Breaking News
Home / TRENDING / ভারত বনাম ভারতের লড়াই, জিতবে কে!

ভারত বনাম ভারতের লড়াই, জিতবে কে!

অর্কপ্রভ সরকার 

অদৃষ্টের সঙ্গে অভিসারের ৭০ বছর পার করে ৭১ বছরের দিকে আমরা এগচ্ছি। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর অনেক পণ্ডিত বলেছিলেন, ভারতবর্ষ দেশ হিসেবে বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। পণ্ডিতরা ভারতবর্ষকে অভিহিত করেছিলেন ‘ওয়ান্ডারফুল এক্সপেরিমেন্ট’। তাঁদের চোখে তখনকার ভারতবর্ষের মাত্র দুটো পরিচয় ছিল। সেটা হল পণ্ডিত নেহেরু আর দুর্ভিক্ষ। কিন্তু শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে আমরা টিকে আছি সাত দশকেরও বেশি সময়। কেন?

ভারতবর্ষে দারিদ্র আছে। ক্ষুধাও আছে। কিন্তু আমরা ষোলআনার ওপর আঠারো আনা নিশ্চিত যে ভারতবর্ষ ‘সাব সাহারন’ আফ্রিকার দেশগুলোর মতো কোনওদিন দুর্ভিক্ষের কবলে পড়বেনা। ভারতবর্ষে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আছে। কিন্তু আমাদের দেশ কখনও সোভিয়েতের বলকানাইজেশনের মতো টুকরো টুকরো হবে না। আমাদের সেনা চিরকালই ব্যারাকে থাকবে। প্রতিবেশী পাকিস্তানের মতো রাওয়ালপিণ্ডি কখনও ইসলামাবাদকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে না। ভারতবর্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে ১৯৭৫ সালের জরুরী অবস্থার মধ্যে দিয়ে। দেশের সেই চরম সংকটের সময়েও দেশের সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে চায়নি। এত বৈপরিত্য স্বত্বেও আমাদের স্যালাডের পাত্রের মতো একসঙ্গে থাকার রহস্যটা কি?

এর সবথেকে বড় কারণ হল, আমাদের সহিষ্ণুতা। আমাদের গণতন্ত্রের ভিত অনেক গভীরে প্রোথিত। পাঁচ বছর অন্তর অন্তর দেশের মানুষ তাঁদের দেশের সরকার গড়ার গণতান্ত্রিক অধিকার ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে প্রয়োগ করেন। ভোট হয় অবাধ। আমাদের আমলাতন্ত্র যথেষ্ট পারদর্শী। আমাদের সংবাদমাধ্যম নিরপেক্ষ। দেশের সিংহভাগ মানুষ নিজেদের প্রতিদিনের যাপনের মধ্যে দিয়ে ধর্ম নিরপেক্ষতার শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগ করেন। আর আসমুদ্র হিমাচল দেশবাসীকে একসুত্রে গেঁথে রেখেছে হিন্দি সিনেমা।

যদি আমরা ভেবে দেখি ৭০ দশকের গোড়ায় মেগা হিট ছবি ‘শোলে’-এর কথা। একবার যদি শোলে’র অভিনেতা অভিনেত্রীদের দিকে তাকাই তা হলেই বুঝতে পারব ভারতবর্ষের টিকে থাকার রহস্যটা কি? শোলের প্রধান চার পুরুষ চরিত্র ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধি। অমিতাভ বচ্চন আদতে উত্তরপ্রদেশের মানুষ। ধর্মেন্দ্র পঞ্জাবের লোক। ঠাকুরসাব সঞ্জীব কুমার গুজরাটের বাসিন্দা। আর গব্বর আমজাদের আসা অধুনা পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে। বাসন্তী হেমা মালিনী দক্ষিণ ভারতের মানুষ। জয়া ভাদুরি মধ্যপ্রদেশের বাঙালি। আর সুরকার পঞ্চম ত্রিপুরার বাঙালি। একজন অভিনেতা শেষ মুহূর্তে বাদ গিয়েছিলেন। যিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষ। এর থেকে কী বোঝা যায় না যে হিন্দি সিনেমা ১৩০ কোটি ভারতবাসীকে একসুত্রে গেঁথে রেখেছে!

