তন্ময় দাম:
”মনে পড়ে সেই সুপুরি গাছের সারি
তার পাশে মৃদু জ্যোৎস্না মাখানো গ্রাম
মাটির দেয়ালে গাঁথা আমাদের বাড়ি
ছোট ছোট সুখে সিদ্ধ মনস্কাম।”
বাংলা গদ্য সাহিত্যে বিপুল প্রভাব বিস্তার করলেও দিনের শেষে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিন্তু একজন কবি।
সেই কবির বয়স যখন ১৭, সময়টা ১৯৫১ সাল। অন্তর পছন্দ করেছে যে মেয়েটিকে তাঁকে পড়াবার জন্য একটি কবিতা লিখে পাঠিয়ে দিলেন ‘দেশ’ পত্রিকায়। কারণ, শুনেছিলেন মেয়েটির বাড়িতে নিয়মিত ‘দেশ’ রাখা হয়। অতএব, তাঁর মন পাওয়ার জন্য এই অভিনব বুদ্ধি। সুনীল লিখছেন—“একটি রচনা ঝোঁকের মাথায় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ‘দেশ’ পত্রিকায়। কবি-খ্যাতির আশায় নয়, শুনেছিলাম, কোনো লেখা ছাপা হলে সেই পত্রিকা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। আশ্চর্যের বিষয়, সত্যিই ডাকযোগে একদিন ‘দেশ’ পত্রিকার একটি প্যাকেট পেলাম।” কবিতার নাম ছিল ‘একটি চিঠি’। তবে অনেকেই জানত না ওই কবিতা তাঁর লেখা। কবির ভাষায়— ‘বন্ধুবান্ধব এবং সেই কিশোরী আমায় বলেছিল, দেখেছ, দেশ-এ একজন একটা কবিতা লিখেছে। তোমার নামের সঙ্গে মিলে গেছে। আমিই যে ওটা লিখতে পারি কেউ কল্পনাও করেনি, আমিও বলিনি।’
এই হলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক। একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ইত্যাদি ইত্যাদি। ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জন্ম। জীবনানন্দ-পরবর্তী আধুনিক বাংলা কবিতায় অন্যতম মুখ তিনি। খ্যাতিমান এই সাহিত্যিক বাংলাদেশের ফরিদপুরের মাদারীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। সেখানই শুরু হয় তাঁর শিক্ষাজীবন। শিক্ষাজীবন শেষে কিছুদিন চাকরি করেন। তারপর শুরু করেন সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা করার সময় কবি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রা। আইওয়াতে উপগ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজও করেন। তবে সেই চাকরিতে বেশিদিন ছিলেন না। ফিরে আসেন কলকাতায়। আবার শুরু করেন সাংবাদিকতা।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত কৃত্তিবাস পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। যেটি ধীরে ধীরে সমসময়ের নতুন প্রজন্মের কবিদের ‘প্ল্যাটফর্ম’ হয়ে ওঠে। শক্তি-শরৎ-তারাপদ-সন্দীপন-আনন্দ বাগচীর কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর মধ্যমণি ছিলেন সুনীল। কৃত্তিবাসে প্রধানত ছাপা হত তরুণদের কবিতা ও প্রবীণদের গদ্য।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা দু’শোরও বেশি। সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সাবলীল বিচরণ থাকলেও কবিতার প্রতি ছিল আন্তরিক টান। কবিতাকে তিনি বর্ণনা করেছেন ‘প্রথম ভালোবাসা’ হিসেবে। কে ভুলতে পারবে ‘হঠাৎ নীরার জন্য’, ‘ভোর বেলার উপহার’, ‘সাদা পৃষ্ঠা তোমার সঙ্গে’, ‘সেই মূহুর্তে নীরা’, ‘আমি কিরকম ভাবে বেঁচে আছি’র মতো কবিতাদের কথা! তবে এইসব জনপ্রিয় কবিতার বাইরেও অসংখ্য অনন্য কবিতা লিখে গিয়েছেন এই মহান কবি। যদিও সুনীলকে বেশিরভাগ পাঠক চেনেন ঔপন্যাসিক হিসেবে।
প্রথম উপন্যাসের নাম ‘আত্মপ্রকাশ’। ১৯৬৫ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। লেখাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সুনীল সমালোচকদের প্রশংসা যেমন পান, একইভাবে তাঁর সদ্য প্রকাশিত উপন্যাসের আগ্রাসী ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ (অনেকের কাছে) ভাষার কারণে তীব্র বিতর্কের সূত্রপাত হয়। সত্যজিৎ রায় এই উপন্যাস নিয়ে একটি সিনেমা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তা হয়ে ওঠেনি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের রচিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘সেই সময়’। সিপাহী বিদ্রোহের কয়েক বছর আগের ও পরের বেশ কিছু ঐতিহাসিক চরিত্র জীবন্ত হয়ে ওঠে এই উপন্যাসে। দুই দশক ধরে সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের একটি ছিল ‘সেই সময়’। ১৯৮৫ সালে ‘সেই সময়ে’র জন্য ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কার পান সুনীল। এই ধারার অন্য দুই উপন্যাস হল ‘প্রথম আলো’ ও ‘পূর্ব-পশ্চিম’। ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসের বিষয় ছিল দেশভাগ পরবর্তী বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের জীবন। অন্যদিকে ‘প্রথম আলো’ আঠারো শতকের শেষ ও উনিশ শতকের গোড়ার দিকের বাংলার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বিপ্লবের দলিল হয়ে উঠেছে। এর বাইরেও সুনীলের বিখ্যাত তথা প্রশংসিত উপন্যাসের সংখ্যা কম নয়। তথাপি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নামটা কিন্তু আসলে একজন কবির।
তাই কবিতার কাছেই কেবল অমরত্ব প্রার্থনা করেন তিনি। এ তো কবিরই স্বভাব—এই যে ভালোবাসাকেই ধর্ম বলে মেনেছিলেন তিনি। বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসার ওষুধ প্রয়োগ করে মানুষের সব অসুখ সারিয়ে তোলা যায়।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news