পার্থসারথি পাণ্ডা : 
কাপড় কাচা সাবানের গন্ধমাখা আর কালো ছোপধরা কাপের চায়ে শেষ চুমুকটি দিয়ে সুনীল টিউশ্যুনি ছুটি দিয়ে বেরিয়ে আসেন রাস্তায়। উদভ্রান্তের মতো হাঁটতে থাকেন পথে। আজই যেন এতদিন পরে চিনে ফেলেছে অপর্ণা তাঁকে বাউণ্ডুলে বেকার বলে, তাই যেন বলার অবসর পেয়েছে সম্পর্কটা কন্টিনিউ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। আর চরম কথাটা বলে দিতেই এতদিনের প্রেম, ভালোবাসা, স্বপ্ন—সব—শুধু একটা ‘সম্পর্ক’মাত্র হয়ে গেল! রাস্তায় কীসের যেন ধর্মঘট, মিছিল, পুলিশের ব্যারিকেড, লাঠিপেটাই চলছে। ঘোরের মধ্যে সেখানে এসে পড়ে মাথার ভেতর ঝিমঝিম করে উঠল, সব যেন গুলিয়ে গেল! পিঠটান দিয়ে সবাই তো পালিয়ে বাঁচে, সেই পালাবার ক্ষমতাটুকুও আর রইল না! ধেয়ে এলো পুলিশের দুর্বিনীত লাঠি, তখনই কে যেন হাত ধরল এসে, একটি নারী, টেনে এনে শক্ত হাতে দাঁড় করিয়ে দিল আশ্বাসের মাঠে। ওরই নাম বুঝি, নীরা। সুনীল বললেন, ‘নীরা, ভালোবাসা নাও, হারিয়ে যেও না…’
আর তক্ষুনি নীরা আরও শক্ত করে ধরল সুনীলের হাত। আসলে নীরার জন্যই কলকাতা শহরের পথ বেয়ে নদী বয়ে যায়, রৌদ্র স্নান করে জ্যোৎস্নায়। জীবনানন্দের বনলতা সেন, বুদ্ধদেব বসুর কঙ্কাবতীর আলো পেরিয়েও নীরা এমন এক পার্থিব মানুষী, যাকে পেয়ে সুনীল বলে ওঠেন, ‘নীরা, তোমার কাছে আমি নীরার জন্য রয়ে গেলাম চিরঋণী।’
শীত শেষের এক দুপুরে হঠাত নীরাকে আমন্ত্রণ, আজ বাড়িতে সাদা থিকথিকে মাছ, ঐ যে গো, যাকে লইট্যা মাছ বলে, পেঁয়াজ রসুন লঙ্কা বেগুন দিয়ে আচ্ছাসে রেঁধেছি। বাড়ির কেউ সে মাছ খায়নি। এসো না, নীরা, আমি আর তুমি দুজনে মিলে খাই আর কাটিয়ে যাই অর্ধেক জীবন… লোকে তারুণ্য তারুণ্য বলে হ্যাংলায় বটে, কিন্তু আমি তো জানি দিনগুণতির তারুণ্য দিয়ে কিস্যু হয় না…ঐ তো ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ চল্লিশের চালশে পেরিয়েই তো লেখা…তারুণ্যের আর কী দিয়েই বা বুক বাজাব আমি? তোমায় ছাড়া?
আমার তখন বছর চার বছর কয়েক বয়স। বাবা ইস্কুলে পড়ান। আমিও ইস্কুলে যাই। দু’নম্বর বিশ্বযুদ্ধে বাংলায় ঘিরেছে আকাল। নুন দিয়ে আলুপোড়া খেতে খেতে পড়ে ফেলি পোড়া বাংলার সুবোধ বালক হওয়ার পাঠ বর্ণপরিচয়। ফরিদপুর আর কলকাতার সাঁকো বড় দীর্ঘ, বড্ড নড়বড়ে। সাঁকো পেরিয়ে চলে এলাম এপারে। বিদেশ হয়ে গেল জন্মভূমি। সাঁকোটা ভেঙে গেল।
কলকাতার রাস্তা দিয়েছে টেনিসনের ট্রান্সলেশন, শক্তির সাহচর্য ও সখ্য দিয়েছে, শরতকে দিয়েছে, ফণীভূষণ আচার্যকে দিয়েছে, আর দিয়েছে ‘কৃত্তিবাস’ এর আখড়া। গড়ে উঠেছে আরেক সাঁকো। প্রথম স্বীকৃতিটা বুদ্ধদেব বসুই দিলেন ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ বইতে। আধুনিক কবিদের কবিতা সংকলনের শেষ সীমা নির্দেশ করতে গিয়ে তিনি ভূমিকায় ‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত’ লিখে সুনীলকে বাংলা কবিতার বাঁক বদলে মাইলস্টোনের মর্যাদা দিলেন। তিনি জানেন, অত্যন্ত সাদামাঠা মুখের কথা, চকিত মনের ভাবনাকে কবিতায় তুলে আনার কৃতিত্ব সুনীলের, তাই মনখারাপ নিয়েও তিনি অনায়াসে অসাধারণ কাব্য করতে পারেন—
‘মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই
বিকেল বেলায় একলা একলা পথে ঘুরে ঘুরে
কিছুই খুঁজি না কোথাও যাই না কারুকে চাইনি…’।
কবিতাটার নামই ‘মন ভালো নেই’। কাব্যের নামও তাই। মানুষের মন খারাপ হলে সে যে কি করবে আর কি করবে না, ভেবে পায় না, কি করলে মন খারাপ কাটবে বুঝতে পারে না, সেই এলোমেলো অভিব্যক্তি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে এই কবিতায়। এই কলকাতার পথেই একদিন অ্যালেন গিনসবারগ এসে পাঠ পড়িয়ে দিয়ে গেলেন আত্মরতির।
সেই আত্মরতির সম্মোহন পেরিয়ে আমি সুনীল, মনে ও শরীরে শান্তি চেয়েছি শুদ্ধতা চেয়েছি, সে তো তুমিই দিয়েছ নীরা, তুমি ছাড়া আর কেই বা আছে আমার, ‘বাহান্ন তীর্থের মত তোমার ও-শরীর ভ্রমণে পুণ্যবান হবো।’
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news