আমাদের এই ভারত ভাবনার মূলে এখন কুঠারাঘাতের চেষ্টা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ভারতবর্ষ মোটেই স্যালাডের পাত্রের মতো নয়। ভারত আসলে স্যামুয়েল হ্যান্টিংটনের ভাষায় ‘মেলটিং পট ’। একটা পাত্রের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রদেশ এবং অঞ্চলের মানুষ তাঁদের সব বৈচিত্রকে উজাড় করে ঢেলে দেবে। সমুদ্রমন্থনের পর যেরকম অমৃত উঠেছিল, ভারত নামক এই পাত্রের মধ্যে থেকে যে অমৃত উঠে আসবে সেই অমৃত কোনও প্রতিবাদ না করে ১৩০ কোটি ভারতবাসী পান করবেন। সেই অমৃতের নাম হল হিন্দুত্ব। সেই হিন্দু সংস্কৃতি ভারতের ২৯ টি প্রদেশের মানুষকে একসঙ্গে ধরে রাখবে। এটাই বিজেপি-আরএসএসের নতুন ভারত ভাবনা। তাঁদের মতে দেশের ১৩০ কোটি মানুষই হিন্দু। আজকে আমাদের দেশে যে কুড়ি কোটি মুসলমান বাস করেন তাঁরাও একসময় হিন্দুই ছিলেন। তাই সংখ্যালঘু মানুষকেও মেনে নিতে হবে এদেশে থাকতে হলে তাঁদেরকে হিন্দুত্বের মূল ভাবনাকে মেনে নিতে হবে। কারণ, হিন্দুত্বই হল ‘টিনা’। মানে দেয়ার ইস নো অলটারনেটিভ।

অদৃষ্টের সঙ্গে অভিসারের ৭১তম বর্ষপূর্তিতে নেহেরু গান্ধীর ভারত ভাবনার সঙ্গে কার্যত সম্মুখসমর শুরু হয়েছে বিজেপি-আরএসএসের ভারত ভাবনার। নেহেরুর ভারত ভাবনা কী সেটা একটা রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রান্ডভিল অস্টিন। অস্টিন সাহেবের নিজের ভাষায়, “সেদিন ২৭ মে, ১৯৬৪ সাল। আমি পণ্ডিত নেহেরুর দিল্লির তিনমূর্তি লেনের বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়ে  আছি। চারিদিক লোকে লোকারণ্য। কিন্তু সবাই সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে আছে। বহু মানুষের চোখে জল। ভিভিআইপিরা আসছেন। তাঁদের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ঢোকার আলাদা প্রবেশদ্বারও রয়েছে। হঠাৎ আমার সামনে একটা সাদা গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে যিনি নামলেন তাঁকে আমি চিনি। ভদ্রলোকের নাম মেহেমুদ সৈয়দ। লন্ডনে পণ্ডিতজির সঙ্গে পড়াশোনা করেছেন। দেশে ফিরে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণও করেছেন। আদ্যন্ত কংগ্রেসি এই ভদ্রলোক পণ্ডিত নেহেরুর ঘনিষ্ট বন্ধু। গাড়ি থেকে তিনি যখন নামলেন তাঁর দু’চোখে জলের ধারা। তাঁকে দেখতে পেয়ে ছুটে এলেন নেহেরু মন্ত্রিসভার বর্ষীয়ান সদস্য জগজীবন রাম। জাতে তিনি চামার। মেহেমুদ সাহেবের হাত ধরে পণ্ডিত নেহেরুর মরদেহের কাছে তাঁকে নিয়ে গেলেন জগজীবন রাম।” অস্টিন সাহেবের চোখে এটাই আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া। একজন বর্ণহিন্দুর বাড়িতে একজন মুসলমানকে হাত ধরে নিয়ে গেলেন চামার জগজীবন রাম। এটাই ছিল দেশের বেশীরভাগ মানুষের ভারত ভাবনা।

এই ভারত ভাবনার সঙ্গে আর্যাবর্তের হিন্দুত্ববাদীদের ভারত ভাবনার একটা মৌলিক ফারাক আছে। আর্যাবর্তের হিন্দুত্ববাদীরা সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদকেই ভারত ভাবনা বলে মনে করেন। এই লড়াইয়ে শেষ হাসি কারা হাসবেন সেটা ভবিষ্যৎ বলবে। একজন কূটনীতিক ভারত কেন টিকে আছে তার একটা চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। পশ্চিমি দুনিয়া ভারতকে সন্দেহের চোখে দেখে কারণ, আমরা তৃতীয় দুনিয়ার প্রবক্তা। তৃতীয় দুনিয়া আমাদের বিশ্বাস করে না। কেননা আমরা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলি। কমিউনিস্টরা আমাদের ঘৃণা করে কারণ, দেশের উন্নতির প্রাথমিক শর্ত হিসেবে আমরা কোনওদিনই কমিউনিজমকে মেনে নিইনি আর মুসলিম দেশগুলো আমাদের অবিশ্বাস করে কারণ আমরা সেকুলার। তাহলে স্বাধীনতার সাত দশক পরেও আমরা এক হয়ে আছি কীভাবে! আমরা অদৃষ্টের পক্ষে এটা নিয়ে কারওর মনে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু অদৃষ্ট কী আমাদের পক্ষে! এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে।

 

লাইক শেয়ার ও মন্তব্য করুন

বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন 

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *