অমিত রায়।

তমোনাশ ঘোষের প্রয়াণ তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে আর পাঁচটা নেতার মৃত্যুর মতো নয়। কারণ, স্বল্পভাষী এই নেতা বরাবর তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকলেও, কখনও তাঁর ঘনিষ্ঠতা জাহির করেননি। জড়াননি কোনও অমূলক বিতর্কে। সারধা, নারদা, রোজভ্যালির মতো কেলেঙ্কারির কালো দাগ তাঁর সাদা পোশাককে কখনও কালিমালিপ্ত করতে পারেনি। শাসকদলের জনপ্রতিনিধি হয়েও, মাটিতে পা রেখে চলেছেন, দেখাননি ঔদ্ধত্য। দল যখন কোনও বড় দায়িত্ব তাঁকে দিয়েছে, তখনও সেই দায়িত্ব পালন করেছেন নিঃশব্দে। সেই সমস্ত দায়িত্বের কথা টের পায়নি সংবাদমাধ্যম। দলীয় কর্মী বা সংবাদমাধ্যমের কাছে ‘তমা দা’ হয়ে উঠলেও, কিছুটা চাপাই ছিলেন তমোনাশ ঘোষ (Tamonash Ghosh)। গত বছর যখন তাঁকে দলের কোষাধ্যক্ষ হওয়ার কারণে সিবিআই তলব করেছিল। তখনও সিবিআই জেরার সম্মুখীন হয়েও প্রকাশ্যে বা আড়ালে আবডালে মুখ খুলে দলের বিড়ম্বনা বাড়াননি।
ব্যক্তিগত স্তরে তাঁর বিরুদ্ধে কোনও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত। তৃণমূল জামানায় ব্লক স্তরের নেতাদের ওয়াই ক্যাটাগরির সিকিউরিটি দেওয়া হলেও, কখনও তেমন পর্যায়ের নিরাপত্তাও চাননি নিজের জন্য। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিধায়ক তমোনাশ বলতেন, “তৃণমূল জামানার আগে বামফ্রন্ট সরকার তাঁকে চারজন দেহরক্ষী দিতে চেয়েছিলেন।” কিন্তু মাত্র একজন নিরাপত্তারক্ষীকেই থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন তমোনাশ। তাকেও বলে দিয়েছিলেন, “আমার বাড়িতে আসার দরকার নেই। আমার প্রয়োজন হলে তোমাকে ডেকে নেব।” সেই প্রয়োজন আজ পর্যন্ত অনুভূত হয়নি।
তৃণমূল (TMC) মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, এখন তৃণমূল তিনটি স্তরে বিভাজিত। ১) আদি, ২) নব্য ও ৩) তৎকাল। তমোনাশ ছিলেন আদি তৃণমূলীদের তালিকায়। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির এই নেতা বেশ কয়েক বছর ধরে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার কথা বলছিলেন। বলেছিলেন, “আর ভোটে দাঁড়াব না। এবার আধ্যাত্মিকতা নিয়ে থাকতে চাইবো।” কি ছিল তাঁর অন্তরের বেদনা ? প্রকাশ্যে মুখ ফুটে বলেননি কখনও ? ঘনিষ্ঠ মহলে কখনো-সখনো মুখ খুলতেন। সংবাদমাধ্যমের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের কাছে সেসব কথা বলে বলতেন, “তোরা যেন কিছু লিখে দিস না আবার।” ছাত্র জীবনে কালীঘাট অঞ্চলে ডাকসাইটে ফুটবলার ছিলেন তমোনাশ। বড় চেহারা নিয়ে রক্ষণভাগে খেলতেন তিনি। ফুটবলের ভাষায় যে পজিশনকে বলে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার। সেই খেলায় এতই নিপুন ছিলেন তিনি, এলাকায় তাঁকে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘কালাপাহাড়’। সেই সময় আশুতোষ কলেজে পড়াকালীন কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদে নাম লেখান। শুরু হয় রাজনীতির পথ চলা। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাড়াতেই থাকতেন তমোনাশ ঘোষ। ছাত্রাবস্থা থেকেই তাঁর বাড়িতে যাতায়াত শুরু। ৭০-এর দশকে শুরু সেই সম্পর্ক শেষ হল আজ।
১৯৯৮ সালে যখন নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তখনও সেই সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ করা হয় তাঁকেই। ২০০১ সালে জোড়াফুলের প্রতীকে ফলতা থেকে জয়ী হয়ে বিধায়ক হন তমোনাশ। ২০০৬ সালে সিপিএম নেত্রী চন্দনা ঘোষ দস্তিদারের কাছে পরাজিত হন। ২০০৪-২০০৮ তৃণমূলের প্রকৃত দুঃসময়ে তমা ছিলেন মমতার পাশে। ২০১১ সালে পরিবর্তনের যুদ্ধে ফলতা থেকেই বিধানসভায় প্রত্যাবর্তন হয় তমোনাশ ঘোষের। কিন্তু, মমতার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয়নি তাঁর। বদলে তাঁকে করা হয় দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয়় পরিবহন নিগমের চেয়ারম্যান। তবে ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের পর থেকে তৃণমূলের ঘরোয়া রাজনীতির সমীকরণ একটু একটু করে বদলাতে শুরু করে। তৃণমূলের ঘরোয়া রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েন যুব ও তৎকাল তৃণমূলের দাপটে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংসদ ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা ডায়মন্ড হারবারের অধীনে ফলতার বিধায়ক ছিলেন তিনি। ফলতার স্থানীয় রাজনীতিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছত্রছায়ায় বাড়বাড়ন্ত হয়েছে যুব নেতাদের। ফলতায় অভিষেকের প্রতিনিধি হিসেবে উঠে এসেছেন যুবনেতা জাহাঙ্গীর খান। বর্তমানে যিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের পূর্ত ও পরিবহনের কর্মাধ্যক্ষ। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এই যুবনেতা ছিলেন ফলতা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি। এমন সমস্ত নেতাদের দাপটে প্রায় দু’বছর নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে যাননি তমোনাশ। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমোকে। তাই ভোট গুরু প্রশান্ত কিশোরের দেওয়া ‘দিদিকে বলো’ ও ‘বাংলার গর্ব মমতা’ কোনও কর্মসূচিতেই অংশ নেননি তিনি। প্রায় রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া আদি তৃণমূলী তমোনাশ ঘোষ চলে গেলেন একরাশ চাপা অভিমান নিয়েই।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news