গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়: 
পরপর তিনখানি বুলেট (সেরকমই জানা যাচ্ছে) শুজাত বুখারির শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করে আরও একবার প্রমাণ করল বন্দুকের নল মোটেও শেষ কথা বলতে পারে না। হয়তো বাক্যটা হেঁয়ালির মতো শোনাচ্ছে, কিন্তু হেঁয়ালি মোটেও নয়।
দীর্ঘদিন ধরে নির্ভীকতার সঙ্গে শুজাত বুখারি কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে লিখে চলেছিলেন। কাশ্মীর নামক উপত্যকার যে একটা নিজস্ব চরিত্র আছে, একটা স্বাতন্ত্র্য আছে, সেখানকার মানুষদের একান্ত আপন চাহিদা আছে, সে কথা তাঁর লেখায় বারবার উঠে আসছিল। যেখানে যুক্তিবাদের প্রাধান্য সেখানে মস্তিষ্কই হয় একমাত্র শক্তি। যুক্তি বিবর্জিত হয়ে শুধুই যেখানে আবেগ আর অপযুক্তি সেখানে পেশিবলই প্রধান, যা মূলত হিংসার পথ, এবং এটা পরীক্ষিত সত্য যে, সে পথে আর যাই হোক নিশানায় পৌঁছানো যায় না। যদি যেত তাহলে, ইজরায়েল-প্যালেস্টাইনের যুদ্ধ দীর্ঘায়ত হত না, আবার প্রবালপ্রতাপ-সহ হুঙ্কারের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম এক টেবিলে অদৃষ্টকে পরিহাস করতে হাস্যমুখে বৈঠকে বসতেন না। শুজাত বুখারি এবং এ দেশের অনেকেই চাইছিলেন, কাশ্মীরে বহু প্রতীক্ষিত শান্তি না ফিরলেও তার প্রক্রিয়া শুরু হোক। শুজাত বুখারির মৃত্যু সেই প্রক্রিয়ার সামনে একটা প্রশ্নচিহ্ন যে দাঁড় করিয়ে দিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু শুজাত বুখারির মৃত্যু একটি চিরন্তন সত্যকে ফের সামনে নিয়ে এল, মানুষের মস্তিষ্কের শক্তির কাছে এখনও পেশিবল এঁটে উঠতে অপারগ।
বহুজনেই এ কথা বলবেন, যে জঙ্গীরা কিছুতেই চাইছিল না, কাশ্মীরে শান্তির আবহ ফিরে আসুক। রমজান মাসে সেনা অভিযান বন্ধ করে কেন্দ্র একটা বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছিল যে, এবার শান্তি বৈঠক হোক, কিন্তু জঙ্গীরা তা মেনে নিতে পারেনি, ঘোলা জলে মাছ ধরতে অনেক সুবিধা বলেই তারা এমন একজনকে হত্যা করল যিনি স্বয়ং চাইছিলেন, কাশ্মীরে ফের স্বর্গ নেমে আসুক। এবার শুজাত বুখারি প্রসঙ্গ একটু পাশে সরিয়ে রেখে দেখা যাক, কেন কাশ্মীরে জঙ্গীদের এত দাপট।
সে প্রসঙ্গের পথে হাঁটতে গেলে একাধিক প্রশ্ন উঠবে। জঙ্গী কে? যে মনে করছে, সে তার নিজের মাটির জন্য লড়াই করছে সে কি নিজেকে জঙ্গী বলে মনে করে? যে যুবক-যুবতী, এমনকী গৃহবধূরা সেনার দিকে পাথর ছুঁড়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে তারাও কি জঙ্গী? এই গোটা ঘটনার জন্য শুধু পাকিস্তানকে দোষারোপ করলেই কি কাশ্মীর সমস্যার শান্তি ফিরে আসবে? এসব প্রশ্ন আজকের নয়, বহুদিন ধরেই উঠছে। উত্তর পায়নি কেন্দ্র সরকার। অথবা, উত্তর পাওয়ার আগেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফল হিতে বিপরীত হয়েছে। কাশ্মীরের ইতিহাস ভারতের জন্মলগ্ন থেকেই বিতর্কিত। প্রথম দিন থেকেই পাকিস্তান বলতে চেয়েছে কাশ্মীর তাদের। কাশ্মীর কিন্তু তা চায়নি। কাশ্মীরিয়ত চেয়েছিল কাশ্মীর। মনে রাখতে হবে, পাক অধিকৃত কাশ্মীরে পাকিস্তান সরকার মোটেই জনপ্রিয় নয়। হওয়ার কথাও নয়। পাক শিক্ষাবিদ এবং প্রশাসক হুসেন হাক্কানি তাঁর বই, ‘পাকিস্তান বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি’ তে পাকিস্তানের রাজনীতি এবং প্রশাসন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, আইএসআই কীভাবে জঙ্গীদের কাজকর্মের সঙ্গে নিজেদের বারবার জড়িয়েছে। তার ফলে পাকিস্তানও কম ভুগছে না। সমস্ত দিক বিচার করে মোদি সরকারের উচিত, কাশ্মীরে শান্তি বৈঠকের প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া। পাকিস্তানের মতো একইভাবে শুধু সেনা দিয়ে যদি কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালানো হয় তাহলে তা কাশ্মীরিদেরই ক্ষতি করবে, পাকিস্তানের নয়।
এই সঙ্গে আরও একটি কথা মাথায় রাখতে হবে। যাঁরা ইতিহাসের পুনারবৃত্তি করে কাশ্মীরকে সেই আলোকে দেখতে চান- মোদি সরকারের, বিশেষত বিজেপি এবং সঙ্ঘ পরিবারের বহু তাবড় ব্যক্তি সেটাই করতে চান -তাহলে সামনের দিকে এগনো যাবে না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া ভাল কিন্তু পিছিয়ে যাওয়ার অর্থ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া নয়। বদ্ ধাতু থেকে বৎস মানে এটা দাঁড়ায় না বৎসের উৎস বদগিরি। বিষ ধাতু থেকে বিষ্ণুর অর্থ এটা নয় যে, বৈষ্ণবরা বিষের আকর।
সামাজিক সমীকরণ আর পাটিগণিতের সমীকরণ এক হয় না।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news