্রনে!
মধ্যিখানে বাঙালি একটি নীরস মা পেল, সে কিনা এক ফ্লাইওভার। মায়েরা সর্বংসহা, তাই সন্তানের গাড়ি দৌরাত্ম্য মুখ বুজে দিনরাত এখনও সয়ে যাচ্ছেন। নামে অসম্ভব ব্যঞ্জনা, কবিতার মতো! দিদির দৌলতে ভগবান বিষ্ণুকেও নতুনভাবে চিনলাম আমরা। তিনি যে ভগবান নন, ভগবতী–এই চরম সত্যটিও পরিবর্তন না-হলে আমাদের অজানাই থেকে যেত! তাও আট বছর জিজ্ঞাসা নিয়ে অপেক্ষার পর এই সেদিন জানলাম, তিনি আসলে ‘বিষ্ণু’ নন, ‘বিষ্ণুমাতা’। ব্যাসদেব এতদিন আমাদের বোকা বানিয়ে রাখলেন! হায় হায়, হায় বিষ্ণুমাতা!
গত দুর্গাপুজোয় আমরা দিদির সুরে ও কথায় ‘মা মাগো মা’ মাতৃবন্দনার গান পেয়েছি; আর এই ভোট পুজোয় মা সিরিজের সর্বশেষ সংযোজনে অভিনেত্রী কাম রাজনেত্রী মিমি চক্রবর্তী মা পেয়েছেন। এত প্রাপ্তি এত প্রাপ্তি, তা সত্ত্বেও হতচ্ছাড়া বাঙালির অবস্থা, ‘হাতে দই পাতে দই, তবু বলে কই কই’। অকৃতজ্ঞ আর বলে কাকে!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news