দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় :
২০০০ সাল। সদ্য মুখ্যমন্ত্রীত্ব থেকে অবসর নিয়েছেন জ্যোতি বসু। উল্টোডাঙায় কৃষি বিপণন দফতরের একটি অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি জ্যোতি বসু। বিকেল চারটের সময় তাঁর আসার কথা। সাংবাদিকরা মূলত তাঁর টানেই তিনটে সাড়ে তিনটে থেকে জড়ো হয়েছে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গনে। কাঁটায় কাঁটায় চারটে, তাঁর কনভয় এসে থামল। মূল মঞ্চের পাশে শামিয়ানা খাটানো হয়েছে, সেখানে প্রবেশ করলেন তিনি।

প্রেসবক্সে একজন রয়েছে, যার শুধুমাত্র বক্তৃতায় রুচি নেই। এক্সক্লুসিভ চাই। চিফ রিপোর্টার কে দেখাতে হবে যে সে কিছু করে এসেছে! শামিয়ানার মধ্যে প্রবেশ করতে সে কোনও বাধা পেল না। দেখল চারিদিকে বড় বড় সোফা পাতা রয়েছে। অভিজাত চেহারার সুবেশ সুবেশা মহোদয় মহোদয়ারা আলো করে রয়েছেন সেই সব আসন। একদম শেষে বাঁ দিকের কোণে একটি তিন জনের বসার সোফায় একা বসে রয়েছেন জ্যোতিবাবু। নিরাপত্তা বেষ্টনীর ঘেরাটোপে। যুবক টি সেই সোফার দিকে এগিয়ে যেতেই একজন সাফারি স্যুট পরা দীর্ঘদেহি ভদ্রলোক এগিয়ে এসে হিন্দিতে জানতে চাইলেন, কি চাই?

ছেলেটি বিশুদ্ধ বাংলায় বলল, একটি ছোট পত্রিকা আছে। ওঁকে দিতে চাই। সাফারি স্যুট জিজ্ঞাসা করলেন, কেয়া পতরিকা?
তিনি যে কিচ্ছু বুঝতে পারেন নি তা তাঁর অভিব্যক্তিতেই স্পষ্ট। বল টা পাস করে দেওয়ার জন্য তিনি বললেন, যাইয়ে, সেক্রেটারি সাব কো পুছিয়ে। সেক্রেটারি সাব তখন খুব ব্যস্ত। অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে তাঁকে। তারই মধ্যে একটি পাতলা পত্রিকা হাতে গলায় প্রেস লেখা কার্ড ঝোলানো উটকো বিপত্তি এসে হাজির! পত্রিকা দেখিয়ে বলে কি না এটা ওঁকে দেবে!
‘আরে তোমায় আর কী বলব! ওঁর শরীরটা একদম ভাল নেই।’ বললেন, সেক্রেটারি সাব মানে জয়কৃষ্ণ ঘোষ।
‘শুধু এটা দিয়ে চলে আসব। তুমি চাইলে তুমিও দিয়ে দিতে পারো।’ বলল প্রেস কার্ড। মুহূর্ত ভেবে জয়কৃষ্ণ ঘোষ বললেন, ঠিক আছে। যাও, দিয়ে এসো। একটাও কথা বলবে না কিন্তু। মনে মনে জয়দার জয়ধ্বনি দিয়ে প্রেসকার্ড গুটি গুটি অগ্রসর হল জ্যোতিবাবুর দিকে। জ্যোতিবাবু এতক্ষণ দেখছিলেন একটি অর্বাচীন ছোকরা তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য ঘুরঘুর করছে।
সামনে গিয়ে দাঁড়াতে তিনি বললেন, কি হয়েছে?
জয়কৃষ্ণ ঘোষের কথা রেখে প্রেসকার্ড কোনও কথা বলল না। শুধুমাত্র পত্রিকা টি তাঁর হাতে তুলে দিল।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কি আছে এতে?
প্রেসকার্ড এবার কি করবে? কথা না বলার কথা দিয়েছে এদিকে প্রশ্নকর্তা স্বয়ং জ্যোতি বসু।
জয়কৃষ্ণ ঘোষ কে মনে মনে প্রেসকার্ড বলল, জয় দা, কেউ কথা রাখে নি। তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না।
সামনে বসা জ্যোতিবাবু কে বলল, আজ্ঞে সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কার বলে কিছু হয় নি। জ্যোতিবাবু বললেন, কেউ যদি কিছু বলে, কি করব? জমি গুলো কোথায় গেল? প্রেসকার্ড অতি উৎসাহী হয়ে বলল, আজ্ঞে উনি বলেছেন, জমি এত দুরে দেওয়া হয়েছে যে জমি তারা রক্ষা করতে পারে না। আর পরিবার বেড়ে যাওয়ার ফলে সে জমি তারা রক্ষা করতেও পারে না।
জ্যোতিবাবু ক্ষণকাল চুপ করে থাকলেন, তারপর বললেন, আপনি আমার ইন্টারভিউ নিতে চান? বলেই পত্রিকা টি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। জয়কৃষ্ণ ঘোষ আগাগোড়া লক্ষ্য রাখছিলেন। এগিয়ে এসে প্রেসকার্ড কে বললেন, বললাম কথা বোলো না। এখন চলো। পরে একদিন দেখছি।সেই পরের একদিন আর কোনওদিন আসে নি। এরপর প্রেসকার্ড আরও বড় হয়েছে। একাধিকবার জ্যোতিবাবুর মুখোমুখি হয়েছে। তাঁর জন্মদিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বাড়িতেও গেছে। এই প্রসঙ্গ আর কোনওদিন ওঠেনি।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news