পার্থসারথি পাণ্ডা :
গভীর রাত। দাউ দাউ করে করে জ্বলছে হেদুয়ার ধারে আকাশছোঁয়া আগুনের শিখা। একশ বছর আগেও দমকলের ঠিক সময়ে আসতে অনেক সমস্যা ছিল। কাজেই দমকল আসার আগেই আগুন পুড়িয়ে ছাই করে দিল লণ্ডন বায়স্কোপের গোডাউন। অসংখ্য থিয়েটারের লাইভ ফুটেজ, বিজ্ঞাপনের ছবি, স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক ফুটেজ শেষ হয়ে গেল। সেইসঙ্গে শেষ হয়ে গেলেন লণ্ডন বায়স্কোপের মালিক, বাংলা তথা ভারতীয় ছবির প্রথম ক্যামেরাম্যান কাম পরিচালক হীরালাল সেন।
হীরালালের চলচ্চিত্র ভাণ্ডার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বাংলা ও ভারতীয় সিনেমার প্রথম অধ্যায়ের ইতিহাস নষ্ট হয়ে গেল। হীরালাল ভারতীয় সিনেমার জনক কিনা এ নিয়ে অনেক বিতর্ক, সেই বিতর্ক আজ তৈরি হত না, যদি তার চলচ্চিত্র কীর্তি নষ্ট না হত। সেদিন আগুনের শিখায় শুধু হীরালালেরই কপাল পোড়েনি, পুড়েছিল বাংলা সিনেমা আর বাঙালির কপাল!
উনিশ শতকের শেষ দিকের কথা, ফরাসি বায়স্কোপের একটি দল এলো কলকাতায়। ময়দানে তাঁবু খাঁটিয়ে দেখা নির্বাক, শব্দহীন ছায়াছবি। গত শতকের অষ্টম আশ্চর্য। মানুষ ছবিতে নড়ছে, চড়ছে, নাচছে, নানান ক্যারিকেচার করছে–এর থেকে বড় আশ্চর্য আর কি হতে পারে! সেই আশ্চর্য জিনিস দেখার জন্য ময়দানের তাঁবুতে ভেঙে পড়ল কলকাতা শহরের সমস্ত মানুষ। পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে তাঁবুতে ঢুকে দেখা যায় এই অষ্টম আশ্চর্য! হীরালালও দেখলেন। দেখে মুগ্ধ হয়েই তিনি থেমে গেলেন না। কারণ, তিনি উদ্যমী মানুষ। তাঁর মনে হল, বিদেশিরা যা পারে আমরা পারব না কেন।
সেই সময় কলকাতার পথেঘাটে ছড়িয়ে গিয়ে ছবি তোলার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল আমেরিকা ফ্রান্সের সিনেমা ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তারা তুলতে পছন্দ করত গঙ্গার ঘাটের নানান ছবি, রাস্তার ভিখারি, মাদারির খেলা, সাপ খেলানোর ছবি, রাজারাজড়াদের বিয়ের শোভযাত্রা, কুচকাওয়াজ ইত্যাদি। বিদেশের দর্শক এসব ছবি দেখতে খুব পছন্দ করত। সুযোগ পেলেই হীরালাল ভিড়ে যেতেন এই সব ক্যামেরাম্যানদের সঙ্গে। ছবি তোলা ও প্রসেসিং-এর টুকিটাকি বুঝে নিতেন। তারপর টাকাকড়ি জোগাড় করে বিদেশ থেকে আনালেন একটি ক্যামেরা। র ফিল্ম। প্রজেক্টার।
হীরালাল নেমে পড়লেন ছবি তুলতে সেই মুভি ক্যামেরা নিয়ে। তুলতে শুরু করলেন নগর জীবনের টুকরো টুকরো ছবি। সেই ছবি দেখাতে শুরু করলেন মাঠে ময়দানে বাড়ির উঠোনে পর্দা খাঁটিয়ে প্রজেক্টার চালিয়ে ছবি দেখাতে। নাম দিলেন, লণ্ডন বায়স্কোপ। দিন দিন লণ্ডন বায়স্কোপের জনপ্রিয়তা বাড়তে বাড়তে অল্প দিনেই আকাশ ছুঁল। রাজাগজা জমিদারেরা বাড়িতে বিশেষ কোন অনুষ্ঠান থাকলেই অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য বায়না করে টাকা দিয়ে লণ্ডন বায়স্কোপের ছবি দেখানোর আয়োজন করতে লাগলেন। ধীরে ধীরে এটাই তখনকার পয়সাওয়ালা বড়লোকের কাছে ফ্যাশন ও আভিজাত্য প্রদর্শনের রীতি হয়ে দাঁড়াল। তখন বাংলায় হীরালালের বায়স্কোপ কোম্পানির মতো আর দ্বিতীয় কোন কোম্পানি ছিল না। তাই একচেটিয়াভাবে হীরালাল এই বায়স্কোপ ব্যবসাতে প্রভূত আয় করতে লাগলেন। যেভাবে চলছিল তাতে কিছুদিনের মধ্যেই হয়ত তিনি শুরু করে দিতেন বাংলার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি তৈরির কাজ। কিন্তু সেই ইতিহাস তৈরি হবার আগেই আগুনে শেষ হয়ে গেল হীরালালের ক্যামেরা, ল্যাব, এ-যাবৎ তোলা সমস্ত ফিল্ম। এতদিনের শ্রম নষ্ট হওয়ায়, খুব আঘাত পেলেন হীরালাল, গভীর আঘাত, সেই আঘাত সামলে আবার চেষ্টা করলেন নতুন করে সব কিছু শুরু করতে। পারলেন না। ভাঙা শরীর আর বইল না। তিনি মারা গেলেন। তার পথ ধরে একদিন পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি হল, সিনেমা হল তৈরি হল, তবে তিনি তাঁবুতে যে ছবি দেখানো শুরু করেছিলেন সেই ঐতিহ্য ধরে এই গত দশ পনের বছর আগেও পাড়াগাঁয়ে মফঃস্বলে তাঁবুতে ছবি দেখানো হত…সেই গল্প পরের রবিবার…
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news